সুইডেনের নো-লকডাউন কৌশল কি সফল?

সৈয়দ মোহাম্মদ বাহালুল

21 May, 2020 02:23pm


সুইডেনের নো-লকডাউন কৌশল কি সফল?
কোভিড ১৯ পরীক্ষার কিট

এক কোটি জনসংখ্যার দেশ সুইডেনে এখন পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার এবং মৃতের সংখ্যা ৩ হাজার ৬০০। তবুও চলছে নো-লকডাউন কৌশল এবং প্রতিনিয়ত আপডেট করা হচ্ছে কৌশলের বিভিন্ন নির্দেশনা। মঙ্গলবার [১৯ মে ২০২০] নতুন করে নির্দেশনা এসেছে যে হোম টাউনের বাইরে জরুরি প্রয়োজন ব্যতীত দুই ঘন্টার অতিরিক্ত সময় নেয়, এমন ভ্রমণ না করার জন্য। নির্দেশনাটি আগামী পনের জুন পর্যন্ত বহাল থাকলে।

গত সপ্তাহে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের সাথে একটি সাক্ষাৎকারে নো-লকডাউন কৌশলটির সূচনাকারী সুইডিশ এপিডেমিওলজিস্ট আন্দার্স টেগনেল, এই ইউনিক কৌশলের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলছেন যে, মহামারির দ্বিতীয় পর্যায়ের আঘাতে অনেক দেশ হয়ত আবার লকডাউনে যেতে বাধ্য হবে। অন্যদিকে বিতর্কিত নীতিটির সূচনাকারীর প্রত্যাশা, মহামারির দ্বিতীয় পর্যায়ের আঘাতের তীব্রতা খুব কম হবে সুইডেনে।

তিনি অনুমান করছেন যে রাজধানীর স্টকহোমের ৪০ শতাংশ মানুষ মেয়ের শেষের দিকে কোভিড -১৯ বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তথা ইমিউনিটি তৈরি করবে। এবং এর সব চাইতে বড় সুবিধা এই যে, এই দেশকে দীর্ঘ মেয়াদে ভাইরাসের বিরুদ্ধে একটা সুবিধাজনক অবস্থায় নিয়ে যাবে।

আসছে শরতে মহামারির দ্বিতীয় পর্যায়ে সুইডেনের একটা উচ্চ মাত্রার ইমিউনিটি তৈরি হয়ে যাবে এবং আক্রান্তের সংখ্যা সম্ভবত বেশ কম হবে।

মহামারির প্রতিক্রিয়ায় অনন্য কৌশলের কারণে সুইডেন এবং সুইডিশ এপিডেমিওলজিস্ট টেগনেল বিশ্বব্যাপী স্পটলাইটের আওতায় এসেছেন।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, রেস্তোঁরা, ক্যাফে এবং দোকানগুলো বেশিরভাগই সুইডেনে স্বাভাবিক ভাবে খোলা। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ মূলত স্বেচ্ছায় সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা এবং সম্ভাব্য ক্ষেত্রে বাড়িতে থেকে কাজ করার উপর গুরুত্ব দিচ্ছে। হাই স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলি বন্ধ এবং ৫০ জনেরও বেশি লোকের জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে এটি এখন পর্যন্ত যে কোনও ইইউ দেশের তুলনায় সবচেয়ে রিল্যাক্সড পদ্ধতি।

মিস্টার টেগনেল বলেছিলেন যে, কার কৌশলটি সব চাইতে ভালো কাজ করেছে এবং কি পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে; তা জানতে এক থেকে দুই বছর সময় লাগবে। তিনি বলছিলেন যে, মূলত সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য এবং যতটুকু সম্ভব মানুষ যেন স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে সক্ষম হয়; এই বিষয় গুলোর উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সংকট চলাকালীন সুইডেনের জনস্বাস্থ্য সংস্থার উপর জনসাধারণের আস্থা বেড়েছে। এমনকি রাষ্ট্রীয় মহামারী বিশেষজ্ঞ অ্যান্ডার্স টেগনেলের পোশাক সচেতনতা নিয়ে ফ্যাশন ম্যাগাজিনে আলোচনা কিংবা তার ছবি দিয়ে উল্কি আঁকা, তাকে আলোচনার শীর্ষে নিয়ে এসেছে।

টেগনেল যুক্তি দিয়েছিলেন যে গণহারে লকডাউন গুলির সাথে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কি? বিশেষত স্কুলগুলি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত, কেননা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত কোন তথ্য নেই যে, শিশুরা সংক্রমণে বড় কারণ।

