দিনমজুরকে ১০ ঘণ্টা থানায় আটকে রাখেন কোন আইনে?

আসাদুল্লাহ বাদল

25 May, 2020 12:41pm


দিনমজুরকে ১০ ঘণ্টা থানায় আটকে রাখেন কোন আইনে?
ফাইল ছবি

কাপাসিয়া উপজেলার বরুন গ্রামের আব্দুল মোতালেবকে একটি সাধারণ ডায়েরির (জিডি) সূত্রে আটক করে থানায় রেখেছিলেন ১০ ঘণ্টা। প্রকৃতপক্ষে সেটি জিডি নয়। জিডির একটি আবেদন মাত্র। মোতালেবের ভাই কাদির ওই জিডি দায়ের করেছিলেন এক হাত জমির সীমানা বিরোধকে কেন্দ্র করে। কিন্তু জিডি এন্ট্রি হয়নি। আইনের গতি এমন বেগতিক দেখে অনেকেই হতভম্ব। মামলা করতে কত বেগ পেতে হয়, আসামি ধরতে আরও বেশি। অথচ একটি জিডির আবেদনের পর একজন বয়সী দিনমজুরকে ধরে থানায় নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি ভাবনার বাইরে। কাপাসিয়া থানার এসআই জাফর আলী খান জিডির আবেদনকে পুঁজি করে ওই দিনমজুরকে আটক করে ‘টুপাইস’ কামিয়ে নিয়েছেন।

জিডি দায়ের করার পর আইনগত প্রক্রিয়া কি? এটি আগে দেখে নেওয়া উচিত। জিডি দায়ের করার পর জিডি তদন্ত করার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। জিডির বিষয় তদন্তে প্রমাণ হলে প্রসিকিউশন দাখিল করার অনুমতি নিতে হয় আদালত থেকে। এ প্রসঙ্গে ফৌজদারি আইনে বিধানের কথা যোগফলকে জানিয়েছেন, মানবতা বিরোধী অপরাধ ট্রাইবুনালের প্রসিকিউটর (প্রশাসন) জেয়াদ আল মালুম। তিনি বলেন, জিডি তখনই দায়ের হয়, যে ঘটনা সাধারণত লঘু প্রকৃতির বা আমল অযোগ্য অপরাধের শ্রেণিতে পড়ে, এমন বিষয়। তার মতে, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৫(২) ধারা অনুযায়ী, “প্রথম শ্রেণি বা দ্বিতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়া অ-আমলযোগ্য কোনো ঘটনার তদন্তে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।” তিনি ঘটনার সূত্রে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

সাধারণত এমন অভিযোগ সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে দায়ের করার পর ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি সাপেক্ষে আদালতে প্রসিকিউশন দাখিল করতে হয়।

কাপাসিয়া থানার এসআই জাফর আলী খান যে জিডি আবেদনের সূত্রে দিনমজুর মোতালেবকে আটক করলেন এই বিষয় এখন পর্যন্ত তদন্তের আদেশ বা প্রসিকিউশনের কোনো ঘটনার অন্তর্ভুক্ত নয়। হবে কিভাবে। আগে তো জিডি এন্ট্রি হতে হবে। জেয়াদ আল মালুম আরও বলেন, ‘প্রসিকিউশন আদালত আমলে নেওয়ার পর সমন বা ওয়ারেন্ট জারি করতে পারে। কেবল ওয়ারেন্ট জারি করলেই আসামিকে গ্রেপ্তার করার সুযোগ রয়েছে। যদি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়ে থাকে, তাহলে তো আসামিকে আদালতে চালান দেওয়ার কথা।’ একজন এসআই কি পরোয়ানা ভুক্ত আসামিকে ছেড়ে দিতে পারে? ছেড়ে দেওয়ার পেছনে কোন রহস্য কাজ করেছে? আসল রহস্য হচ্ছে মোতালেবকে জিম্মি করে লাভবান হওয়ার পায়তারা মাত্র।

