ভেস্তে গেল কাপাসিয়া কলেজ অধ্যক্ষের ‘পাতানো অডিট’

যোগফল প্রতিবেদক

24 May, 2020 06:19am


ভেস্তে গেল কাপাসিয়া কলেজ অধ্যক্ষের ‘পাতানো অডিট’
ছবি : সংগৃহীত

গাজীপুরের কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজের দুর্নীতিগ্রস্থ অধ্যক্ষ মো. ছানাউল্লাহ নিজের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের যেসব অডিট আপত্তি ওঠেছে তা নিরীক্ষা (অডিট) করতে নাটোর থেকে নিরীক্ষক (অডিট কর্মকর্তা) এনেছেন। এ কাজে তাকে সহযোগিতা করেছেন কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মো. হুমায়ূন কবীর। তার বাড়ি নাটোরে।

মঙ্গলবার (৫ জুন ২০১৮) দুপুরের আগে মোজাফ্ফর হোসেন নামের ওই নিরীক্ষক কাপাসিয়া কলেজে গিয়ে অধ্যক্ষ ছানাউল্লাহ ও শিক্ষক মো. হুমায়ূন কবীরের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেন। পরে দুপুর আড়াইটার দিকে গাজীপুরের জেলাপ্রশাসক ডক্টর দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীরের সঙ্গে সাক্ষাত করতে রওনা হন।

একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্যমতে, “অধ্যক্ষের কক্ষে ছানাউল্লাহ, শিক্ষক প্রতিনিধি হুমায়ূন কবীর ও মোজাফ্ফর হোসেন দীর্ঘক্ষণ বৈঠক করেন। সেখানে কলেজের অন্য কোন শিক্ষক, শিক্ষক প্রতিনিধি ও পরিচালনা পর্ষদের কেউ উপস্থিত ছিলেন না। এমনকি পরিচালনা পর্ষদের কোন সদস্যও বিষয়টি জানতেন না। বৈঠক শেষে অধ্যক্ষ ছানাউল্লাহ মোজাফ্ফর হোসেনকে জেলাপ্রশাসকের কাছে পাঠাতে কলেজের প্রধান ফটকের সামনে গিয়ে রিকশায় তুলে দেন।”

একাধিক শিক্ষকের অভিযোগ, ‘অডিট রিপোর্ট যাতে নিজের পক্ষে হয় সেজন্য অধ্যক্ষ ছানাউল্লাহ শিক্ষক প্রতিনিধি হুমায়ূন কবীরের পরামর্শে মোজাফ্ফর হোসেনকে কলেজে এনেছেন।’

নিরীক্ষক আনার বিষয়ে শিক্ষক প্রতিনিধি হুমায়ূন কবীর যোগফলকে বলেন, আমি কাউকে নিয়ে আসিনি, ওনার (মোজাফ্ফর) সাথে আমার কোন যোগাযোগও ছিলনা, জানিও না চিনিও না, চিনতামও না। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন আমি নিরীক্ষক আনব কেন?

জেলাপ্রশাসক ডক্টর দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর যোগফলকে বলেন, “অডিট ফার্ম থেকে যোগাযোগ করেছে। অধ্যক্ষ ও শিক্ষক প্রতিনিধি মিলে অডিট ফার্মের লোক এনেছে জানানো হলে তিনি বলেন, বিষয়টি খোঁজ করে দেখছি।”

অধ্যক্ষ ছানাউল্লাহ সব অস্বীকার করে যোগফলকে বলেন, অডিট কর্মকর্তা আমার কাছে আসবে কেন? ডিসি স্যার নিয়োগ না দিলে আমার এখানে আসার কোন অর্থ আছে? কলেজে ওই নিরীক্ষক গিয়েছিল কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার সাথে দেখা হয়নি। বৈঠক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, না না না ভুল কথা। ডিসি স্যার অডিট করতে যাকে পাঠায়, যেদিন পাঠায় তাকে সহযোগিতা করতে বলা হয়েছে।

আপনি অডিট ফার্মকে খবর দিয়েছেন কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি খবর দিতে যাব কেন? আমি এসব বিষয়ে জানিনা। সব ডিসি স্যার বলতে পারবে।’

ওই সূত্রের তথ্যনুযায়ী জেলাপ্রশাসকের কাছে অধ্যক্ষ বলেছেন, “একজন লোক সিএ ফার্ম থেকে ফোন করে কলেজের অডিট করতে আগ্রহী বলে অধ্যক্ষকে জানিয়েছেন। তখন ওই লোককে তিনি কলেজে না এসে কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির কাছে যেতে বলেন।”

নিরীক্ষক মোজাফ্ফর হোসেন যোগফলকে বলেন, “কলেজে গিয়েছি। অনেক প্রাচীন কলেজ। আমার কাছে মনে হয়েছে বার বার অধ্যক্ষ পরিবর্তনের ফলে কলেজ কাক্সিক্ষত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। অধ্যক্ষসহ কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা হয়েছে। আগের অডিট রিপোর্ট দেখেছি। ওই রিপোর্ট ঠিকমত হয়নি। কলেজের হিসাবরক্ষক খুব দুর্বল। কলেজে গিয়ে পরিচালনা পর্ষদের কাউকে পাইনি।”

তিনি বলেন, কাপাসিয়া কলেজ, পিয়ার আলী ডিগ্রি কলেজ, ভাওয়াল কলেজ, মিজানুর রহমান মহিলা কলেজের অডিট আমরা করেছি এবং অধ্যক্ষদের সঙ্গেও কথা-বার্তা হয়। আমরা সকল কলেজের নম্বর পেয়ে থাকি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

তিনি বলেন, যদি কোন অধ্যক্ষ টাকা আত্মসাৎ করে তাহলে কোনভাবেই পার পাবে না। কিন্তু অডিট করতে হলে আপনাদের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে।

তিনি অডিট করতে পারবেন না এমন সংশয় প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি জেলাপ্রশাসকের সঙ্গে সাক্ষাতের পর বলা হয়েছে রেবাবারে যেতে। চলে আসার পর এডিসি (শিক্ষা) আমাকে ফোন করে জানতে চান অধ্যক্ষের সাথে আমার কথা হয় কি-না। তখন বলেছি হ্যাঁ, সব কলেজের অধ্যক্ষদের সঙ্গে কথা হয়। পরে আপনার (প্রতিবেদক) সাথে প্রথম কথা বলার পর এডিসি আবার ফোন দিয়ে জানালেন রোববারে আসতে হবে না। কবে যেতে হবে তা পরে জানানো হবে।’

তিনি বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানের নাম শফিক, মিজান, রহমান ও আগস্টিং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট।

আপনি কার মাধ্যমে এসেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যে কেউ নিয়ে যাক সেটা কোন কথা না। ডিসি যদি অডিটে নজর রাখে তাহলে কেও কিন্তু পার পাবে না। তিনি বলেন, আমাদের চেয়ে ভাল অডিট কেও করতে পারবে না।’

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষক হুমায়ূন কবীরের বিধি সম্মত নিয়োগপত্র নেই। নিরপেক্ষ অডিট হলে এসব প্রকাশ হতে পারে ভেবে অধ্যক্ষের সঙ্গে যোগসাজস করছেন।

একাধিক শিক্ষক ও স্থানীয় সচেতন মহলের অভিমত, অধ্যক্ষ ছানাউল্লাহ কলেজের ৪-৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এখন তাকে দায়িত্বে রেখে অডিট নিরপেক্ষভাবে করা সম্ভব না। তাদের ভাষ্য, যেকোন সময় ছানাউল্লাহ দেশ ত্যাগ করতে পারেন। তাই তার পাসপোর্ট জেলাপ্রশাসক ও কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির কাছে জমা রাখা হোক।

উল্লেখ্য, অধ্যক্ষের নিয়োগে কারচুপি, শিক্ষক নিয়োগে বাণিজ্য, কলেজের অর্থ আত্মসাৎ, শিক্ষকদের মধ্যে বিভাজন, কলেজের কাজ ননএমপিও প্রভাষকের দোকানে, এমপিওভুক্তদের বেতন বকেয়া, প্রতিবাদ করলেই অধ্যক্ষের টার্গেটে থাকেন শিক্ষকরা এমন চিত্র তুলে ধরে ‘কাপাসিয়া কলেজে অডিট না হওয়ায় গচ্চা যাচ্ছে কোটি টাকা’ শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে যোগফল। পরে এসব তদন্তে কমিটি করে জেলাপ্রশাসক। অন্যদিকে গত পাঁচ বছরের অডিটের সিদ্ধান্ত চ‚ড়ান্ত হয়। ২০১৮।