কথিত জিনের বাদশাদের প্রতারণার কাহিনি

আসাদুল্লাহ বাদল

30 May, 2020 07:52pm


কথিত জিনের বাদশাদের প্রতারণার কাহিনি
গ্রেপ্তার হওয়া কথিত চার জিনের বাদশা

প্রতারক চক্রের কথিত চারজন জিনের বাদশাকে গ্রেফতার করেছে রংপুর মহানগর পুলিশ। শুক্রবার [২৯ মে ২০২০] গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। 

এসময় প্রতারণার কাজে ব্যবহার করা মোবাইল ফোন, টাকাসহ বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ উদ্ধার করা হয়। চক্রটি সাধারণ মানুষকে ভাগ্য পরিবর্তনের প্রলোভন দেখিয়ে মোবাইল ফোনে লাখ টাকা হাতিয়ে নিতো।

তারা হলেন: রিয়াদ হাসান রকি ওরফে রায়হান (২০), সিদ্দিকুল ইসলাম (৩৫), আজহার আলী শেখ (৩২) ও রফিকুল ইসলাম ওরফে রিপন (৪৫)। এরা সবাই গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জের তালুক কানপুর, নাকাই ও বাজুনিয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা।

শুক্রবার বিকালে প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রতারক চক্রের চারজনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন আরপিএমপি’র উপ-পুলিশ কমিশনার (অপরাধ) কাজী মুত্তাকী ইবনু মিনান।

তিনি জানান, কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার শফিকুল ইসলামকে গভীর রাতে মোবাইল ফোনে ইসলামিক আলাপচারিতায় ভাগ্য পরিবর্তনের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলায় কথিত জীনের বাদশা চক্রের ওই প্রতারকরা। তারা বিভিন্ন সময়ে ফোনের মাধ্যমে ওই ব্যক্তির কাছ ৬ মে থেকে কয়েক ধাপে এক লাখ ৮ হাজার ৫০০ টাকা হাতিয়ে নেয়। এ নিয়ে গত বুধবার (২৭ মে ২০২০) মাহিগঞ্জ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেন শফিকুল ইসলাম।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বিষয়টি আমলে নিয়ে অভিযোগের প্রকৃত রহস্য উম্মোচন ও জড়িতদের শনাক্তে ব্যাপক গোয়েন্দা তৎপরতা চালানো হয় বলে জানান ওই পুলিশ কর্মকর্তা। বৃহস্পতিবার (২৮ মে ২০২০) সহকারী পুলিশ কমিশনার (মাহিগঞ্জ জোন) ফারুক আহমেদের নেতৃত্বে গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জের বিভিন্ন এলাকাতে সারাদিন অভিযান পরিচালনা করে ওই চারজনকে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সঙ্গে নিজেদের জড়িত থাকার বিষয়টি তারা স্বীকার করেছেন।

কাজী মুত্তাকী ইবনু মিনান বলেন, এই চক্রটিসহ গাইবান্ধা জেলার শত শত প্রতারক চক্র প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নানান শ্রেণি-পেশার মানুষকে প্রতারিত করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তাদের প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে অনেক মানুষ। বিশেষ করে নিরক্ষর, অসচেতন ও নারীরা তাদের ফাঁদে পা দিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। বিভিন্ন মোবাইল অপারেটরদের এজেন্ট ও ডিস্ট্রিবিউটরদের সহযোগিতায় নকল সিম সংগ্রহ করে রমরমাভাবে এই প্রতারণার বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে কথিত এই জীনের বাদশা চক্রের সদস্যরা।

