টাকার গন্ধ শুঁকে সংঘবদ্ধ অপরাধ খুঁজে বের করে যে চেক অনুসন্ধানী দল

ইয়ান উইলোবি

07 May, 2020 07:16am


টাকার গন্ধ শুঁকে সংঘবদ্ধ অপরাধ খুঁজে বের করে যে চেক অনুসন্ধানী দল
অনুসন্ধানী দল

২০১৮ সালে খুন হন স্লোভাকিয়ার সাংবাদিক ইয়ান কুচিয়াক ও তার বাগদত্তা মার্টিনা কুশনিরোভা। এই হত্যাকাণ্ডের জের ধরে দেশটিতে প্রচণ্ড বিক্ষোভ শুরু হয় এবং শেষপর্যন্ত তা সরকারের পতন ঘটায়। মৃত্যুর আগের সময়্টাতে কুচিয়াকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছিল চেক সেন্টার ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম (সিসিআইজে)।

কুচিয়াকের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখতেন সিসিআইজে-র সূচনাকারী ও পরিচালক পাভলা হলকোভা। “আমরা সবকিছু শেয়ার করতাম,” বলেন তিনি। ২৭ বছর বয়সী সাংবাদিক কুচিয়াক তখন স্লোভাক গণমাধ্যম অ্যাকচুয়ালিটির জন্য একটি প্রতিবেদন নিয়ে কাজ করছিলেন। বিষয় ছিল: ইতালির এনদ্রানগেতা মাফিয়া গোষ্ঠীর সঙ্গে স্লোভাকিয়ার বড় বড় রাজনীতিবিদদের সম্পর্ক।

“সাধারণত, মাফিয়াদের নিয়ে কাজ করতে গেলে কিছু পরিস্কার বিভাজন দেখা যায়। সেখানে সংগঠিত অপরাধী চক্র থাকবে, ব্যবসাবাণিজ্য থাকবে ও রাজনীতি থাকবে। এবং আপনি এগুলোকে আলাদা আলাদাভাবে শনাক্ত করতে পারবেন। কিন্তু স্লোভাকিয়ার ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, এসব কিছু একসঙ্গে মিশে গিয়েছে।” প্রাগে, সিসিআইজের ব্যস্ত অফিসে বসে বলছিলেন হলকোভা।

কুচিয়াক ও কুশনিরোভাকে, তাদের বাড়ির কাছে হত্যা করার কথা আদালতে স্বীকার করেছেন স্লোভাকিয়ার এক ব্যক্তি। দেশটির প্রভাবশালী ব্যবসায়ী মারিয়ান কোচনারসহ আরো বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা চলছে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে। গত ফেব্রুয়ারিতে ৬৯ মিলিয়ন ডলার সমমানের প্রমিসরি নোট জালিয়াতির আরেক অভিযোগে ( প্রমিসরি নোট হচ্ছে, কোনো ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট অংকের টাকা পরিশোধের অঙ্গীকারনামা) ১৯ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে কোচনারকে।

২০১৩ সালে হলকোভাসহ কয়েকজন সাংবাদিক মিলে যখন প্রাগে সিসিআইজে সূচনা করেন, তখন তারা স্লোভাকিয়ার বিষয়আশয়ও কাভার করতেন। কারণ তাদের প্রতিবেশী দেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কোনও প্রতিষ্ঠান ছিল না। তবে কুচিয়াক হত্যাকাণ্ডের পর, তার স্মরণে স্লোভাকিয়ার সাংবাদিকরা গঠন করেন ইনভেস্টিগেটিভ সেন্টার অব ইয়ান কুচিয়াক। এখণ সিসিআইজেও কুচিয়াক হত্যার বিচার নিয়ে কাজ করছে।

বরাবরই সিসিআইজে-র প্রধান দৃষ্টি ছিল আন্তর্জাতিক পরিসরে, জানান হলকোভা। কিউবার কারাগার থেকে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা নিয়ে কাজ শুরু করে, তিনি এসেছেন বর্তমান অবস্থানে। সরকার বিরোধী কিছু সাংবাদিককে অবৈধভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার অপরাধে হলকোভাকে বন্দী করা হয় কিউবায়। সেখানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্ট (ওসিসিআরপি)-র পরিচালক পল রাদু। কিভাবে আন্তসীমান্ত অনুসন্ধানী প্রকল্পগুলো পরিচালনা করা হয়, সে ব্যাপারে এই জেলে বসেই হলকোভাকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছিলেন রাদু।

সিসিআইজে-র কর্মকাণ্ড বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিচালিত হয় সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্র নিয়ে। চেক প্রজাতন্ত্রে এই বিষয়টির দিকে কোনও সংবাদমাধ্যমই পর্যাপ্ত নজর দেয় না বলে জানান হলকোভা।

কমবেশি সবাই জানে, পূর্ব ইউরোপের অনেক মাফিয়া নেতা চেক প্রজাতন্ত্রে ব্যবসা করছেন এবং সম্পদ গড়ছেন। এখানে এসে তারা ব্যবসার কৌশলও পাল্টে ফেলেছেন। সহিংসতার বদলে “লজিস্টিকস” দিয়ে কাজ করছেন। এ নিয়ে একটি অসুন্ধান করেছিলেন হলকোভা ও সার্বিয়ার ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং নেটওয়ার্ক (কেআরআইকে)-র স্টিভান দোইসিনোভিচ। তারা দেখিয়েছিলেন, বলকান অঞ্চলের পুরোনো মাফিয়ারা চেক প্রজাতন্ত্রে এসে, কীভাবে বৈধ কোম্পানি খুলে ব্যবসা চালাচ্ছেন এবং জমিজমা কিনছেন।

হলকোভা বলেছেন, “এমন বিষয় নিয়ে কাজ করতে গেলে অন্য দেশের সাংবাদিকদের সহযোগিতা দরকার হয়। এই সহযোগিতা বিষয়টি, চেক সংবাদ জগতে ততটা প্রতিষ্ঠিত নয়।” হলকোভা ২০১৭ সালে চেক প্রজাতন্ত্রের একমাত্র সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছিলেন ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (আইসিআইজে) পরিচালিত পানামা পেপার্স অনুসন্ধানে। এজন্য তারা সেবছর পুলিৎজার পুরস্কারও জিতেছিলেন।


আন্তর্জাতিক সহযোগিতা

আন্তর্জাতিক অপরাধীদের নিয়ে অনুসন্ধান করতে গেলে সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজন বৈশ্বিক সহযোগিতা। কারণ দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ প্রায়শই দেশের সীমারেখা পেরিয়ে যায়। আর সেখানেই থেমে যেতে হয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে।

“সব বড় বড় প্রতারক, মাফিয়া সদস্য, সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর মধ্যে একটি সাধারণ ব্যাপার আছে। সেটি হলো: অর্থপাচার। তাই অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে জরুরী হয়ে দাঁড়ায়: টাকা কোথায় কোথায় যাচ্ছে, তা অনুসরণ করা,” বলেছেন হলকোভা।

সিসিআইজের সম্পাদক ইয়ারোস্লাভ ফরমানে বলেছেন, ইউরোপে অর্থপাচারের ক্ষেত্রে লন্ডন ও ভিয়েনার পরেই আসে প্রাগের নাম। সেখানে অপরাধ ও অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থকে অভিনব সব পদ্ধতিতে আইনি বৈধতা দেওয়ার কাজ করে যাচ্ছে রুশ, আজারবাইজানি এবং কাজাখরা।

সূচনার পর থেকে গত ৭ বছরে সিসিআইজের সবচে বড় সাফল্য ছিল মেসিডোনিয়ার (বর্তমানে উত্তর মেসিডোনিয়া) গুপ্ত গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানকে নিয়ে করা প্রতিবেদন। সাসো মিয়ালকভ নামের এই কর্মকর্তা গোপনে চেক প্রজাতন্ত্রের রিয়াল এস্টেট ব্যবসায় বড় অঙ্কের টাকা লগ্নী করেছিলেন। ২০১৪ সালে এই “জমিদার গোয়েন্দার” কাহিনি জনসম্মুখে তুলে ধরেছিলেন পাভলা হলকোভা ও মেসিডোনিয়ার রিপোর্টার সাস্কা সিভেটকোভস্কা। এই রিপোর্টের কারণে চাকরি হারান মিয়ালকভ।

“এটি ছিল দেয়ালের প্রথম ফাটলের মতো,” বলেন হলকোভা, “মেসিডোনিয়ার গণমাধ্যমে প্রতিবেদনটি পুনঃপ্রকাশ হওয়ার পর সেখানে এমন আরও অনেক ফাটল ধরতে থাকে। এবং ২ বছরের মধ্যে সরকারের পতন হয়।”

হলকোভা ও সিভেটকোভস্কা পরবর্তীতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কার পান এই কাজের জন্য। এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য শাস্তি পেতে হয় মিয়ালকভকে।

সংগঠিত অপরাধ, মাদক চোরাচালান এবং চীন-রাশিয়া থেকে কোনো গোয়েন্দা চেক প্রজাতন্ত্রে ঢুকে পড়ছে কিনা, ইত্যাদি বিষয় নিয়ে যেসব পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী কাজ করেন; তারাও ঢুঁ মারেন সিসিআইজের সুবিন্যস্ত ওয়েবসাইটে। এমনটিই জানিয়েছেন সিসিআইজের অভিজ্ঞ ও প্রবীন সম্পাদক ইয়ারোস্লাভ ফরমানে।

অনন্য অবস্থান

চেক প্রজাতন্ত্রের অন্য যে কোনও গণমাধ্যমের চেয়ে, একেবারে আলাদা সিসিআইজে। এখানে কোনও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনের জন্য রিপোর্টারদের অনেক সময় দেওয়া হয়। ফরমানে বলেন, “আমি কোথাও দেখিনি, একটি প্রতিবেদন তৈরির জন্য রিপোর্টারকে তিন সপ্তাহ বা এক মাস সময় দেওয়া হচ্ছে।”

