রাজনীতির রূপক ঘোড়া ও ঘাসের বন্ধুত্ব!

আসাদুল্লাহ বাদল

26 May, 2020 05:01pm


রাজনীতির রূপক ঘোড়া ও ঘাসের বন্ধুত্ব!
ঘোড়া

পুঁজিবাদী সমাজে দেশপ্রেম নামের ধারণাটি যদি পরীক্ষা করা হতো তাহলে বুঝা যেত কার কত দেশপ্রেম। দেশপ্রেম এমন একটি বিষয় যেখানে কোন শতাংশের হিসাব মিলে না। ১০০ অবশ্যই ১০০ শতাংশ হতে হয়। ৯৯.৯৯ শতাংশ দিয়ে দেশপ্রেম মাপা যায় না। 

এমন কমতি মাপে কেউ পড়ে গেলে তাকে আর দেশপ্রেমিক বলা যায় না। প্রথম পোপ গিলোসিয়াসের দুই তরবারি নীতি থেকে নিকোলাই মেকিয়াভেলির নির্দেশিত শাসক সিংহের মতো বলবান আর শিয়ালের মতো ধূর্ত নীতি মেনে পশুতে পরিণত হওয়া সম্ভব। মানবতাবাদী হওয়া মোটেও সম্ভব নয়। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সৈয়দা জোহরা তাজ রাজনীতির হিসাব থেকে বিলীন হয়ে গেছেন। খুব কম জনগণ মনে করতে পেরেছে ২০ ডিসেম্বর ২০১৪ ছিল তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। কারণ, তার যোগ্য উত্তরসুরীরাই ভুলিয়ে রেখেছে জনগণকে। দেশপ্রেমের নামে দেশপ্রেমের খেলা এমনই পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়।

১৯৯১ পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতার পরিবর্তনকে অনেকেই ধারাবাহিক পরিবর্তন বা একই দল দুইবার ক্ষমতায় টিকে না থাকার সূত্র আবিস্কার করেছিলেন। ২০০১ সালে আবার ধারাবাহিক ক্ষমতার বদল ওই ধারণাকে আরও পাকাপোক্ত করেছিল। ২০০৮ সালে ধারাবাহিক ক্ষমতার পরিবর্তন অতই পাকাপোক্ত হয়, যে এটি একটি নিয়মে পরিণত হয়েছে। অন্তত এই সময় অর্থাৎ ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার পতনের পর সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাবার কারণে সামান্য ব্যত্যয়সহ বিবেচনা করলে ২৪ বছরের নাগরিক পিছনের আর কোন ইতিহাস না ঘেটে বলে ফেলতে পারে তেমন কিছু না করেও ধারাবাহিক বদলের ফলে ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার একটি সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ফলে রাজনৈতিক চিন্তা চেতনা অসাড় হয়েছে আর রাজনীতির রূপক বৃদ্ধি পেয়েছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির চেয়েও বেশি নির্লজ্জভাবে। ঘোড়া সাধারণতই ঘাস খেয়ে জীবন ধারণ করে। ঘোড়া যদি ঘাসের সাথে বন্ধুত গড়ে তোলে, আর বন্ধুত্বের মর্যাদা রক্ষা করে তবে ঘোড়াকে না খেয়ে মরার পথে পাড়ি জমানোর পথ বেছে নিতে হবে অনিবার্যভাবেই। সুতরাং ঘোড়ার বন্ধু ঘাস! এই বিবেচনায় রাজনীতির মাঠে ফাঁকা গোল দেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায় বৈকি। বরং আমরা খেলা শুরু হওয়ার আগেই গোল হয়ে যাওয়ার মত বেকুবি ঘোষণা দিয়ে দিতে পারি না। ক্ষমতার এই ধারাবাহিক পরিবর্তনটি খুব ভালভাবে আঁচ করতে পেরেছিল বিএনপি জামাত জোট। ফলে তারা একটি একতরফা নির্বাচনে ক্ষমতায় টিকে থাকার সবরকম চেষ্টা চালিয়েছিল ২০০৬ সালের শেষপর্যন্ত। কিন্তু ওয়ান ইলেভেন নামের দৈত্য সেই হিসাবের খাতা  শিয়ালের গর্তে ঢুকিয়ে দেয়। ২০০৮ সালে মহজোট ক্ষমতায় এসে একই হিসাব ভিন্নভাবে মিলিয়ে ধারাবাহিক ক্ষমতা পরিবর্তনের ধারা বদল করে দেয়। স্বাভাবিকভাবে তথাকথিত যেসব বিএনপি জামাত ও তাদের মিত্র ১৮ সতেরতে নেমেছে, আবার কুড়িতে উঠেছে তারা সরকারের মেয়াদ দুইবছর বাকি থাকতেই ক্ষমতার স্বাদে বিভোর হয়েছিলেন। কিন্তু ধারাবাহিকতা একপর্বে বিলীন হয়ে যাওয়াতে সবকিছুই ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। যেকোন রেকর্ড ভেঙে, যেখানে ১৫১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে সরকার গঠন করা যায়, সেখানে ১৪ দল ও তার মিত্র জাতীয় পার্টি ১৫৩ আসনের ভোটারদের হাতে শৃঙখল পড়িয়ে দেয়। এমনকি ওইসব আসনে যারা ১৪ দল ও জাতীয় পার্টির সমর্থক তারাও ভোটের অধিকার হারিয়ে ফেলে। ফলে গত ২৩ বছর ধরে ধারাবাহিক ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা বদলের স্বপ্ন ভিন্ন পথে পা দেয়। আর তাতে সবরকম ছলচাতুরি কাজে লাগিয়ে একই দল দুইবার ক্ষমতায় থাকতে পারে না, এই লাইন একটু ঘুরে যায়। 

