এক চোখে তেল বেচি, এক চোখে নুন!

আসাদুল্লাহ বাদল

25 May, 2020 11:41am


এক চোখে তেল বেচি, এক চোখে নুন!
আসাদুল্লাহ বাদল

আসাদুল্লাহ বাদল : “গত ১ ডিসেম্বর ২০১২। ঢাকা ইডেন কলেজের সামনে একটি মাইক্রোবাস থেকে পুলিশ ৩৪২ বোতল ফেনসিডিল ও একটি রিভলবার উদ্ধার করে। ওই গাড়ি থেকে ভোলার সিনিয়র সহকারী জজ জাবেদ ইমামকে গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় নিউমার্কেট থানার পুলিশ তার বিরুদ্ধে মামলা করে। কোন আইনের ভিত্তিতে মাদক মামলার আসামি ভোলার সিনিয়র সহকারী জজ জাবেদ ইমামকে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করা হল, তা জানতে চেয়েছেন আদালত। ব্যাখ্যা দিতে ৬ ডিসেম্বর পুলিশের পাঁচ কর্মকর্তাকে আদালতে হাজির হতে বলা হয়। ৩ ডিসেম্বর ঢাকা মহানগর হাকিম এম আবদুস সালাম এ নির্দেশ দেন। আদালত বলেছেন, যেভাবে গণমাধ্যমের সামনে বিচারক জাভেদ ইমামকে হাজির করা হয়েছে তা আইনের পরিপন্থী। বিচার বিভাগকে জনগণের সামনে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য বিচারককে নিয়ে মিডিয়া ট্রায়াল করা হয়েছে, যা গুরুতর অন্যায়। আদালত আরও বলেছেন, পুলিশ একজন আসামিকে নিয়ে এভাবে মিডিয়া ট্রায়াল করতে পারে না। বিচারের আগেই কাউকে এভাবে হাজির করার বিধান নেই। তাই পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। আদালত আরও বলেছেন, যদি কোনো আসামি দোষ স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে চান, তাকে অবশ্যই নিকটস্থ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হাজির করতে হবে।” ( সাপ্তাহিক বৃত্তের বাইরে সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত)।

এই আদেশ হয়তো হয়েছে জাবেদ ইমাম বিচারক ছিলেন বলে। এর আগে কি এমন মিডিয়া ট্রায়াল হয়নি? এখন কি মিডিয়া ট্রায়াল বন্ধ হয়েছে? এর আগে যত মিডিয়া ট্রায়াল হয়েছে, তাতে কি আইনের লঙ্ঘন হয়নি। এমন শত প্রশ্নের কোনো উত্তর না পাওয়া গেলেও ভিআইপি আসামির তেলেসমাতি পাওয়া যায়। 

এক চোখে তেল বেচা ও আর এক চোখে নুন বেচাকে সাধারণত অবিচারের প্রতীক হিসাবে তুলনা করা হয়। মানুষের সাধারণত দুই চোখে সবকিছুকে সমান দেখাকে ন্যায়বিচার মনে করা হয়। কিন্তু যখন একই রকম ঘটনায় এক এক রকম বিচার দেখা যায়, ঠিক তখন দুই চোখে দুইজনকে দুইভাবে দেখা বোঝানো হয়। দুইভাবে দেখা মানেই অবিচার। ন্যায় বিচার নয়। এক চোখ উত্তরে, এক চোখ দক্ষিণে বলেও মত প্রকাশ করা হয়। সাধারণত দুই চোখ একই দিকে ধাবিত হয়।

আমাদের দেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে লেখা রয়েছে, ‘সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং সকলেই আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ (সহজ ভাষায় বাংলাদেশের সংবিধান, আরিফ খান, পৃষ্ঠা ৪৭)। চমৎকার এই কথা লেখা থাকলেও আইনের সমান সুযোগ সকলে লাভ করতে পারে কিনা এই প্রশ্ন অবারিত জারি থাকে।

আসামি গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রেস বিফ্রিং করতে চাইলে, করা উচিত। আসামি সম্পর্কে জনগণের চাহিদা মতে যাবতীয় তথ্য সরবরাহ করতে বাধা না দেওয়া উচিত। কিন্তু গ্রেপ্তার হওয়া মাত্র আসামির গায়ে ‘সাইনবোর্ড’ লাগিয়ে দেওয়া কেবল অনুচিত নয়, বেআইনিও। ফৌজদারি আইনের সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, চূড়ান্তভাবে কেউ দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী ঘোষণা না করা। হরহামেশা সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যা এখনই বন্ধ করা জরুরি।