চেক প্রজাতন্ত্রের সিন্ডিকেট অব জার্নালিস্ট-এর প্রেসিডেন্ট অ্যাডাম কার্নির দৃষ্টিতে, সিসিআইজে দেশটির অভ্যন্তরীণ সংবাদ জগতে অনন্য ও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।

কার্নি বলেছেন, “সিসিআইজে এমন সাংবাদিকতা করে যেখানে অনেক সময় ও বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমেই খারাপ হতে থাকায়, প্রথাগত সংবাদমাধ্যমগুলো সেটি প্রায়ই করতে পারে না।”

রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির কারণেও চেক প্রজাতন্ত্রে জটিল কোনো সাংবাদিকতার প্রজেক্ট হাতে নেওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন পাভলা হলকোভা। গত বছর রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারের প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ১৪০টি দেশের মধ্যে চেক প্রজাতন্ত্র ছিল ৪০তম অবস্থানে।

এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো: বড় বড় কিছু সংবাদমাধ্যমের মালিকানা আছে স্থানীয় অভিজাতদের হাতে। যেমন: আন্দ্রে বাবিস। তিনি এখন চেক প্রজাতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী। এছাড়াও সংবাদমাধ্যমের ওপর অনেক চাপও আছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট মিলোস জিমান কুখ্যাতি কুড়িয়েছেন সাংবাদিকদের নিয়ে “রসিকতার” জন্য। একবার তিনি নকল বন্দুক হাতে সংবাদ সম্মেলনে এসেছিলেন। তার গায়ে লেখা ছিল “সাংবাদিকদের জন্য।”

নিজেদের প্রতিবেদনগুলো আরো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ডেনিক এন নামের একটি চেক সংবাদপত্রের সঙ্গে জোট বেঁধেছে সিসিআইজে। ২০১৮ সালে চালু হয়েছে এই সংবাদপত্রের অনলাইন ভার্সন। সেটিও বেশ পাঠকপ্রিয় হয়েছে। ফলে দেশের কোনও বিষয়ে সিসিআইজে যখন বড় কোনও প্রতিবেদন তৈরি করে, তখন তা অনেক পাঠক-দর্শকের কাছে পৌঁছায়।

এগিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছা

চেক প্রজাতন্ত্রের এই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কেন্দ্রে কাজ করেন ১০ জনের মতো সাংবাদিক। তাদের মধ্যে কেউ কেউ খণ্ডকালীন। ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি চলেছে কমবেশি এক লাখ ১০ হাজার ইউরোর বাজেট দিয়ে। যার পুরোটাই এসেছে অনুদান থেকে। এর মধ্যে এনডাওমেন্ট ফান্ড ফর ইনডিপেনডেন্ট জার্নালিজম-এর (চেক ব্যবসায়ীদের একটি গ্রুপ এটি তৈরি করেছে) অনুদানও আছে। ভবিষ্যত নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনও পরিকল্পনা করার সময় মাত্র নয় মাসের কথা মাথায় রাখতে পারে প্রতিষ্ঠানটি।

আন্তসীমান্ত সহযোগিতামূলক প্রজেক্টগুলো চালিয়ে যাবে সিসিআইজে। তবে ভবিষ্যতে শুধু চেক প্রজাতন্ত্র নিয়ে আরও গভীর বিশ্লেষণমূলক রিপোর্টিং করার পরিকল্পনা আছে তাদের।

তাদের কয়েকজন রিপোর্টার সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন কুচিয়াক ও কুশনিরোভা হত্যাকাণ্ডের বিচারের দিকে।

২ বছর আগে সেই হত্যাকাণ্ডের পর নিজেদের নিরাপত্তায় বাড়তি কোনও উদ্যোগ নিয়েছেন কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে হলকোভা বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা ও অন্য সতর্কতা দুই বছর আগেও যেভাবে মেনে চলতেন, এখন তার চেয়ে খুব আলাদা কিছু তিনি করেন না।

এই হত্যাকাণ্ডের পর পেশা বদলে ফেলার কথাও চিন্তা করেননি সিসিআইজের প্রধান। দলের সবার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, “আমি এরকম ভাবিনি। বরং উল্টোটাই মনে হয়েছে। আমাদের মনে হয়েছে, যদি আমরা চুপ করে যাই তাহলে তারা জিতে যাবে। তারা ইয়ানকে হত্যা করেছে, আমাদের রিপোর্টিং বন্ধ করে দিতে চেয়েছে। কিন্তু আমাদের উল্টোটা করতে হবে। আমরা বরং আরও উদ্যোমী হয়েছি। রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে আরও বেশি কাজ করছি।”

ইয়ান উইলোবি: একজন প্রাগভিত্তিক আইরিশ সাংবাদিক। প্রায় ২ দশক ধরে তিনি রিপোর্টার ও এডিটর হিসেবে কাজ করেছেন রেডিও প্রাগ ইন্টারন্যাশনালে। এছাড়াও তিনি বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের জন্য ফ্রিল্যান্স কাজ করেছেন


বিভাগ : মুক্তমত