২৫ বছরের অপেক্ষার অবসান, চলতি শিক্ষাবর্ষেই বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি
ছবি সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক:
দীর্ঘ ২৫ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে নতুন আইন ও নামে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়। চলতি ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষেই গুচ্ছ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্যে একাডেমিক ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী একাডেমিক ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান উপাচার্য অধ্যাপক ড. কুদরত-ই-জাহান। বগুড়ার সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রথমবারের মতো মতবিনিময়ের জন্য এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য বলেন, ২০০১ সালে বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নামে আইন পাস হলেও প্রতিষ্ঠানটি বাস্তবে যাত্রা শুরু করতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ৪ জুন রাষ্ট্রপতি তাকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেন। তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে বৃহৎ পরিসরে বহুমাত্রিক বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
তিনি বলেন, গত ১৬ জুলাই নতুন আইনের গেজেট অনুমোদন পায় এবং ১৯ জুলাই আইনটি কার্যকর হয়। ২০০১ সালের আইনের সঙ্গে বর্তমান আইনের প্রায় ৯৯ শতাংশ পার্থক্য রয়েছে। নতুন আইন কার্যকর হওয়ার আগে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। তবে গত আড়াই মাসে একাডেমিক ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি অনেকটাই সম্পন্ন করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে জরুরি ভিত্তিতে চারজন কর্মকর্তা ও সাতজন কর্মচারীসহ মোট ১১ জনকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান উপাচার্য।
তিনি আরও জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭ সদস্যের সিন্ডিকেটের মধ্যে এখন পর্যন্ত ছয়জন সদস্য পাওয়া গেছে। ন্যূনতম নয়জন সদস্যের ফোরাম পূর্ণ হলে সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, শহরের যানজট এড়ানো, মাঠ, কাঁচাবাজার ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ বিবেচনায় নিয়ে অস্থায়ী ক্যাম্পাসের ভবন নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে স্মার্টবোর্ড সংবলিত শ্রেণিকক্ষ, কম্পিউটার ল্যাব, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানির সুবিধা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন ও অধ্যাপক মুনিয়ারের নেতৃত্বে গঠিত একটি প্রতিনিধিদল সম্প্রতি বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
চাকরির বাজারের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে নয়টি যুগোপযোগী বিষয় চালুর প্রস্তাব ইউজিসির কাছে তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান উপাচার্য। প্রস্তাবিত বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিক্স, কম্পিউটার সায়েন্স ও ফিনটেক (ফিন্যান্সিয়াল টেকনোলজি)।
তিনি বলেন, ইউজিসির চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া মাত্রই মার্চে নির্ধারিত গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তির কার্যক্রম শুরু করা হবে।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে উপাচার্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান সৃষ্টির জায়গা। একজন অযোগ্য শিক্ষক দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতির কারণ হতে পারেন। স্বজনপ্রীতি বা সুপারিশের ভিত্তিতে কোনো শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে না। যোগ্য প্রার্থীরাই নিয়োগের সুযোগ পাবেন।
সংবাদ সম্মেলনে বগুড়া টেলিভিশন রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি মোহন আখন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক অনুমোদন, প্রস্তাবিত নয়টি বিভাগ, ভর্তি পরীক্ষার সময়সূচি এবং মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া দ্রুত চূড়ান্ত করার আহ্বান জানান।
বগুড়া প্রেস ক্লাবের সভাপতি রেজাউল হাসান রানু উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রস্তাবিত অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক কাঠামোয় আঞ্চলিক চাহিদার প্রতিফলন রাখার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ২০০১ সালে পাস হওয়া আইনটি দীর্ঘদিন কার্যকর না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। তাই নতুন উদ্যোগে আর বিলম্ব না করে চলতি শিক্ষাবর্ষ থেকেই শিক্ষার্থী ভর্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি স্থায়ী ক্যাম্পাসের স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সমন্বিত ক্যাম্পাস কাঠামো বিবেচনায় রাখার জন্য উপাচার্য ও জেলা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
শিক্ষাবিদ ও গবেষক ড. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা সায়েন্সনির্ভর আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অন্যদিকে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক প্রতিনিধি মেহেরুল সুজন উত্তরাঞ্চলে পেশাদার সাংবাদিকতার বিকাশ এবং গণমাধ্যম চর্চার সুযোগ বাড়াতে বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগ খোলার প্রস্তাব দেন।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে উপাচার্য অধ্যাপক ড. কুদরত-ই-জাহান জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনায় সাংবাদিকতা বিভাগ অন্তর্ভুক্তির চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক মানের মডেল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
তুলি আক্তার/ অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম

আপনার মতামত লিখুন