‘প্রিয়া সাহা’ কি দেশে ফিরবে?

আসাদুল্লাহ বাদল

25 May, 2020 12:16pm


‘প্রিয়া সাহা’ কি দেশে ফিরবে?
ছবি : সংগৃহীত

‘প্রিয়া সাহা’ নামের এক নারী বিশে^র সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্পের নিকট বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সংক্রান্ত একটি নালিশ করে মারাত্বক বেকায়দায় পড়েছেন। মূলধারার মিডিয়াসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুক্রবার (১৯ জুলাই ২০১৯) থেকে তুমুল আলোচনা সমালোচনা চলছে। এতে প্রিয়া সাহার পক্ষ নেওয়ার মতো উল্টো স্রোতে হাঁটতে পারে এমন কারও দেখা মিলেনি। এমনকি তিনি যে সংগঠনের নেতা, ওই সংগঠনও পরিস্থিতি দেখে বক্তব্য দিচ্ছে।

এ ব্যাপারে সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডক্টর এ কে আব্দুল মোমেনসহ কয়েক মন্ত্রী, এমপি, পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও মত প্রকাশ করেছেন।

ঘটনাটি যেহেতু দেশের (বাংলাদেশের) বিরুদ্ধে বদনাম ফলে ঐক্যবদ্ধ সুরে প্রিয়া সাহার বিরোধীতা হচ্ছে। প্রিয়া সাহার এই বক্তব্যের জেরে আর আগে তিনি কোন কোন বিখ্যাত ব্যক্তিদের সঙ্গে ফটো তোলার সুযোগ পেয়েছিলেন তাও প্রকাশ পেয়েছে। নিশ্চিত বলতে পারি গতকালের আগে ওই নারীর নামও শুনিনি। আজই (শনিবার, ২০ জুলাই ২০১৯) জানতে পেরেছি তিনি ‘মাসিক দলিত কণ্ঠ’ নামের একটি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক তিনি। পত্রিকাটি ঢাকা জেলা থেকে নিবন্ধিত।

প্রিয়া সাহা যে নালিশ ট্রাম্পের নিকট করেছেন, এতে কি ধরনের মিথ্যাচার বা ভুল তথ্য আছে এটি পরিষ্কার করা দরকার। কিন্তু বিরোধীতার উচ্চস্বরে তথ্য নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় খুব একটা নাই বললেই চলে। প্রিয়া সাহার স্বামী দুদকে কর্মরত বলেও জানা গেছে। তার সম্পর্কেও তেমন কোন তথ্য নেই। কিন্তু অনেকেই ধরে নিয়েছেন, যেহেতু বেচারা দুদকে কর্মরত ফলে তিনি দুর্নীতিবাজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এহেন আশঙ্কা বা অনুমান বাস্তব সম্মত কিনা এটি বোঝানোর সময় আপাতত নেই। তার স্বামীকেও অনেকে একহাত নিচ্ছেন এই সুযোগে। আবার প্রিয়া সাহা সনাতন ধর্মের বলেও তার বিরুদ্ধে বিষোদগার রয়েছে। অপরাধ করে থাকলে, কেবল অপরাধী বিবেচনা করে আইনি দিক বিবেচনা না করলে ‘ছেলেধরা সন্দেহে’ গণপিটুনির মতো অবস্থা হতে বাধ্য। উস্কানি যতটা প্রাপাগাণ্ডায় রূপ নিয়েছে, ততটা অসাম্প্রদায়িকতা দেখাতে পারাও কঠিন।

আগামিকাল ২১ জুলাই দেশের অনেক আদালতে প্রিয়া সাহার নামে মামলা দায়ের হবে এমন আগাম ঘোষণা শোনা যাচ্ছে। একটি অপরাধের জন্য কতটি মামলা দায়ের করা দরকার, এটি কারও বিবেচনায় আছে কিনা কিংবা রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে রাষ্ট্র নিজেই মামলা করতে পারার সুযোগ রেখে নিজস্ব উদ্যোগের দরকার কতটুক সেটিও বিবেচনায় রাখা যেতে পারে। যদি কেউ মিডিয়ায় আলোচনা তৈরির জন্য এসব করে থাকে, তবে ভিন্ন কথা। বলে রাখা উত্তম রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করতে হলে রাষ্ট্রের অনুমতি লাগে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ পরীক্ষা নিরীক্ষা করে রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত গড়িয়ে অনুমতি সাপেক্ষে তবেই মামলা দায়ের হতে পারে। কিন্তু এখন যে হাইব্রিড রাজনীতির গরম বাতাস বইছে তাতে কে কোন আইন যাচাই করে? তবে যে কেউ ইচ্ছা করলে মামলা দায়েরের জন্য আদালতে নালিশ জমা দিতে পারে।

