সব নির্বাচনে ইভিএম চালু হউক

আসাদুল্লাহ বাদল

19 Jan, 2020 08:36am


সব নির্বাচনে ইভিএম চালু হউক

ভোট ডাকাতির মহোৎসব বন্ধ করতে ইভিএম হতে পারে আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর পদ্ধতি। এখন যেভাবে ব্যালট বই ছিনতাই হয়, জোর করে ব্যালটে সিল মারা হয়, ভোট গগনার আগে এজেন্ট বের করে দেওয়া হয়, ভোটের আগের রাতেই ব্যালট বইয়ে সিল দেওয়া হয় বা দুপুর গড়ানোর আগেই ব্যালট বই শেষ হয়ে যায় অন্তত এসব সমস্যা কাটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে ইভিএম হতে পারে যুগান্তকারী সমাধান।

যন্ত্র বা প্রযুক্তি ব্যবহারে বরাবরই অনীহা দেখা দেয়। এই অনীহা দেখানোর পিছনের কারণ পিছন থেকে চলমান। টাইপ রাইটার ভেঙে কমপিউটার বন্ধের আবেদন বা মেশিন ভেঙে উৎপাদন বন্ধের ষড়যন্ত্র বরাবরই ছিল। উৎপাদন বাড়িয়েও ধর্মঘট করা যায়। মাইক ব্যবহারের ফতোয়া এক্ষেত্রে বিবেচনা করা যেতে পারে। যন্ত্র ব্যবহারের অনীহা পিছিয়ে পড়া ছাড়া আর কিছুই এগোয় না।
এখনও যারা ফেসবুক বা স্যোসাল মিডিয়া ব্যবহার না করে গর্বিত বোধ করে এমন নির্বোধ প্রকৃতির আচরণ ইভিএম বিরোধীতায় গড়াতে পারে। মোবাইল ফোনে কল রিসিভ ও ডায়ালিং ছাড়া আর কিছু করতে পারি না এটি কোন উত্তম বুদ্ধিমানের লক্ষণ নয়। বরং বোকামীর পরিচয়। পোস্ট অফিস চালু রাখতে এসএমএওস বা মেইল না চালানোর মধ্য কোন শুভ লক্ষণ দেখি না।

মৌলবাদী আচরণ বা রক্ষণশীলতা প্রমাণ হয় কাজের ক্ষেত্রে। বক্তব্য দেওয়া আর বাস্তবায়ন করা কখনও এক নয়। নতুনকে স্বাগত জানানোর মতো মানুষ কম থাকে সবসময়। তাই বলে নতুন সব সময়, নতুন থাকে না। নতুন ও পুরাতন হয়ে যায়। ইভিএমকে স্বাগত জানিয়ে ইভিএমের মন্দ দিক এড়িয়ে ইভিএমকে জনপ্রিয় করে তোলা উচিত। এমনকি যারা বিরোধীতা করছেন তাদের চ্যালেঞ্জ দেওয়ার ক্ষমতা থাকা উচিত কেন ইভিএম চা না।

ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনকে (ইভিএম) আতঙ্ক মনে হয় কেন? কেন ইভিএম চান না। না চাওয়ার যুক্তি কি? আপনি কি অশিক্ষিত থাকতে চান? আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে চান না? আপনি এমপি হতে চান কিন্তু ইভিএমে ভোট দিতে পারবেন কি না এই সংশয় রয়েছে। জনগণের সামনে বেইজ্জত হতে চান না? ইভিএম চালু হলে কি সমস্যা? ইভিএম কি পৃথিবীর কোথাও চালু নেই? যেসব দেশে চালু আছে সেসব দেশে কি সমস্যা তৈরি হয়েছে? ইভিএম চালু হলে কি ক্ষতি হতে পারে? সব বিষয় বিস্তারিত আলোচনা করা দরকার। আলোচনার দরজা উন্মুক্ত থাকুক।

