গাজীপুরে সাড়ে ১১ হাজার একর বেদখল বনভূমি উদ্ধার হবে?

আসাদুল্লাহ বাদল

24 May, 2020 08:55pm


গাজীপুরে সাড়ে ১১ হাজার একর বেদখল বনভূমি উদ্ধার হবে?
আসাদুল্লাহ বাদল

আসাদুল্লাহ বাদল : সরকারী গেজেট মূলে গাজীপুর ও ঢাকা জেলার ২০৯টি মৌজায় মোট বনভূমি রয়েছে ৫৩ হাজার ৬৭১ দশমিক ৮৯ একর। আরএস (রিভিশনাল সার্ভে) রেকর্ড মুলে রয়েছে ৪৬ হাজার ২২৩ দশমিক ২৫ একর বনভূমি। এর মধ্যে ১১ হাজার ৬৫৬ দশমিক ৪৭ একর বিভিন্ন কারখানা ও প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে। তবে বাস্তবে এই দখলের চিত্র আরও বেশি। 

বনের জমির পাশে অনেক বৈধ জমিও রয়েছে। যার কারণে বার বার উচ্ছেদ অভিযান বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। এই সংক্রান্ত অনেক আবেদন রয়েছে জেলা প্রশাসনের কাছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে ব্যক্তি মালিকানা ও বনের জমির সমস্যা নিস্পত্তি করা হবে বলে জানিয়েছেন গাজীপুর জেলা প্রশাসক দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর।

গাজীপুর বন আদালত সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় কালিয়াকৈর, কাচিঘাটা, রাজেন্দ্রপুর, ভাওয়াল এবং শ্রীপুর এলাকায় রেঞ্জ। ওই ৫টি রেঞ্জের আওতায় বিট অফিস রয়েছে ২৭টি। ওই রেঞ্জের আওতায় ৩ শতাধিক শিল্পকারখানার বিরুদ্ধে বনের জমি জবর দখলের মামলা রয়েছে। এছাড়া বন উজার, বনের জমি থেকে মাটি কাটা ও বনের জমিতে স্থাপিত নির্মাণ করায় ৫ হাজার ২৮৩টি মামলা চলমান রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান, সরকার ঘোষিত সংরক্ষিত বনাঞ্চল। কিন্তু ভূমি ব্যবস্থাপনায় ক্রুটি, বন বিভাগের উদাসীনতা আর ক্ষমতাশালীদের প্রভাবে দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে এ বনের আয়তন। এরমধ্যে বনের জায়গায় রাস্তাঘাট, কারখানা নির্মাণ করায় হুমকিতে পড়েছে এর জীববৈচিত্র।

গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানটি ১৯৮২ সালে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে সরকার সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেন। গজারিগড় বেষ্টিত আড়াইশ প্রসাদ, ভবানীপুর, বাড়ইপাড়া, ডগুরী, বন খরিয়া, বাওপাড়া, উত্তর সালনা, বাহাদুরপুর মৌজার ৬৫ হাজার ৩৮৫ একর জমিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আওতায় আনা হয়। এসব সংরক্ষিত বনাঞ্চলে রয়েছে হরেক রকমের গাছ পালা আর নানা ধরনের প্রাণী। তবে বনের ভেতরে স্থানীয় অধিবাসীদের জোত জমি থাকায় তারা অবাধে বনে প্রবেশ করছে। আর এই সুযোগে বিভিন্ন কলকারখানার মালিক কৃষকদের কাছ থেকে জমি কিনে মিল কারখানা স্থাপনের নামে অবাধে বনের জমি দখল করে নিচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বন বিভাগের কর্মকর্তাদের গোচরেই কলকারখানার মালিক ও প্রভাবশালীরা সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জমি গ্রাস করছে। প্রভাবশালীদের হাত থেকে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জমি রক্ষা করতে না পারলে একদিন ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের গাছসহ জীববৈচিত্র হারিয়ে যাবে।

এলাকাবাসী, ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, বন বিভাগের জমি দখল করা হয় একশ্রেণীর দালালচক্রের মাধ্যমে। তারা বন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অর্থের লেনদেন করে দখলে সহায়তা করে। প্রথমে কোন শিল্পপ্রতিষ্ঠান বনের জমির সঙ্গে লাগানো ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি কিনে নেন। তাতে তারের বেড়া দিয়ে রাতারাতি সীমানা বর্ধিত করে। অনেক সময় স্থানীয় ভূমি কার্যালয়ে টাকা দিয়ে নামজারিও করে নেয় কারখানা কর্তৃপক্ষ। দখলদারগণ সীমানা নির্ধারণ করে, সেখানে চটের ছালা বা প্লাসটিকের কাগজ দিয়ে বেড়া দেয়। পরে নতুন টিন বা ওয়ালে কালো রং বা আলকাতরা দিয়ে স্থাপনা তৈরি করে। হঠাৎ করে দেখলেও মনে হবে অনেক পুরোনো স্থাপনা। অপর দিকে বনের জমি দখল করে উপরে বালু ফেলে তা প্লট আকারে বিক্রি করে প্রভাবশালীরা। এসব কাজে সহযোগীতা করে বনের লোকজন ও দালালচক্র। উপর মহলের চাপের মুখে বন কর্মকর্তারা কিছু স্থাপনা উচ্ছেদ করলেও দুই তিন দিনের মধ্যে সেখানে ফের স্থাপনা গড়ে উঠে। তবে দখল, বন উজার, বনের জমি থেকে মাটি কাটা, স্থাপনা নির্মাণ করায় গাজীপুরে সাড়ে ৫ হাজারেরও বেশি মামলা চলমান রয়েছে। এসব মামলা পরিচালনায় জনবল সংকটের কারণে মামলাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব মামলা আদালতে দীর্ঘদিন বিচারাধীন থাকার সুযোগে বনের জমি দখলের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। ফলে নির্বিগ্নে শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ, রাস্তা-ঘাট, বহুতল ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের প্রতিযোগিতা শুরু করে দখলদাররা। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় বনের জমিতে শিল্পকারখানা, শত শত ঘর-বাড়ি, দোকানপাট, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। নির্মাণাধিন রয়েছে শত শত স্থাপনা। এছাড়াও বনের জমিতে বালি ফেলে প্লট করে দখল বিক্রি করা হয়েছে। তা এখনো চলছে। গাজীপুরের ৫টি রেঞ্জে বনের জমি ব্যাপক স্থাপনা তৈরি ও দখলবাজি চলছে। এদের মধ্যে কালিয়াকৈর ও কাচিঘাটা রেঞ্জে বেশি। 

বনবিভাগের এসব জমি উদ্ধারের পদ্ধতি কি হবে? বন বিভাগের দাবি নিরংকুশ কিনা? কারণ ভাওয়াল স্টেট যে জমির মালিক ছিল এই রকম অনেক জমি পত্তন দেওয়ার পর এসএ রেকর্ডে ব্যক্তি মালিকানায় হয়েছে। পরে হঠাৎ বনবিভাগের নামে গেজেট হয়েছে। আবার আরএস রেকর্ডও ব্যক্তি মালিকানায় হয়েছে, এমন জমিও বনবিভাগের নামে গেজেট হয়েছে। এসএ রেকর্ডে সরকারের নামে এক নম্বর খতিয়ানে ছিল, এমন জমি সরকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে। এখন হঠাৎ বন বিভাগ ওই জমির মালিকানা দাবি করছে। উভয় বিভাগই সরকারের। কিন্তু বনবিভাগ প্রাধান্য পাবে, না কালেক্টরের প্রাধান্য পাবে এটি সুরাহা হওয়া দরকার।

১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে জেলা প্রশাসক এক নম্বর খাস খতিয়ানের এক খন্ড জমি বরাদ্দ দিয়েছেন ভবানীপুর মৌজা থেকে। ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে ওই জমির জোত থেকে খাজনা নেওয়া বন্ধ করা হয়েছে। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের গেজেটে ওই দাগে মাত্র ৮ শতাংশ জমি বনবিভাগের হলেও সম্প্রতি ভূমি অফিস পুরো জমি বনবিভাগের বলে প্রতিবেদন দাখিল করেছে। এর আগে ওই দাগে ব্যক্তির নামে ১৪২ শতাংশ জমি রেকর্ড হয়েছিল। একই রকমভাবে কাপাসিয়া উপজেলার কোটবাজালিয়া গ্রামের বাসিন্দা জেলা প্রশাসন থেকে বরাদ্দ পাওয়া জমি বনবিভাগের নামে গেজেট হওয়ায় গাজীপুরের আদালতে মামলা করেছেন। বানিয়ার চালার মো. সিদ্দিক সীমানা চিহ্নিত করণের আবেদন করেছেন।

৬০ বছরের বেশি সময় ধরে দখল আছে এমন জমির মালিকানা গেজেট দিয়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব কিনা এটি ভেবে দেখা দরকার। আদালতে যে মামলার চলমান আছে তা নিস্পত্তি করতে কতদিন বা কত বছর লাগবে এরও নিশ্চয়তা নাই। গাজীপুরে দেওয়ানি মামলা সাধারণত ৪ থেকে ৬ মাস পরে তারিখ হয়। এক তারিখ কোন মতে পেরিয়ে গেলে পরের তারিখে বছর পার হয়। এতে যে মামলা চলমান আছে বিচার পর্যায়ে তাও ১০ বছরে নিস্পত্তি করা সম্ভব হবে না। আবার হাইকোর্টে আপিল বা রিভিশন আছে। আপিল বিভাগেও রিভিশন আছে। শক্তিশালি পক্ষ আপিল বিভাগে রিভিউ দায়ের করারও রেওয়াজ আছে। গত ১০ বছর বা আরও বেশি সময় যাবত সাধারণত ব্যক্তি মালিকানার দাবির মামলায় রায় পায় না। সরকারি স্বার্থ থাকলে রায়ে জেতা খুবই কঠিন।

আসাদুল্লাহ বাদল : সম্পাদক, দৈনিক যোগফল, ১১ মে ২০১৯।