স্মরণীয়, একতরফা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫ জানুয়ারি ২০১৪ তে ৪৭টি ভোট কেন্দ্রে একজন ভোটারও ভোট প্রদান করেনি এই খবর চাউর হয়েছে সিনেমা জগতের কেলেংকারির মত। মিডিয়াসহ সকলেই কেবল ভোট পড়েনি এই বিষয়টিকে নেগেটিভ ধারণা সমৃদ্ধ করার জন্যই ব্যস্ত রয়েছে। আর বিরোধী শিবির এই ভোট না পড়াকে রাজনীতির মাঠ গরমের কাজে লাগাতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কেন ওইসব ৪৭টি কেন্দ্রে একটিও ভোট পড়েনি।  সাধারণত এক হাজারের বেশি এবং তিন হাজারের মধ্যে ভোটার সংখ্যা হলেই একটি ভোট কেন্দ্র স্থাপন করা হয়ে থাকে। সেইক্ষেত্রে একটি ভোট কেন্দ্রে চারজন থেকে আটজন পর্যন্ত পোলিং এজেন্ট নিয়োগ করতে পারে একজন প্রার্থী। গড়ে পাঁচজন করে পোলিং এজেন্ট নিয়োগ করলেও ৪৭ কেন্দ্রে ২০০ থেকে ৩০০ জন পোলিং এজেন্ট নিয়োগ করার কথা। পোলিং এজেন্ট নিয়োগ করতে হলে অবশ্যই এজেন্টকে ভোটার হতে হয়। এক কেন্দ্রের ভোটার অন্য কেন্দ্রে এজেন্ট হতে পারে না। জাতীয় পরিচয়পত্র, দুইকপি ছবিসহ এজেন্ট ফরম প্রার্থী অথবা প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনি এজেন্টের সইয়ে নিয়োগ হয়ে থাকে। আর যখনই কেউ কোন প্রার্থীর জন্য এজেন্ট হয় তখন অবশ্য তিনি তার প্রার্থীকে ভোট প্রদান করার কথা। কিন্তু ৪৭টি কেন্দ্রে একটিও ভোট না পড়ায় এটি পরিস্কার হয়েছে ওইসব কেন্দ্রে আওয়ামীলীগ দলীয় প্রার্থীরা পোলিং এজেন্টও নিয়োগ করতে পারেনি। এছাড়া ওই আসনের অন্য দলীয় প্রার্থীরাও কোন পোলিং এজেন্ট নিয়োগ করতে পারলে অন্তত ভোট শূণ্য হত না। এই ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ। আর কেনইবা মিডিয়াগুলি এজেন্টবিহীন ভোট কেন্দ্রের সংবাদ ভোট গ্রহণকালে প্রচার করতে পারেনি এটিও বোধগম্য নয়। সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস মোকাবেলায় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগ মাঠে যে কথাই বলুক না কেন যারা নির্বাচনে সব কেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট নিয়োগ দিতে পারে না তাদের পক্ষে সম্ভব কিনা নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে। 

ভাঙাচুরা রাস্তাঘাটে রঙিণ পোস্টার ব্যানার বিলবোর্ড সাটিয়ে দিতে কোন হিসাব কিতাব লাগে না। ছিচকে চোর-ডাকাতও জাতীয় নেতাদের ছবির ঘরে ছবি সেটে দিয়ে নেতা বনে যাচ্ছে। বিদ্যুৎবিহীন এলাকায়ও ডিজিটাল ঘোড়া ধাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে। প্রতিষ্ঠিত দল ও সংগঠনে জায়গা করতে না পেরে নিজেদের ইচ্ছামত নানান সংগঠন গড়ে তোলা হচ্ছে স্রেফ চাঁদাবাজি ও আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য। লাগাম টানার কেউ নেই, বরং এসব সংগঠকদের অনুষ্ঠানে আদমবোমা ফাটানোর মত, যা তা বক্তব্য দিয়ে নিজেদের অযোগ্যতার প্রসার ঘটিয়ে চলছে। ব্যানার পোস্টারের বক্তব্য দেখে মনে হবে আমাদের দেশই হয়তো বিশ্বের সেরা অর্থনীতির সনদ পেয়েছে নতুবা আমাদের অর্জন এমন যে আরও একশ বছরেও এটি কেউ কল্পনায়ও ছুয়ে দেখতে পারবে না। এভাবেই রাজনৈতিক দৈন্যদশা বেড়ে চলছে তো কমবে কি না তা আঁচ করা ও মুশকিল। স্বৈরাচার পতনের দাবি নিয়ে যদি কেউ শান্তির প্রতিকখ্যাত কবুতর উড়ানোর ছবি প্রদর্শন করে শেষে রাজনীতির মাঠ ছেড়ে ভেগে যায়, তাহলে রাজনীতির কি দুর্দশা এটি আর পরিসংখ্যান দিয়ে মাপঝোঁকের দরকার নাই। হরতাল ডেকে নেতাকর্মীরা নিজ কর্মস্থলে বসে যখন বিবৃতি দেয় আর বলে হরতাল সফল হয়েছে, তখন বুঝতে বাকি থাকে না এরা আসলে কোন আন্দোলন করতে চায় না, ধারাবাহিক বদলের পালে ক্ষমতায় আরোহন করতে চায়। চিরাচরিত ঐতিহ্য গাড়ির চাকা ঘুরবে না, দোকানপাট খুলবে না, স্কুল কলেজ চলবে না, অফিস আদালত খুলবে না এমনসব স্লোগান হারিয়ে যাচ্ছে। কি দাবিতে কেন কবে হরতাল এটি আর জনগণ জানতেও চাইছে না। আচ্ছা হরতাল ডাকছে, হরতালের মত হরতাল হবে। এমন গাছাড়া ভাবে রাজনীতি রাজনীতির কুঠারি স্বার্থে লুকিয়ে আছে। আন্দোলন হলে হয়তো জনগণের কোন স্বার্থ উদ্ধার হয়ে যাবে, তাতে বুর্জোয়া রাজনীতির লাভ কি? যেমন কয়েকদিন আগে ২০ দলের নেতা খালেদা জিয়া গাজীপুরে সমাবেশে যোগদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কিন্তু পারেননি। যারা তার আগমনকে স্বাগত জানিয়ে পোস্টার ব্যানার সেটেছিলেন তারা নিজেদের কখনও প্রশ্ন করেছেন কি না কেন খালেদা জিয়া সমাবেশ করতে পারেনি। এটি খালেদার ব্যর্থতা না, তার দলের। কুড়ি দল আসলে কুিড় দল কিনা, সংখ্যা  গণনা করে ওই অনুসারীদের ৯৯ শতাংশই বলতে পারে না। একই রকমভাবে কত দলে ১৪ দল সেই হিসাবও একই বাতিল খাাতায় আশ্রয় নিয়েছে। পাঠক মাত্রই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেখতে পারেন এজাতীয় নেতাদের ৯৯ শতাংশের উত্তর আমতা আমতা ও আঙুলের দাগ গুনে শেষে আর কয়েকটির নাম পরে হিসাব মিলিয়ে বলব এমন অজুহাতে শীতের দিনে গাঁ ঘেমে পার পেতে চাইবেন। এসব দল ও দলের নেতারা নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত প্রতীক সমৃদ্ধ হওয়ার পরও অন্যের প্রতীকে নির্বাচনে জিতে আসতে চায়। আবার নিবন্ধন নাই এমন দলের সাথে জোট করে নিবন্ধন পাওয়া ও নিবন্ধনবিহীন দলকে এক কাঁতারে তুলে বেশি সংখায় প্রচার প্রপাগান্ডা চালাতে চায়। ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর খালেদা জিয়া যতটুকু রাস্তা পায়ে হেটে গণমাধ্যম কর্মীদের সামনে আসতে পেরেছিলেন এক বছর পর ২৭ ডিসেম্বর গাজীপুরে ততটুকু রাস্তা মাড়াতে না পেরে যেসব জায়েজ করা ফর্মুলা দিয়ে বেড়াচ্ছেন, তাতে তিন বছর আগে এই জোট কিভাবে ক্ষমতার স্বাদ গুনতে শুরু করেছিল এটি ভাবনার বিপরীতে চলে যায়। যে সাবেকী ছাত্রদলের নেতারা মাত্র কয়েকদিন আগে হুংকার ছুড়েছিলেন তারা ভাবতে পারে না ধারাবাহিকতা কোন পথে হাঁটছে। বর্তমানরাও যেখানে কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে নিজ দলের অফিস তালাবদ্ধ করে নেতাদের পথ আটকে দেয়, তারা নিজ নেতাকে সমাবেশস্থলে পৌঁছে দিতে পারেনা। এজন্য তাদের কোন আফসোস নেই। সব করেছে বাকশাল এমন একটি বুলি আওড়িয়ে সব শেষ। অবশ্য ক্ষমতায় থাকলে এদের নিয়ন্ত্রণ করতে সংবাদপত্রে কলাম লেখতে হয়। ক্ষমতা না থাকলে ইঁদুরের গর্তে লুকিয়ে থাকতে মোটেও লজ্জা পায় না। ব্যবসায়িক পার্টনারশিপ ঠিক থাকলে ক্ষমতা বদল কিংবা অপরিবর্তনীয় তাতে কিছুই আসে যায় না। বাকশাল বলে একটা গালি আছে এটি সময় সময় দিতে পারলেই হল। বাস্তবিকপক্ষে যারা বাকশাল বলে গালি দেয় তারাও জানে না বাকশাল কি, আবার যাদের গালি দেয় তারাও ঘাপটি দিয়ে থাকে, না জানার লজ্জায়। স্মরণীয়, তিনটি দল একীভুত হয়ে বাকশাল গঠিত হয়েছিল। এছাড়া কয়েকটি দল থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন পদধারী নেতারাও বাকশালে যোগদান করেছিল। যত সমালোচনাই করা হউক যদি রাজনৈতিক শক্তি ছাড়া রাজনীতি মোকাবেলা করা হয় তাতে ফল পাওয়ার আশা কেবল বৃথাই নয় ফাঁকা আসমান দেখার মত। কেন ক্ষমতার পরিবর্তন জরুরি, ক্ষমতা পরিবর্তন হলে জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন হবে কি না, আগে যতবার ক্ষমতা বদল হয়েছে তাতে কি জনগণের ভাগ্য বদল হয়েছিল, এমন প্রশ্ন যখন উঠেপড়ে লেগেছে তখন মিডিয়া আর টকশোকেও গাল দিতে বাদ রাখে না শাসকগোষ্ঠী। 

২০১৫ সালকে যারা রাজনৈতিক বিবেচনায় স্বাগত জানিয়েছেন, তাদের হিসাবে ক্ষমতার বদল আছে কি না, অতীতে যত স্বপ্ন ধূসর হয়েছে তা থেকে নতুন কোন ছক মিলানো যাবে কি না, এসব প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে। ফেসবুকে একটি মাত্র মন্তব্য ছিল গাজীপুরে ২০ দলের সমাবেশের নামে যুদ্ধাপরাধী নিজামী, সাঈদী, মুজাহিদ, মীর কাশেম, কামারুজ্জামানদের মুক্তির দাবিতে বেলুন উড়বে কিনা, খালেদার ব্যানারে জামাত শিবিরের কর্মীদের ফ্রন্টলাইনে জায়গা ছেড়ে দিয়ে পিছনের সারিতে দাঁড়িয়ে ক্ষমতার আসমান দেখার ভিড়ে বিএনপিওয়ালারা হাসফাঁস করবে কিনা। এটি তো গাজীপুর। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে মুক্তি শুরুর ইতিহাসে নাম লেখানো স্থান। ১৯ মার্চ ১৯৭১ স্মরণ করে জয়দেবপুরের পথ ধরো এই স্লোগানকে কলংকিত করা যায় কি না, এমন প্রশ্নবান ঠিকই রাজনীতির মাঠে গড়িয়ে গেছে। গণতন্ত্রের নামে সমাবেশ করতে দেওয়া, ঠেকিয়ে দেওয়া কিংবা বিরত থেকে যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির মহড়া দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ না হয়ে, বিনাভোটে কিভাবে সরকার গঠন হয়ে যায় সেই হিসাব মিলিয়ে দেখা জরুরি হতে পারে। শেষপর্যন্ত ১৪৪ ধারা। এখান থেকে বিএনপি নিজেদেরকে নিজেরাই গুটিয়ে নেয়। ১৪৪ ধারা ভাঙার ক্ষমতা তো দুরের কথা ১৪৪ ধারার প্রতিবাদে হরতাল ঘোষণা করে নিজেরাই স্ববিরোধী হয়ে পড়েছে। আবার হরতাল পালনের তেমন কোন চেষ্টাও তারা করেনি। নিয়ন্ত্রণ অতদুর গড়িয়েছে একই ইসুতে দুইবার হরতাল পালন করেছে। শেষে অন্তত যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির নিশানার যন্ত্রনা গাজীপুরবাসীকে ভোগ করতে হয়নি। 

মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের উপদেষ্টা ন্যাপ নেতা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ প্রায়ই বলে থাকেন, এখন যারা গুলশান বনানীতে থাকে তারা ৪৩ বছর আগে শানকিতে ভাত খেত। এমনকি এরা বাথরুম, ল্যাট্রিন কিভাবে ব্যবহার করতে হয় তাও জানত না। এরাই এখন ক্ষমতার ভাগীদার হয়েছে ফলে রাজনীতি যা হওয়ার তাই হয়েছে। আর এক রাজনীতিক মনজুরুল আহসান খান প্রায়ই বলেন তিনি যতবার জেলে গেছেন ততবারই কোন না কোন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী তার সঙ্গে জেলে ছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রিদের কাজ কেমন, কি কারণে তারা জেলে যায় সেটি নিশ্চয়ই পাঠকরা বুঝবেন, এই ভেবে যে সম্প্রতি শাহজানপুরে শিশু জিহাদ ওয়াসার পানির পাইপে পড়ে যাওয়ার পর বর্তমান স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রি যে বক্তব্য বদল করেছেন তাতে দেশের সকলেই কানের ভুলে কি শুনেছেন সেটি তিনি ঠাহর করতে পারেননি। এমন দুরবস্থার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাওয়া রাজনীতি কতটা জটিল পথে পা দিয়েছে তা কেবল মরার পরে জিহাদই দেখিয়ে যেতে পেরেছে। 

মিডিয়ার বদৌলতে সরকারি বিরোধী দলে থাকা তথাকথিত বিরোধী দল জাতীয় পার্টি জায়গা ঠিকমত না পেলেও বিএনপিই পেয়ে যাচ্ছে। ১৯৮১ সালেই যখন বিএনপির ভবিষ্যত নিয়ে শংকা প্রকাশ করেছিলেন, তারা এখন আর কিছু বলতে চাচ্ছেন না লজ্জায়। বুর্জোয়া গিরিধারী বুদ্ধিজীবিরা প্রগতিশীল আন্দোলন ও দল কিভাবে বিলীন হয়ে পড়ে এই নিয়ে গবেষণা করলেও মুসলীম লীগ, জাতীয় পার্টি কিভাবে দুরবস্থায় পড়েছে এটি ভেবে দেখে না। কারণ এতে কোন এজেন্সি কাজ করে না, বিনিয়োগ করে না। পাঠক-দর্শক বিবেচনায়ও বুর্জোয়া সংখ্যায় বেশি হিসাবে গণধোলাইয়ের পথে পা ফসকে পড়তে পারে এই আশংকা বিরাজ করে। ফলে জাতীয় সম্পদ রক্ষা, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন বিষয়ে মেহনতি মানুষের আন্দোলনে থাকা কমিউনিস্টরাও কোন স্থান করতে পারে না। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় হতাশার ছাতা এদের আরও বেশি আকড়ে ধরে। যতটুকু অগ্রগতি ঘটে এদের জোটে তারচেয়ে বেশি ভাটা পড়ে। ১১ দল একটি মাইলফলক রাজনীতির জোটে পরিণত হয়েছিল কিন্তু ক্ষমতার তাৎক্ষণিক মোহের বিভ্রান্ত্রি বুর্জোয়া জোটকে শক্তিশালি করতে ভাড়া খাটায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে কতক দল ও গোষ্ঠী। আর বাকিরা আবার গুছিয়ে উঠতে ব্যস্ত কারণ, রাজনীতি ত্যাগ করা যায় না। রাজনীতি প্রকৃত অর্থে রক্তে মিশে থাকে, তা সময় সময় গর্জে উঠে।

যে কারণে যে পরিস্থিতিতে রাজনীতির মাঠে যারা থাকবেন তাদের কাজ কি হতে পারে বর্তমান সময়ে। ক্ষমতার ধারাবাহিকতা যদি ধরা না দেয় তাহলে তো অন্য পথে হাঁটতে হবে। সেই পথ নিশ্চয়ই কর্মসূচী ঘোষণা করে ঘরে বসে থাকা নয়। কিংবা কর্মসূচী বাস্তবায়ন করতে না পারলে কিংবা বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা না থাকলে বাস্তবায়নযোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলা জরুরি। একজন সরকার দলীয় সাংসদ প্রায়ই বক্তৃতা দিয়ে বলেন, তার সংগঠনের নেতারা সবাই একই বক্তৃতা করে। অর্থাৎ মুখস্ত বুলি আওড়ায়। নেতাকে খুশি করতে চায়। আবার সেই সাংসদ নিজেও এমন কাজ করেন যাতে দল সরকার ও প্রতিষ্ঠান আলাদা করতে পারেন না। সব একই জালে আবদ্ধ করে একই ব্যানারে চালিয়ে দেন। এমন কুটিল জাল ছিড়ে ফেলতে হলে নিশ্চয়ই যৌক্তিক ফর্মুলা দরকার হবে। কবুতর উড়িয়ে সরকার পতন হবে না। 

জনগণের ইচ্ছাকে পাশ কাটিয়ে ধারাবাহিক অথবা ধারাবাহিকতা ভিন্ন যেভাবেই হউক মানব মুক্তির সংগ্রাম এগিয়ে নেওয়াই হবে আসল কাজ। আশাহত হওয়ার কিছু নেই কারণ প্রতারণার আশ্রয়ের ক্ষমতা সাময়িককালে সমসাময়িক বিবেচিত হলেও মোটেও চুড়ান্ত নয়। সব কিছুরই সীমানা আছে, শোষণেরও সীমানা শেষ শেষ হবে, শাসকগোষ্ঠী ভেঙে পড়বে, জনগণের সামনে জনগণের জন্য। ঘোড়া ঘাস খেয়েই বেঁচে থাকবে। ০২.০১.২০১৫।