গাজীপুর সিটির প্রকৌশলী

‘দেলোয়ার হত্যাকাণ্ডের পেছনে হাজার কোটি টাকার টেন্ডারও রয়েছে’

যোগফল প্রতিবেদক

29 May, 2020 02:50pm


‘দেলোয়ার হত্যাকাণ্ডের পেছনে হাজার কোটি টাকার টেন্ডারও রয়েছে’
ছবি : সংগৃহীত

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কোনাবাড়ী (অঞ্চল ৪) নির্বাহি প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন  হত্যাকাণ্ডের ‘দায় স্বীকার করে’ আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন তার সহকর্মী সহকারী প্রকৌশলী আনিসুর রহমান সেলিম।

এর আগে এই ঘটনায় আর দুই আসামি দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয়।

বুধবার (২৭ মে ২০২০) ঢাকা মহানগর হাকিম শাহীনুর রহমানের খাসকামরায় তিনি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। এ নিয়ে এ হত্যাকাণ্ডে দায় স্বীকার করে তিনজন জবানবন্দি দিলেন। এছাড়া মামলার অন্যতম সাক্ষি রিকশাওয়ালা রফিকুল ইসলামও জবানবন্দি দিয়েছেন।

প্রকৌশলী দেলোয়ার হত্যার বিচার দাবিতে বিবৃতি দিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও প্রকৗশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থীরা।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র জাহাঙ্গীর আলম বৃহস্পতিবার (২৮ মে ২০২০) তার ফেসবুক আইডিতে একটি ভিডিয়ো বার্তা প্রচার করেছেন। এতে তিনি হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছেন। এছাড়া প্রয়োজনে মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে নেওয়ার দাবি জানান।

এদিকে প্রকৌশলীসহ সচেতন নাগরিকরা ফেসবুকে একটি গ্রুপ খুলে দেলোয়ার হত্যার বিচার দাবি জোরদার করছেন। ওই গ্রুপে এখন পর্যন্ত ৬ হাজারের অধিক ব্যক্তি যুক্ত হয়েছেন।

পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে আনিসুর রহমান সেলিমকে বুধবার ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে পুলিশ। এ সময় তিনি স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দেন। এসময় তা রেকর্ড করার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তুরাগ থানার ইন্সপেক্টর (অপারেশন) শেখ মফিজুল ইসলাম। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর হাকিম শাহীনুর রহমান তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

মহানগর পুলিশের অপরাধ, তথ্য ও প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-কমিশনার জাফর হোসেন এ তথ্য জানিয়েছেন।

জবানবন্দি সূত্রে জানা গেছে, দেলোয়ার কারণে অকারণে সেলিমকে বকাঝকা করতো। এতে দেলোয়ারের ওপর সেলিমের প্রচণ্ড ক্ষোভ জন্মে। এই কারণে দেলোয়ারকে অপর আসামি হাবিব ও শাহীনকে নিয়ে তারা হত্যা করেছে।

এদিকে এই মামলার তদারক কর্মকর্তা পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপ কমিশনার (ডিসি) নাবিদ কামাল শৈবাল গণমাধ্যমকে বলেছেন, শুধু দুর্বব্যবহারের কারণে দেলোয়ার হোসেনকে খুন করেছে কি না, তা তদন্ত শেষে নিশ্চিত করা যাবে। হত্যাকাণ্ডের পেছনে হাজার কোটি টাকার টেন্ডার রয়েছে, এমন তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। পুরো ঘটনার তদন্ত চলছে। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের একাধিক কাউন্সিলর ও দেলোয়ারের কর্মস্থলের অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

আসামি গ্রেপ্তারের আগে কয়েকটি গণমাধ্যমে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। সেসব প্রতিবেদনে যে তথ্য প্রকাশ হয়েছে আসামিরা স্বীকারোক্তি দেওয়ায় খুনের ঘটনা প্রমাণের দিকে যাচ্ছে বলে ধারণা অনেক অ্যাক্টিভিস্টদের। 

“দেলোয়ার হোসেন সৎ কর্মকর্তা ছিলেন। সিটি করপোরেশনে নিম্নমানের উন্নয়নকাজ করায় তিনি বিভিন্ন ঠিকাদারের অন্তত শতকোটি টাকার বিল আটকে দিয়েছিলেন। এর মধ্যে কোনাবাড়ী এলাকায় এক কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ৩৩ কোটি টাকা খরচ ধরা হয়। জাইকা, এডিবি ও আরও একটি দাতা সংস্থার নামে পৃথক বিল তৈরি করা হয়। অর্থাৎ মোট ৯৯ কোটি টাকার বিল করা হয়। একই কাজ পৃথক তিনটি সংস্থার নামে বিল উত্তোলনের বিষয়টি দেলোয়ার আটকে দেন। এ ছাড়া গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় সুপেয় পানির লাইন স্থাপনে শত কোটি টাকার একটি বিল তিনি অনিয়মের অভিযোগে আটকে দেন। এই কারণেই শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করে এবং তা বাস্তবায়ন করে।”  ইত্তেফাক, ২১ মে ২০২০)। টিআইবির বিবৃতি ও গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এক্ষত্রে সহয়ক হয়ে ওঠছে। এ ব্যাপারে গত ২২ মে দৈনিক যোগফলে ‘গাজীপুর সিটির নির্বাহি প্রকৌশলী দেলোয়ার খুনের জট খুলতে কত দেরি? শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়।

গত ১৫ মে ঢাকা মহানগর হাকিম শহীদুল ইসলাম আসামি আনিসুর রহমান সেলিমের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ওই দিন গাড়ি চালক হাবিব ও হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া শাহীন (ভাড়াটে খুনি) ঘটনার দায় স্বীকার করে স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ঢাকা মহানগর হাকিম শহীদুল ইসলাম আসামি হাবিবের এবং হাকিম শাহীনুর রহমান আসামি শাহীনের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

প্রকৌশলী দেলোয়ার মিরপুরের বাসা থেকে গত ১১ মে সোমবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে গাজীপুরের সিটির কর্মস্থলের রওনা হন। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। বিকেল চারটার দিকে উত্তরা ১৭ নম্বর সেক্টরের ৫ নম্বর ব্রিজের পশ্চিম দিকের ৮ রোডের পাশের একটি জঙ্গল থেকে প্রকৌশলী দেলোয়ারের লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহতের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

এই ঘটনায় নিহতের স্ত্রী খোদেজা আক্তার তুরাগ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।


বিভাগ : আড়চোখ