করোনাভাইরাস টেস্ট কিটের কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে কত দিন লাগে?

আলী রীয়াজ

26 May, 2020 01:32pm


করোনাভাইরাস টেস্ট কিটের কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে কত দিন লাগে?
আলী রীয়াজ

আমাকে কি কেউ বলতে পারেন যে করোনাভাইরাস টেস্ট কিটের কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে কত দিন লাগে? আমি ভাইরোলজিস্ট নই, ডাক্তার নই, জনস্বাস্থ্য বিষয়ে আমার কোনো ধরনের জ্ঞান নেই। সেই কারণেই এই রকম একটা নির্বোধ প্রশ্ন সর্বসমক্ষে করতে হচ্ছে। 

সারা পৃথিবীতে মহামারি চলছে। বাংলাদেশে এখন সংক্রমণের মাত্রা উর্ধ্বমুখী। মৃত্যুর হার বাড়ছে। সরকারের নিয়োগ দেওয়া জাতীয় কারিগরি বিশেষজ্ঞ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডাক্তার মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন তাদের কমিটির সুপারিশ রয়েছে ‘প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ হাজার টেস্ট করতে’। কিন্ত এখন পর্যন্ত দৈনিক পরীক্ষা হচ্ছে ১০ হাজারের কম। দেশের সবগুলো পিসিআর ল্যাব একত্রিত করলে টেস্টের সামর্থ্য ৩০ হাজারই। তা হলে দাঁড়াচ্ছে যেভাবেই হোক টেস্টের সংখ্যা বাড়াতে হবে। বাড়াবার একটা উপায় তো হাতেই ছিল। 

গণস্বাস্থ্যের তৈরি করা কিট। ১৭ মার্চ প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণায় কিট উৎপাদনের কথা জানায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের গবেষক ডক্টর বিজন কুমার শীলের নেতৃত্বে ডক্টর নিহাদ আদনান, ডক্টর মোহাম্মদ রাঈদ জমিরউদ্দিন, ডক্টর ফিরোজ আহমেদ এই কিট তৈরি করেন। 

মনে রাখবেন সেটা হচ্ছে বাংলাদেশে প্রথম করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত শনাক্ত হবার নয় দিনের মধ্যেকার ঘটনা। ১৯ মার্চ কিট উৎপাদনে যায় প্রতিষ্ঠানটি। সেদিন বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। দেখে মনে হয় প্রয়োজনের তাগিদে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছেন কয়েকজন গবেষক। মানুষকে বাচাবার জন্যে তাদের যতটুকু সামর্থ্য তাই নিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। পৃথিবীর আর দশটা দেশে যেমন বিজ্ঞানীরা উঠেপরে লেগেছেন ঔষধ এবং টিকা আবিষ্কারের জন্যে ঠিক তেমনি জরুরিভাবেই কাজে নেমেছিলেন এই বিজ্ঞানী দল। তাদের এই কিট কাজে দেবে কিনা সেটা তো পরীক্ষা করে দেখার বিষয়। তারা তাদের সবটুকু করবেন, যথাযথ কর্তৃপক্ষ, যাদের কাজ হচ্ছে পরীক্ষা করা, তারাও তো বাংলাদেশেরই প্রতিষ্ঠান। তারাও নিশ্চয় একই রকম জরুরি বিবেচনায় এগিয়ে আসবেন সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্ত আমরা এখন সবাই জানি তারপরে কী হয়েছে। গণস্বাস্থ্যে ল্যাবে বিদ্যুত নেই এই খবর পাওয়া গেল ১১ এপ্রিল। ২৫ এপ্রিল গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পক্ষ থেকে সরকারকে কিট দেওয়ার অনুষ্ঠানে সরকারের কেউ এলেন না। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদের কাছে করোনা টেস্টের কিট হস্তান্তর করা হল। তারপরে শুরু হল হাইকোর্ট দেখানো। কিছু লোক এমনভাবে কথা বলতে শুরু করলেন যেন সারা দুনিয়া ২০২০ সালের ১ জানুয়ারিতে আছে, কত আইন, কত নিয়ম, কত পদ্ধতি আছে তার হিসেবের খাতা খুলে আমাদের দেখানোর কাজ নিলেন। গবেষণা তারা করেন কিনা সেটা বড় কথা নয়, তারা যে অনুমোদনের নিয়ম মুখস্ত করেছেন সেটা জানা গেলো। আমলারা কত ধানে কত চাল তার হিসেব দেখিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, দিল্লী অনেক দূরে। সেই সব দেখে মনে হল মানুষের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা–তামাশার খেলা শুরু হয়েছে। তারপরে ৩০ এপ্রিল ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের থেকে বিএসএমএমইউ বা আইসিডিডিআরবিতে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উদ্ভাবিত কিটের কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য অনুমতি দেওয়া হল। মে মাসের ২ তারিখ কিটের কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য বিএসএমএমইউ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডাক্তার শাহীনা তাবাসসুমকে প্রধান করে ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করা হল। সেই কমিটির পরীক্ষা এখনও শেষ হয়নি। অন্তত আমাদের জানার সুযোগ হয়নি। 

