সাংবাদিকতা: পেশাদারত্বের সংকট

আসাদুল্লাহ বাদল

25 May, 2020 11:55am


সাংবাদিকতা: পেশাদারত্বের সংকট
আসাদুল্লাহ বাদল

আজকাল ক্ষমতা, প্রভাব প্রতিপত্তি, আভিজাত্য বিষয়গুলোর সাথে সাংবাদিকতা নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই এগুলো নিয়েই বড় ধরনের আলোচনা-সমলোচনার সম্মুখীন হতে হয়। বিশেষত টেলিভিশনে টক শো প্রচার হওয়ায় এই বিষয়টি বেশি আলোচিত। অনেক সময় এ পেশার সাথে যুক্ত বলে কঠিন প্রশ্নবানে বিদ্ধ হতে হয়। 

আমজনতা সাংবাদিক, সংবাদকর্মী, রিপোর্টার, প্রতিনিধি, প্রতিবেদক, প্রদায়ক (সাংবাদিক কে এই বিষয়ে খুববেশি ধারণা রাখে না জনগণ, বরং শব্দভেদে নানান রকম তারতম্য দেখে থাকে) এমনতর ভিন্ন ভিন্ন শব্দে সাংবাদিকের পরিচয়কে পেশাদার অপেশাদার বিবেচনা কম করে বরং সাংবাদিক পরিচয়কে বড় করে দেখে থাকে আর তাতেই হিসাব কিতাব জবাবদিহির পর্যায়ে বেশি পড়ে। 

সময়ের সাথে দিন দিন মানুষের সচেতনতা বাড়ছে এসব আলোচনায় তা আরও পরিস্কার হয়। সাথে সাথে বহিঃর্বিশ্বের চ্যালেঞ্জিং সাংবাদিকতা নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও শ্রদ্ধাবোধও দিন দিন বাড়ছে। পথে পান্তরে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করলেও সাংবাদিকদের প্রতি সাধারণের ধারণা যে খুব ভাল তা নয়। এক সময় সাধারণ মানুষ পুলিশ, আদালত, মোবাইল কোর্ট, সুদ ব্যবসায়ীদের পথ পারত মাড়াত না। আর বর্তমানে এর সাথে যুক্ত হয়েছে তথাকথিত এক ধরনের সাংবাদিকতা। যার আদর্শ বা নৈতিকতার বিষয়গুলো কোন ক্রমেই মুখ্য বিষয় নয়। এ সাংবাদিকতার সাথে জড়িতদের সংখ্যা খুব বেশি না হলেও তারাই সাধারণের কাছে বেশি পরিচিত। ফলে যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতার নিরিখে সততা ও নিষ্ঠার সাথে এ পেশার সাথে যারা যুক্ত থাকতে চান, তাদের যেমন উদ্ভুত পরিস্থিতির সাথে লড়াই করতে হয়। তেমনি লড়তে হচ্ছে পেশাগত মর্যদার লড়াইয়ে।

