ফিদেল ক্যাস্ট্রো মার্কসবাদী ছিলেন?

আসাদুল্লাহ বাদল

25 May, 2020 12:32pm


ফিদেল ক্যাস্ট্রো মার্কসবাদী ছিলেন?
ফিদেল ক্যাস্ট্রো

১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ১৩ আগস্টে জন্ম হয় ফিদেল ক্যাস্ট্রোর। তিনি ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ২৫ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। কিউবা বিপ্লবের অন্যতম নেতা তিনি। ইউনিভার্সিটি অব হাভানার ল’ স্কুল থেকে তিনি আইনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রকালে তিনি রাজনৈতিক দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। পরে তিনি কিউবান পিপলস পার্টিতে কাজ করেন। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির তিনি ফার্স্ট সেক্রেটারি ছিলেন।

১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ৮১ জন বিপ্লবী নিয়ে তিনি কিউবা বিপ্লব সফল করেন। তার অন্যতম সহযোগী আর্নেস্টা চে গুয়েভারা। চে গুয়েভারাকে নিয়ে ফিদেল ক্যাস্ট্রো প্রায় ২০০ পৃষ্ঠার স্মৃতিচারণ লিখেন। এটি ‘চে স্মৃতিকথা’ নামে পরিচিত। এখানেই তিনি তার রাজনৈতিক মতের বিষয় স্পষ্ট করেন।

বিশ্বব্যাপি কমিউনিস্ট পার্টিগুলো মার্কসবাদ লেনিনবাদ মাওসেতুঙ চিন্তাধারার প্রচারক হিসাবে কাজ করে। কিন্তু ফিদেল ক্যাস্ট্রো ও চে গুয়েভারা এর ব্যতিক্রম। কোন মতবাদকে ফিদেল মতবাদ হিসাবে গ্রহণ করতে রাজি হননি। এর ফলে তিনি খোলামেলা ওই আলোচনা করেছেন।

“চে’র অর্থনৈতিক ভাবনার প্রচার করতে শুরু করি। কিন্তু কোনো ম্যানুয়াল বা অকাট্য দলিল হিসাবে আমি সেগুলি প্রচার করিনি, কেননা কোনো একজন রাজনীতিবিদের চিন্তাধারা, কোনো তাত্ত্বিক বা রাজনীতিকের ভাবনাকে অনমনীয় বা চূড়ান্ত হিসাবে গ্রহণ করতে পারেন না।

আমার সারা জীবন আমি গোঁড়া মতবাদের বিরাধীতা করে আসছি। অসাধারণ রাজনৈতিক নেতা কিংবা অনন্য সাধারণ কোনো বিপ্লবীর চিন্তাধারা যেন মতবাদের রূপ না নেয়, সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। কেননা, সকল চিন্তাই একটা বিশেষ মুহূর্তের, বিশেষ পরিস্থিতির, প্রাপ্ত তথ্য এবং অভিজ্ঞতার আলোকে লিখিত। ফলে, লেনিন যে পরিস্থিতিতে কোনো একটি পদ্ধতিকে যথার্থ বলে মনে করেছিলেন, সেটি অন্য কোনো দেশে, অন্য কোনো পরিস্থিতিতে বা ভিন্ন কোনো সময়ে প্রযোজ্য নাও হতে পারে” (চে স্মৃতিকথা: ফিদেল ক্যাস্ট্রো, পৃষ্ঠা ১৮৫-১৮৬; অবনি আচার্য এটি বাংলায় তরজমা করেছেন। বইটি কিউবার চে গুয়েভারা স্টাডিজ সেন্টার, হাভানার অনুমোদিত)।

ফিদেল বা চে’কে তরুণরা নানা কারণে ধারণ করলেও বিপ্লবী রাজনৈতিক দলগুলো সেভাবে গ্রহণ করে না। এমনকি বাংলাদেশে প্রচলিত ধারার কোন কমিউনিস্ট পার্টি চে গুয়েভারার মৃত্যুবার্ষিকও পালন করে না। একই দিনে অন্য কোনো বিপ্লবীকে স্মরণ করলেও সঙ্গে চে’কে স্মরণ করা হয় না। এর অন্যতম কারণ চে বা ফিদেলকে তারাও মার্কসবাদী হিসাবে মেনে নেন না। এমনকি কেউ কেউ তাদের বিপ্লবী বা কমিউনিস্ট হিসাবেও মানতে নারাজ। ফিদেল ও চে নিজেই মার্কসবাদকে মতবাদ হিসাবে মানেন নি বরং অস্বীকার করেছেন।

আরও জানা যাক ফিদেলের লেখা থেকে, “মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন বা চে’র ভাবনা কিন্তু মতবাদ নয়। তাঁরা একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে এবং সময়ের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং বিপ্লাবী চিন্তাধারায় তাঁদের মেধার স্বাক্ষর রাখতে পেরেছিলেন (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৮৬)। নরম হৃদয়ের কমিউনিস্টরা হয়তো মনে করবেন চে কিংবা ফিদেলকে নিয়ে আবার নতুন ষড়যন্ত্র নয় তো। সুতরাং ফিদেলের খোলামেলা কথা বিস্তারিত জেনে নেওয়াই উত্তম।

“অপরিবর্তনীয় মতবাদ হিসাবে ধরে নিলে সেসব ভাবনাকে বৈজ্ঞানিক, রাজনৈতিক এবং বিপ্লবী পরিপ্রেক্ষিত থেকে সরিয়ে ধর্মের পর্যায়ে নিয়ে যাবার মতো হবে (প্রাগুক্ত ১৮৬)।” ফিদেল এসব কথা ভালমতো চিন্তা করেই লিখেছেন। বরং আমাদের দেশের ভেকধারী বিপ্লবীরা চে বা ফিদেলকে যারা (তরুণ) মনে ধারণ করে কিন্তু ভিন্ন ধারার বিপ্লবী রাজনীতি করে তারা যেন দলছুট না হয় ওই কারণে আসল ঘটনা স্পষ্ট করে না। এটি তথাকথিত বিপ্লবীদের মারাত্বক ভন্ডামী।

সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতায় কিংবা সমাজতন্ত্র বিনির্মাণে ফিদেল অসামান্য ভূমিকা পালন করেছেন। তাকে স্মরণ করি। শ্রদ্ধা জানাই। যারা ফিদেলকে ধারণ করেন না কিন্তু ত্যাগও করেন না, তাদের প্রতি অভক্তি। আশা করি ভবিষ্যতে এসব ভন্ডামী চিরতরে শেষ হবে।

লেখক: সম্পাদক, দৈনিক যোগফল।