অরক্ষিত উপকূলের সাড়ে ৪ কোটিরও বেশি মানুষ

যোগফল ডেস্ক

24 May, 2020 09:17am


অরক্ষিত উপকূলের সাড়ে ৪ কোটিরও বেশি মানুষ
আমফানের পরের চিত্র

কালো মেঘ দেখলেই আঁতকে ওঠেন উপকূলের মানুষ। দুর্যোগ-দুর্বিপাক প্রতি বছরই আঘাত হানে উপক‚লে। আসে সিডর আইলার মতো প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়। প্রতি বছর এই সময়ে ঝড়-তুফান ও ঘূর্নিঝড় উপকূলবাসীকে তাড়া করে। অরক্ষিত উপক‚লীয় এলাকার সাড়ে ৪ কোটিরও বেশি মানুষ। গত বছর ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে দেশের উপকূলীয় বাঁধগুলো জরাজীর্ণ হয়ে আছে। বর্ষার আগেই জরুরি ভিত্তিতে বাঁধ সংস্কার করা না হলে কোটি কোটি টাকার ফসল, সম্পদসহ বহু জনপদ বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ষাটের দশকে নির্মিত উপক‚লীয় এলাকার বেড়িবাঁধের বেশিরভাগই এখন নাজুক হয়ে পড়েছে। উপক‚লের বেড়িবাঁধ এখন নামেই আছে। উপক‚লের বেড়িবাঁধ সংস্কার ও মেরামতের নামে প্রতি বছর চলে সীমাহীন দুর্নীতি। সরকারি অর্থের হয় হরিলুট। ঠিকাদার, প্রকৌশলী আর ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বরাদ্দের অর্থ নিয়ে করেন নয়ছয়। এ কারণে উপকুলে হয় না স্থায়ী শক্তিশালী বেড়িবাঁধ। সামান্য জোয়ারে বেড়িবাঁধ ভেঙে গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হয় প্রতি বছর।

গত বছরের মে মাসে আঘাতহানা ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে জোয়ারে ভাঙা বাধ দিয়ে পানি ঢুকে নিমজ্জিত হয় উপক‚লের বহু এলাকা। বেড়িবাঁধ ভেঙে তালিয়ে যায় ফসলের জমি ও জনবসতি। এরপর থেকে ঝুকির মধ্যেই বসবাস করছে বরগুনা, সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী ও পিরোজপুর, খুলনার উপকূলের মানুষ।

সিডরের ১৩ বছর পরও দক্ষিণাঞ্চলের বিধ্বস্ত বেড়িবাঁধ সংস্কার হয়নি। সিডরে বিধ্বস্ত বেড়িবাঁধগুলোর বেশির ভাগ এখনও আগের মতোই আছে। বাঁধগুলো দিয়ে সামান্য জোয়ারের পানি ঢুকে যায় ফসলী জমিতে। মিঠাপানির উৎসও পুনঃস্থাপন হয়নি। সিডর-কবিলত শরণখোলা, মঠবাড়িয়া, পাথরঘাটা, বরগুনা, তালতলী, কলাপাড়া, গলাচিপা, চরখালীসহ অন্যান্য এলাকায় এখনও বহু মানুষ ঘর পায়নি। তারা এখনো বেড়িবাঁধের ওপর বাস করছে। জেলেদের অবস্থা আরও করুণ। তারা যে জাল ও ট্রলার সাহায্য হিসেবে পেয়েছিল তার বেশির ভাগই ব্যবহার করতে না পেরে বিক্রি করে দিয়েছেন। রয়েছে সুপেয় পানির তীব্র সংকট।

ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের অন্তত ৪২৪ কিলোমিটার বাঁধ। এ অবস্থায় উত্তাল নদী কিংবা আকাশে মেঘ দেখলেই ভাঙন আতঙ্কে আঁতকে উঠে উপক‚লের মানুষ। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, খুলনা অঞ্চলে ৩৬৫ দশমিক ২৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে সংস্কারের অভাবে প্রায় ১০৯ কিলোমিটার বাঁধের অবস্থা জরাজীর্ণ। পাউবো খুলনা দুই এর ৫১০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে ৪৫ কিলোমিটার। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল হোসেন বলেন, খুলনা ও সাতক্ষীরার ১৬০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের অধিকাংশ ঝুঁকিপহৃর্ণ অবস্থায় আছে। বাগেরহাটের প্রায় ৪০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের অবস্থা ঝুকিপূর্ণ। স্থানীয়দের আশংকা, সামনের বর্ষায় মৌসুমে বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হতে পারে শতাধিক গ্রাম।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, সুপার সাইক্লোন সিডরে দক্ষিণের ৩০ জেলার ২ হাজার ৩৪১ কিলোমিটার বাঁধ বিধ্বস্ত হয়। যার মধ্যে একেবারেই বিলীন হয় ৩৯১ কিলোমিটার বাঁধ। এক হাজার ৯৫০ কিলোমিটার বাঁধ আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ওই বাঁধ মেরামতের জন্য পাউবো দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে। কিন্তু সামান্য পূর্ণিমার জোয়ারে এসব বাঁদ ভেঙে যায়। উপকহৃলের মানুষের যেন জীবনের কোন নিরাপত্তার ও নিশ্চয়তা নেই। সামান্য ঝড়-বৃষ্টিতেও বিপর্যয়ের আশংকায় আতংকিত দিনযাপন করে উপকূলের মানুষ।

