প্রেমপত্র ছিঁড়ে ফেলার সংবাদ

আসাদুল্লাহ বাদল

25 May, 2020 12:24pm


প্রেমপত্র ছিঁড়ে ফেলার সংবাদ
আসাদুল্লাহ বাদল

একই প্রশ্ন বারবার নতুন করে ওঠে, গণমাধ্যম স্বাধীনতা ভোগ করে কি না। স্বাধীনতা ভোগের ব্যাপার ঢাক ঢোল পিটিয়ে প্রমাণ করা যায় না। সাধারণত সরকার প্রশাসন রাজনৈতিক দল ও ক্ষমতাবানদের স্বীকারোক্তি ও গণমাধ্যমে  যুক্ত ব্যক্তিদের অস্বীকৃতির মধ্যে এই প্রশ্ন ঘুরপাক খায়। তবু বিবেচনা করতে হবে একটি গণমাধ্যম তথ্য সরবরাহের পর ওই গণমাধ্যম কতটা চাপ বোধ করে। আত্মনিয়ন্ত্রণ বা সেলফ সেন্সরশিপ এখন প্রকাশ্য ব্যাপার। 

গণমাধ্যম একসময় তুলনামূলক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভক্ত ছিল। এখন সকল মিডিয়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচারণা চালায়। ইন্টারনেট প্রযুক্তির কারণে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ধারণা খুব কম সময়ে ঘুচে যাচ্ছে। বিশ্বগ্রাম ধারণা ক্রমেই অগ্রসর হচ্ছে। ৮০ বছর বয়সে পৃথিবীর বিখ্যাত ও প্রচার সংখ্যায় শীর্ষ নিউজউইক বন্ধ হয় ২০১২ খিস্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর। বন্ধ হয় বলতে মুদ্রণ বন্ধ হয়। ধারণা করা হয় ২০৪৩ খ্রিস্টাব্দে মুদ্রণ কোনো কাগজ থাকবে না। এটি আশঙ্কা বটে। আবার অবাস্তব নয়। নিউজউইকের মুদ্রণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে এটি হয়তো এক যুগ আগেও ভাবা হতো না। বাংলাদেশে ‘সকালের খবর’ একই রকমভাবে মুদ্রণ বন্ধ করে। অথচ সকালের খবর নতুন কলেবরে বাজারে এসেছিল বিশেষ মিশন নিয়ে। বাংলাবাজার তো পুরোপুরিই বন্ধ। দেশ বাংলাও ছাপা হচ্ছে না। মৃদুভাষণসহ অনেক সাপ্তাহিক বন্ধ হয়েছে। এই গতি আরও গতিশীল হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। যদিও এই গতি মোটেও পজেটিভ নয়। আবার প্রযুক্তির তালে গতিশীল থাকতে চেহারায় ফুটিয়ে তোলা ছাপা কাগজের গুরুত্ব বোঝানো অসম্ভব হবে হয়তো। 

বাংলা সংবাদপত্র ২০০ বছর পার করেছে ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে। এ জন্য বাংলা সংবাদপত্র তেমন কোন আয়োজনে মেতেছিল এমন তথ্য কারও চোখে পড়েছে কি না ঠাহর করতে পারছি না। একমাত্র কোলকাতা প্রেসক্লাব বাংলা সংবাদপত্রের ২০০ বছর নামে একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। বিশ্ব গণমাধ্যমে বাংলা সংবাদপত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও কোন আশঙ্কা রয়েছে কি না এটিও ঠাহর করা মুশকিল।

সাধারণত পাঠক যখন একটি সংবাদপত্র বা সাময়িকী কেনেন তখন এর পুরো খবরই তিনি পান। কিন্তু একজন পাঠকের সব খবর পছন্দ নাও হতে পারে। এই কারণে একটি সংবাদপত্রকে আংশিকভাবে বিবেচনা করা যায় না। আবার টেলিভিশনেও একই রকম ব্যাপার ঘটে। কোন কনটেন্ট পছন্দ না হলেই রিমোট কার্যকর করা যায়। এভাবে একজন পাঠক বা দর্শকের স্বাধীনতা বিবেচনায় নেওয়া যায়। কিন্তু একটি সংবাদপত্র পুরো স্বাধীনতা ভোগ করছে, না আংশিক স্বাধীনতা ভোগ করছে এটি মীমাংসা করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার স্বাধীনতাকে খণ্ডিত বা আংশিকভাবে বিবেচনা করাও যায় না। স্বাধীনতা বরাবরই পূর্ণাঙ্গ ধারণা। পাঠক ১০ টাকায় যে সংবাদপত্র কিনে তাতে যদি ১০০ খবর থাকে আর এর ১০টি খবর ওই পাঠকের পছন্দ না হয়, এতে ওই সংবাদপত্রের দাম আনুপাতিক হিসাবে নয় টাকায় নেমে আসে না। এমনকি ১০টি সংবাদ পছন্দ না হওয়ার কারণে, সংবাদপত্রটি না কিনেও বাকি পছন্দের খবরগুলো নিজের আওতায় আনতে পারে না। সংবাদপত্রের পলিসি ও পাঠকের অভিরুচি যেমন একত্রে মিলানো সম্ভব হয় না, তেমনি শাসকগোষ্ঠী ও গণমাধ্যমকর্মীদের ইচ্ছা পূরণ করাও যায় না। আবার সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বলতে যখন মালিকের স্বাধীনতার গণ্ডী বৃদ্ধি পায় তখন হিসাব আরও উলট পালট হয়ে যায়।

গণমাধ্যমের ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন কীভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত? কোন নৈতিক আদর্শ দ্বারা গণমাধ্যমকর্মীরা পরিচালিত হবে? সাংবাদিকতার কি কোন লিখিত দলিল থাকবে? ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ব পরিসরে গণমাধ্যমের কি ভূমিকা থাকবে? কোন দুর্নীতি অনুসন্ধানে সাংবাদিক কি মিথ্যার আশ্রয় নিতে পারে? অপরাধ উন্মোচনে সাংবাদিকরা কি গোপনীয়তা অবলম্বন করতে পারে? অভিযুক্তের বক্তব্য ছাড়া কি কোন প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত। এহেন প্রশ্ন শত বছরের।

বাকশালের কারণে চারটি সংবাদপত্র রেখে বাদবাকি সংবাদপত্র বন্ধ করায় পঁচাত্তর পরবর্তী জঘন্য ঘটনাও চাপা পড়েছে কি না এটি এখনও প্রশ্ন। নব্বই পরবর্তী সংবাদপত্রের বিকাশ ধারায় বিশেষ ক্ষমতা আইন ও মুদ্রণ ও প্রকাশনা আইনের বিধি বিধানকে দায়ি করা হয়। প্রথম সংসদে যখন মুদ্রণ ও প্রকাশনা আইন ১৯৭৩ পাশ হয়, তখন সংসদে আব্দুল্লাহ সরকার ছাড়া আর কোন শব্দ উচ্চারণ হয়েছে বলে মনে হয় না। তিনি সংসদে যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, এর সবই পুরাদমে পরে বাস্তবায়ন হয়েছিল। অমর্ত্য সেনের আলাপ দিয়েই এর সমাধান আশা করা যায়। তিনি মনে করেন, কোন দেশে গণমাধ্যম স্বাধীন থাকলেও ওই দেশে দুর্ভিক্ষ হয় না। চিন ও ভারতে এটি প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশে ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দেও একই বিষয় প্রমাণিত।

ব্যক্তি যখন সমাজে তার মতামতকে সংখ্যালঘু অবস্থানে দেখতে পায়, তখন নিজের মত গোপন রাখতে বা প্রকাশ না করতে চেষ্টা করে। এভাবে বিরত থাকতে থাকেতে এক পর্যায়ে নীরবতা পালন করে। এই প্রক্রিয়া নীরবতা কুণ্ডলীতে রূপ নেয়।

চুরানব্বইতে হাতেখড়ি অবস্থায় গরু চুরি করে জবাই করা গরুর চামড়া চুরির প্রতিবেদন লিখে পাঠানোর পর ‘পাক্ষিক সোপানে’ ছাপা হয়েছিল। এটি আমার জন্য বিশেষ সংবাদ। বাদবাকি চার-পাঁচটা সংবাদ তখন ছাপা হলেও সেগুলো ছিল খুবই নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার। এমন একটি খবর ছাপা হউক এটি ভুক্তভোগিদের ইচ্ছা হলেও তখন তেমন কোন দৈনিকে এটি খবর হয়ে ওঠেনি। একটি পাক্ষিকে এই খবর ছাপা হওয়ার পর অনেকেই দৌড়ঝাঁপ দিয়েছিল। আমার বুক দুরু দুরু ওই সংবাদের চাপ কত গভীর হতে পারে, এই আন্দাজ কোনকালেই ছিল না। কুড়ি বছর বয়সে চাপ সামলানো কত কঠিন, এটি আন্দাজ হয়েছে প্রেমপত্র লিখে ছিঁড়ে ফেলার মতো। সাহসের অভাবে অনেক প্রেমপত্র যথাস্থানে পৌঁছে না। সবচেয়ে খারাপ অনুভুতি ও অভিজ্ঞতা হচ্ছে মানুষের ইচ্ছা কত দ্রুত পাল্টে যায় সেটি অনুধাবন করার মধ্যে। ভুক্তভোগিরা খুব দ্রুত বুঝতে পেরেছিল গরু চুরি হওয়া ভাল, তবু খবর ছাপা হওয়া ভাল নয়। এটি আন্দাজ করেছি যারা বক্তব্য দিয়েছিল, তারা আগে কখনও জানতে পারেনি সংবাদ হলে নানা ঝমেলা তৈরি হয়!

আসাদুল্লাহ বাদল : যোগফল সম্পাদক।