তার ধারণা ইউরোপীয় নেতারা তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ডুবে যাওয়ার আশঙ্কায় চীনের লকডাউন পদ্ধতির অনুসরণ করার প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন।

সুইডেনের জনস্বাস্থ্য সংস্থার গাণিতিক মডেল অনুসারে, মে মাসের শুরুতে স্টকহোমের প্রায় চতুর্থাংশ লোকের ভাইরাস ছিল। অন্যদিকে, নরওয়ের রাজধানী অসলোতে ওই সময়ে ২ শতাংশেরও কম জনসংখ্যা সংক্রামিত হয়েছিল বলে অনুমান করা হচ্ছে।

তবে টেগনেল বলছিলেন যে ভাইরাস প্রতিরোধ ক্ষমতা কত দিন টিকে থাকবে সে সম্পর্কে অনিশ্চয়তার অর্থ সুইডেনের "চরম প্রতিরোধ ক্ষমতা" বা "হার্ড ইমউনিটির" পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা। হার্ড ইমিউনিটি বিষয়টা এমন যে, রোগের এমন একটি স্তর যেখানে বড় সংখ্যক লোক আক্রান্ত হয়, প্রায় ৮০ শতাংশ এবং এটি ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করে দেয়। তিনি মনে করেন না যে, সুইডেন অথবা বিশ্বের অন্য কোন দেশ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার এই পর্যায়ে পৌঁছে যাবে।

অনেক দেশ আশাবাদী যে কোনও ভ্যাকসিন না পাওয়া পর্যন্ত তারা ভাইরাসটিকে প্রতিরোধ করতে পারবে। তবে টেগনেল বলেছিলেন যে, এমনকি খুব দ্রুততার সাথেও যদি একটা ভ্যাকসিন তৈরি হয় এবং সেটা একটা পুরো জনগোষ্ঠীর উপর প্রয়োগ করতে কমপক্ষে কয়েক বছর সময় লাগব।

"বসে থাকা এবং কেবল একটি ভ্যাকসিনের জন্য অপেক্ষা করা, এটা একটা বড় ভুল"। কোভিড -১৯ প্রতিরোধক ভ্যাকসিন সন্ধানের জন্য বিশ্বব্যাপী প্রচেষ্টা প্রয়োজন। আমরা যা ধারণা করছি তার চাইতেও বেশি সময় লাগবে হয়তো একটা কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরি করতে। যে কারণে টেকসই বিকল্প ব্যবস্থা রাখার নীতির উপর জোর দিয়েছি আমরা সুইডেনে।

সুইডেনের এই অনন্য কৌশল, বিশেষ পরিবর্তন ছাড়াই বছরের পর বছর না পারলেও কয়েক মাস ধরে অনায়াসে চলতে পারে। অন্য দিকে ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলো একটা উপায় হন্যে হয়ে খুঁজছে যে, কিভাবে সংক্রমণ বৃদ্ধি না করে কীভাবে সবকিছু আবার খুলে দেওয়া যায়।

কিছু সমালোচনা এসেছে যে, কোভিড-১৯ এর মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে সুইডেনের আরও কঠোর প্রচেষ্টা করা উচিত ছিল। মাথাপিছু মৃত্যুর পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে যে মহামারির এই পর্যায়ে সুইডেন কেবল যুক্তরাজ্য, ইতালি, বেলজিয়াম এবং স্পেনের পিছনে রয়েছে।

বৃদ্ধাশ্রম গুলোতে সংক্রমণ ঠেকানোর ক্ষেত্রে সুইডেন ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর জবাবে মি. টেগনেল বলছিলেন যে, বৃদ্ধাশ্রম গুলোতে উচ্চ হারে সংক্রমণ বা মৃত্যুর কারণ পদ্ধতিগত ত্রুটি নয়। মূলত কিছু কিছু ক্ষেত্রে নির্দেশনা না মানা এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে কোয়ালিটি বা মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিশেষ করে যেসব বৃদ্ধাশ্রম বেসরকারি ভাবে পরিচালিত, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ টা বেশি। এই একটা বিষয় নিয়ে আমার গভীর অনুশোচনা রয়েছে।

সৈয়দ মোহাম্মদ বাহালুল: ফিজিওথেরাপিস্ট, সুন্ডসভাল, সুইডেন।


বিভাগ : মুক্তমত