সংবিধান লঙ্ঘন করে মামলা নিচ্ছে ‘জিএমপি সদরের ওসি’

যোগফল প্রতিবেদক

23 May, 2020 02:13pm


সংবিধান লঙ্ঘন করে মামলা নিচ্ছে ‘জিএমপি সদরের ওসি’
ছবি : সংগৃহীত

দেশের সংবিধান ও আইন লঙ্ঘন করে বহুল আলোচিত ‘ডিজটাল নিরাপত্তা আইনে’ মামলা নিচ্ছেন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) সদর থানার ওসি সমীর চন্দ্র সূত্রধর। সম্প্রতি এ থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে পৃথক মামলা হয়েছে।

এর মধ্যে আড়াই বছর আগের একটি ‘সাজানো ঘটনা’কে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রূপ দেওয়া হয়েছে। মাত্র ১৪ দিনের ব্যবধানে একই আইনে অন্য মামলাটি হয়েছে গাজীপুরের শীর্ষ দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে।

বিধিবহির্ভ‚ত মামলাগুলোর ‘কারিগর’ সমীর চন্দ্র সূত্রধর ১৯৯৯ সালে কনস্টেবল পদে পুলিশে যোগদান করেন। গোপালগঞ্জে বাড়ি থাকার সুবাদে ২০ বছরেই সময়মত বিভাগীয় পদোন্নতি নিয়ে ওসির পদ বাগিয়ে নেন তিনি।

২০১৮ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ৮টি থানা নিয়ে গঠিত জিএমপি’র আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। এর মধ্যে পূর্বের জয়দেবপুর থানাকেই গাজীপুর সদর থানায় রূপ দেওয়া হয়। সে হিসেবে এই থানার প্রথম ওসি সমীর চন্দ্র সূত্রধর; যিনি ঢাকার সূত্রাপুর থানার (ডিএমপি) পরিদর্শক (তদন্ত) থেকে পদোন্নতি পেয়ে গত ১৬ সেপ্টেম্বর এই থানায় যোগদান করেন।

তিনি দায়িত্ব নেওয়ার ৬৯ দিনের মাথায় গত ২৪ নভেম্বর নতুন ইতিহাস গড়েছেন। তার থানায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে থাকা ঝিনাইদহ সদরের হলিধানী গ্রামের আব্দুল খালেক মিয়ার ছেলে মো. মশিউর রহমান (৩৬) নির্যাতন সইতে না পেরে রিমান্ডের তিন দিন না যেতেই মারা যান। 

মশিউর মানবপাচার প্রতিরোধ দমন মামলার আসামি হিসেবে ২১ নভেম্বর থেকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পুলিশ হেফাজতে ছিলেন। ‘রহস্যজনক’ এই মৃত্যুকে সাংবাদিকদের সহযোগিতায় সমীর চন্দ্র সূত্রধর আত্মহত্যায় রূপ দিয়েছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। 

ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর সদর থানায় দুই বছর ছয় মাস আগের একটি ঘটনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা (নম্বর ৪) করেছেন জুলীয়াস চৌধুরী। যেখানে মাত্র ১৪ সপ্তাহ আগে এই আইন কার্যকর হয়েছে। বাদী এজাহারে নানা অবান্তর তথ্য যুক্ত করেছেন।

গত বছরের ৮ অক্টোবর ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮’ কার্যকর হয়। সংবিধানের ৩৫(১) অনুচ্ছেদে বলা আছে, “যখন ঘটনা ঘটবে তখন বলবৎ নেই এমন কোনো আইনে কারও বিচার করা যাবে না।”

এই মামলার আসামি ভোলার লালমোহন থানার নয়নী গ্রামের মো. আবুল হোসেনের ছেলে মেহেদী হাসান এবং খুলনার কয়রা থানার বনশখালী গ্রামের পরিতোষ কুমার মন্ডলের ছেলে পার্থ জ্যোতি মন্ডল। তাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৩(২,৩) ও ৩৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। 

এজাহারের তথ্য বলছে, বাদী নিজের নামের সঙ্গে মিল রেখে dearjulius.com নামের একটি ব্যক্তিগত ব্ল খুলেছেন। যদিও এজাহারে বলা হয়েছে, এই ব্লগে একটি আন্তর্জাতিক ওয়েব পোর্টাল রয়েছে। তবে ভিনদেশের ঠিক কোন ওয়েবসাইটের সঙ্গে যুক্ত তা উল্লেখ নেই। অনলাইন গণমাধ্যমকে বলা হয় নিউজ পোর্টাল।

এজাহারে দাবি করা হয়েছে, “বাদীর নামে তৈরি ওয়েবসাইটের অধীনে “দুটি দৈনিক অনলাইন সংবাদপত্র ও ১৭টি ম্যাগাজিন ছাড়াও abc.com.bd নামক একটি বাংলা ওয়েবসাইট রয়েছে।” এসব ওয়েবসাইট, সম্পাদক ও প্রকাশকের কোনো অস্তিত্ব নেই।

জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালায় অনুমোদনের জন্য “abc.com.bd ও dearjulius.com ওয়েবসাইট দুটি আবেদিত নয়।”

ঘেঁটে দেখা গেছে, abc.com.bd ঠিকানায় ক্লিক করলেই dearjulius.com নামক ব্যক্তিগত বব্লগটি চালু হয়। এতে বিভিন্ন পত্রিকা, টেলিভিশন ও নিউজ পোর্টালের লিঙ্ক (ঠিকানা) দেওয়া আছে। 

আইটি বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ‘এটি রি-ডাইরেক্ট করা একটি কমিউনিটি ওয়েবসাইট। যা কোনো গণমাধ্যম নয়।’

ওয়েবসাইটির নিচে কিছু প্রতারণামূলক তথ্য রয়েছে। প্রথমেই প্রধান সম্পাদকের স্থলে জুলীয়াস চৌধুরীর নাম রয়েছে। নামের পরই নিউইয়র্ক সিটির একটি মোবাইল নম্বর দেওয়া আছে। যাচাই করে নম্বরটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। 

‘সম্পাদকের নাম দেওয়া আছে শামসুল হক চৌধুরী। যেটি জুলীয়াসের অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলের নাম।’

এছাড়াও ব্যক্তিগত এই ওয়েবসাইটের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মো. মোর্শেদ আহাম্মেদ, নির্বাহী সম্পাদক নাশিদ আহমেদ তুষার। আবার রিপোর্টিং বিভাগে স্বপন চন্দ্র দাস নামে একজনের নাম ও ফটো সাংবাদিক পদবী দেওয়া আছে। যাদের প্রকৃত পরিচয় কি তা যোগফল জানতে পারেনি।

এসব ছাড়াও বাদীর নিজ নামে তৈরি বøগে তিনটি ঠিকানা দেওয়া আছে। এর মধ্যে প্রধান কার্যালয় হিসেবে দেওয়া ঠিকানাটি মূলত একটি গাড়ি বিক্রেতার অফিস বলে জানতে পেরেছে যোগফল। এছাড়া নিউইয়র্কের একটি ঠিকানা দেওয়া হয়েছে। গুগল ম্যাপের তথ্যানুযায়ী, উল্লেখিত ঠিকানায় এমন কোনো অফিস নেই। কমিউনিটি এই ওয়েবসাইটটিতে গাজীপুরের একটি ঠিকানাও দেওয়া আছে।

অপরদিকে গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর গাজীপুরের দুই শীর্ষ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা (নম্বর ২৯) নিয়েছেন ওসি। মামলাটি এ আইনের ২৫(২) ও ২৯ ধারায় রুজু হয়েছে। এই আইনের ৫৩ ধারা অনুযায়ী, “উভয় ধারা [২৫(২) ও ২৯] অ-আমলযোগ্য অপরাধ।”

ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৫(২) ধারা অনুযায়ী, “প্রথম শ্রেণি বা দ্বিতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়া অ-আমলযোগ্য কোনো ঘটনার তদন্তে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।”

সাধারণত এমন অভিযোগ সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে দায়ের করার পর ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি সাপেক্ষে আদালতে প্রসিকিউশন দাখিল করতে হয়। কিন্তু আইনের এসব বিধান লঙ্ঘন করে ওসি সমীর চন্দ্র সূত্রধর সরাসরি মামলাটি এফআইআর করেছেন।

তড়িঘড়ি করে এ মামলার তদন্ত কাজ শুরু হয়েছে এজাহার দায়েরের পরই। যেখানে গুরুত্বপূর্ণ অনেক মামলা এফআইআর করতে অর্থ খরচের পাশাপাশি পোহাতে হয় ভোগান্তি।

গত ১৫ অক্টোবর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৯টি ধারা সংশোধন চেয়ে সম্পাদক পরিষদ রাস্তায় নেমেছিল; যা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। সম্পাদক পরিষদ বলছে, সদ্য কার্যকর হওয়া আইনটির বিভিন্ন ধারা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

দুই মামলার বিষয়ে সদর থানার ওসি সমীর চন্দ্র সূত্রধর যোগফলকে বলেন, “সেটা কোর্ট ধরবে। আপনি এভাবে প্রশ্ন করতে পারেন না। প্রশ্ন করলে কোর্ট করবে। যদি কোর্ট আমাকে শোকজ করে, আমি কোর্টে কথা বলব।”

জিএমপি সদর জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) শরীফ হায়দার শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় মুঠোফোনে যোগফলকে বলেন, ‘দেখি, আমার নলেজে নেই। বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি কিছু না বলে সংযোগ কেটে দেন।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রুহুল আমিন তুহিন যোগফলকে বলেন, কগনিজেন্স চ্যালেঞ্জ করলেই মামলা বাতিল হবে। চার্জশিটের দরকার নেই।

অপর আইনজীবী মো. কাওসার হোসাইন যোগফলকে বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধি ৫৬১(এ) ধারার বিধানমতে হাইকোর্ট বিভাগে এসব মামলার বৈধতা চ্যালেঞ্জ (কোয়াশমেন্ট) করলে আইনগত ত্রুটির কারণে টিকবে না, বরং বাতিল হয়ে যাবে। এ জাতীয় মামলার নজির খুব কম। একটি থানায় ১৪ দিনের মধ্যে দুটি বেআইনি মামলা দায়ের উদ্বেগজনক। ২০  জানুআরি ২০১৯।


বিভাগ : হ-য-ব-র-ল