যেভাবে টার্গেট সংগ্রহ করে ‘জিনের বাদশা’ প্রতারক চক্র

টার্গেট সংগ্রহ করতে শুরুতে কথিত জিনের বাদশা চক্রের সদস্যরা গভীর রাতে নির্জন জায়গা থেকে একটি মোবাইল নম্বরকে টার্গেট করে। এরপর একাধিক সিম ব্যবহার করে ওই নম্বরে কল করতে থাকে। চক্রটি প্রতিরাতে ওই মোবাইল নম্বরটিকে ভিত্তি ধরে সেটির ডিজিট পরিবর্তন করে নতুন নম্বর তৈরি করে এবং সেগুলোতে কল করে। কল রিসিভ করলে, শুরুতে সালাম দিয়ে নিজেকে ‘জিনের বাদশা’ হিসেবে পরিচয় দেয়। এরপর কল রিসিভকারীকে বলে,“তুমি খুবই সৌভাগ্যবান, মহান সৃষ্টিকর্তা তোমার উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন। তিনি তোমাকে অঢেল ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সাও স্বর্ণ প্রদান করবেন। “যদি তারা বুঝতে পারেন, কলরিসিভকারী তাদের কথা বিশ্বাস করছেন না, ততক্ষণাৎ সংযোগটি কেটে দিয়ে নম্বরটি বন্ধ করে দেন। আর যদি দেখেন, কলরিসিভকারী তাদের কথা বিশ্বাস করেছেন, তা হলেই ধাপে ধাপে এগিয়ে চলে প্রতারণার কৌশল। এভাবেই একটি বা একাধিক কলরিসিভকারীকে টার্গেটে পরিণত করে এগিয়ে চলে চক্রটির প্রতারণার কার্যক্রম।

জিনের বাদশা চক্রটির প্রতারণা কৌশল

প্রথম ধাপে চক্রটির প্রতি টার্গেটের বিশ্বাস ও আস্থা আরও জোরালো করার জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া, রোজা রাখা ও সৎ পথে জীবন যাপন করতে বলে। তাদের সাথে টার্গেটের যোগাযোগের বিষয়টি গোপণ রাখতেও উদ্ভুদ্ধ করে। চক্রটির কথায় টার্গেট টাকা প্রদান করবে কি-না সেটি পরখ করার জন্য টোপ হিসেবে কোনো মসজিদ, মাদরাসা বা মাজারে কোরআন শরীফ বা জায়নামাজ দেওয়ার কথা বলে তাদের দেওয়া নম্বরে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পাঠাতে বলেন। যেসব টার্গেট এই প্রথম টোপটি গিলে টাকা প্রদান করেন, চক্রটি তাদেরকে পর্যায়ক্রমিকভাবে নানা উপায়ে প্রলুব্ধ করতে থাকে।

দ্বিতীয় ধাপে চক্রটি বশীভূত টার্গেটকে মাজারে মুসল্লিদের খাওয়ানোর জন্য একটি খাসি ও ২১ কেজি চালের দাম মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পাঠাতে বলে। এভাবে চক্রটি টার্গেটের কাছে থেকে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। এ ধাপেও তাদের সাথে টার্গেটের যোগাযোগের কথা গোপণ রাখতে জোর দেয় চক্রটি।

তৃতীয় ধাপে চক্রটি টার্গেটের কাছে থেকে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ফন্দি করে। এজন্য চক্রটি টার্গেটকে দূরের একটি নির্দিষ্ট স্থানে ডেকে পাঠায় এবং সেখানে একা একা যেতে বলে। চক্রটি সেখানে কাগজ কিংবা কাপড়ে মুড়িয়ে কথিত সোনার পুতুল (কার্যত সেটি পিতল কিংবা সিমেন্টের তৈরি পুতুল) প্রদান করে। সেটি এমনভাবে রাখা হয়, যাতে না খুলে ভেতরে কি আছে, তা বোঝার উপায় থাকে না। পুতুলটি প্রদানের আগেই চক্রটি টার্গেটকে এই বলে ভয় দেখায়, পুতুলটি নিয়ে ঘরে ফেরার সময় কাউকে কিছু বলা যাবে না। সেটি কোনোভাবেই খুলে দেখা যাবে না। বাসায় নেওয়ার তিনদিনের পর ‘জিনের বাদশা’ যখন বলবে, কেবল তখন সেটি খুলে দেখা যাবে। এ নির্দেশের অমান্য করলে তাঁর বিরাট আর্থিক ক্ষতি হবে। এমনকি ঘরে ফেরার পথে দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে হঠাৎ মৃত্যু হবে। এতে ভীত হয়ে টার্গেট ঘটনাগুলো অন্যদের কাছে প্রকাশ করা বা ভেতরে কি আছে সেটি খুলে দেখা থেকে বিরত থাকেন। কথিত সোনার পুতুল হাতে পাওয়ার পর টার্গেট চক্রটিকে জোরালোভাবে বিশ্বাস করতে থাকেন এবং চক্রটির কথা মতো টাকা পাঠাতে থাকেন।

চতুর্থ ধাপে চক্রটি টার্গেটকে বলেন, তোমাকে সাতটি পুরস্কার দেওয়া হবে। সাতটি বড় হাঁড়িতে স্বর্ণের মোহর পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হবে। হাঁড়িগুলো মাটির ৪১ ফুট নিচে আছে। এরমধ্যে একটি হাঁড়ির তলা খুলে গেছে। তলা মেরামতের জন্য ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা লাগবে। টার্গেট যদি বলে,তার কাছে টাকা নেই, তখন ধার দেনা করে হলেও টাকা সংগ্রহ করতে বলে চক্রটি। এভাবে হাতিয়ে নেয় আরও টাকা।

পঞ্চম ধাপে চক্রটি টার্গেটকে বলে,তোমার ঘরের চার কোণায় রক্ত দিতে হবে। এজন্য চারটি খাসি বাবদ ৪৩ হাজার ৫০০ টাকা পাঠাও।" প্রলোভনে পড়া টার্গেট চক্রটির কথা মতো ৪৩ হাজার ৫০০ টাকা পাঠায়।

শেষ ধাপে চক্রটি ভুক্তভোগীকে বলে,“তোমার ভয়ানক একটি সমস্যা আছে। সমস্যাটির সমাধান করার জন্য সাতজন যুবতী নারী লাগবে। তুমি তো যুবতী নারী সংগ্রহ করতে পারবে না। আমাদের ২৫ হাজার ৫০০ টাকা পাঠিয়ে দাও। আমরা সব ব্যবস্থা করে নিবো।" এবার টার্গেট ২৫ হাজার ৫০০ টাকা পাঠায়। এভাবে, ধাপে ধাপে লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়ে সটকে পড়ে প্রতারক চক্রটি।

পরে টার্গেট যখন পরিবার কিংবা আত্মীয়-স্বজনদের কথিত সোনার পুতুলটি দেখান, তিনি বুঝতে পারেন আসলে সেটি সোনার কিছুই নয়, এটি নিছক পিতল কিংবা সিমেন্টের তৈরি। টার্গেট তখন বুঝতে পারেন যে, তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তবে টার্গেটের আর্থিক অবস্থা ও পারিপার্শিক অবস্থা জেনে ‘জিনের বাদশা’ প্রতারক চক্রটি প্রতরণা কৌশল ও টাকা চাওয়ার পরিমাণে কিছুটে হেরফের করে।

জিনের বাদশা পরিচয়ে কেউ ফোন দিলে যা করবেন

যদি কখনও জিনের বাদশা পরিচয় দিয়ে কেউ ফোন দেন, সাথে সাথেই ওই মোবাইল নম্বরটি সংরক্ষণ করুন এবং দ্রুততার সাথে নিকটস্থ পুলিশকে জানান। প্রয়োজনে, আইনি সহায়তা নিন। কোনোভাবেই প্রলোভনে পড়ে আর্থিক লেনদেনে জড়াবেন না। জিনের বাদশার নামের প্রতারণা চক্রটির বিষয় পরিবার কিংবা আত্মীয়-স্বজনের সাথে শেয়ার করুন। নিজে সতর্ক হন। এ ব্যাপারে অপরকেও সতর্ক করুন। সূত্র: বাংলাদেশ পুলিশ।


বিভাগ : হ-য-ব-র-ল