সাবেক বস্ত্র মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী বিদেশে অবস্থানকালে একটি মন্তব্য করার দায়ে তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা দায়ের হয়েছিল (২০১৫ খ্রিস্টাব্দে)। তিনি বিদেশে থাকাকালেই মিডিয়ায় আলোচনায় আসতে আগ্রহী অনেকে মামলা দায়ের করেছিল। ওই মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা কি এটি সম্ভবত মামলার বাদী ও আইনজীবী ছাড়া আর কেউ জানে না। একই অভিযোগে একাধিক মামলা ও বিদেশে অবস্থানকালে মামলা দায়েরের কারণে লতিফ সিদ্দিকীর আইনজীবী সুপ্রীমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করার প্রেক্ষিতে মামলার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের নামে একই অভিযোগে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে দায়ের করা ৭৩টি মামলাও একই পরিণতিতে রয়েছে।

কোন অপরাধী বিদেশে অবস্থান করলে রাষ্টের প্রকৃতি না দেখে ওই দেশ থেকে আসামি দেশে এনে বিচার করা জটিল হয়ে পড়ে। বিশেষত শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলায় দণ্ডিত একাধিক আসামিকে দীর্ঘদিনেও দেশে ফেরত আনা সম্ভব হয়নি। যুদ্ধাপরাধের দায়ে কয়েকজন দণ্ডিত আসামি বিদেশে পালিয়ে আছে। 

হুজুগে না মেতে আইন অনুযায়ী মামলা না করলে কেবল আলোচনা তৈরি হবে। বিচার হবে কিনা এটি সংশয়ে থেকে যাবে। কোনো নাগরিক বিদেশে থেকে অপরাধ করলে দেশের সীমানায় প্রবেশের পর ওই অপরাধ আমলে নেওয়ার বিধান থাকায় অধৈর্য্য হয়ে মামলা না করে প্রকৃত অবস্থা বিবেচনায় রাখা উচিত। সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী যে মত প্রকাশ করেছেন, এতে সরকারই বিষয়টি (মামলা করা বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া) বিবেচনায় রাখছে। এতে নাগরিকদের মামলা করার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?

ফৌজদারি কার্যবিধির ১৮৮ ধারার বিধান হচ্ছে যখন বাংলাদেশের কোন নাগরিক বাংলাদেশের বাইরে কোন স্থানে কোন অপরাধ করে; 

তখন বাংলাদেশের যে স্থানেই তাকে পাওয়া যাবে, সে স্থানে অপরাধ করেছে বলে ধরে নিয়ে সেই মোতাবেক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। অর্থাৎ অভিযুক্ত নাগরিক দেশে আসা মাত্র তার বিরুদ্ধে আইন কার্যকর শুরু হবে।

যখন কোন ব্যক্তি বাংলাদেশে কোন নিবন্ধনকৃত কোন জাহাজ বা বিমানে, তা যেখানেই থাকে না কেন, কোন অপরাধ করে। এই অপরাধ সমুদ্র বা আকাশ সীমায়ও হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে ৬৫ ডিএলআর (২০১৩) পৃষ্ঠা ৪১, গিয়াস উদ্দীন আল মামুন বনাম রাষ্ট্র ও ৬৭ ডিএলআর (২০১৫) আপিল বিভাগ, পৃষ্ঠা ২২৭ সহ আরও দুইটি মামলায় বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। ফলে কেবল মামলা করার জন্য মামলা না করে, শাস্তি দেওয়ার জন্য মামলা করা উচিত।

প্রিয়া সাহা যে কায়দা কৌশলে ট্রাম্প পর্যন্ত পৌঁছেছেন তাতে তার দৌড় হুজুগে হওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে তিনি মামলা ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি দেখিয়ে মার্কিন মুল্লুকে স্থায়ী হওয়ার চিন্তা করতে পারেন। প্রকৃত পক্ষে প্রিয়া সাহার অপরাধ প্রমাণ করতে চাইলে, তাকে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য দেশে আনা উচিত। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রিয়া সাহা আদৌ দেশে ফিরবে কিনা এই সংশয় থেকেই যাবে। হয়তো কালই নতুন কোন ঘটনা ঘটবে, যাতে নতুন মোড় নিবো আমরাও। প্রিয়া সাহা থেকে যাবে ট্রাম্পের দেশেই। আরও নতুন কোন পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।

আসাদুল্লাহ বাদল : সম্পাদ ও প্রকাশক, দৈনিক যোগফল। ২০ জুলাই ২০১৯।