হুজুগে মেতেছে গণমাধ্যমও

আসাদুল্লাহ বাদল

10 Apr, 2020 05:41pm


হুজুগে মেতেছে গণমাধ্যমও
আসাদুল্লাহ বাদল

মহামারিকালে গণমাধ্যমের ভূমিকা কেমন হবে এই নিয়ে একাধিকবার দৈনিক যোগফলের সংবাদ ও কলামে বক্তব্য প্রচার হয়েছে। বড় গণমাধ্যম বা মূলধারা দাবিদাররা কি ভূমিকা পালন করেছে, এটি রীতিমতো প্রশ্নবিদ্ধ। যে যার মতো সুবিধা বিবেচনা করে নিউজের কাটতি বাড়াতে নৈতিকতা বাদ রেখেই সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার করছে।

৯ এপ্রিল ২০২০ তারিখে একজন গার্মেন্টস মালিক করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। ওই গার্মেন্টস মালিকের নাম ও ছবি একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। এটি প্রকাশ করা উচিত হয়েছে কি?

একই দিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক প্রো ভিসি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে বলে তার ছবি ও নাম পরিচয়ও একাধিক গণমাধ্যম প্রকাশ করেছে। ছবি প্রকাশ করা কতটা জরুরি?

দুদকের একজন পরিচালক জালাল সাইফুর রহমান মারা যাওয়ায় তার ছবি ও নাম পরিচয়ও প্রায় সব গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। আমরা অত্যন্ত দুঃখিত এই জন্য যে, যোগফলেও তার নাম পরিচয় প্রকাশ করেছি। কিন্তু কেন নাম পরিচয় প্রকাশ করেছি, সেই কৈফিয়তও প্রকাশ করেছি। বিশেষত এটি ছিল কোনও রোগীর প্রথম নাম পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়া। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন শোক প্রকাশ করার প্রেক্ষিতে যোগফলে জালাল সাইফুর রহমানের পরিচয় প্রকাশ করেছি। কিন্তু আইনের দৃষ্টিতে সকলের সমান সুযোগ বিবেচনা করে এই পরিচয় প্রকাশও যথাযথ হয়নি। এ কারণে আমরা আন্তরিকভাবে আবার দুঃখ প্রকাশ করছি।

সুনামগঞ্জে এলাকায় একজন ইটভাটা শ্রমিকের করোনা ভাইরাস আক্রান্ত জনিত সন্দেহের পরিপ্রেক্ষিতে দাফনে অসহযোগিতা খবর প্রকাশ হয়েছে। একটি লাশ বহনের জন্য খাটিয়া পাওয়া যায়নি। যা খুবই দুঃখজনক। যারা এহেন অমানবিক আচরণ করেছে, তারা কেউ আক্রান্ত হবে না বা করোনায় মারা যাবে না এই গ্যারান্টি কে দিতে পারবে?

একই সময়ে শরিয়তপুরের নড়িয়ায় একজন যুবক মারা যাওয়ার পর ২১ ঘণ্টা লাশ পড়ে ছিল। কেউ তাকে দাহ করতে রাজি হয়নি। পরে পাশের এলাকার ব্যক্তিরা ওই যুবকের লাশ দাহ করেছে। এরই মধ্যে জানা গেছে ওই যুবক করোনায় আক্রান্ত ছিল না। ওই যুবকের বৃদ্ধা মা ২১ ঘণ্টা আকুতি জানিয়েছে তার সন্তানের লাশ দাহ করার জন্য। কিন্তু মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ‘ভদ্র পল্লীতে’ তিনি নাড়া দিতে সক্ষম হননি।

আরও একাধিক লাশ দাফনে জনগণের অংশ নেওয়ায় আপত্তির প্রশ্নে দেখা দিয়েছে। দাফনে মানুষের ঢল নামার পরিবর্তে শূন্যতা নেমে এসেছে। মানুষের মানবিকতায় হঠাৎ এই ধস খুবই উদ্বেগজনক।

গত ৬ ও ৮ এপ্রিল কাপাসিয়ায় এক নারী ও এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। তারা করোনা উপসর্গ বহন করছিল বলেই ধারণা করা হয়েছিল। এই কারণে তাদের দেহের নমুনা পরীক্ষা করে বিশেষ কায়দায় দাফন করা হয়েছে। এখন তাদের দেহে করোনার লক্ষণ ছিল না বলে রিপোর্ট এসেছে।

এই সুবাদে একদল হুজুগে ফেসবুকে প্রচারণা চালাচ্ছে, যারা করোনা সন্দেহ প্রকাশ করেছে, তারা গুজব ছড়িয়েছে। যারা এই দাবি করছেন, তাদের নিকট জানতে চাই, রিপোর্ট আসার আগ পর্যন্ত আপনার ধারণা কি ছিল? যদি এটি গুজব হয়, তাহলে প্রশাসনের যারা করোনা সন্দেহ করে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেছে, তারা কি ভুল করেছে? আপনারা যদি আগেই এত সচেতন হবেন, তাহলে ওই দুইজনের দাফনে অংশ নিলেন না কেন? কেন আপনারা তখন বলেননি ওই দুইজন করোনায় আক্রান্ত ছিল না। এহেন হুজুগে মেতে ওঠা মোটেও উচিত নয়। বলতে দ্বিধা নেই, নিশ্চয়ই আপনাদের মতলব ছিল ভিন্ন, করোনা আক্রান্তের ফল এলে ভিন্ন মত প্রচার করতেন। এই ধরনের সুবিধাবাদী আচরণে দক্ষতার কোনও পরিচয় প্রকাশ পায় না।

যারা সুবিধাবাদী আচরণে হুজুগে মেতেছেন, তাদের চোখে কি একজন চিকিৎসক ও গার্মেন্টস মালিকের পরিচয় প্রকাশ কিভাবে দেখেন?

বলে রাখা উত্তম, কয়েকদিন আগেও দাফনে যাদের বক্তৃতার দাপটে টিকে থাকা যেত না, তারা আজ কোথায়? তারা কেন দাফনে অংশ নিচ্ছেন না? পুলিশ ও প্রশাসন দাফনে সহায়তা না করলে কী লাশগুলো উন্মুক্তই পড়ে থাকবে?

আমরা খুব ডিজিটাল হয়েছি ভেবে আকাশে পাখা মেলেছি। কিন্তু কতটা বিজ্ঞানমনস্ক হয়েছি। কতটা কুসংস্কার ত্যাগ করেছি। কতটা মানবিকতা অর্জন করেছি? এসব প্রশ্নের উত্তর নিজের বুকে হাত রেখে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারি।

শেষে কাপাসিয়ায় শুক্রবার [১০ এপ্রিল ২০২০] একজন করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে অনেকে তার নাম বয়স ঠিকানা ও কর্মস্থল প্রকাশ করে দিয়েছেন। কতটা ঠিক কাজ করছেন আপনারা?


বিভাগ : মর্গ