পোশাকের কথা শুনেই এত বিচলিত কেন?

আসাদুল্লাহ বাদল

08 Jun, 2020 01:13pm


পোশাকের কথা শুনেই এত বিচলিত কেন?
ছবি: পুলিশ পরিদর্শক আফজাল ও এসআই সাদেক

মাত্র চাঁদপুর থেকে দায়িত্ব পালন করে গাজীপুরে যোগদান করেছেন পুলিশ সুপার (এসপি) সামসুন্নাহার। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ২৮ আগস্ট তিনি প্রথম সাংবাদিকদের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন পুলিশ সুপারের সভাকক্ষে। ফলে বারবার তিনি ‘গাজীপুর’ শব্দের স্থলে ‘চাঁদপুর’ উচ্চারণ করছিলেন। আবার শোধরেও নিচ্ছিলেন। শুধু একটু পেছনে ফিরিয়ে নিতে চেয়েছি। ভাবমূর্তির প্রশ্ন তুলবেন না।

অনেকটা চাঁদপুর জয় করেই এসেছিলেন সামসুন্নাহার। গাজীপুরও জয় করুন। কিন্তু প্রায় দুই বছরে অনেক অভিযোগের সুরাহা দেখছি না। ফলে উদ্বেগ রয়েছে আমাদের। ঠিক সমাধান করুন, অভিযোগ শুনেই মামলা দায়ের করে, সরকারি কাগজ কলমের অপচয় যেন না ঘটে। শ্রম, সময় তো আছেই।

একটু দেরিতে শুরু হলেও ওই সভায় সামসুন্নাহার ‘তাক লাগানো’ বক্তব্য দিয়েছিলেন। তিনি তখন বলেন, যদি কোন পুলিশ সদস্য অনিয়মে জড়িত হয় তা হলে তার ‘ইউনিফরম’ (পোশাক) খুলে নিবেন তিনি। যোগফল অনলাইন সংস্করণে ওই দিনই [২৮ আগস্ট ২০১৮] “ইউনিফরম খুলে নিব : এসপি সামসুন্নাহার” শিরোনামে একটি খবর প্রকাশ হয়।

এই খবরের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল যোগফলের তরফ থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তারিখে। পোশাক খুলে নেওয়ার ঘটনার স্মরণে। পরে তিনি বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকায় অনেক পুলিশের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। কারও কাছে কোনো তথ্য থাকলে তা জানাতে অনুরোধ করেন তিনি।’

এবার মাত্র অভিযোগের আলোকে খবর প্রস্তুত হচ্ছিল। এরই মধ্যে আক্রান্ত হলো দৈনিক যোগফল। ভাবমূর্তির প্রশ্নে নিজের গা বাঁচানোর চেষ্টা হয়েছে। গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসনের প্রতি নজর দেওয়া হয়েছে কিনা এটি আবার পরখ করে দেখার সময় এসেছে। প্রশ্ন করলেই চটে যাওয়ার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। গণমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ ভেবে খুব বেশি দূর আগানো যায় না।

চলতি ১ জুন দৈনিক যোগফল প্রকাশক ও সম্পাদক অ্যাডভোকেট আসাদুল্লাহ বাদলসহ চার সাংবাদিকের নামে জয়দেবপুর থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে  মামলা দায়েরের পর নতুন খটকা লেগেছে। হিসাব তা হলে আর আগের জায়গায় নেই? হয়তো এরই মধ্যে পোশাক খুলে নেওয়ার নিয়ম ‘রদ’ হয়ে গেছে। এমনকি অভিযোগ খতিয়ে দেখারও প্রয়োজন বোধ হয়নি!
এসব সংশয় প্রকাশের কারণ হচ্ছে গাজীপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) সামসুন্নাহারের ঘোষণার ১৬৪ দিনের মাথায় দুই পুলিশ সদস্যের পোশাক খুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন।

যাদের পোশাক খুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল তাদের একজন গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানার সহকারি উপপরিদর্শক (এএসআই); অন্যজন পাশ্ববর্তী টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর থানায় একই পদে কর্মরত ছিলেন।

২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ৬ ফেব্রুয়ারি তিন তরুণকে অপহণের দায়ে ওই দুই পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল।
তারা ছিলেন কালিয়াকৈর থানার এএসআই আবদুল্লাহ আল মামুন ও মির্জাপুর থানার এএসআই মুসফিকুর রহমান।
“তারা দুইজনই গাজীপুর জেলার ডিটেকটিভ ব্রাে  (ডিবি) কর্মরত ছিলেন। তখন থেকেই তাদের মধ্যে সখ্যতা গড়ে ওঠে। এরপর নানা অপরাধে জড়ান”। এসব অনিয়মের কারণে ‘ইউনিফরম’ খুলে নেওয়ার কথাই প্রশ্নবোধক আকারে রাখা হয়েছিল। আর তাতেই কি না আপত্তি দেখা দিয়েছে। অন্তত ঘটনা তদন্ত করে দেখা দরকার ছিল। তির মেরেছেন একটি গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে। দেখতে পারেন যোগফল অনলাইন: ‘ইউনিফরম খুলেই নিলেন সামসুন্নাহার’।

