গুজবের সীমারেখা কতটুকু, কেউ কী জানেন?

আসাদুল্লাহ বাদল

31 Mar, 2020 05:09am


গুজবের সীমারেখা কতটুকু, কেউ কী জানেন?

খালি কলসে থাকা ছিদ্র খোঁজে পাওয়া বড়ই কঠিন। পানি ভর্তি করলে তবেই, কোথায় ছিদ্র, কিভাবে পানি চুইয়ে পড়ে এটি ঠাহর করা যায়। ছোট ছিদ্র দিয়ে অল্প পানি পড়তে পড়তে এক সময় কলস খালি হয়ে যায়। গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মুক্তমত, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিজ্ঞানচেতনা ও বিজ্ঞান মনস্কতা চুইয়ে কিভাবে কুসংস্কার টিকে থাকে, এটি পানি ভর্তি কলসের মতো প্রমাণ করা যায় না। কুসংস্কারের কারণে কিভাবে ডিজিটাল অগ্রগতি চুইয়ে পড়ে এটিরও হিসাব মেলানো কঠিন। গালগল্প বিকাশ না করে প্রকৃত বাস্তবতার বিকাশ ঘটানো জরুরি হলেও কারও নজর এই দিকে থাকে না। ব্যক্তিগত লাভ ও মুনাফা সমাজে এমন বিস্তার লাভ করেছে, যৌথ উদ্যোগ একেবারেই চুইয়ে পড়েছে।

দেরিতে হলেও বাণী এসে কানের কাছে ধাক্কা দিয়েছে গণমাধ্যম ও সরকার একত্রে কাজ করলে গুজব থামানো যায়। গুজব প্রতিরোধে কার্যকর কোনও উদ্যোগ না নিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন দিয়ে শাস্তির ভয় দেখালে আদৌ গুজব থামবে কিনা সন্দেহ পোষণ করি। সরকারি বিভিন্ন দফতর ও পুলিশ বিভাগ গুজব না ছড়ানোর আহবান জানিয়েছেন। আসল ঘটনা কি, আসল ঘটনার কতটুক বাইরে গেলে সেটি গুজব হবে, এই বাণী কারও জানা আছে কিনা এটি মোটেও স্পষ্ট নয়।

সত্য ঘটনা ও গুজবের সীমারেখা কতটুকু। কোনটা সত্য, কোনটা গুজব এটি পরিমাপ করে কে? কমপক্ষে আটজন মন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তর্ক বিতর্ক হয়েছে। অন্য মন্ত্রীদের নিয়ে হয়নি। তাহলে বলতে বাধা কোথায় যে আটজন মন্ত্রীর বক্তব্য মানুষ পছন্দ করেনি। অথবা তারা প্রাসঙ্গিক বক্তব্য দিতে পারেনি। করোনা ভাইরাস নিয়ে যে প্রচারণাই চালানো হউক না কেন, জনমনে নানা প্রশ্ন রয়েছে। এসব প্রশ্ন কেন উদয় হয়, এই উত্তর জানা জরুরি। উত্তর দেওয়ার সক্ষমতা না থাকলে, আইনের ভয় দেখিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায় কি?

এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী, করোনা ভাইরাসের লক্ষণ দেখা যাওয়া সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তির তথ্য প্রচারে সীমারেখা জারি করা হয়েছে কি? গণমাধ্যমকর্মী কিংবা আরও অনেক কর্মকর্তারা এসব বিষয় পরিষ্কার কিনা এই সন্দেহ রয়েছে। ফলে গণমাধ্যম ব্যবহার করা সাধারণ জনতাকে সবক দেওয়ার আগে একটা সীমারেখা ঘোষণা করা জরুরি।

জনগণের সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে প্রেসনোট নিয়ে মন্দ ধারণা। এই মন্দ ধারণা বিকাশ হয়েছে যুগে যুগে। হঠাৎ পরিবর্তন আশা করাও উচিত মনে হয় না। মানুষ মোটেও মরতে চায় না। কেন এখনও করোনার চিকিৎসা আবিষ্কার হয়নি, এই অভিযোগ নেই। কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য স্বস্তির তথ্য পাওয়া মানুষ অধিকার মনে করে। যদিও চিকিৎসা সাংবিধানিক অধিকার।

