মেটা মামলায় হারলে বদলে যাবে ইনস্টাগ্রাম-ফেসবুক!
যোগফল পোর্টাল ডেস্ক | ১৮ আগস্ট ২০২৬
তরুণ ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষতিকর প্রভাব তৈরি এবং শিশু-কিশোরদের গোপনীয়তা রক্ষায় আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে আইনি চাপে রয়েছে Meta Platforms। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ৩০টি অঙ্গরাজ্যের করা একটি মামলার জুরি ট্রায়াল মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) শুরু হচ্ছে। মামলায় মেটা হেরে গেলে যুক্তরাষ্ট্রে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ব্যবহার-পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হতে পারে।
২০২৩ সালে ক্যালিফোর্নিয়া, নিউইয়র্কসহ ৩০টি অঙ্গরাজ্য মেটার বিরুদ্ধে মামলাটি করে। এতে অভিযোগ করা হয়, শিশু ও কিশোরদের সুরক্ষা এবং গোপনীয়তা রক্ষায় ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্যের একাধিক আইন লঙ্ঘন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
মামলায় অঙ্গরাজ্যগুলো মেটার কাছে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। পাশাপাশি ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের বেশ কিছু জনপ্রিয় ফিচার পরিবর্তনের দাবিও জানানো হয়েছে।
যেসব ফিচারে পরিবর্তনের দাবি
মামলাকারী অঙ্গরাজ্যগুলোর দাবির মধ্যে রয়েছে—
- ব্যবহারকারীদের পোস্টে ‘লাইক’ সংখ্যার প্রদর্শন বন্ধ করা;
- অনন্ত স্ক্রল বা ‘ইনফিনিট স্ক্রল’ ব্যবস্থা বন্ধ করা;
- কিশোর ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে অভিভাবক যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু করা;
- তরুণদের দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখার উদ্দেশ্যে তৈরি সুপারিশ অ্যালগরিদমে পরিবর্তন আনা;
- ব্যক্তির চেহারা পরিবর্তন করে এমন কিছু ইমেজ ফিল্টার সরিয়ে দেওয়া;
- ভিডিওর স্বয়ংক্রিয় চালু হওয়া বা ‘অটোপ্লে’ বন্ধ করা;
- একজন ব্যবহারকারীর একাধিক অ্যাকাউন্ট তৈরির সুযোগ সীমিত বা নিষিদ্ধ করা;
- নির্দিষ্ট সময় পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে অদৃশ্য হয়ে যায় এমন ‘এফেমেরাল’ পোস্ট বন্ধ করা।
অঙ্গরাজ্যগুলোর অভিযোগ, এসব ফিচারের অনেকগুলো এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যাতে ব্যবহারকারীরা প্ল্যাটফর্মে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন এবং বারবার ফিরে আসেন। তরুণদের অ্যাপ থেকে দূরে থাকা কঠিন করে তুলতে ঘন ঘন নোটিফিকেশন পাঠানোর মতো কৌশলও মেটা ব্যবহার করে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
‘আসক্ত’ করে ব্যবসা বাড়ানোর অভিযোগ
মামলায় অঙ্গরাজ্যগুলোর অভিযোগ, শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্ত করে তুলতে মেটা ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ানো এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের চেষ্টা করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
মেটা অবশ্য এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র বলেন, তারা অভিযোগগুলোর সঙ্গে দৃঢ়ভাবে দ্বিমত পোষণ করেন। তরুণদের সহায়তার ক্ষেত্রে মেটার দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে এবং আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণেও সেটি উঠে আসবে বলে তারা আত্মবিশ্বাসী।
বিচারকের আদালতেই হবে গুরুত্বপূর্ণ শুনানি
মামলাটির শুনানি হবে ক্যালিফোর্নিয়ার প্রধান ফেডারেল বিচারক ইভন গনজালেজ রজার্সের আদালতে। বহুল আলোচিত ইলন মাস্ক ও স্যাম অল্টম্যানের মামলাটিও তার আদালতে হয়েছিল।
প্রায় দুই দশক ধরে বিচারকের দায়িত্ব পালন করা গনজালেজ রজার্স বেঞ্চে সরাসরি ও তীক্ষ্ণ অবস্থানের জন্য পরিচিত। ফলে তার আদালতে শুরু হতে যাওয়া এই বিচারকে মেটার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিউ মেক্সিকোর রায়েও বড় ধাক্কা
এরই মধ্যে নিউ মেক্সিকোতে মেটার বিরুদ্ধে করা আরেকটি মামলায় প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। সেখানে বিচারক ব্রায়ান বিডশেইড মেটাকে মোট ৯৪ কোটি ২০ লাখ ডলার জরিমানা করেছেন এবং প্ল্যাটফর্মে বেশ কিছু পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছেন।
নির্দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ‘লাইক’ সংখ্যা প্রদর্শন বন্ধ করা, কিশোরদের মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মে নগ্ন ছবি পাঠানো বা গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা এবং দিনের নির্দিষ্ট সময়ে পুশ নোটিফিকেশন সীমিত করা।
বিচারক বিডশেইড মেটার প্ল্যাটফর্মগুলোকে একটি ‘জনদুর্ভোগ’ হিসেবে উল্লেখ করে এমন একটি কারখানার সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা বাতাসে দূষণ ছড়িয়ে মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে এবং যার প্রভাব পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর পড়ছে।
মেটা অবশ্য ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানিয়েছে।
রায় মেটার বিরুদ্ধে গেলে প্রভাব পড়তে পারে পুরো যুক্তরাষ্ট্রে
নিউ মেক্সিকোর রায়ের নির্দেশনা মূলত ওই অঙ্গরাজ্যের জন্য প্রযোজ্য। তবে এবার ৩০টি অঙ্গরাজ্যের করা মামলায় মেটা হেরে গেলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
মামলায় থাকা অঙ্গরাজ্যগুলোর সম্মিলিত জনসংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। ফলে এসব অঙ্গরাজ্যের দাবির পক্ষে রায় গেলে শুধু জরিমানা নয়, পুরো যুক্তরাষ্ট্রে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের বিভিন্ন ফিচার ও কার্যপ্রণালিতে পরিবর্তন আনার চাপ তৈরি হতে পারে।
‘লাইক’ নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ
ফেসবুকের শুরুর সময় থেকেই ‘লাইক’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অন্যতম পরিচিত ফিচার। বর্তমানে প্রায় সব বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই কোনো না কোনো ধরনের এনগেজমেন্ট মেট্রিক ব্যবহৃত হয়। তবে তরুণদের ক্ষেত্রে এসব মেট্রিকের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উদ্বেগ বেড়েছে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ‘লাইক’ সংখ্যার মতো এনগেজমেন্ট মেট্রিক কিশোরদের মধ্যে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অনুভূতি ও বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। মেটার নিজস্ব গবেষণাতেও লাইক সংখ্যা ব্যবহারকারীদের মধ্যে সামাজিক তুলনা বাড়াতে পারে বলে উঠে এসেছে।
অর্থাৎ অন্যের ছবি, জীবনযাপন বা জনপ্রিয়তার সঙ্গে নিজের অবস্থান তুলনা করে নিজের মূল্যায়ন করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। ইনস্টাগ্রামকেন্দ্রিক এই সামাজিক তুলনার সঙ্গে একাকিত্ব, নিজের শরীর নিয়ে নেতিবাচক ধারণা এবং নেতিবাচক আবেগের সম্পর্ক থাকার কথাও মেটার অভ্যন্তরীণ গবেষণায় উঠে এসেছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মেটার অভ্যন্তরীণ গবেষণাও আদালতে
৩০ অঙ্গরাজ্যের মামলায় মেটা জানিয়েছে, তারা এরই মধ্যে ২০ লাখের বেশি নথি আদালতে জমা দিয়েছে। মামলার আইনজীবীরা এসব নথির মধ্যে মেটার নিজস্ব গবেষণার তথ্যও তুলে ধরছেন।
নিউ মেক্সিকোর মামলার রায়েও তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। বিচারক বিডশেইডের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো যেভাবে পরিচালিত হয়েছে, তা তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
কী হতে পারে মেটা হারলে?
মামলায় মেটা হেরে গেলে প্রতিষ্ঠানটিকে শুধু বিপুল অঙ্কের জরিমানা গুনতে হতে পারে—বিষয়টি এমন নয়। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের দীর্ঘদিনের বেশ কিছু জনপ্রিয় ফিচার, নোটিফিকেশন ব্যবস্থা এবং ব্যবহারকারীদের কাছে কনটেন্ট পৌঁছানোর অ্যালগরিদমেও পরিবর্তন আনতে হতে পারে।
বিশেষ করে ‘লাইক’, ইনফিনিট স্ক্রল, অটোপ্লে, সুপারিশ অ্যালগরিদম ও কিশোরদের অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এলে যুক্তরাষ্ট্রে তরুণদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের অভিজ্ঞতাই আমূল বদলে যেতে পারে।
ফলে ৩০ অঙ্গরাজ্যের এই মামলার রায় শুধু মেটার জন্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রের পুরো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খাতের ভবিষ্যৎ ব্যবহারের ধরন নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তানজিলা / অনলাইন
ডেস্ক / যোগফল.কম

আপনার মতামত লিখুন