সংবাদ সম্মেলনের ঘটনায় ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) রাসেল শেখ ফোন করে যোগফলকে বলেছিলেন, ‘এই সময়ের (১৬৪ দিন) মধ্যে ২০ জন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ ওঠেছে। এদের মধ্যে তিনজনের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অন্যদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ; তা অনুসন্ধানের পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে’।

পুলিশ সংবাদ সম্মেলনের কয়েক ঘণ্টা পরেও দায়িত্বের জায়গা থেকে যোগফলকে তথ্য জানানোর ঘটনায় আগ্রহ দেখিয়েছিল। কিন্তু এবার কোথায় যেন ওই আগ্রহ নেই। বলে রাখতে চাই, যে ২০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের কথা বলেছিলেন, গত দেড় বছরে তাদের সম্পর্কে কোন আপডেট আছে কি? এসব অভিযোগে কি পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় না। অন্তত যারা অপহরণে জড়িত হয়েছিল।

কার মনের কি অবস্থা, তা জানা না থাকলেও সন্দেহের তির সরানো যায় না। যে কারণে যোগফলের নামে মামলা দায়ের করা হয়েছে, ওই এজাহারে ‘চার লাখ টাকা ঘুষ চাপা দিতে পোশাকে টান পড়বে না তো?’ এই প্রশ্নবোধক উদ্ধৃত করা হয়েছে। এই প্রশ্নর উত্তর দিতে এত চাপাচাপি কিসের। মামলা পর্যন্ত গড়িয়েছে প্রশ্নের উত্তর! যদি অভিযোগ প্রমাণ হয়, তা হলেও পোশাকে টান পড়বে না? না আগেই ঠিক করে রাখা হয়েছে অভিযোগ প্রমাণ হবে না।

প্রশ্ন করলে উত্তর না দিয়ে প্রশ্নকে ভাবমূর্তির সঙ্গে তুলনা করায় কোন দার্শনিক যুক্তি আছে? আগে যে দুইজনের পোশাক খুলে নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, এর সঙ্গে যোগ করতে চাই গোপালগঞ্জে কৃষক নিখিল তালুকদারকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে এএসআই শামীম হাসান। এই ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছে। শামীমকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে [৮ জুন ২০২০]। তাতে শামীমের কি পোশাক থাকবে? না এই প্রশ্ন করাও উচিত নয়।

রোববার [৭ জুন ২০২০] এসআই মাহমুদুল হাসানের জামিন আবেদন নাকচ করেছেন হাইকোর্ট বিভাগ। ‘মাহমুদুল’ আলোচিত সাবেক ডিআইজি (মামলা দায়েরের পর বরখাস্ত হয়েছেন) মিজানুর রহমানের ভাগিনা। ডিআইজি মিজানও কারাগারেই আছেন। তার (মিজান) কি পোশাক আছে? মিজানের ভাবমূর্তির ওজন কত?

ফেনী জেলার সোনাগাজী মডেল থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন সাজা ভোগ করছেন কারাগারে। মোয়াজ্জেমের কি পোশাক আছে? এই পোশাক বলতে নির্দিষ্ট ইউনিফরমকে বোঝানো হয়েছে।

ডিএমপির যুগ্ন কমিশনার ইমাম হোসেনকে (লজিস্টিক) ‘দুর্নীতিপরায়ন’ উল্লেখ করে চিঠি লিখেছেন ডিএমপির কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম। ঘটনা (ইমাম হোসেনের) এখনও তদন্ত হয়নি। তা হলে কি ইমাম হোসেনকে ‘দুর্নীতিপরায়ন’ বলে ডিএমপির কমিশনার ভুল বলেছেন। ‘আফজাল’ যে গতিতে যোগফলের বিরুদ্ধে লেগেছেন, ইমাম হোসেনের গতি কি ভিন্ন?
বলে রাখা দরকার ওই চিঠি পুলিশ সদর দফতরে পৌঁছার আগেই গণমাধ্যমে ফাঁস হয়েছে। এই কারণে (ফাঁস) একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গণমাধ্যমে ওই চিঠির সূত্র প্রকাশ না হলে দেশের মানুষ জানতে পারতো একজন যুগ্ন কমিশনার তার কমিশনারকে পার্সেন্টেজ নেওয়ার অফার (ঘুষ) দিয়েছিল।

