করোনামুক্ত বিশ্ব কেমন হওয়া উচিত

আসাদুল্লাহ বাদল

03 Apr, 2020 07:01am


করোনামুক্ত বিশ্ব কেমন হওয়া উচিত

“পরিবেশে যারা আঘাত করে পৃথিবী তাদের বরদাস্ত করতে পারে না। তাড়াতাড়ি সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে। প্রকৃতি যেন নিজের নিয়মে পরিচ্ছন্ন থাকতে চেষ্টা করে। তাই যুগ যুগ যত জীবকে এনেছে এবং তাদের অধিকাংশকে পরিত্যাগ করেছে।” জনবিস্ফোরণ ও পরিবেশ সমস্যা, সুধাংশু পাত্র, দেজ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৯৯৯। পৃষ্ঠা ০৯।

বর্তমান প্রজন্ম ইতিহাসের উত্তরাধিকার দেখা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সুযোগ কেবল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকেই সম্ভব। এর আগের আর কোনও বিপদ বিশ্বময় একত্রে অনুধাবনের সুযোগ নেই। এখনও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখা মানুষের অস্তিত্ব থাকার কারণে এটি বলা সম্ভব হচ্ছে।

মানুষ তার পৃথিবীকে এমনভাবে সর্জন [সৃজন] করেছে, যাতে নানা বিপদ থাকলেও এমন মহামারির আশংকা করেনি। যেখানে গোটা মানবজাতি থমকে যেতে পারে। আরও কতদিন পারে এই মহামারির চিকিৎসা মানুষের হাতের নাগালে আসতে এটি এখনও নিশ্চিত নয়। ১২ থেকে ১৮ মাসের হিসাব কষা হচ্ছে। যদি আগেই পাওয়া যায়, হয়তো এই যাত্রায় স্বস্তি মিলবে।

মানুষ বরাবর আশাবাদী বলে এই আশাও জারি রেখেছে যাতে মানূষ শূন্য হবে না পৃথিবী। হয়তো হঠাৎ মানুষের স্বপ্নে ধস নেমেছে। এরপরও মানবজাতিকে টিকিয়ে রাখতে, নিজেকে টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা চালাচ্ছে মানুষই। মানুষ ছাড়া পৃথিবীর আদৌ কানাকড়ি দাম আছে কিনা, এটি নতুন করে উপলদ্ধি করছে মানুষ নিজেই।

মানুষ নিজেই পৃথিবী ধ্বংস করে ফেলার মতো মারণাস্ত্র তৈরি করে বসে আছে। কিন্তু যে শত্রুতার কারণে পারমানবিক ও রাসায়নিক অস্ত্র, সেই শত্রুতা টিকে থাকবে তো? মহামারি যদি মানুষ শূন্য হয়ে যায় তাহলে আর মারণাস্ত্রের দরকার কি?

আশাবাদী মানুষ যদি টিকে যায়, তাহলে আর কোনও মারণাস্ত্র তৈরি করব না। বিদ্যমান মারণাস্ত্র বিনাশ করব। এমন ঘোষণা কি দেওয়ার মতো বিবেচনা মানুষ করতে পারে না।

জলবায়ু পরিবর্তন হয়েছে বিশ্বব্যাপী মানুষের কারণে। মানুষই এহেন বিষময় পরিবেশ তৈরি করেছে। সমুদ্রের পিষ্ঠ উচ্চতা বেড়েছে মানুষের কারণে। পৃথিবীর বিরাট এক অংশ তলিয়ে যেতে পারে মানুষের কারণেই। প্রকৃতির ওপর নিষ্ঠুর চাপ বারবার তৈরি করছে মানুষ। নতুন বিপদ আচ করে অন্তত মানুষকেই অঙ্গীকার করতে হবে ভবিষ্যত পৃথিবীর।

কয়েকমাস আগে পৃথিবীর হৃদপিন্ড বলে পরিচিত আমাজন বন পুড়েছে। করোনা আক্রান্ত হওয়ার সময়ও কানাডায় আগুনের ঘটনা ঘটেছে। অস্ট্রেলিয়া আগুন নিভাতে নানা টালবাহানা করেছে। মোট জমির অন্তত ২৫ শতাংশ বন থাকা জরুরি হলেও বাংলাদেশে ১০-১২ শতাংশের বেশি বন আছে বলে হিসাব মিলানো যাচ্ছে না। অন্তত ৩০ বছর আগের হিসাবে বাংলাদেশে ১৭ শতাংশ বনের কথা জানা যায়। ২৫ শতাংশ বনের বৃদ্ধি না করে, কমিয়ে ফেলা হয়েছে এতে তেমন কোনও সন্দেহ নাই।

নদী খাল বিল এখন মাছ ও মানুষের জন্য নয় বলেই মনে হচ্ছে। পানিতে বাস করে এমন প্রাণি কোথায় বাস করবে, এটি যেন মানুষ ভাবনার বাইরে রেখেছে। যে পানিতে চেহারা দেখা যেত, ওই পানি এখন আলতরার মতো। যে পানিতে গোসল করা যেত, ওই পানিতে এখন নামলেই চুলকানো শুরু হয়। পরিকল্পনা মেনে কোনও শিল্প গড়ে না তোলার কারণে জলাবদ্ধতা মারাত্বক আকার ধারণ করে।

চিকিৎসা পদ্ধতিতে করোনা ভাইরাসের ঔষুধ না থাকায় মানুষের তেমন খেদ নেই। কিন্তু চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের খেদ রয়েছে। প্রশাসন ও পুলিশ ক্রান্তিলগ্নে ভূমিকা পালন করে জনমনে সন্তুষ্টি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
এখনই মানুষের উচিত ভবিষ্যতে অন্তত মানুষ না ঠকানোর অঙ্গীকার করা। মানুষকে শোষণ করে, মানুষকে বিরক্ত করে, মানুষ সুুখে থাকতে পারে বলে মনে হয় না। তবু মানুষ সাময়িক সুখের নকল প্রত্যাশায় প্রতারণার আশ্রয় নেয়।
যেসকল নেগেটিভ ধারণা মানুষের বিপরীতে কাজ করে, সেই সব বিপরীত ধারণা মানুষ ইচ্ছা করলেই বর্জন করতে পারে। মানুষের জন্য মানুষ যদি নিজের পৃথিবী বাঁচিয়ে না রাখে তাহলে আদৌ এই আতংক কাটবে না। আতংকে থেকে কী লাভ?

বরং এই মহামারিকালে মানুষ শিক্ষা নিতে পারে আগামী দিনের বেঁচে থাকার প্রত্যয় ঘোষণা করে। ধর্ম, বর্ণ, জাতি, আভিজাত্য হিসাব করার আগে মানুষ একটি ভ্যাকসিন আশা করছে। ভ্যাকসিন নিয়ে যেন কাক্সিক্ষত পৃথিবীতে বাস করা যায় এই আশাও জিইয়ে রাখা জরুরি।

প্রয়োজন কোনও আইন মানে না। এই নীতি প্রবল বেগে মানুষের নিকট চলে এসেছে। প্রয়োজনের কারণে মানুষ উপাসনালয় পর্যন্ত বন্ধ রেখেছে। শারীরিক দূরত্ব তৈরি করেছে। লাশ দাফনেও অভিনবত্ব এনেছে। বেঁচে থাকার প্রত্যয় থেকেই মানুষ স্বজনের লাশও ছুঁতে পারে না। বিনাশ করা পৃথিবীও করোনা রোগে আক্রান্ত লাশের মতোই।