শিশু বা কিশোরকে গ্রেপ্তার করার পর বা হেফাজতে নেওয়ার পর কিভাবে তাকে উপস্থাপন করা যাবে, এ ব্যাপারে শিশু আইনে স্পষ্ট বিধান রয়েছে। কিন্তু বিধান হয়তো আইনের বইয়ে লেখা রয়েছে, বাস্তবতা বড়ই ভিন্ন। শিশুকে প্রচলিত আদালতে উপস্থাপনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও, এখন পর্যন্ত শিশু আইনের বিধান মতে ‘শিশু আদালত’ চালু হয়নি।

খবর লেখলেই খড়গ নেমে আসে। কিন্তু যোগফলে সম্পাদকীয় প্রকাশের পর একটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শিশুদের ছবি প্রকাশে সতর্কতা অবলম্বন করছে বলে আমাদের ধারণা। জব্দ তালিকা ও আলামত বিষয়েও সতর্কতা দেখা গেছে। সাধারণ আসামির মোবাইল ফোন জব্দ ও ‘পানসুপারি জব্দ’ একই রকমের ব্যাপার বইকি। এমনকি ভিকটিম শিশু হলে, তাকেও পরিচিত করানো যাবে না। আমরা কিছুটা বেকায়দা মোকাবেলা করলেও আক্রোশকে মোকাবেলা করিনি। আক্রোশের ফল গণমাধ্যমের জন্য ‘শুভ লক্ষণ’।

আসামি শনাক্ত করতে বা জনগণের চাহিদা পূরণ করতে গ্রেপ্তার হওয়া আসামির ছবি প্রকাশ করা যেতেই পারে। বর্তমানে আসামি কারাগারে যাওয়ার পর তাদের ছবি তুলে রাখা হয়। এমনকি আবাসিক হোটেল তাদের গেস্টের ছবি তুলে রাখে, ভবিষ্যত প্রয়োজনে। কিন্তু কখনও কখনও ব্যতিক্রমও দেখা যায়। তাগাদা দিয়েও কিছু বিষয় আদায় করা যায় না। গত ২১ সেপ্টেম্বর শ্রীপুরে একটি চাঁদাবাজির মামলায় আওয়ামীলীগ ও যুবলীগের তিননেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের একজন দুইবারের ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও একজন চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থী। তাদের কেমন সম্মান আছে জানতে পারিনি। তবে তিনদিন পরেই মামলার বাদী আদালতে হাজির হয়ে হলফনামা দিয়ে বলেছেন, তার নিকট আসামিরা কোনো চাঁদা দাবি করেনি। ফলে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য যে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছিল, বিচারক তা খারিজ করে দেন। এসব আসামিদের ছবি ও তথ্য প্রচার হয়েছে দিব্যি।

সম্প্রতি কাপাসিয়ায় দুইজন ভিআইপি আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারের পর তাৎক্ষণিক তথ্য সরবরাহ না করায় গণমাধ্যমসহ বিকল্প মাধ্যমে ধুম্রজাল তৈরি হয়। তাদের একজনকে পরে নির্দিষ্ট এমটি মামলার আসামি হিসাবে চালান দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট মামলার আসামিকে গ্রেপ্তারের পর তথ্য দিতে কৌশলগত কোনো বাঁধা আছে বলে মনে করি না। বরং প্রকৃত তথ্য না দেওয়ার ফলে ধোঁয়াশা তৈরির ব্যাপার ঘটে। এটি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় তথ্য সরবরাহ করে। আর এক আসামিকে চালান দেওয়া হয়েছে মাদকের মামলায়। সাধারণ ব্যতিক্রম হচ্ছে এসব বিষয়ে গণমাধ্যম আগে যেসব তথ্য পায়, এবার তা পায়নি। বলে রাখা উত্তম থানা থেকে ৫০ গজের মধ্যে যে আসামি প্রতিদিনই অবস্থান করে, তাকে চার মাসেও গ্রেপ্তার না করার লুকোচুরি জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করে। আইনের দৃষ্টিতে সকলে সমান বলে যে ‘বাণী’ প্রচার করা হয়, তা প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। পাঁচটি ইয়াবা বড়িসহ গ্রেপ্তার হওয়া আসামির ছবি প্রকাশে আগে অনেক রেওয়াজ আছে। যোগফল এমন একজন আসামির মাদক সেবনের চার মিনিটের একটি ভিডিয়ো ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করেছে। আর একটি ভিডিয়ো ২২ মিনিট ব্যাপি। এতেও মাদক সেবন ও মাদক কেনাবেচার ‘দরদাম’ রফাদফার ‘ডায়ালগ’ রয়েছে।

