পত্রিকা বের করার জন্য সরকারি চাকরি ছাড়েন ‘সাখাওয়াত হোসেন’

আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

28 May, 2020 11:09pm


পত্রিকা বের করার জন্য সরকারি চাকরি ছাড়েন ‘সাখাওয়াত হোসেন’
ছবি : সংগৃহীত

বিমানের এক সহযাত্রী বারবার মুখের দিকে তাকাচ্ছিলেন। তখন সাখাওয়াত হোসেনের সুপৌরুষ গড়ন। নেমেই সহযাত্রীটি পরিচিত হওয়ার জন্য হাত বাড়ালেন। তিনি একজন চলচ্চিত্র পরিচালক। তার সিনেমায় প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দিলেন। তখন সাখাওয়াত হোসেন কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপক।

তার ঝোঁক টেলিভিশন অনুষ্ঠানের উপস্থাপনার দিকে। এ জন্য মাঝে মধ্যে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। সেদিকে তার এতই টান যে, মাঝেমধ্যে চাকরিই ছেড়ে দিতে চান। শেষ পর্যন্ত চাকরি ছেড়েই দিলেন। তবে সিনেমায় অভিনয়ের জন্য নয়, টেলিভিশনের উপস্থাপক হওয়ার জন্যও নয়, পত্রিকা বের করার জন্য।

১৯৮৬ সালের কথা। তখন উত্তরবঙ্গে কোনো ইংরেজি দৈনিক নেই। তিনি রাজশাহী থেকে বের করলেন ইংরেজি দৈনিক সানশাইন। বর্তমানে যা বাংলা দৈনিক হিসেবে বের হচ্ছে।

শিশুর মতো সরল এই মানুষটিকে পৃথিবীর আলো-বাতাস আর ধরে রাখতে পারেনি। গত ২৫ মে সবাইকে কাঁদিয়ে নিজের জন্য চির অন্ধকার আশ্রয় খুঁজে নিয়েছেন। রাজশাহী নগরীর হেতেমখাঁ গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে। তার বয়স হয়েছিল প্রায় ৭০ বছর।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাখাওয়াত হোসেন হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স এবং মাস্টার্স করেছিলেন। তার পৈত্রিক নিবাস ছিল গাইবান্ধায়। প্রথম জীবনে ঠাকুরগাঁ কলেজে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন। তারপর গ্ল্যাক্সো কোম্পানিতে এলাকা ব্যবস্থাপক হিসেবে খুলনায় কর্মরত ছিলেন। তারপর যোগ দিয়েছিলেন কৃষি ব্যাংকের চাকরিতে।

তাঁর তিন ছেলেমেয়ে। বড় ছেলে একটি ফোন কোম্পানির কর্মকর্তা ছিলেন। কিছুদিন আগে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে অবসর নিয়েছেন। ছোট ছেলে একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। ঢাকায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরত আছেন।

একমাত্র মেয়ে আমেরিকাপ্রবাসী। মেয়ের কাছেই থাকেন স্ত্রী। ছেলেমেয়েরা বাইরে থাকলেও সাখাওয়াত হোসেন রাজশাহী ছেড়ে বাইরে থাকতে চাননি। নগরীর বসুয়া এলাকায় ছোট বোন রাশিদা খাতুনের বাসাই ছিল তার ঠিকানা। বোনও তাকে চোখের আড়াল হতে দিতে চাইতেন না।

সম্প্রতি তিনি নগরীর লক্ষ্মীপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সহকারী শিক্ষক হিসেবে অবসর নিয়েছেন। ভাইকে নিয়ে তার উদ্বেগের শেষ ছিল না। তিনিই দৌড়ঝাঁপ করছিলেন। তারই চেষ্টায় অবশেষে জানা যায়, সাখাওয়াত হোসেন আসলে ক্যানসারে ভুগছিলেন। তাঁর বাসায় রেখেই চিকিৎসা চলছিল।

সেখান থেকেই ভাইয়ের চিকিৎসার জন্য সারা পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে যাচ্ছিলেন। বড় বোন রাজিয়া খাতুন লন্ডপ্রবাসী চিকিৎসক। তার সঙ্গে অনবরত কথা বলছিলেন। সেই সঙ্গে ঢাকায় পরামর্শ করছিলেন চিকিৎসক ভাতিজার সঙ্গে।

২০ মে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। ২৫ মে বেলা সাড়ে এগারটার দিকে মৃত্যুর খবর পাওয়ার এক মিনিট আগেও তিনি অনলাইনে একজন চিকিৎসককে ভাইয়ের কাগজপত্র দেখানোর জন্য চেষ্টা করছিলেন।

অসুস্থতার খবর শুনে এই লকডাউনের ভেতরেই মৃত্যুর একদিন আগে গাইবান্ধা থেকে এসে হাজির হয়েছিলেন সেই সময়ের ইংরেজি দৈনিক সানশাইনের কম্পোজার রেজ্জাক আলী। অবাক করা বিষয়, রেজ্জাক আলী লেখাপড়া কিছুই জানেন না।

সাখাওয়াত হোসেনের একান্ত সহচার্যে থাকতে গিয়ে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন দৈনিকটির কম্পোজার। লাশ দাফনের পরে রেজ্জাক আলীর সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা হলো।

তিনি বললেন, কীভাবে দৈনিক সানশাইন তখন বের হতো। সত্যিই ভাবনার বিষয়। তখনকার দিনে ইংরেজিতে কোন সাংবাদিক খবর লিখে পাঠাতেন, কীভাবে ছাপা হতো। রেজ্জাক আলী সব দেখেছেন। সে সময় এই পত্রিকার সঙ্গে রাজশাহীর যারা জড়িত ছিলেন তাদের দুই-একজনের নামও বলতে পারলেন এই রেজ্জাক আলী। তাদের মধ্যে মুস্তাফিজুর রহমান খান আলম, সাংবাদিক সরকার শরীফুল ইসলাম, সুজাউদ্দীন ছোটন, আনু বসুনীয়া ও মোহনপুর ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ইয়াহিয়ার নাম পরিষ্কারভাবেই বলতে পারলেন।

গরিব ঘরের ছেলে হিসেবে সাখাওয়াত হোসেন রেজ্জাক আলীকে রাজশাহীতে নিজের বাসায় এনে রেখেছিলেন। লেটার প্রিন্টে করা সাইনশাইনের কম্পোজ দেখতে দেখতে একদিন রেজ্জাক আলীও হাতে অক্ষর তুলে নেন। অক্ষর চেনার জন্য বাসার দেওয়ালে চক দিয়ে সব অক্ষর লিখতেন। এভাবে তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন সিদ্ধহস্ত কম্পোজার।

রেজ্জাক আলী বলেন, কাগজ বাংলা হলে তিনি বাংলা কম্পোজও শিখে নিয়েছিলেন। পরে এমন হয়েছিল সব রিপোর্টারের হাতের লেখাও তিনি পড়তে পারতেন। ২০০৪ সালে সাখাওয়াত হোসেন পত্রিকার মালিকানা বিক্রি করে দেন। এখন সম্পাদক তসিকুল ইসলাম বকুল। প্রকাশক ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মো. ইউনুস আলী। সাখাওয়াত পরিবারের সদস্যরা এখনও এই পত্রিকাটি ভীষণভাবে বুকের মাঝে লালন করেন।

আমার সঙ্গে কবে প্রথম সাখাওয়াত হোসেনের পরিচয় হয়েছিল আজ আর মনে নেই। যেখানে দেখা হতো খুব আন্তরিকভাবে কথা বলতেন। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে, শুনে ১৮ মে রাতে তাঁকে বাসায় দেখতে গেলাম। তখন তার চেতনা ছিল না। যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। ডাক দিলেও সাড়া দিতে পারলেন না।

ফেরার সময় টেবিলের ওপরে দেখলাম দৈনিক সানশাইন পত্রিকার একটি নোট বই। হাতে নিলাম। ভেতরে কেনো পাতা নেই। শুধু ওপরের মলাট আছে। তবু টেবিলের ওপরে সযত্বে নোট বইটি রাখা দেখে চোখ ভিজে উঠল।

হায় পত্রিকা! তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। সিনেমার নায়ক হতে চাননি, টেলিভিশনের উপস্থাপক হননি, একটি পত্রিকার সম্পাদক হয়েছিলেন। আজ তার স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক: নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রথম আলো, রাজশাহী।


বিভাগ : মুক্তমত