ফারজানা শোভন রাব্বানীর ‘আমলনামা’ খুলে দেওয়া হউক

আসাদুল্লাহ বাদল

27 May, 2020 01:42pm


ফারজানা শোভন রাব্বানীর ‘আমলনামা’ খুলে দেওয়া হউক
আসাদুল্লাহ বাদল

আসাদুল্লাহ বাদল : “২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সম্প্রতি ফেনসিডিলের বেশ কয়েকটি খালি বোতল পাওয়া যায়। কার্যালয় দেখভালের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিষয়টি জেনে প্রধানমন্ত্রী ক্ষুদ্ধ হন। তবে মাদকের বিষয়ে ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের বিরেুদ্ধে আগে থেকেই অভিযোগ ছিল।

সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন ‘গুলিস্তান পার্টি অফিসে কিছু লোক মদের বোতল রেখে ছবি তুলে নেত্রীকে পাঠিয়েছে’।” (প্রথম আলো, ১৪ সেপ্টেম্বর, ‘ছাত্রলীগের নেতৃত্ব, টাকার ভাগ বাঁটোয়ারা নিয়ে যত ঝামেলা’ শিরোনামে প্রথম পৃষ্ঠার প্রতিবেদনের অংশ বিশেষ চতুর্থ পৃষ্ঠা থেকে)।

আওয়ামীলীগের কার্যালয়ের একাংশে ছাত্রলীগের কার্যালয়। সেখানে কেউ ষড়যন্ত্র করে ‘খালি মদের বোতল’ রাখার সাহস করতে পারে কিনা? যদি কেউ ষড়যন্ত্র করে থাকে, তাহলে তারা তাদের স্বগোত্রীয় হওয়ার বাইরে কেউ নয়। বাইরে থেকে কেউ আওয়ামীলীগের কার্যালয়ে গিয়ে এমন দুঃসাহসী কর্ম করতে পারবে, এমন ভাবা যায় কিনা? কার্যালয় দেখভালের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কতটা সাহস রয়েছে যে, ক্ষমতাবানদের ফাঁসিয়ে দিতে পারে? খালি মদের বোতল কোথায় পাওয়া যায়, যেখান থেকে আওয়ামীলীগের অফিসে বোতল নেওয়া সম্ভব? বরং যাদের নামে মাদকের অভিযোগ রয়েছে, তারা স্বভাব সুলভ ভাবে মাদক সেবন করে ‘বোতল’ ফেলে রেখেই চলে গেছে এটি ভাবা সহজতর ও স্বাভাবিক। ধরেই নেওয়া হয়েছিল হয়তো, কর্মচারিরা তো মদের বোতলগুলো সরিয়েই ফেলবে। যারা খালি মদের বোতলের ছবি তুলে প্রধানমন্ত্রীকে দেখিয়েছে, তাদের ‘সৎসাহস’ আছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাদের নিকট থেকে তথ্য নিলেই প্রকৃত চিত্র জানা সম্ভব হতে পারে।

একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে বা ছাত্র সংগঠনের কার্যালয়ে যেকোনো পদ্ধতিতে ফেনসিডিলের বোতল পাওয়া লজ্জাকর ব্যাপার। এটি মেটেও ষড়যন্ত্রের গন্ধ দিয়ে বিবেচনা না করে, আসল চেহারা দেখানোর জন্য উন্মুক্ত করা উচিত। ক্ষমতাসীন দল বা সংগঠন না হয়ে, বিরোধী দলীয় ষড়যন্ত্র হলে আবার ব্যাপারটা অন্যরকম হতো। যদি ষড়যন্ত্র হয়ে থাকে, তাহলে ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হউক। বলে রাখা যায়, ষড়যন্ত্রের শিকার হলে শোভন রাব্বানী ‘পদ’ হারাতেন না।

ছাত্রলীগের পদ হারানো সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগে যুগ্ম সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইনের ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে। এই ফোনালাপের সত্যতা নিয়ে তেমন কোনো প্রশ্ন উদয় হয় নাই। বরং ফোনালাপের ঘটনা মেনে নেওয়ার উপক্রম হয়েছে।

গাজীপুর জেলায় ছাত্র যুবসহ একাধিক সংগঠনের কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অবৈধ লেনদেনের বিনিময়ে কমিটি কিনে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। লেনদেনের পরিমাণ কমবেশির ওপর কমিটি পাওয়া, না পাওয়া নির্ভর করে বলেও আলাপ চালু রয়েছে। আবার অনেকে বিনিয়োগ করে কমিটি আনতে পারেনি, টাকাও ফেরত পায়নি বলেও আলোচনা আছে। এসব এখন খোলামেলা আলোচনা। আবার এমন কমিটিও অনুমোদন পায়, সেসব কমিটির সদস্য সংখ্যা ‘সিঙ্গেল’ বলয়ে থাকে। কোনোকালে কমিটি পূর্ণ করতে পারে না। এমনকি কমিটি পূর্ণ করার কোনো চেষ্টাও থাকে না। দুই তিনজনে মিলে কমিটি কিনে, নিজেরা টাকা নিয়ে কমিটির সদস্য নির্বাচন করে এমন অভিযোগও অহরহ শোনা যায়। এসব ক্ষেত্রে সংগঠনগুলোর গঠনতন্ত্র মানা হয় না। ‘ওপেন সিক্রেট’ এসব বিষয় আলোচনায় এখন তেমন রাখঢাক নেই। বরং কে কত বেশি বিনিয়োগ করে কমিটি কিনতে পেরেছে এই নিয়ে গর্ববোধ করার প্রতিযোগিতা আছে। ইউনিট কমিটি বিক্রি তো প্রকাশ্য ব্যাপার।

ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতার পদ হারানোর ফলে সারা দেশ থেকে যারা বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটি নেওয়ার জন্য অপক্ষমান ছিলেন, তারা হতাশায় ভোগছেন বলেও শোনা যাচ্ছে। এটি অনেকটা ‘ভিক্ষা চাই না, কুকুর সামলান’ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

কয়েক বছর আগে একটি দৈনিকে টাকার বিনিময়ে যুবলীগের পদ বাণিজ্য শিরোনামে অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশের জেরে যারা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন ও ঘটনা অস্বীকার করেছিলেন তাদের ভূমিকা জেনে নেওয়া উচিত। ‘নমিনেশন বাণিজ্য’ নিয়েও কয়েক বছর যাবত আলোচনা রয়েছে। এটিও আমলে রাখলে ভাল হয়। কুষ্টিয়ার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ১৫ সেপ্টেম্বর ছাত্রলীগের একাংশ ‘৪০ লাখ টাকার কমিটি মানি না’ বলে স্লোগান দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের নেতৃত্বে ৮ জনসহ ৩৪ শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষা না দিয়েই ভর্তি হওয়ার সুযোগ নিয়েছে। কারা এই অনৈতিক সুযোগ দিয়েছে, তাদের শাস্তি না হলে, এ জাতীয় অপরাধ চলতেই থাকবে। এটি খুব দ্রুত সমাধান করা উচিত। বিশেষত যারা সুযোগ দিয়েছে, তাদের বহিষ্কার ও যারা সুযোগ নিয়েছে তাদের ভর্তি বাতিল করা।

ডিআইজি মিজানুর রহমান ও ডিআইজি পার্থ বণিক দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়ে মামলার দায়ে কারাগারে রয়েছেন। দুর্নীতির অভিযোগে বিভিন্ন দপ্তরের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা বরখাস্ত হয়েছে। কয়েকজন কারাগারেও রয়েছেন।

হাইকোর্ট বিভাগের তিন বিচারপতিকে অসদাচরণের দায়ে বিচার কাজ থেকে বিরত রাখা হয়েছে। পরে তাদের ছুটি মঞ্জুর করা হয়েছে। তদন্ত শেষে তাদের চূড়ান্ত পরিণতি জানা যাবে। এসব দৃষ্টান্ত সমাজের জন্য একটা ‘পজেটিভ বার্তা’। ছাত্রলীগের যে দুজন নেতা পদ হারিয়েছেন তারাও একই রকম বার্তা পেয়েছেন। যুবলীগসহ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি পরিহার করে ‘কাগজের কমিটি’ দিয়ে যত সংগঠনকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে, সবগুলোতে অবৈধ লেনদেন হয়েছে বলে ‘আওয়াজ’ ছড়িয়েছে মাঠে। আওয়াজগুলোকে ‘ফাঁকা’ না ভেবে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। মাঠ পর্যায়ের অভিযোগ ও অনুসন্ধানী রিপোর্টগুলোকে আমলে নেওয়া দরকার। অনুসন্ধানী রিপোর্টের কারণেই কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। এসব সমস্য আদৌ জনগণের জানার সুযোগ হতো না।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফারজানা ইসলাম নানা ‘টালবাহানা’ করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে যে উন্নয়ন কাজ হবে, তা থেকে ফারজানা ইসলামের হাতে টাকা যাওয়ার সুযোগ কই। তিনি কিভাবে কমিশন নিয়েছেন, এটি বের করা জরুরি। তিনি কমিশন নিয়ে ছাত্রলীগকে কমিশনের কত অংশ দিয়েছেন, এটিও বের করা জরুরি। এসব কমিশন ভাগাভাগির পর্যায়ে একাধিক বৈঠক করা হয়েছে বলেও খবর বেরিয়েছে। বৈঠকগুলো সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হলে ভিসি যেখানে বৈঠক করেছেন, সেখানে সিসিটিভি থাকলে তা আমলে নেওয়া উচিত। তারা (ভিসি ও অভিযুক্ত ছাত্রনেতা) নিশ্চয়ই গত দুইমাসে কয়েক দফা টেলিফোনে বা মোবাইল ফোনে কথাবার্তা বলেছেন। তাদের ফোনালাপ জব্দ করে তদন্ত করলেই তো প্রযুক্তির কল্যাণে সহজ সমাধানে পৌঁছা সম্ভব। ‘দুর্নীতির বিরেুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ নামের আন্দোলনের মোর্চা যে বক্তব্য রেখেছে এটি আমলে নিলেও ঘটনার জট খুলতে পারে।

ফারজানা ইসলামের আগে দুজন ভিসি শরীফ মোহাম্মদ এনামুল হক ও আনোয়ার হোসেন স্বাভাবিকভাবে বিদায় নিতে পারেননি। তাদের বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন হয়েছিল। আন্দোলনের ফলেই তাদের বিদায় নিতে হয়েছে। ফারজানা ইসলামের বিদায়ও একই পথে হবে বলেই মনে হচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষদের ক্ষুদ্র উদ্যোগ অনেকটা সফল হয়েছে। এই পথে হেঁটেই বাকি সমস্যার সমাধান আশা করা যায়। ইতোমধ্যে রাব্বানী ক্ষমা আশা করেছেন!

আসাদুল্লাহ বাদল : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক যোগফল। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯।