হে অভিজাত, যেমন খুশি তেমন সাজো

আসাদুল্লাহ বাদল

24 May, 2020 09:55pm


হে অভিজাত, যেমন খুশি তেমন সাজো
আসাদুল্লাহ বাদল

ক্ষমতাবান (রাজনৈতিক দল, নেতা , প্রশাসন) সুযোগ পেলেই গণমাধ্যমের প্রতি চটে। যুক্তি কেবল মুখের বুলি। গণমাধ্যম স্বাধীন এটি ঘোষণা দিয়ে প্রমাণ করা যায় না। পরিস্থিতি বিবেচনা করে ঠাহর করতে হয়। আমি নিজে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মত কালো আইন, যারা দ্বারা বিনা কারণে সাংবাদিক সমাজ হয়রানির শিকার হতে পারে এই ঝুঁকি বিদ্যমান মনে করি। নানা ধরনের আশা জাগিয়ে রাখলেও এই আইনের অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব নয়।

কোন খবর কখন কার নামে যশ তৈরি করে বা কার নামে বিরুদ্ধ পরিবেশ তৈরি করে এটি আগে অনুমান করা যায় না। খবর প্রচারের পর সংশ্লিষ্টদের আচরণে ঠাহর করা যায়। সম্প্রতি যোগফলের সঙ্গে সংবাদ প্রকাশের জেরে একাধিক নেতার বাক্য বিনিময় হয়। এসব বাক্য গণমাধ্যমে প্রকাশের উপযোগী মনে করি না। তবে এই ভেবে বিস্মিত হই, গণমাধ্যমের প্রতি বিরূপ মত প্রকাশ করলেও তার নিজের কর্মীদের প্রতি বিরূপ মত চরম আপত্তিকর। ‘কর্মীরা অধিকাংশ ছাগল পাগল। তাদের কথা রেফারেন্স হিসাবে সাংবাদিকদের ব্যবহার করা উচিত না।’ কোন কর্মীর আচার আচরণ এহেন প্রকৃতির এটি গণমাধ্যম আন্দাজ করবে কিভাবে? আবার এহেন কর্মীরাই তো দিনভর প্রচার চালাচ্ছেন। কখন তারা কর্মী থেকে নিচে নেমে যান এটি হিসাব মিলিয়ে দেখতে পারিনি। দেশের বিখ্যাত একটি গণমাধ্যম আমার পছন্দ না হতে পারে। তাদের সংবাদ প্রকাশের রীতি ও সম্পাদকীয় নীতিমালা অপছন্দ হতে পারে। কিন্তু দায়িত্বশীল কোন ব্যক্তি বা নেতা অশালীন কথা বলতে পারে এটি ভাবনায় রাখি না।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন যে নীতিমালা ঘোষণা করেছে এটি স্বাভাবিক ও স্বাধীন সাংবাদিকতার মারাত্বক অন্তরায়। এটি আমি নিজে উপলদ্ধি করি বলে পর্যবেক্ষক হতে আগ্রহী নই। এমনকি যোগফলের প্রতিনিধিদেরও আগ্রহ নেই। পরে পরিস্থিতি বদল হলে আমাদের সিদ্ধান্ত বদল হতে পারে।