মানুষের মুখ বন্ধ রাখা যায় না। বিশেষত গুজব প্রতিরোধে প্রকৃত তথ্য দেওয়ার চেয়ে উত্তম কোনো পদ্ধতি নাই। খবর পছন্দ না হলে করণীয় কি, এটি জানা দরকার। কোনো গণমাধ্যমকর্মী সোর্স প্রকাশ করতে বাধ্য নয়। এমনকি আদালতেও নয়। যদি সাংবাদিকের নামে মামলার উদ্ভব হয়, আর আসামি নথি প্রকাশ করলেই রেহাই পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়, তারপরও তথ্য প্রকাশ না করার স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে গণমাধ্যমকর্মীরা। কারণ, নিজে মামলা থেকে রেহাই পাওয়ার চেয়ে ‘তথ্য দাতার’ জীবনের নিশ্চয়তা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। যারা খড়গ নিয়ে বসে থাকে, তারা ভাবতেও পারে না, খড়গ কিভাবে আলগা হয়ে যেতে পারে। যোগফল আর্ন্তজাতিক সংবাদ রীতি নীতি মানার চেষ্টা করে। অন্তত ঘটনার ৮০ শতাংশের বেশি কখনও প্রকাশ করে না। ২০ শতাংশ বা আরও বেশি তথ্য রিজার্ভ রেখেই সংবাদ প্রকাশ করি। চাঞ্চল্যকর ঘটনার ক্ষেত্রে এই নীতি আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

কোনো আসামি গ্রেপ্তারের ১৪ ঘণ্টা পরও যদি বলা হয়, ‘দেখি কি করা যায়’ তাহলে সাংবাদিকের ‘নাক’ ও ‘নিউজ সেন্স’ তরতাজা হয়ে ওঠে। আপসযোগ্য নয় এমন অভিযোগ বাদী ও আসামি আপস করলেও আসামি জামিন না নিয়েও, পুলিশের সামনে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালে আইনশৃঙ্খলার প্রতি সাধারণ ইচ্ছা দুর্বল হয়ে পড়ে। কে ক্ষমতবান, কে ক্ষমতাবান নয়, এই অজুহাতে তথ্য চাপা দিয়ে রাখা যায় না।

একজন বন্ধু গণমাধ্যমকর্মীর একটি অনুসন্ধানের রেকর্ড শুনেছি মনোযোগ দিয়ে। এতে মাদক সংশ্লিষ্ঠতার অভিযোগ স্বীকার করা হলেও, পরে ঘটনার ব্যাখ্যা ভিন্ন হয়ে গেছে।

জাভেদ ইমামকে ফেনসিডিল ব্যবসায়ী লিখে প্রেসের সামনে হাজির করা হয়েছিল। আদালত আদেশ দেওয়ার কারণে জাবেদ ইমামের গায়ে সাটানো স্টিকার আংশিক কর্তন করা হয়েছে। পরে জাবেদ ইমাম ওই মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়। তার চার বছর কারাদণ্ডের আদেশ হয়। তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তও করা হয়।

সম্প্রতি শ্রীপুর থানার একটি ডাকাতি মামলার [নম্বর ৩৮(০৬)১৯] তদন্তদকারী কর্মকর্তা এসআই রাজিব কুমার সাহা একজন আসামির রিমান্ড আবেদন পাঠিয়েছেন গাজীপুর আদালতে। ওই আবেদনে তিনি মামলায় আগে একজন আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় যে জবানবন্দি দিয়েছেন, এর সারাংশ উল্লেখ করে দিয়েছেন। সাধারণ আইনের বিধান হচ্ছে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করার আগে বিচার সংশ্লিষ্ঠ ছাড়া আর কেউ আসামির জবানবন্দি দেখতে পারে না। কিন্তু বেচারা তদন্তদকারী কর্মকর্তা নিজেই ফাঁস করে দিয়েছেন গোপন তথ্য। এমনকি গ্রেপ্তার হয়নি, এমন দুই আসামির নামও লিখে দিয়েছেন তার চালানপত্রে। এসব কখন ঘটছে, তা ভেবে দেখা উচিত। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯।