‘ছোঁয়াচে’ শব্দটাই অভিশপ্ত!

সেরীন ফেরদৌস

07 Apr, 2020 01:53pm


‘ছোঁয়াচে’ শব্দটাই অভিশপ্ত!
সেরীন ফেরদৌস

করোনায় এত মৃত্যু কেন! রোগ যদি এতই সাধারণ, তাহলে লাশ কেন এত বেশি? কেন এত আতঙ্ক! কেন পৃথিবীব্যাপী এত বিরাট ঝাঁকুনি ও তোলপাড়!

প্রশ্নটা অনেকেরই মনে। রোগটায় মৃত্যু হবেই এমন নয়, অধিকাংশের বেলায় হাসপাতালও দরকার নেই, খুব খারাপ অবস্থায় ভেন্টিলেশনে নিয়ে গেলে সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও প্রবল। সবার ভেন্টিলেশন লাগেও না। তারপরও কেন অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে!

যদি খুব মোটা দাগে বলি, তবে বলতে হয়, চাহিদার তুলনায় কৃত্রিম ভেন্টিলেটরের সংখ্যা কম থাকায় মানুষগুলো মরছে! অনেক দেশেই স্বাস্থ্যকর্মীদের সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে, ভেন্টিলেটরের বাইরে কাদের রাখা হবে।

তাহলে করোনাভাইরাসের বিপদ কোথায়? বিপদ একটাই খুব, খুব, খুবই ছোঁয়াচে এই ভাইরাস। এই “ছোঁয়াচে" শব্দটাই অভিশপ্ত! এতই ছোঁয়াচে যে, অতি দ্রুত, বুঝে ওঠার আগেই, সতর্ক হবার আগেই একাধিক ব্যক্তিতে ছড়িয়ে পরে রোগটি এবং পরে আরও বেশি হারে ছড়ানোর সুযোগ করে দেয়। নীরবে, চোখের পলক ফেলার আগে ছড়িয়ে পরতে পারে শরীর থেকে শরীরে! রোগীর ন্যূনতম সেবা করার লোকের অভাব পরে যায় খুব দ্রুত! হাসপাতালও জায়গা দিতে পারে না এত রোগীর।

যে রাষ্ট্র যত আগে ভাইরাসের “চেইন অফ ইনফেকশন” ভেঙে ফেলতে পারছে, সেই দেশ তত বেশি মৃতের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে। প্রায় একই সময়ে জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালিতে ভাইরাসটির প্রবেশ ঘটলেও জার্মানির মৃত্যুহার ০.৮%, ফ্রান্স ও স্পেনের ৬-৮% এবং ইতালির ১১%।

তাহলে “চেইন অফ ইনফেকশন” প্রক্রিয়াটা দেখা যাক। ছয়টি ধাপ এটার। প্রথমে ভাইরাসটি একজনের শরীরে (রিজারভয়ের) বা কোনও সারফেসে (অরগানিজম) থাকে। সেখান থেকে বের হয় (মুখ, নাক, পোর্টাল অব এক্সিট) অথবা বাহিত হয় (হাত- ট্রান্সমিশন)। তারপর আবার অন্যজনের ভেতরে ডাইরেক্ট (মুখ-নাক) অথবা ইনডাইরেক্ট বাহিত (হাত, সারফেস, জিনিসপত্র) হয়। দুর্বল ইমিউনওয়ালাকে অসুস্থ করে। এই প্রক্রিয়া একটি গোলাকার চেইনের মতো। এই চেইনের ছয়টি ধাপের যে কোনও একটি অংশে বাধা দিলেই ভাইরাসটি আর ছড়াতে পারে না।

এবার জার্মানির দিকে তাকাই। কেন ইতালি বা ইউএস-এ বেশি মৃত্যু হল জার্মানির তুলনায়? জার্মানি ইতালি, ফ্রান্স, আমেরিকা, এমনকি কানাডার চাইতেও বেশি সংখ্যক টেস্ট করে অনেক কম সময়ে জেনে ফেলেছে কে কে আক্রান্ত এবং তারা কোন স্টেজে আছে। জার্মানি এমনকি হাল্কা উপসর্গ যাদের আছে, তাদের টেস্টও করে ফেলছে। অর্থাৎ ভেন্টিলেশনে রাখার চাহিদাটাকেই তারা বাগে আনতে সক্ষম হয়েছে বেশি সংখ্যক মানুষকে “টেস্ট" এর আওতায় এনে! গত ৩ সপ্তাহে তারা প্রায় ১০ লাখ মানুষের টেস্ট রেজাল্ট বের করে ফেলেছে যা কানাডাও পারেনি।

তারা আক্রান্তদের চটজলদি আলাদা করে ফেলেছে এবং নতুনভাবে আক্রান্ত হওয়া বন্ধ করার দিকে মনোযোগ দিয়েছে। অর্থাৎ “চেইন অব ইনফেকশন” এর চেইন ভেঙে ফেলতে দক্ষতা দেখাচ্ছে। বাকি বেশি আক্রান্তদের হাসপাতাল-সুবিধা বেশি দিতে পারছে ও মৃত্যুহার কম রাখা সম্ভব হয়েছে। কারণ কোনও দেশেরই আইসিইউতে এত বেশি জীবন-বাঁচানো ভেন্টিলেটর ব্যবস্থা নাই।

কাজেই, বলা চলে, পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটরের অভাবেই মানুষগুলো মারা যাচ্ছে! আসুন, আমরাও চেইন অফ ইনফেকশনের অন্তত একটি ধাপে হলেও বাধা দেই ও করোনা প্রতিরোধ করি!

সেরীন ফেরদৌস: কানাডা প্রবাসী সাংবাদিক। রচনা ৩১ মার্চ ২০২০।


বিভাগ : শিকড়


এই বিভাগের আরও