সময়ের সাথে সবকিছুই পাল্টে যায়। পাল্টে যায়, মানুষের মন মননশীলতা, তথ্য প্রযুক্তি। সে ভাবেই মিডিয়ার ক্ষেত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। মূহুর্তের মধ্যেই বিশ্বের যে কোন ঘটনা বিশ্লেষণ আমরা প্রযুক্তির কল্যাণে জেনে যাই। ফলে পেশা হিসেবে সাংবাদিকতা আজ আর কোন গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ নয়। ইলেকট্রনিক্স, প্রিন্টিং, অনলাইন মিডিয়ায় এখন যে কেউ এ পেশায় কাজ করতে পারছে। দেশে বর্তমানে ২৫টি টেলিভিশন, ৪টি এফএম রেডিয়ো, ১৪টি কমিউনিটি রেডিয়ো রয়েছে যারা সংবাদ পরিবেশন করে (দেশে বর্তমানে প্রায় তিনমাস যাবত আলোচিত ইউটিউব বন্ধ থাকলেও এই সময়ে ঘটে যাওয়া সব খবরই ওই সাইটে আপলোড হয়েছে)। তবে এর জন্য আমাদের দেশে বিশেষ কোন যোগ্যতার প্রয়োজন হয় না। বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি বেসরকারী ১২টি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতার ওপর পড়াশুনার ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া পিআইবি সাংবাদিকতার ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রদান করে। একাধিক বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে ৩ থেকে ৬ মাসের শর্টকোর্সও চালু রয়েছে। পৃথিবীর অন্য দেশে এ অবস্থা কিন্তু এমন নয়। আর একটি বিষয় উলে­খ না করলেই নয়। বহিঃবিশ্বে সাংবাদিকতার আর একটি ধারা রয়েছে, সেটি এমন যে কেউ যে কোন বিষয়ে তথ্য দিতে পারেন, জানাতে পারেন তাদের মতামত। এ ক্ষেত্রে অনলাইন মাধ্যম বেশ শক্তিশালী। ব্লগ বা নিজস্ব ওয়েব সাইটের মাধ্যমে এটি অনায়াসে করা সম্ভব। মজার বিষয় এক্ষেত্র ইচ্ছামত ভিডিয়ো, ফটোগ্রাফও ব্যবহার করা যায়। এদেশেও কিছু কিছু সাইটে মতামত প্রদান করার সুবিধা চালু হয়েছে। বিশেষ করে করে শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকা ও টেলিভিশনের সাইটগুলোতে এটি চালু হয়েছে। নিশ্চয় এ বিষয়গুলো কোন পেশাদার সাংবাদিকের জন্য আশার আলো দেখায়। মানুষ স্বপ্ন দেখে নতুন বিশ্বায়নের, সেখানে সবাই সমান সুযোগ ও মর্যাদায় সামিল হতে পারে। কিন্তু কেন আমরা আমাদের দেশে সে মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারছি না? কেন আমরা শুভ বিষয় উপেক্ষা করে অশুভের পথে ঝুঁকে পড়ছি।

তৃতীয় বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র রাষ্ট্র বাংলাদেশ। এখানে সবকিছুই শুরু হয় কিছুটা হলেও দেরিতে। বিশ্ব যখন নতুন নতুন দ্বার উম্মোচন করে, তখন আমরা নতুনের যাত্রাকে রুদ্ধ করতে দ্বার বন্ধ রাখার পক্ষে থাকতে চাই। ফলে যা হবার তাই হয়। বলছিলাম আমদের সাংবাদিকতা নিয়ে। সে কথাই ফিরে যাই। কেন আজ সাংবাদিকতা নিয়ে এতো কথা, এতো বিশ্লেষণ। গণমানুষের জন্য কিছু করার বা বলার সুযোগ রয়েছে এ পেশায় সে কারণে মুলত আকৃষ্ট হয়েছিলাম প্রথম থেকে। আমার কাজের এ স্বল্প সময়ে নানান জায়গায় কাজ করার সুযোগ হয়েছে অবশ্য সাংবাদিকতা বলতে যা বুঝায়, হিসাব সেভাবে করলে আমি বাস্তবিক কোন সাংবাদিক না হয়েও সাংবাদিকতার সাথে সম্পৃক্ত থেকে দায়বদ্ধতার জায়গায় আটকে যাই। আর এ কাজের মধ্যে থেকেই দীর্ঘদিন আমার মাথায় পেশাদার সাংবাদিকতা, রির্পোটিংসহ নানা বিষয়ে ভাবনা বেড়েছে। সব সময়েই ভাবছি এ পেশার মানুষকে সাধারণ মানুষ ভয় নয়, শ্রদ্ধা করুক। মর্যাদা দিক। এ নিয়ে অনেক সতীর্থ বন্ধু ও পেশাদারদের সাথে আলোচনা করেছি, হতাশা ব্যক্ত করেছি। আলোচনায় উঠে এসেছে নানা সীমাবদ্ধতা ও সমস্যার কথা। তারপরও অপেক্ষা করছি হয়ত সুদিন আসবে। সব মেঘ কেটে যাবে, দেখা দেবে জ্বলজ্বলে সূর্য।

সাংবাদিদের পেশাগত নানা সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে এ কথা স্বীকার না করে উপায় নেই। প্রথমেই যে কথা আসছে সেটা হলো অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা। আর এ অর্থই সকল অনর্থের মুলে দাঁড়িয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হিসেবে সাংবাদিকতা তালিকার শীর্ষে। এ কারণেই খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে জীবন পর্যন্ত দিতে হয়েছে। সত্যিকার অর্থে এ ঝুঁকি মোকাবেলায় আমাদের দেশে তেমন কোন সার্পোট নেই। এ পেশার বেতন-ভাতা নিয়েও নেই কোন নিয়ম-নীতি। হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের পর্যাপ্ত সুযোগ দিলেও সংখ্যা গরিষ্ঠের মধ্যে রয়েছে শুভংকরের ফাঁকি। একটি পরিচয়পত্রই সাংবাদিকতা পেশার সকল সুযোগ-সুবিধা বলে পরিগণিত হচ্ছে। আমি আগেই বলেছি এ সংখ্যা নিতান্তই কম কিন্তু শক্তিশালী। 

অপরদিকে কতিপয় পূর্বসুরীদের আন্তরিকতার প্রশ্ন। মানুষ ছোট থেকে যা কিছু শিখে তা অধিকাংশই বড়দের কাছ থেকে। সে কারণে আজ যারা নতুন করে এ পেশার সাথে সম্পৃক্ত হতে চান তারা প্রথমেই বাধার সম্মুখীন হন ওই কথিত পূর্বসূরীদের কাছ থেকে। কোন গাইড লাইন না পেয়ে তারা এক সময় চোরাগলিতে হারিয়ে যায়। এেে ত্র দু-প্রজম্মের মাঝের সীমাবদ্ধতাও অস্বীকার করার উপায় নেই। এ সীমাবদ্ধতার প্রথমেই উঠে আসে যোগ্যতা, অংশীদারিত্ব ও সর্বোপরি মানসিকতার বিষয়। সবমিলিয়ে নানা দুর্নীতি, অবক্ষয়, অনৈতিকতা জর্জরিত এ সমাজের আয়না হিসেবে পরিচিত সাংবাদিকদের অনেকই বিতর্কিত হন। অপরদিকে সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা বা নীতিমালা না থাকা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব এ পেশার মানকে দিন দিন কলুষিত করছে। 

কোন বাধ্যবাধকতা, নিয়ম-নীতি না থাকায় দেশে কয়েক শত পত্রিকা থাকলেও এ সকল প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাংবাদিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তারা অধিকাংশদেরই বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করতে হয় যা পেশার দৈন্যতার চিত্রাংকনের জন্য যথেষ্ট। এখানে প্রশ্ন হতে পারে কেন সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীরা বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করবে বা করে ও পরিশেষে অনৈতিকতার সাথে সম্পৃক্ত হয়। প্রথমতঃ এ পেশাটি এমন একটি পেশা যেখানে রোমাঞ্চ আছে আবার নেশাও। আর এ সবই একটি মানুষকে অনায়াসে আটকে দেয় এ পেশায়। 

অনিয়ম, দুর্নীতি, সমস্যার অনুসন্ধান করতে গিয়ে নিজেরাই এ ফাঁদে পা দেয়। ফলে এখান থেকে বেড়িয়ে আসা খুবই অসম্ভব। বিপরীতে সততা ও নিষ্ঠার সাথে পেশায় সম্পৃক্তরা মানবেতর জীবন যাপন করতে রাজি থাকলেও তারা পালিয়ে যেতে চান না। টিকে থাকতে চান, যুদ্ধ করতে চান।

আজকে যদি সত্যিকার অর্থে সাংবাদিকতার যোগ্যতা ও মর্যাদার আসনে আসীন করতে হয় ,তা হলে সে উদ্যোগ নিতে হবে এ পেশার সাথে সংশ্লিষ্টদের। বাইরে থেকে এর সমস্যা চিহ্নিতকরণ যেমন দুর্সাধ্য, তেমনি সমাধানের পথ বাতলে দেওয়াও ভ্রান্তিকর। আমরা চাই নিরপে ও সুষ্ঠু সাংবাদিকতার প্রসার লাভ করুক। কেউ যেন এ পেশা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে না পারেন, সে দায়িত্ব সাংবাদিকদেরই নিতে হবে। আমরা কেউ যেন ব্যক্তি স্বার্থ রক্ষার নামে এ পেশাকে বিকিয়ে না দেই এবং তার আগেই মানে মানে সরে পরি। তবেই দেশ ও জাতির জন্য তা মঙ্গলজনক হবে। মূল রচনা: ২০১০।