আওয়ামীলীগ ও তাদের মিত্ররা ইভিএম চায় বলে বিএনপি ও তাদের মিত্র জোট চায় না? আওয়ামীলীগ যে দোকানের মিষ্টি খায়, বিএনপি তার বিপরীত? আটদলীয় বাম গণতান্ত্রিক জোটও ইভিএম চায় না বলে শোনা যাচ্ছে। এই আট দলে অবশ্য তিনটি মাত্র দল নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত। বিএনপির নেতৃত্বের জোটেও একই অবস্থা। অবশ্য মোটা দাগে আওয়ামী লীগ যেভাবে চাইবে তাদের মিত্ররা একইভাবে চাইবে। আবার বিএনপি যেভাবে চাইবে তাদের মিত্ররাও একইভাবে চাইবে। এহেন অন্ধ অনুকরণের বাইরে কি আশা করা যায়? কিন্তু প্রগতিশীল ও বিজ্ঞানমনস্ক গতিশীল শক্তি বাম জোট কেন ইভিএম চায় না এটি ঠাহর করা ভীষণ জটিল।
যারা ইভিএমের বিরোধীতা করছে, তারা কেন বিরোধীতা করছে এটি আদৌ স্পষ্ট নয়। বিরোধীতার কারণে বিরোধীতা চিরাচরিত ব্যাপার। প্রকৃতপক্ষে ইভিএম চালু হলে কি সমস্যা এটি স্পষ্ট করে বোঝানো উচিত। হতে পারে পক্ষে বিপক্ষে বাহাস। কিন্তু বাহাস করার মতো সাহস শক্তি মনোবল আছে বলে মনে হয় না।

কোন কেন্দ্রে বা নির্বাচনি এলাকায় কমপক্ষে ৫০ শতাংশ ভোট কাস্টিং না হলে ওই কেন্দ্র বা নির্বাচনি এলাকার ভোট বাতিল করার আইন পাশ করা জরুরি।

প্রশ্ন হচ্ছে অল্প সময়ে ভোটাররা ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট দিতে পারবে কি না। অল্প সময় বলতে কত সময়ের দরকার, এটি এখনও কেউ হিসাব করে বলেনি। দেশে যে পরিমাণ ব্যক্তি ইন্টারনেট ব্যবহার করে এর কোন প্রশিক্ষণ কখনও হয়েছে কি? মোবাইল ব্যবহারের প্রশিক্ষণ ছাড়াই চলছে তো। গণমাধ্যম (সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন, স্যোসাল মিডিয়া), শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রচার চালালে ইভিএমে ভোট দেওয়ার পদ্ধতি শিক্ষা দিতে কতদিন লাগতে পারে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও তাদের মিত্ররা ইচ্ছা করলে তাদের কর্মীবাহিনী দিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে। তবু ভোট ডাকাতির যে ভয়ঙ্কর নমুনা ইতোপূর্বে লক্ষ্য করা গেছে তা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ইভিএম হতে পারে ভাল ব্যবস্থা।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে ১০০ আসনে ইভিএমে ভোট হবে বলে প্রচারণা চললেও পরে হয়েছে ছয়টিতে। বাস্তবে যদি আবার বিএনপির মিত্ররা ভোট বর্জন করে তাতে কত আসনে ভোট হবে এটি মোটেও নিশ্চিত নয়। ফলে ৩০০ আসনেই ইভিএম চালু করা উত্তম। পুরো দেশকে একত্রে একই পথে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালানো এককেন্দ্রিক সরকারের জন্য জরুরি। এখন পর্যন্ত দেশে যেসব কেন্দ্রে ইভিএম ভোট নেওয়া হয়েছে ওইসব কেন্দ্রে ভোট নেওয়ার অবস্থা দেখে নেওয়া যেতে পারে।

ভোট নেওয়া শুরুর পূর্ব অবস্থা : ভোট নেওয়া শুরুর আগেই উপস্থিত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা তাদের নির্বাচনী এজেন্ট বা পোলিং এজেন্টদের মেশিনটি দেখানো হবে। একইসঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তার প্রতীক ঠিক আছে কি-না তা নিশ্চিত করা হবে।

ভোট নেওয়া : ভোটকক্ষে নিয়োজিত সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ভোট নেওয়ার আগে ইভিএম মেশিন সেটআপ করবেন। প্রিজাইডিং কর্মকর্তা কেন্দ্রের সব ভোটকক্ষে ব্যবহার করা ভোটিং মেশিন চালু করার নিরাপত্তা ‘পিন কোড’ এবং পাসওয়ার্ড গোপনীয়ভাবে রিটার্নিং কর্মকর্তার দফতর থেকে নেওয়া, সংরক্ষণ এবং সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তাকে সরবরাহ করবেন। এক্ষেত্রে ‘অডিট কার্ড’ প্রবেশ করিয়ে প্রিজাইডিং কর্মকর্তা/সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা পাসওয়ার্ড/পিন দেখিয়ে মেশিনের চাহিদা অনুযায়ী আঙুলের ছাপ দিয়ে ইভিএম ভোট নেওয়ার জন্য প্রস্তুত করবেন।

ভোট নেওয়ার আগে মেশিনের অপর কার্ড স্পটে ‘পোলিং কার্ড’ প্রবেশ করাবেন। এবার ভোট নেওয়ার জন্য মেশিন সম্পূর্ণ প্রস্তুত হলে ‘অডিট কার্ড’ বের করে নেবেন। সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ভোটার শনাক্ত করতে প্রয়োজনে ব্যবহার করবেন স্মার্টকার্ড।
একজন পোলিং কর্মকর্তা ভোটার তালিকার হার্ডকপির (ছাপানো) সঙ্গে মিলিয়ে শনাক্ত করা ভোটার নম্বর চিহ্নিত করবেন। অপর পোলিং কর্মকর্তা বৈধ ভোটারের আঙুলে অমোচনীয় কালির দাগ দেবেন এবং ইলেকট্রনিক ব্যালট ইস্যু করবেন।

ভোট নেওয়া শেষ হলে সংশ্লিষ্ট সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তারা ইভিএমে পুনরায় অডিট কার্ড প্রবেশ করিয়ে ‘এন্ড পোল’ বোতাম চেপে ভোট শেষ করবেন। এরপর প্রিজাইডিং কর্মকর্তা সব ভোটিং রুমের মেশিন থেকে ‘অডিট কার্ড’ দিয়ে ইভিএম থেকে প্রথমে ফাইনাল রেজাল্ট মুদ্রণ করবেন। মুদ্রণ শেষ হলে কেন্দ্রভিত্তিক ফল একত্রিত করে উপস্থিত প্রার্থীদের বা তার প্রতিনিধিদের কাছে উপস্থাপন করবেন বাধ্যতামূলকভাবে। এছাড়া সরবরাহ করা ফরম যথাযথভাবে পূরণ করে ফল প্রকাশ/কপি বিতরণ এবং সব ধাপ সম্পন্ন করে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে ভোটিং মেশিন, আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতিসহ অন্য মালসহ ফল জমা দেবেন প্রিজাইডিং কর্মকর্তা।

পিন/পাসওয়ার্ডের নিরাপত্তা : প্রতিটি ইভিএমের জন্য ব্যবহার বিভিন্ন কার্ড এবং মেশিন চালু করার পিন/পাসওয়ার্ড প্রিজাইডিং কর্মকর্তাকে সরবরাহ করা হবে। কার্ডগুলো ব্যবহার করা হবে যথাযথ নিরাপত্তার সঙ্গে। ভোট নেওয়া শেষে কার্ডগুলো পৃথকভাবে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে বুঝিয়ে দেবেন প্রিজাইডিং কর্মকর্তা।

ভোট প্রদান : ভোটাররা ভোট প্রদানের জন্য আঙুলের ছাপ/ভোটার নম্বর/জাতীয় পরিচয়পত্র/স্মার্টকার্ড ব্যবহার করে নিজের ভোট দেবেন। এছাড়া অন্য কোনো উপায়ে ভোটার তার নিজেকে ইভিএমে শনাক্ত করার সুযোগ পাবেন না। এক্ষেত্রে শনাক্ত হওয়ার পর সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ভোটিং মেশিনের মাধ্যমে ভোটারকে তিনটি ইলেকট্রনিক ব্যালট পেপার (সিটি নির্বাচনের জন্য তিন পদের জন্য) দেবেন। ব্যালট ইউনিটে ব্যালট পেপার ইস্যু করার পর ভোটার গোপন কক্ষে প্রবেশ করে তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন।

ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ভোটার তার পছন্দের প্রার্থী এবং প্রতীক দেখে তার বাম দিকের বোতামে চাপ দিয়ে সিলেক্ট করবেন। সবুজ রংয়ের বোতাম চেপে ভোট সম্পন্ন করবেন। ভুল হলে দুইবার কেন্সেল করে তৃতীয়বার ভোট দিতে পারবেন।

উল্লেখ্য, আমাদের দেশে প্রায় ৫০ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মরত। এদের অধিকাংশ অল্প শিক্ষিত। তবু তারা অনেক কারখানায় প্রবেশ করে ফিঙ্গার টাচ বা কার্ড পাঞ্চ করে। কারখানার গেইটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্ড পাঞ্চ করে বা ফিঙ্গার টাচ করে অল্প শিক্ষিত শ্রমিক চাকুরি রক্ষা করতে পারে আর আমাদের রাজনৈতিক নেতারা জনগণকে ইভিএম বিষয়ে সচেতন করতে পারে না এটি ভাবা যায়!

নির্বাচনি আইনের আমূল বদল ঘটাতে আরও অনেক প্রস্তাব থাকতে পারে। যোগফলে ওই প্রস্তাব প্রকাশের ব্যবস্থা রয়েছে। 

আসাদুল্লাহ বাদল : সম্পাদক, দৈনিক যোগফল


বিভাগ : নির্বাচন