গণমাধ্যমের কারণে করোনা ‘তথ্য মহামারিতে’ রূপ নিচ্ছে?

আসাদুল্লাহ বাদল

28 Mar, 2020 02:15pm


গণমাধ্যমের কারণে করোনা ‘তথ্য মহামারিতে’ রূপ নিচ্ছে?
আসাদুল্লাহ বাদল

গণমাধ্যম সর্বদাই করোনায় আক্রান্ত রোগের ঘটনা, রোগীর চিকিৎসা, সরকারি ব্রিফিংসহ যাবতীয় সংবাদ প্রচারণা চালাচ্ছে। জনগণের কি করা উচিত এমন সতর্ক বার্তা, উপদেশ ও পরামর্শও প্রচার করছে। মোটাদাগে সব খবরই প্রচার হচ্ছে। অনেকটা গণমাধ্যম হয়ে ওঠছে করোনা নির্ভর। এটা অনেকটা তথ্য মহামারিতে রূপ নিচ্ছে। এরই মধ্যে অনেকে মনগড়া ডাক্তারি, কবিরাজি ফর্মুলাও জারি করছে। রোগটি ছোঁয়াছে নয় এমন ফতোয়াও চেখে পড়ছে। মধু খেলেই সফল হওয়া যেতে পারে কিংবা কালিজিরা খেলে আর কিছু দরকার নেই এমন প্রোপাগান্ডাও দেখা যায়। এসব ব্যাপারকে আমলে নিয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।

বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা, জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান ইউনিসেফ ও সরকারি প্রতিষ্ঠান যেসব প্রচারণা চালাচ্ছে এরচেয়ে গায়েবি প্রচারণা অনেক সময় জোরদার হচ্ছে। যে কোন বয়সী মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারার আশংকা থাকলেও শিশু ও বেশি বয়সীরা আক্রান্ত ঝুঁকিতে এই অজুহাতে যুবক ও মধ্য বয়সীরা এই ভাইরাস আতংককে কম গুরুত্ব দিচ্ছে। অনেকের ধারণা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই রোগের প্রাদুর্ভাব থাকায়, গ্রামের মানুষ ঝুঁকিমুক্ত। যা মোটেও সত্য নয়। সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করার ক্ষেত্রেও নিয়ম মানা হচ্ছে না। অনেক স্থানে এখনও ভিড় দেখা যাচ্ছে।

করোনা নির্ভর হয়ে ওঠার মধ্যে কোন সমস্যা তৈরি হচ্ছে কিনা এটি বিবেচনায় রাখা উচিত। যে দেশে গুজব ছড়াতে পারে, মিথ্যা ঘটনা খবর হিসাবে প্রচার হতে পারে, অবৈজ্ঞানিক ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন তথ্য আসল তথ্য হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে, সেখানে গণমাধ্যমের ভূমিকা হওয়া উচিত, উন্নত বিশ্বের চেয়ে অধিক বলিষ্ঠ। কারণ উন্নত বিশ্বের মানুষ তুলনামূলক বিজ্ঞানমনস্ক হয়। কিন্তু আমাদের দেশে বিজ্ঞানচিন্তার চেয়ে বাতাসে ভেসে বেড়ানো কথা আমলে নেওয়ার প্রবণতা বেশি রয়েছে। হঠাৎ আমুল পরিবর্তন আনা সম্ভব না হলেও গণমাধ্যম একাট্টা হয়ে এই প্রচারণা চালালে বাজে প্রচারণা টিকতে পারবে না।

যেখানে পাঠকের ফিল্টারিং ধারণা একবারেই কম [অনুগ্রহ করে কোন পাঠককে ছোট করে দেখছি এটি ভাববেন না]। কারণ যেসব প্রতিক্রিয়া স্যোসাল মিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে তাতে এমন মনে হয়, যেদিন নতুন রোগীর খবর থাকেনা, এদিন কেউ কেউ হতাশ হন।

ইতিপূর্বে সংবাদপত্র একাধিকবার একই সম্পাদকীয় প্রকাশ করে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে এমন দৃষ্টান্ত আছে। তখন অবশ্য গণমাধ্যম বলতে কেবল সংবাদপত্রই ছিল। এখনও একই বিষয় সংবাদপত্র, অনলাইন পোর্টাল, রেডিয়ো, টেলিভিশন, কমিউনিটি রেডিয়ো, ভিডিয়ো চ্যানেলসহ অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো বিজ্ঞানমনস্ক চিকিৎসা সহায়ক রচনা একযোগে প্রচার করার ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এজন্য বৈঠক করার দরকার নেই। আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি সম্মিলিত রচনা বা ডকুমেন্টারি প্রচার করা যায়।

যদি এমন রচনা প্রচার করে আহবান জানানো হয়, যাতে সকল স্যোসাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা অন্তত একবার ওই রচনার পোস্ট শেয়ার করেন। এতে আবোল তাবোল অনেক প্রচারণা সামনে আসতে পারবে না। আবার প্রকৃত তথ্য প্রচার পাবে সকলের জন্য। একে তৈরি হবে একটি সচেতনার ভিত। যা থেকে বিভ্রান্তি কেটে মানুষ যতদিন করোনা রোগের ভ্যাকসিন বা ঔষুধ হাতে না পাচ্ছে, ততদিন সাবধানে থাকতে পারে।

প্রিয়জন আক্রান্ত হওয়ার খবর, মারা যাওয়ার খবর সবসময় খারাপ খবর। করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তিকে দাফন করার বিশেষ কৌশল অবলম্বন করার কারণে নিজে বেঁচে থাকার কায়দায় মানুষের মনোজগতে বড় মহামারি দেখা দিয়েছে। মনোবিজ্ঞানী স্টিভেন টেইলর জনমানসের এই এই প্রতিক্রিয়া দেখেছেন।

যেসব দেশে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে, বাংলাদেশ ওই সব দেশের তুলনায় অনেক ভালো অবস্থায় রয়েছে। এখানে টানা ১০ দিনের ছুটিতে মানুষকে যেভাবে দিনযাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সেভাবে মানুষ থাকতে চাচ্ছে না বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু কেন মানুষ বিপদকে আঁচ করতে পারছে না? ঘরে বসে থাকাকে কেউ ক্ষমতাহীনতা মনে করছে কিনা এটি ভেবে দেখা দরকার।

মোটাদাগে গণমাধ্যম একত্রে একটি অবস্থায় জনগণকে নিতে চাইলে পারবে বলে মনে হচ্ছে। এক্ষেত্রে আরও ভিন্নমত, দ্বিমত থাকতে পারে। তবু চেষ্টা করতে বারণ কোথায়?



এই বিভাগের আরও