মানুষ কি আগেই অমানবিকই ছিল, নাকি এখন করোনার কারণে হয়েছে

যোগফল রিপোর্ট

07 May, 2020 08:58am


মানুষ কি আগেই অমানবিকই ছিল, নাকি এখন করোনার কারণে হয়েছে
করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তির লাশ

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান এক ব্যক্তি। সামাজিক বিড়ম্বনার ভয়ে পরিবারের মানুষেরা তার নাম প্রকাশ করতে চাননি।

ওই ব্যক্তির মৃত্যুর পর জামালপুর শহরের বাসিন্দা ওই পরিবারটি বুঝতে পারে, স্বজনের মৃত্যুই হয়ত সবচেয়ে বড় আঘাত নয়।

 মৃত ব্যক্তির বোন বলছিলেন, ২৫ এপ্রিল কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে মারা যান তার বড় ভাই। এরপর দাফন করার জন্য লাশ যখন জামালপুরে তাদের গ্রামে নিয়ে যান, জানাজা ও মাটি দেওয়ার জন্য গ্রামের কেউ আসেনি।

“এমনকি কবর খুঁড়তেও আসেনি কেউ। সবাই ভাবছে এখানে আসলে তাদেরও করোনা হবে। যেহেতু আমাদের পরিবারে আর কোন পুরুষ সদস্য নেই, তাই তখন আমরা আল মারকাজুলকে ফোন করি। ঘণ্টা দুয়েক পরে তাদের একটি দল এসে জানাজা পড়ে মাটি দেয় আমার ভাইকে।"

ওই ব্যক্তির বোন বলেন, ভাইয়ের কবর হয়ে যাওয়ার পর গ্রামবাসীর অসহযোগিতার আর এক ধরন দেখতে পান তারা।

“অমানবিক আচরণ করে গ্রামের লোকজন। তার ভাইয়ের স্ত্রী ও সন্তানদের বাইরে থেকে ঘরে তালা দিয়ে আটকে রাখতে চেয়েছিল তারা। কোন আত্মীয়স্বজনকে বাড়ির ত্রিসীমায় আসতে দেয়নি। সাধারণত মৃত মানুষের বাড়িতে খাবার দেয় আত্মীয়স্বজন, আমাদের কেউ খাবার দেয়নি, আর কাউকে খাবার নিয়ে আসতেও দেয়নি।"

“শোকের পরেও মানুষের খেতে হয়। আবার রোজাও শুরু হইছে। তখন বাধ্য হয়ে আমরা নিজেরা প্রতিবেশী কয়েকজনকে বলি কিছু বাজার করে দিতে, তখন তাদেরও হুমকি দেওয়া হয় যে কেউ বাজার করে দিলে তাদেরও ঘরে তালা মেরে দেবে।"

এরপর ওই ব্যক্তির বোন এবং স্বামীর হস্তক্ষেপে স্থানীয় প্রশাসন এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এসে সবাইকে সহনশীল আচরণ করতে আহ্বান জানান। কিন্তু গত ১১ দিনেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি, এখনও তাদের পরিবারকে প্রায় ‘একঘরে' করে রাখা হয়েছে।

“আমার ভাবি বা তাদের বাচ্চাদের কারও করোনাভাইরাসের কোন উপসর্গ নাই, পরীক্ষা করে তাদের সবার নেগেটিভ আসছে। কিন্তু গ্রামের কেউ সেটা বিশ্বাস করছে না। তাদের সাথে কেউ কথা বলে না। কাছেও আসে না কেউ। কেউ ভাবেনা তাদেরও এই রোগ হতে পারে।"

ওই ব্যক্তির (মৃত) পরিবার এখন শঙ্কায় রয়েছে, সামাজিক রীতি পালন শেষে যখন তারা শহরে ফিরবেন, সেখানে তাদের জন্য কী পরিবেশ অপেক্ষা করছে।

ধর্মীয় রীতিতে সৎকার

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেলে, পরিবারের বাকি সদস্যদের নানা গঞ্জনা ও সামাজিক নিগ্রহের শিকার হতে হচ্ছে। জামালপুরের ওই ব্যক্তির পরিবার এখানে একা নন। নারায়ণগঞ্জে আখড়ার মোড়ের বাসিন্দা ‘হকারদের নেতা’ কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মারা যান এপ্রিলের মাঝামাঝি। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সৎকারের জন্য ওই ওনতার আত্মীয়দের কেউ আসেননি।

ওই নেতার সন্তান ও বন্ধুদের সহায়তায় সন্তান আর তার স্ত্রী দুইজন মিলে সৎকারের কাজটি করেছেন। ওই নেতার মৃত্যুর খবর প্রকাশ করেছে অনেক গণমাধ্যম। কিন্তু সৎকারে সমস্যার কথা সকলেই চেপে গেছে। ওই ওনতার সন্তান ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে আবেগঘন কথা লিখেছেন।

“যারা করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়, এখানে নারায়ণগঞ্জে কেউ তাদের সহজভাবে নেয় না। আমার বাবার যখন করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়, আমাদের বিল্ডিং এর দারোয়ান পালিয়ে যায়। আত্মীয়রাও আসেনি।

“বাবাকে দাহ করে যখন আমরা রাতে বাসায় ফিরি, আমাদের বাড়িরমালিক ফোন করে বলে যেন আমি আর আমার মা ১৪ দিন বাসা থেকে একদমই না বের হই।"

তিনি বলেছেন, বাড়িরমালিক বলার আগেই তিনি ও তার মা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তারা দুইজন ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকবেন। কিন্তু পরবর্তী ১৪ দিনেও ভবনের কেউ এমনকি ফোনেও কোন খোঁজ নেননি এই পরিবারটির।

তিনি বলছেন, তাদের বাবা আক্রান্ত হবার পর এবং তার মৃত্যুর পরে আরও একবার তিনি ও তার মায়ের করোনাভাইরাস পরীক্ষা করা হয়েছে, দুইজনেরই নেগেটিভ এসেছে ফল। করোনাভাইরাসের কারণে অনেক পরিবারকে অভাব-অনটনের মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে।

“কিন্তু আশেপাশের মানুষের আচরণ দেখলে মনে হয়, আমি ও আমার মা কোন দোষ করেছি। তারা সরাসরি কিছু বলে না, কিন্তু আমাদের যেন দোষীর চোখে দেখে সবাই। যেন আমার বাবা মারা গেছেন এটা আমাদের কোন অপরাধ।"

তিনি বলছিলেন, “১৪ দিন টানা বাড়িতে থাকার পর যখন আমি বাসা থেকে বের হলাম, দেখলাম চারপাশের মানুষ হঠাৎ সরে যাচ্ছে দুই পাশ থেকে। এখনও বের হলেই দেখি নির্ধারিত সামাজিক দূরত্বের চেয়ে অনেক বেশি দূরে দূরে সরে যায় মানুষ।"

“আমার বাবা মারা গেছে, আমাকে বা আমার মাকে কেউ সান্ত্বনা তো দেয়ই না, উল্টো কেউ কথাও বলে না আমাদের সাথে। জানি না মানুষ কি আগে থেকে এরকম অমানবিকই ছিল, নাকি এখন করোনার কারণে হয়েছে!" ওই নেতা নারয়ণগঞ্জে বেশ জনপ্রিয় ছিল।

সংবাদটি বিবিসি থেকে নেওয়া। বিবিসি রোগী ও মৃত ব্যক্তির নাম প্রকাশ করে। যোগফল নিজস্ব নীতিতে তাদের নাম প্রকাশ করেনি। অবশ্য মারা যাওয়া ব্যক্তির জন্য অফিসিয়াল বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হয়

বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত রোগীর নাম পরিচয় প্রকাশের ক্ষেত্রে এখন আর কোন গণমাধ্যম বাকি নেই। নানা রকমের প্রতিযোগিতা করেই নাম পরিচয় প্রকাশ হচ্ছে। আবার কারও ক্ষেত্রে চেপে যাওয়া হচ্ছে।


বিভাগ : বায়োস্কোপ