হাতে হাতে মোবাইল ফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ, কমপিউটার বিস্তার হয়েছে। মোবাইল ফোন কেবল ফোনে ব্যবহার হয়, তা নয়। ফেসবুক চালানো, ভিডিয়ো কলে কথা বলা, মেসেজ ডেলিভারি দেওয়ারও বিস্তার ঘটেছে। এসব ঘটনাকে আমরা ডিজিটালাইজেশন বলে তৃপ্তি বোধ করি। এসব প্রক্রিয়া পদ্ধতিতে এক গোষ্ঠী সাইদীকে চাঁদে দেখিয়েছিল। তাতে প্রায় ৭০ জন নিহত হয়। কেন গুজব ছড়িয়ে পড়ে, বিজ্ঞানচেতনা কেন কাজে লাগানো যায় না?

গত বছর ৪২ জন মানুষ গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে। ছেলেধরা আতঙ্ক, পদ্মাসেতু নির্মাণে মাথা দরকার এহেন গুজব ছড়িয়ে পড়ে । শিক্ষাদীক্ষার এত উন্নতির পরও কেন আমাদের সমাজে বিশ্বাস হয়, সেতু নির্মাণে মাথা লাগতে পারে? কোনটি লৌকিক, কোনটি অলৌকিক, এই ব্যাপারে ধারণা বিস্তারে ভূমিকা  রাখতে পারে গণমাধ্যম। গণমাধ্যমকে প্রণোদনার আওতায় আনার কোনও সম্ভাবনা আছে কি?

বিজ্ঞান শিক্ষা মারাত্বক হারে কমেছে। যেটুকু আছে এতে সমাজে অগ্রগতি সাধন হলে গুজবের ডালপালা ছড়ানোর কথা নয়। বিজ্ঞান পড়লেই কেউ বিজ্ঞানমনস্ক হয়, এটা মোটেও ঠিক নয়। অশিক্ষিত মানুষও বিজ্ঞানমনস্ক হতে পারে। বিজ্ঞানের প্রযুক্তি ব্যবহার করে জঙ্গিবাদী কার্যক্রম বিকাশ হচ্ছে। বিশেষ সময়ে দেশব্যাপি বিজ্ঞান বিরোধী বয়ান চালু থাকে। এসব কর্মকাণ্ডে প্রগতিশীলরাও অংশ নেয়। ভোটের রাজনীতি ও ক্ষমতার দাপট কার্যকর রাখতে বিজ্ঞানের বাক্স চুইয়ে পড়ে।

ভাষা আন্দোলন, দাঙ্গা, মুক্তিযুদ্ধকালে একই সম্পাদকীয় একাধিক দৈনিকে প্রকাশের রেওয়াজ আছে। দেশে এখন সম্পাদক পরিষদ আছে। টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন আছে। এফএম রেডিয়ো, কমিউনিটি রেডিয়ো, অনলাইন পোর্টালের অভাব নেই। আট হাজার আবেদন জমা পড়েছে বলে জানা গেছে। সকলে মিলে গুজব বিরোধী একটা প্রচারণায় মানুষের জীবন বিনাশকারী এই বিপদ কি কাটিয়ে তোলা যায় না?

সরকার মোবাইল কোম্পানির মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাপারে এসএমএস দিয়ে থাকে। এই ব্যাপারে একটা এসএমএস দিতে বাঁধা কোথায়? সব গণমাধ্যম ইচ্ছা করলেই সচেতনতামূলক কর্মসুচি পালন করতে পারে।

সরকারের বিভিন্ন দফতর ভূমিকা পালন করতে পারে। স্থানীয় সরকার বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন প্রচারণা চালাতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ এনজিওগুলো সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে পারে। কিন্তু কেউ কিছু বলতে চাচ্ছে না বা বলার ধরণটা মোটেও গ্রাহ্য হচ্ছে না।

আসাদুল্লাহ বাদল : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক যোগফল। ৩১ মার্চ ২০২০।



এই বিভাগের আরও