গণস্বাস্থ্যের বিজ্ঞানীদের জানার সুযোগ হয়নি, এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান জাফরুল্লাহ চৌধূরীরও জানার সুযোগ হয়নি। এই অবস্থায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ‘ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের’ জন্য মঙ্গলবার (২৬ মে ২০২০) সময় নির্ধারণ করে। সোমবার (২৫ মে ২০২০) ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর গণস্বাস্থ্যকে ‘অনুরোধ’ করেছে ‘অনুগ্রহ করে এ পরীক্ষা বন্ধ’ করতে। পরীক্ষা বন্ধ হয়েছে। এই অনুরোধ যেদিন আসল সেদিন পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসেবে ৭ হাজার ৩৩৪ আর মৃতের সংখ্যা সরকারি হিসেবে ৫০১ জন। এর বাইরে যারা পরীক্ষা ছাড়াই মারা গেছেন। উপসর্গে মারা গেছেন তাদের হিসেব নিলে সংখ্যা কোথায় দাঁড়াবে তা কেবল অনুমান করতে পারি। এরমধ্যেই জানা গেলো যে ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আইসোলেশনে আছেন। জাফরুল্লাহ চৌধুরী সুস্থ্য হয়ে সবার মাঝে ফিরবেন সেটাই প্রত্যাশা। আগামি ১৪ দিন তাকে এই কিট নিয়ে দৌড়ঝাপ করতে দেখতে পাবোনা। এটা কি তা হলে কিটের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালকে পিছিয়ে দেবে? আর জানতে ইচ্ছে হয় ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর এই অনুরোধের কারণ কি? কত দিনের জন্যে অনুরোধ? এখন তো একটা জনস্বাস্থ্য বিষয়ক জরুরি অবস্থার মধ্যে আছে দেশ। এই সময়ে এই অনুরোধের কারণটা কি তারা বলতে পারেন? বাংলাদেশের সব গণমাধ্যমেই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে উদ্ধৃত করে এই অনুরোধের কথা বলা হয়েছে। কিন্ত কোনো সংবাদমাধ্যম কি ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরকে জিজ্ঞেস করেছেন কেন? দেশে জবাবদিহি নেই, কে কিসের সিদ্ধান্ত নেয় বোঝা মুশকিল। কিন্ত প্রশ্ন তো করা যায়। আর হ্যাঁ, এটাও জানতে মন চায়, বিএসএমএমইউ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই কমিটির পরীক্ষা কি শেষ হয়েছে? জনস্বাস্থ্য যখন বিপদে, মহা বিপদে সেই সময়ে এই ধরনের পরীক্ষায় কত দিন লাগে?

আলী রিয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনিয় ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক। তিনি মঙ্গলবার (২৬ মে ২০২০) দুপুর সাড়ে বারোটায় তার ফেসবুক আইডিতে এই মতটি প্রকাশ করেন।


বিভাগ : মুক্তমত