যোগফলে এ ব্যাপারে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) আমীনুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন। তিনি নিজেই তদন্ত করবেন। ‘তদন্ত’ তদন্তের গতিতে চলুক। এই নিয়ে আমাদের মাথা ঘামানো মোটেও কাজ নয়। কিন্তু বেআইনি কাণ্ডের বিষয়ে আপত্তি আছে। আপত্তি এই কারণে জিডির দরখাস্তকারী স্বীকার করেছেন ‘তার’ আসামিকে ধরে নিয়ে গেছে। আসামি নিজেও একই দাবি করেন। জিডির দরখাস্ত থানায় দিলেই কাউকে ধরে নিয়ে যেতে হয়? যে এসআই এ ঘটনা ঘটিয়েছেন, তিনিও দিনমজুরকে ধরার বিষয় অস্বীকার করেন নি। আবার একজন ‘কথিত’ নেতার জিম্মায় ছেড়েছেন বলেও জানিয়েছেন। প্রথম আপত্তিটা সেখানেই। ওই জিডির আবেদনের সূত্রে দিনমজুর মোতালেবকে আটক করে থানায় নেওয়ার আইন আছে কিনা। থানায় ১০ ঘণ্টা আটকে রাখার সুযোগ আছে কিনা? যদি এত সুযোগ থাকে, তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে গাজীপুর জেলায় গত ৮ মাসে কতটি জিডি দায়ের হয়েছে? আর কতজনকে এভাবে আটক করা হয়েছে?

বিনা কারণে দিনমজুরকে ছাড়া হয়নি। সাড়ে ৮ হাজার টাকা ঘুষের বিনিময়ে ছাড়া হয়েছে। কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, এই যুগে সাড়ে ৮ হাজার টাকা আর কি ব্যাপার! কিন্তু এসআই জাফর কতটা অভাবী হলে সাড়ে ৮ হাজার টাকা ঘুষ নেয়? যিনি সাড়ে ৮ হাজার টাকা ঘুষ দিয়েছেন, তিনি যদি সামর্থ্যবান হতেন তাহলে ঘটনার সময়ই ঘুষ দিয়ে ছাড়া পেতেন। তিনি ঘুষ দিয়ে ছাড়া পেতে চান নি। ছাড়া পেতে বাধ্য হয়েছে। যিনি মাত্র সাড়ে ৮ হাজার টাকা ঘুষ দিতে ১০ ঘণ্টা সময় নিয়েছেন তাকে একবার মানবিকতা দিয়ে বিবেচনা করতে পারেন।

গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার সংবাদের ঘটনা আমলে নিয়ে তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছেন এটি নিশ্চয়ই ‘শুভ লক্ষণ’। সাড়ে ৮ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে যিনি (মোতালেব) যারপর নাই আফসোসে আছেন, তাকে সাক্ষিসহ ডাকাডাকি করার চেয়ে চৌকষ পদ্ধতি অবলম্বন করে তদন্ত করা নিশ্চয়ই উত্তম। কিভাবে, কখন ওই দিনমজুরকে আটক করা হয়েছিল, কখন মুক্তি দেওয়া হয়েছে, জিম্মানামা কখন তৈরি করা হয়েছে, কে জিম্মায় ‘নেতাগিরি’ করেছে, সবই খোলাশা হওয়া জরুরি বইকি। না হয় এহেন ঘটনা ঘটতে থাকবে। ভুক্তভোগী যেন কোন জুলুমের শিকার না হয়, সে কারণে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করাও জরুরি। ঘটনাস্থলের অনেকের বক্তব্যও হয়তো পাওয়া যেতে পারে সহজে।

বলে রাখা উত্তম ভুক্তভোগী মোতালেব আটক থাকার সময় মোতালেবকে ছাড়ানোর জন্য তার পরিবারের সদস্যরা যে ভূমিকা পালন করেছে এলাকায় তা অনেকেই অবগত। মোতালেবের গৃহিনী স্ত্রী যিনি নিতান্তই সহজ সরল, তার সরল স্বীকারোক্তি যোগফলে রেকর্ড রয়েছে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস তিনি মিথ্যা কথা বলেননি। তিনি টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে ১০-২০ হাজার বলেননি। যে পরিমাণ টাকা দিয়েছে, সেটিই বলেছেন। মোতালেব নিজেও অন্য কোনো অভিযোগ করেন নি। পরিস্থিতি এমন ঘোলাটে করা মোটেও উচিত হবে না, যেন ভুক্তভোগী মনে না করেন ঘুষ দিয়ে তিনি আরও বড় বিপদে পড়েছেন।

যিনি (জাফর) ঘুষ নিয়েছেন আর নেতাগিরি করে মোতালেবকে ছাড়িয়েছেন তাদের বিশাল ক্ষমতা রয়েছে এই নিয়ে আমাদের মতভেদ নেই। কিন্তু ভুক্তভোগী নিতান্তই ক্ষমতাহীন। ক্ষমতাবানের কষাঘাতে আর এক বার যেন হয়রানীর শিকার না হয়। ইতোমধ্যে ক্ষমতাবানরা ভুক্তভোগীর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে বলে লক্ষণ দেখা দিয়েছে। তারা আর কোনো বিচারই চাইতে চান না। 

আসাদুল্লাহ বাদল : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক যোগফল। ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯।