এসআই মফিজের ‘ফোনালাপ’ ও ‘সিসিটিভি ফুুটেজ’ তদন্তে নেওয়া হবে কী?

আসাদুল্লাহ বাদল

27 May, 2020 01:34pm


এসআই মফিজের ‘ফোনালাপ’ ও ‘সিসিটিভি ফুুটেজ’ তদন্তে নেওয়া হবে কী?
আসাদুল্লাহ বাদল

“ঘুষ নিয়ে ‘দেড় হাজার ইয়াবা গায়েব’ জব্দ তালিকা করেও দুইজনকে ছাড়ল গাজীপুর ডিবি!” শিরোনামে যোগফলে ৪ সেপ্টেম্বর সংবাদ প্রকাশের পর ওই দিন দ্রুততম সময়ে অভিযুক্ত এসআই মফিজুর রহমান মল্লিককে ক্লোজড করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে। গাজীপুর জেলা পুলিশের এমন ‘ইতিবাচক’ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই।

৪ সেপ্টেম্বর বিকেল পাঁচটা ১৮ মিনিটে গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) আমীনুল ইসলাম বিষয়টি যোগফলকে নিশ্চিত করেছেন।  

তিনি জানিয়েছিলেন, যোগফলের সংবাদটি আমলে নিয়ে তাৎক্ষণিক এসআই মফিজুর রহমানকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেন এসপি। এরপর তাকে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে। ঘটনাটি গভীরভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। এই অপরাধের সঙ্গে আরও কেউ যুক্ত থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটিই স্বাভাবিক। 

দেখা যেতে পারে তদন্তটি কিভাবে হবে? এটি পুলিশ করবে, তাদেরই দায়িত্ব। যদি ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশ না হতো, তাহলে কখনও এই ঘটনা তদন্তের প্রশ্ন দেখা দিত না। এই ঘটনা জনগণ জানতেই পারত না। এখানে গণমাধ্যম অনুঘটক হিসাবে কাজ করেছে বলেই ধরে নিতে হবে। প্রকাশ হওয়া সংবাদই ‘মুখ্য সাক্ষি’। ফলে তদন্তের গতি সংবাদ কেন্দ্রিক ও পারিপার্শি^ক অবস্থা বিবেচনা করলে তেমন অসম্ভব নয়।

গভীর তদন্ত যদি শুরু হয়ে থাকে তাহলে পুলিশ তাদের ‘পলিসি’ মতো তদন্ত করুক। এই নিয়ে তেমন কোন ‘নসিহত’ করার ইচ্ছা নেই। তবু বলার অপেক্ষা রাখে না, কেওয়া পশ্চিম খন্ড এলাকার মৃত জোবেদালী মিয়ার সন্তান জাহাঙ্গীর আলম (৩০) ও একই এলাকার মো. আ. আউয়াল শেখের সন্তান মো. রাসেদ শেখকে (২৫) আটক করেছিলেন এসআই মফিজুর রহমান মল্লিক (মফিজ)। তারা দুইজনই ওই এলাকার শীর্ষ পর্যায়ের মাদক ব্যবসায়ী বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। তাদের কখন কোথায় আটক করা হয়েছিল? প্রকৃতপক্ষে তাদের আটক করার কারণ কি ছিল? ওই জব্দ তালিকার সাক্ষি রাজিব আরও একাধিক মামলায় সাক্ষি। রাজিব একজন ‘সোর্স’ হিসাবে এলাকায় পরিচিত। মাদক না পাওয়া গেলেও মাদকের মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার অভিযোগে জড়িত থাকার দায় রাজিবেরও রয়েছে। রাজিবের সঙ্গে এসআই মফিজের ফোনালাপ ঘেঁটে দেখা দরকার। এতেও বেরিয়ে আসতে পারে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ডিআইজি মিজানুর রহমান ও দুদক কর্তা খন্দকার এনামুল বাছির ফোনালাপের সূত্র ধরেই বর্তমানে বরখাস্ত হয়ে কারাগারে আছেন। 

শ্রীপুর থানার মামলা নম্বর ৬০(৮)১৯ এ অভিযুক্ত আসামি ‘চায়না বেগম’ বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। চায়না গাজীপুর জেলার শীর্ষ গাঁজা ব্যবসায়ী বলে জনশ্রুতি রয়েছে। কিন্তু চায়নাকে গ্রেপ্তারের সময় মাদক পাওয়া যায়নি বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেছিল। আবার চায়না বেগমকে ছেড়ে দেওয়ার পায়তারাও করেছিল মফিজ। কিন্তু চায়না বেগমকে আটকের খবর গণমাধ্যমে চলে যাওয়ার পর তাকে ছাড়া হয়নি। এই নিয়ে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য রয়েছে অনুসন্ধানী পর্যায়ে। মফিজ যোগফলকে জানিয়েছিল মূলত চায়নার স্বামী মাদক ব্যবসায়ী। চায়নাকে ছেড়ে দেওয়া হলে এটিও যুক্তি হতে পারতো। ইদের আগে অনেকেরই অনেক বেশি টাকা দরকার ছিল বলে ‘রব’ আছে।

মফিজের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে যোগফলের সহায়তা চেয়েছেন আমীনুল ইসলাম। সহায়তা করার ক্ষেত্রে যোগফল সব সময় আগ্রহী। তবে অবশ্যই আইনি প্রক্রিয়া মেনে ওই সহায়তা নেওয়া উচিত। 

মাদকের মামলায় সাধারণ পাবলিকে সাক্ষি দিতে রাজি হয় না বলে রাজিবের মতো দুষ্ট লোকেদের সাক্ষি করা হয় বলেও মফিজ যোগফলকে জানিয়েছিল। দেশে সাক্ষি দেওয়া ব্যক্তির এত ‘ঘাটতি’ কবে থেকে দেখা দিল এটি বিবেচনায় নেওয়া উচিত। মাদক উদ্ধারের ঘটনায় যেন এমন কোন প্রপঞ্চ যুক্ত না হয়, যাতে জনমনে কোনো সন্দেহ দেখা দেয়। মাদকের পক্ষে কেবল মাদকাসক্তরা যুক্তি দিতে পারে, সুনাগরিক নয়। অথবা মাদক উদ্ধারের ক্ষেত্রে এমন কোনো ‘কারসাজি’ রয়েছে কিনা, যে কারণে সাধারণ পাবলিক সাক্ষি হতে চায় না? আমজনতার মুখে মুখে যেসব কথা চালু থাকে, সেসব যদি গুজবও হয়ে থাকে, তাহলে ‘গুজব’ মুক্ত করা জরুরি মনে করি।

মাদক ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে এক হাজার পিস ও রাসেদের কাছ থেকে ৫০০ পিস লালচে রঙের ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করেছে বলে গায়েব করা জব্দ তালিকায় বর্ণনা রয়েছে। এসব ইয়াবার দাম দেখানো হয়েছে সাড়ে চার লাখ টাকা।

আসামিদের গাজীপুর এসপি অফিসের নিচতলায় অবস্থিত ডিবির কার্যালয়ে পর্যন্ত আনা হয়েছিল বলেও জানা গেছে। এসপি অফিসের প্রবেশ পথেই সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। কে, কখন এসপি অফিসে প্রবেশ করেন, কে কখন বের হয়ে যান সব কিছুই সিসিটিভির ভিডিয়ো ফুটেজে ধারণ করা থাকার কথা। তদন্তের স্বার্থে গত ৮ আগস্ট ও ৯ আগস্টের সিসিটিভি ভিডিয়োটি এখনই জব্দ করা উচিত। এরমধ্যে যদি করা হয়ে থাকে, তাহলে পুলিশ বিভাগকে আর এক দফা অভিনন্দন জানাই, ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য।

ডিবি কার্যালয়েও সিসিটিভি রয়েছে। যে দুইজন মাদক ব্যবসায়ীকে এখানে আনা হয়েছিল, তাদের ছাড়িয়ে নিতে কে কে তদবির করেছে, এটি খুব সহজেই বের করা সম্ভব। শ্রীপুর পৌরসভার একজন কাউন্সিলর আসামিদের ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছে বলে এসআই মফিজ যোগফলকে নিশ্চিত করেছিল। কিন্তু ওই কাউন্সিলরের নাম প্রকাশে তার অনীহা রয়েছে। মাদক ব্যবসায়ীদের মুচলেকা নিয়ে ছাড়া হয়েছে, না বিনা মুচলেকায় ছাড়া হয়েছে এটিও জানা দরকার। একটি অফিসে আসামি আনার পর অফিস বিষয়টি অবগত বলেই ধরে নেওয়া হয়। এটি যদি স্পষ্ট করা না যায় তাহলে ভবিষ্যতে এই ফাঁক গলে আরও বড় ধরনের ঘটতে পারে।

আসামিদের আটক করার সময় অন্তত আরও চারজন ডিবির সদস্য ছিল বলে এসআই মফিজ যোগফলকে জানিয়েছিল। কিন্তু তাদের নাম প্রকাশ করতে তিনি রাজি হননি। অভিযান চালানোর ঘটনায় নিশ্চয়ই একটি তালিকা রয়েছে। যারা অভিযানে অংশ নিয়েছে, তারা সকলে অবগত থাকার কথা ওই অভিযানে কত পরিমাণে মাদক উদ্ধার হয়েছে। মফিজ দেড় হাজার ইয়াবা জব্দ করে আইনগত প্রক্রিয়ায় না এগিয়ে বেআইনি কাজ করেছে। একই রকমের বেআইনি কাজ অভিযানে অংশ নেওয়া বাকি সদস্যদের ওপরও বর্তায়। কারণ একজন সদস্যও যদি প্রকৃত ঘটনা পুলিশের উর্ধ্বতন বাহিনীকে অবগত করতো, তাহলে ওই ঘটনা ঘটতে পারত না।

অভিযোগের বিষয়ে ডিবির এসআই মফিজ যোগফলকে সরাসরি বলেন, ‘ছেড়ে দেওয়া দুইজনের সঙ্গে কোনও মাদক পাওয়া যায়নি। ডিবি অফিসে এনে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের জানিয়ে তাকে ছাড়া হয়েছে।’ যদি কারও অনুমতি নিয়ে বা সম্মতি নিয়ে ছাড়া হয়ে থাকে, তাহলে কার সম্মতি নেওয়া হয়েছে। এটি জানার অধিকার নিশ্চয়ই জনগণের রয়েছে। আবার মফিজ উধ্বর্তন কর্মকর্তাদের ভুল বুঝিয়েছে কিনা এটিও নিশ্চিত করা দরকার।

মফিজ যোগফলকে নিজের দোষের কথা বলে যে বক্তব্য দিয়েছে এতে দেড় হাজার পিস ইয়ার দাম সাড়ে ৪ লাখ টাকা কোথায় গেলো? দেড় হাজার পিস ইয়াবা কি করা হয়েছে? কারও নিকট ওই ইয়াবা গচ্ছিত রাখা হয়েছে বলে কোন সূত্র নাই। দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের তফসিল মতে দণ্ডবিধি আইনের যে বিধান রয়েছে এটি মফিজের ক্ষেত্রে কার্যকর করতে তেমন কোনো বাঁধা থাকার কথা নয়। আলামত গায়েব করে ফেলার জন্যও আইনে ব্যবস্থা রয়েছে। যে জব্দ তালিকা মফিজ প্রস্তুত করেছিল, ওই ঘটনায় নিশ্চয়ই একটি এজাহারও তৈরি করার কথা। যে কেউ এজাহার লিখে থানায় জমা দেওয়া, না দেওয়ার অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে। কিন্তু একজন পুলিশ কর্মকর্তা কি সেটি করতে পারবে? বেশ কয়েকটি মাদকের মামলা ঘেঁটে দেখা গেছে মফিজুর রহমান মল্লিক যে অভিযানে নেতৃত্ব দেন, সেসব মামলার অধিকাংশ তিনি নিজেই বাদী হন। যেমন: জয়দেবপুর থানার মামলা নম্বর ৬(৯)১৯ ও কালিয়াকৈর থানার মামলা নম্বর ১১(৯)১৯। মামলা দুইটি পরপর দুইদিনের।

পিআরবির ২৮০ ধারা ও ফৌজদারি কার্যবিধির ১০২, ১০৩, ১৬৫ ও ১৬৬ ধারার বিধান বলে অভিযান, তল্লাশি, আলামত জব্দ ও জব্দ তালিকা প্রস্তÍত করা হয়। এসব আইনের তোয়াক্কা না করেই মফিজ জব্দ করা মাদক ‘আত্মসাৎ’ করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

যদি এমন হয়ে থাকে মফিজ তেমন কোনো মাদক উদ্ধার করতে না পেরেই ওই দুই মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে থাকেন, তাহলেও প্রশ্ন থেকে যায়। এমন একটি জব্দ তালিকা তৈরি করে দেড় হাজার পিস ইয়াবার মামলার ভয় দেখিয়ে ‘মোটা অঙ্কের ঘুষ’ আদায়ের ‘হুমকি’ দেওয়া হয়েছিল কিনা? কাউকে জিম্মি করে ‘ঘুষ’ আদায়ের চেষ্টা করা হয়ে থাকলেও ফৌজদারি অপরাধ সংগঠিত হয়েছে।

শেষে বলতে চাই প্রাথমিক পর্যায়ে মফিজুর রহমান মল্লিক প্রত্যাহার হয়েছেন। এটি খবরের ‘মর্যাদা’ অর্জন করতে পেরেছে বলে গাজীপুরের ‘খবরদার’ ব্যক্তিরা আন্দাজ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। অথচ এই জেলা থেকে গত নির্বাচনে পাঁচ শতাধিক খবরদার ‘খবরদারি’ করার সুযোগ নিয়েছিল। 

চট্টগ্রাম জেলার পটিয়ায় এক লাখ ৬৮ হাজার পিস ইয়াবাসহ গাজীপুরের তিন মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার হয়ে এক বছর যাবৎ কারাগারে রয়েছে। ওই ঘটনার সময় পালিয়ে যাওয়া মাদক কারবারিও পরে গ্রেপ্তার হয়েছে। এত বড় চালান আনতে তারা কাদের সহায়তা ও শেল্টার নিত বা কোথায় এসব মাদক বিক্রি করতো এই ঘটনা যাচাই করার সুযোগ ছিল। কিন্তু কেউ উদ্যোগ নেয়নি। ‘একমাত্র যোগফলে’ এদত সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ হয়েছিল। ‘মাদকের বিস্তার রোধকল্পে সহায়ক’ ও ‘মাদক টিকিয়ে রাখার অপচেষ্টা’ কারীদের নিয়ে বেশ কয়েকটি অনুসন্ধানী সংবাদ যোগফলে প্রকাশ হলেও ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা আগে দেখা যায়নি। মাদকের ডিলারদের নিয়েও সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। জনমনে আনাগোনা রয়েছে এমন মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকাও প্রকাশ হয়েছে। সংবাদের প্রেক্ষিতে ঘটনার তদন্ত হতে পারে এমন আশ্বাসও দেখেছি কিন্তু ফল দেখার সুযোগ পাইনি। এমন কথা শুনেছি বিড়ালের রঙ দেখে নাকি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু আগে পরে জানতাম বিড়াল ‘সাদা’ না ‘কালো’ এটি দেখার চেয়ে বিড়াল ইঁদুর ‘ধরে’ কিনা এটি দেখা জরুরি। যদি প্রকৃতপক্ষে মাদক মুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজের আশা কেউ করে, তাহলে উচিত সংবাদের ঘটনা যাচাই করা। অন্তত এই যাত্রায় যাচাই শুরু হয়েছে এটি চলমান থাকবে আশা করি। ইঁদুর ধরে দেখাতে চাই, বিড়ালের রঙ দেখাতে চাই না।

আসাদুল্লাহ বাদল : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক যোগফল। ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯।