ফরমায়েশি সাংবাদিকতার নতুন মডেল গাজীপুর

আসাদুল্লাহ বাদল

25 May, 2020 12:05pm


ফরমায়েশি সাংবাদিকতার নতুন মডেল গাজীপুর
আসাদুল্লাহ বাদল

সম্প্রতি গাজীপুর থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিকে একজন পুলিশ কর্তার গুনগানের রচনা প্রকাশ হয়েছে। এটি একটি সংবাদ বিবেচনা করছি এই কারণে ওই পুলিশ কর্তার আইনি কার্যক্রমের ওপর যোগফলে একাধিক সংবাদ ও মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশের জের ধরে হয়েছে বলে স্বাভাবিক অনুমান করছি। সাধারণত একটি সংবাদে ছয়টি বিষয় উল্লেখ থাকা জরুরি। এই ছয়টি বিষয় না থাকলে ওই সংবাদকে পূর্ণাঙ্গ সংবাদ বলার সুযোগ থাকে না। কে, কখন, কোথায়, কিভাবে, কেন ও কিভাবে এই ছয়টি বিষয়কে সংবাদে চাবি বলা হয়ে থাকে। কিন্তু গুনগানের ওই বিজ্ঞাপনধর্মী ফরমায়েশি মডেলে এসব প্রশ্ন পাশ কাটিয়ে একটি গল্পের অবতারণা করা হয়েছে। যা প্রকৃতপক্ষে কোন সংবাদ না হলেও পাঠকের সামনে সংবাদ হিসাবে হাজির করা হয়েছে।

ফরমায়েশি শব্দের অর্থ ‘প্রমিত বাংলা বানান অভিধান’ এ তৈরি করার জন্য আদেশ দেওয়া হয়েছে লেখা রয়েছে। ডক্টর রতন সিদ্দিকী ওই অভিধানের রচয়িতা। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডেরও সদস্য ছিলেন তিনি। একই রকম অর্থ লেখা রয়েছে বাংলা ভাষার অন্তত ১০টি অভিধানে। আমি সহজ ও একক অর্থটির কারণে এটি বেছে নিলাম।

ওই সংবাদটি সাক্ষাতকার কিনা এটিও উল্লেখ নেই। কি কারণে সংবাদ হলো সেটি তাও উল্লেখ নেই। কোথায় দিয়েছেন ওই বক্তব্য এরও স্থান নেই। কেন দেওয়া হয়েছে এই বক্তব্য এটি বলা হয়নি। কে ধারণ করেছেন ওই বক্তব্য তার সূত্রও নেই। কিভাবে ধারণ করা হয়েছে বা কেন ধারণ করা হয়েছে এসব প্রশ্ন অমীমাংসিত রেখে যে সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে এটি নিতান্ত ফরমায়েশি বলতে কোথাও বাধা আছে বলে মনে করি না। এহেন সংবাদ পাঠক কিভাবে গ্রহণ করে এটিও প্রশ্ন হতে পারে। যার গুনগান গাওয়া হয়েছে তিনি কোন বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত বলেও জানা নেই। বরং জিএমপির অন্য থানার একজন ওসি পুরস্কার জিতেছেন গত মাসে।

গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর গাজীপুরের দুই শীর্ষ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা (নম্বর ২৯) নিয়েছেন গাজীপুর সদর থানার ওসি। মামলাটি এ আইনের ২৫(২) ও ২৯ ধারায় রুজু হয়েছে। এই আইনের ৫৩ ধারা অনুযায়ী, “উভয় ধারা [২৫(২) ও ২৯] অ-আমলযোগ্য অপরাধ।”

ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৫(২) ধারা অনুযায়ী, “প্রথম শ্রেণি বা দ্বিতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়া অ-আমলযোগ্য কোনো ঘটনার তদন্তে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।” সাধারণত এমন অভিযোগ সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে দায়ের করার পর ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি সাপেক্ষে আদালতে প্রসিকিউশন দাখিল করতে হয়। কিন্তু আইনের এসব বিধান লঙ্ঘন করে ওসি সমীর চন্দ্র সূত্রধর সরাসরি মামলাটি এফআইআর করেছেন।

গত বছরের ৮ অক্টোবর ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮’ কার্যকর হয়। সংবিধানের ৩৫(১) অনুচ্ছেদে বলা আছে, “যখন ঘটনা ঘটবে তখন বলবৎ নেই এমন কোনো আইনে কারও বিচার করা যাবে না।”

গাজীপুর সদর থানায় আরেকটি মামলা এফআইআর হয়েছে চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি। মামলা নম্বর ২৮(১)১৯। এই মামলার ঘটনার তারিখ ১ জানুয়ারি ২০১৮ থেকে ১৬ জানুয়ারি ২০১৯ পর্যন্ত। ফৌজদারি মামলায় অপরাধ বিবেচনা হবে এক বছরের মধ্যে। কিন্তু এই মামলার ঘটনা এক বছর ১৬ দিনের। ফৌজদারি কার্যবিধির ২২২ ধারার ২ উপধারার বিধানের শর্ত হচ্ছে ‘প্রথম ও শেষ তারিখের মধ্যবর্তী সময় এক বৎসর অতিক্রম করবে না।’ এক বছর অতিক্রম করা ঘটনায় মামলা দায়েরও নিশ্চয়ই আদালতেই জবাব দিবেন। ভোগান্তি পোহাবেন কে? 

যোগফলে এসবের প্রতিকার ও সমস্যা সমাধানের যেসব প্রশ্ন রেখে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে এর একটি উত্তরও দেওয়া নেই ফরমায়েশি সংবাদে। কিংবা পাল্টা প্রশ্ন বা যোগফলে কোন ভুল আইনের রেফারেন্স ব্যবহার করা হয়েছে, এমন তথ্যও পরিবেশিত হয়নি। তিনটি মামলার ধারা ও আইনের বিধানের কোন ব্যতিক্রম আছে কিনা এমন প্রশ্নও তোলা হয়নি। যখন যোগফলে প্রকাশিত সংবাদের কারণে আইনি দক্ষতা ও জনভোগান্তির প্রশ্ন ওঠেছে তখন এমন কারো (ওসির) পক্ষে বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপনধর্মী তথ্য সমাজকে পিছিয়ে দেওয়ার নতুন প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।

যারা নিজ দায়িত্বে এমন ফরমায়েশি সংবাদ প্রকাশ করেছেন তাদের কোন স্বার্থ থাকতে পারে। তারা কোন কারণে ম্যানেজ হয়ে থাকতে পারেন। তাদের সংবাদ বিষয়ে উদাসীনতাও থাকতে পারে। এর ফল ভোগেরও ব্যাপার তাদের নিজস্ব। কিন্তু গণমাধ্যমের চরিত্র কি এইরকম হতে পারে?

গত বছরের ২৪ নভেম্বর গাজীপুর সদর থানায় মানব পাচারের অভিযোগের মামলায় ঝিনাইদহ জেলার আব্দুল খালেকের সন্তান মশিউর রহমান (৩৬) নিজের কাপড়ে দিয়াশলাই দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনে পুড়ে মশিউর মারা যায়।  তখন মশিউর ৫দিনের রিমান্ডে ছিল। 

রিমান্ডে থাকা আসামি মশিউর কিভাবে দিয়াশলাই পেল? তাকে কে দিয়াশলাই দিল? থানা হাজতে আসামি কি দিয়াশলাই রাখতে পারে? দিয়াশলাই জ্বালিয়ে দেওয়ার কতক্ষণ পর মশিউরের শরীর পুড়ে গেল? মশিউর কি তখন থানা হাজতে একাই ছিল? একই মামলায় আর এক আসামি আসাদুজ্জামানও রিমান্ডে ছিল। তার ডাক চিৎকারে আগুনের ঘটনা ‘খবর’ হয়। থানা হাজতে দিয়াশলাইয়ের অস্তিত্ব প্রমাণ করা জরুরি। রিমান্ড হচ্ছে নিরাপদ হেফাজত। না হয় হেফাজত অর্থের তারতম্য দেখা দিবে। থানা হাজতে আসামিদের কি পাহারা দেওয়া হয় না? পাহারা থাকলে কেন পাহারাদাররা আগুন লাগানোর ঘটনা দেখতে পেল না? হাজতে কি দিয়াশলাই রিজার্ভ থাকে? এসব প্রশ্ন কি একজন নাগরিক করতে পারে? না, ফরমায়েশি সাংবাদিকতার আড়ালে সব হারিয়ে যাবে?

গাজীপুর যদি নতুন মডেল হয়ে থাকে, থাকে তাহলে ভিন্ন কথা। কিন্তু কোন প্রশ্নকে আড়াল করার মধ্যে আর এক প্রশ্ন উদয় হয়। আপদ কেটে গেলেও বিপদ রয়ে যায়।

যারা ফরমায়েশি সাংবাদিকতা করেছেন, তারা রিমান্ডে থাকা আসামি মশিউরের মৃত্যু সংবাদ না শুনে থাকলে অবশ্য আপদ আপদ হিসাবেই থাকতে পারে। কারও সাফাই গাওয়ার সুবাদে একজন মানুষ যেন বিচার হীনতায় পতিত না হয়। সংবাদপত্র ও সাংবাদিক যেন কারও সাফাইয়ের অস্ত্র না হয়। 

আসাদুল্লাহ বাদল : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক যোগফল। ২৯ জানুয়ারি ২০১৯।