সিডর ও আইলায় পটুয়াখালী জেলার ক্ষতিগ্রস্থ ২৮৫ কিলোমিটার বাঁধ আজও সংস্কার হয়নি। পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্র জানিয়েছে, জেলার ১২টি পোল্ডারের অধীনে মীর্জাগঞ্জ, গলাচিপা ও কলাপাড়া উপজেলায় ৬০ কিলোমিটার বাঁধ এখনও অরক্ষিত। গলাচিপার চালতাবুনিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আজিজুর রহমান জানান, তাদের ইউনিয়নের চারদিকে নদী। বাঁধ না থাকায় পানি বাড়লেই ডুবে যায় বাড়িঘর। ক্ষতিগ্রস্থ হয় ফসলের।

সাগর ও নদী বেষ্টিত উপক‚লীয় জেলা বরগুনায় এখনও জোয়ারের পানি সামান্য বেড়ে গেলেই নিম্নাঞ্চলসহ বেড়িবাঁধের বাইরে বসবাসকারীদের বাড়ি-ঘর, ফসলী জমি তলিয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় রান্না-বান্না। জলোচ্ছ¡াস বা ঘূর্ণিঝড়ের সময়ে আশ্রয় নেবার মতো পর্যাপ্ত সাইক্লোন সেল্টার নেই। তাই মৃত্যু ঝুকি নিয়েই বরগুনার উপক‚লীয় এলাকার মানুষ বসবাস করছে। বলেশ্বর তীরবর্তী পোটকাখালী আশ্রয়ন প্রকল্পের বাসিন্দা মোহর মিয়া জানান, জোয়ারের পানি সামান্য বেড়ে গেলেই ঘরে পানি উঠে যায়।

এ বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ঘূর্নিঝড়, জলোচ্ছ¡াস আর বন্যা থেকে উপক‚লীয় এলাকা রক্ষায় দক্ষিণের ছয় জেলায় নির্মাণ করা হবে ৬২৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। যার খরচ ধরা হয়েছে ৩ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। প্রকল্পের আওতায় খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরগুনা ও পটুয়াখালি জেলার ১৭টি পোল্ডারে নির্মিত হবে বেড়িবাঁধ।

মেরামত ও সংস্কার কাজে ঠিকাদারের ফাঁকি এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঠিক নজরদারির অভাবে বার বার বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রা ও দাকোপ।

দাকোপে বার বার বাঁধ ভাঙা সম্পর্কে স্কুল শিক্ষক হাসান রানা বলেন, মোংলা চ্যানেলের জোয়ারের পানি সরাসরি এই বাঁধে আঘাত করে। এছাড়া জোয়ারের পানির তোড়ে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃদ্ধির কারণে বাঁধটি বার বার ভেঙ্গে যাচ্ছে।

পানি উন্নয় বোর্ডের তথ্যমতে সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলায় ৫৫৩ কিলোমিটার ভেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ২৭ কিলোমিটার ভেড়িবাঁধ অধিক ঝুকিপূর্ণ। ঘুর্ণিঝড় ফণির আঘাতে ১৫ কিলোমিটার ভেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দাঁতিনাখারী প্রায় ১ কিলোমিটার এলাকা ধ্বসে পড়ার উপক্রম হয়েছে। পাউবোর নির্বাহি প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান বলেন, সাতক্ষীরার দুই ডিভিশনের আওতায় মোট ২৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে পাউবোর আওতায় ১০ কিলোমিটার ঝুঁকিতে আছে।

সিডরের ১৩ বছরেও পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের পায়রা নদীর পাড়ে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ হয়নি। ঘূর্ণিঝড় ফণি’র প্রভাবে বাঁধ ভাঙে। গত বছর পায়রা নদীর ভাঙনের কারণে এ বেড়িবাঁধটি ভেঙে গেছে। এতে উপজেলার দেউলি সুবিদখালী ইউনিয়নের চরখালী, মেন্দিয়াবাদ, হাজিখালী, রানীপুর ও গোলাখালীসহ পাঁচ গ্রাম এবং মির্জাগঞ্জ সদর ইউনিয়নের রামপুর, কিসমত রামপুর, ভিকাখালী ও সন্তোষপুরসহ পাঁচ গ্রামের মানুষের বাড়িঘর ও ফসলি জমিসহ বিস্তীর্ণ জনপদ চরম ঝুঁকির মধ্যে।

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম মন্টু বলেন, উপকূলের বিভিন্ন বাঁধের অবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বাঁধগুলো আরও উচু ও টেকসই করে তৈরি করতে হবে। বেড়িবাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মনিটরিং টিম গঠন দরকার। একদিকে বাঁধ তৈরি হয়, অন্যদিকে ভেঙ্গে যায়। বাঁধের টাকা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ আছে। বাঁধ সংরক্ষণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মনিটরিং বাড়াতে হবে।

এ বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডাক্তার মো. এনামুর রহমান বলেন, আমরা পরিকল্পনা নিয়েছে, উপকূলীয় বাঁধগুলো আরসিসি ঢালাই করতে চাই। এতে বাঁধ নিয়ে অনিয়ম কমবে এবং বাঁধ টেকসই হবে। এটা করতে পারি তাহলে শুধু ঘূর্ণিঝড় নয়, জলবায়ু পরিবর্তনে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে আমাদের উপকূলকে এই বাঁধ রক্ষা করবে। তিনি বলেন, উপকুলের মানুষ এখন ত্রাণ চায় না, স্থায়ী বেড়িবাঁধ চায়।

এ বিষয়ে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক বলেন, উপকূলীয় সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি, খুলনার কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপ উপজেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডে সাতটি পোল্ডারের আওতাধীন বেড়িবাঁধ নির্মাণে ১২ হাজার ৯ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। চলমান এসব প্রকল্পের কাজ বর্ষা মৌসুমের আগেই শেষ করা হবে। সূত্র: এগ্রোনিউজ বিডি ডটকম।


বিভাগ : খেতখামার