গত গাজীপুর সিটি নির্বাচনে কশ্মিনকালেও সাংবাদিক নয় এমন ব্যক্তিও সাংবাদিক পরিচয়ে নির্বাচনে সাংবাদিক পর্যবেক্ষক কার্ড সংগ্রহ করে নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করেছে। সাংবাদিক না হওয়ার পরও এক বা একাধিক ব্যক্তিকে সাংবাদিক পরিচয়ে পর্যবেক্ষক হতে সহায়তা করেছে সাংবাদিক নামধারী কিছু ব্যক্তি। যাকে ওই পর্যবেক্ষক হতে সহায়তা করা হয়েছে, তিনি এখন নিজেই নতুন আইন জারি করেছেন। তার নিজের পেশা রয়েছে। ওই পেশায় থেকে সাংবাদিকতা করা যায় না এমন ফতোয়া বলে বেড়াচ্ছেন। যদি তাই হয়, তাহলে তিনি কিভাবে সাংবাদিক পরিচয়ে পর্যবেক্ষক হয়েছিলেন। এমনকি ওই পর্যবেক্ষকের নিকট আত্মীয় নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন। তার পক্ষে ওই পর্যবেক্ষণ কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে অপব্যবহার হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তাদের জেনে রাখা উত্তম অ্যাডভোকেট আ ক ম মোজোম্মেল হক কিশোর মানস এর প্রকাশক। আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম বর্তামানে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তিনিও একটি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক। সাংসদ সালমা ইসলাম দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক ছিলেন। এই দৃষ্টান্ত দেশব্যাপি অভাব নেই। কিন্তু যিনি আইন না জেনে নিজে আইন জারি করেন, এমনকি নিজের জারি আইন ভেঙে নৈতিকতা বিসর্জন দেন, তার নিজস্ব কোন স্বকীয়তা নেই। যেটি আছে, সেটি কেবল নিজের স্বার্থ। এই ঘটনায় যেসকল দলদাস বা দলকানারা সাংবাদিক পরিচয়ে গর্বিত বোধ করে, তারা নিজেরা নিজেদের পথ বন্ধ করে রাখে। এসব দলদাসরা অতীতে অনেক অনুরোধ করেছে একটি খবর প্রচারের ব্যবস্থা করতে, ভবিষ্যতেও করবে।

স্বাধীন সাংবাদিকতার বিষয়ে কবি জন মিল্টন (১৬০৮-১৬৭৪) চেয়েছিলেন বিবেকের স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা। তিনি বলেছিলেন,  “দাও আমায় জ্ঞানের স্বাধীনতা দাও, কথা বলার স্বাধীনতা দাও, মুক্তভাবে বিতর্ক করার স্বাধীনতা দাও। সবার ওপরে আমাকে দাও মুক্তি।” বর্তমানে দলদাস ছাড়া কেউ প্রেস রিলিজ চর্চার বাইরে কি করতে পারছেন এটি প্রত্যেকের নিজস্ব ব্যাপার। 

ঘটনা অস্বীকার করেন না বা ঘটনা মিথ্যা এটি বলেন না কিন্তু সংবাদ মিথ্যা! এটি কিভাবে সম্ভব হতে পারে। নিজের মত কিভাবে অস্বীকার করা যায়? ভিডিয়োতে ধারণ করা বক্তব্য কিংবা বক্তব্যের অডিয়ো অস্বীকার করা বোকামী বইকি। ভুলক্রমে কেউ কোন শব্দ উচ্চারণ করতে পারে। এটি এক ধরনের বিষয়। ভুল বক্তব্য প্রত্যাহার করা যায়, শুদ্ধ করা যায় কিন্তু অস্বীকার করা যায়?

হুমকি, ধমক, মামলার ভয় এসব নিছক অহমিকা। কোন প্রকৃত সংবাদকর্মী হুমকি, ধমক, মামলার ভয়কে পরোয়া করে সাংবাদিকতা করে এটি মনে করি না। যে নিজেকে অভিজাত মনে করে কিন্তু মাঠে নামে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশায়, তার রাজতন্ত্র চর্চা হলেও গণতন্ত্র কাম্য মনে হয় না। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বব্যাপি ৫৩ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন পেশাদারত্বের কারণে। তাদের প্রতি এই লেখা উৎসর্গ করা হলো।

অভিজাতদের বয়ান রেকর্ডে রইলো। সাংবাদিক না হয়েও সাংবাদিক পরিচয় দানকারী ব্যক্তির ডকুমেন্টও সংরক্ষণে রইলো। সংবাদ পচনশীল হলেও এসব রেকর্ড পচনশীল নয়। যার যেমন ইচ্ছা সাজতে পারে। 

আসাদুল্লাহ বাদল: সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক যোগফল।