যোগফল যে সংবাদ প্রকাশের জন্য কাজ করছিল, ওই সংবাদ প্রকাশ হলেই তো দেখা যেত আফজাল হোসাইন কতটা পারঙ্গম ও কতটা সৎ? সংবাদ প্রকাশ বাধাগ্রস্ত করলেই রেহাই পাওয়া যায়? গাজীপুরে কনস্টেবল নিয়োগ খুবই স্বচ্ছ ছিল। নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরে দুই ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়েছিল গাজীপুরে। মামলাও হয়েছিল। গ্রেপ্তার না হলে কি দেশবাসী এসব ঘটনা জানতে পারতো? এই কারণেই পারফেক্ট ঘটনা যাচাইয়ের জন্য তদন্ত দরকার হয়। পক্ষপাত দরকার হয় না।
জয়দেবপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আফজাল হোসাইন ও এসআই সাদেকুর রহমান সম্পর্কে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন ওই থানা এলাকার সাহিদা আক্তার। ওই অভিমত পুরোটাই সাহিদার। তার অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হলো না কেন? তদন্ত হলে কি আসল সত্যটা বেরিয়ে আসতে পারতো না? কিসের জন্য এত ধামাচাপা?

সত্য হউক আর মিথ্যা হউক অভিযোগ তদন্ত ছাড়াই সাংবাদিকদের নামে মামলা দায়ের করে কোন দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করা হয়েছে? অনুসন্ধান শেষ হবে কি? ভোর কেটে যাবে বলেই বিশ্বাস ও আস্থা।

জয়দেবপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আফজাল হোসাইন মামলায় যে বয়ান জাহির করেছেন তাতে অনুমান হয়েছে তিনি খুবই ‘মানি’ ব্যক্তি। তার মানহানি হয়েছে বলেই তিনি মামলায় গড়িয়েছেন। কিন্তু তিনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে অভিযোগকারী নারীর অভিযোগ মোকাবেলা করতে পারেননি কেন? কোথায় কোন ‘গলদ’ লুকিয়ে থাকেনি তো?
আফজাল হোসাইন তার পেশাদারত্বের প্রতি সম্মান জানাতে নিজের বাহিনীর ভাবমূর্তির প্রশ্ন হাজির করেছেন। এটি তিনি করতেই পারেন। আমি তাকে ‘আমজনতা’ মনে করি না। একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা তিনি। ফলে তার ভাবমূর্তি রক্ষা করতে মামলার আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু একটি মামলার আড়ালে সব লুকিয়ে যাবে? এও ভাবা যায় কখনও? কিন্তু আমজনতার মতো ‘গয়রহ’ কথা এজাহারে লিখেছেন আফজাল। এসব প্রমাণ করতে না পারলে যোগফলও একটি প্রতিষ্ঠান এটি আগেই মগজে রাখা উত্তম। গয়রহ কথার ব্যাখ্যা দেওয়া হবে যোগফলে। প্রমাণের দায়িত্ব নিতে হবে।

যোগফলের তরফ থেকে আরও যেসব প্রশ্ন হাজির করা হবে এর অংশ বিশেষ হচ্ছে: তিনি (আফজাল) মনে করেন কিনা ডিআইজি মিজান, ওসি মোয়াজ্জেম, এসআই মাহমুদুল হাসান, এএসআই শামীম হাসান প্রকৃত পক্ষে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্নের জন্য দায়ি। ডিআইজি মিজান, ওসি মোয়াজ্জেমের মতো আরও অনেক পুলিশ অফিসারই আগেও ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছে। যদি নিজের পেশার প্রতি প্রকৃত সম্মান আফজাল দেখাতেই চান, তা হলে বিতর্কিত ওই অফিসারদের নামে কি তিনি একটি মামলা দায়ের করেছেন? না তারা ‘জাত ভাই’ বলে যে অপকর্মই তারা করুক না কেন এতে মানহানি হয় না? ভাবমূর্তিও ক্ষুন্ন হয় না। জায়গা মতো একটা মামলা করলেই তো হিরো বনে যাওয়া যেত।

একটি প্রশ্ন রাখা হয়েছিল একটি অভিযোগের ভিত্তিতে। ওই অভিযোগের দায় কি সংবাদপত্রের ওপর বর্তায়। গয়রহ কথা বলে কি কণ্ঠরোধের এই অপচেষ্টা সফল হবে?

আসাদুল্লাহ বাদল: প্রকাশক ও সম্পাদক, দৈনিক যোগফল। ০৮ জুন ২০২০।

পরের কিস্তি : যোগফলের প্রতি আফজালের এত জেদ কেন?





এই বিভাগের আরও