যোগফলের প্রতি আফজালের এত জেদ কেন?

আসাদুল্লাহ বাদল

08 Jun, 2020 08:27pm


যোগফলের প্রতি আফজালের এত জেদ কেন?
ছবি: আফজাল হোসাইন

“যা রটে তার কিছু ঘটে”  ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ২ সেপ্টেম্বর গাজীপুর জেলা ডিবির একজন কর্মকর্তাকে ফোন করেছিলাম। ফোনে জবাব দেওয়ার চেয়ে সশরীরে হাজির হতেই ‘তিনি’ আরাম বোধ করেন। ফলে তিনি তড়িঘড়ি করে কয়েক মিনিটের মধ্যেই যোগফল অফিসে হাজির হন।

যে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ওই প্রশ্নের উত্তর দিতে তিনি রাজি হননি। ফলে ৩ সেপ্টেম্বর যোগফলে যে সংবাদ ছাপা হয়, তাতে তার বক্তব্য দেওয়া সম্ভব হয়নি।

“ইদের আগে তো [২০১৯ সালের ইদের আগে]। ... দরকার ছিল। তাই” এহেন বাক্য যোগফল মর্গে সংরক্ষণ করা হয়েছে ভবিষ্যত প্রয়োজনে। এই প্রসঙ্গটি এখনও প্রাসঙ্গিক রয়েছে। যখন এই চমৎকার স্বীকারোক্তি কোন সংবাদে কাজে লাগবে, তখন জানবেন বাকি ‘কাহিনি’। ডিবির তৎকালীন এসআই মফিজুর রহমান মল্লিকের কাহিনিও প্রাসঙ্গিক হবে, আরও কিছুদিন অপেক্ষা করলেই। আশা করি পাঠকের সেই সময় পর্যন্ত ধৈর্য্য থাকবে। মফিজ গোপালগঞ্জের বাসিন্দা। মফিজ নিজেকে বাঁচাতে কত বাহানা-ই করেছেন। ঢাকাইয়া সাংবাদিক পর্যন্ত যোগফল অফিসে নিয়ে এসেছিলেন। মামলা হওয়ার পর মফিজও উজিয়ে উঠেছেন।

কেউ ওপরের এসব কথাকে হুমকি মনে করবেন না। কারণ যে ঘটনার সূত্রে জয়দেবপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আফজাল হোসাইন চলতি ১ জুন দৈনিক যোগফল প্রকাশক ও সম্পাদক অ্যাডভোকেট আসাদুল্লাহ বাদলসহ চার সাংবাদিকের নামে জয়দেবপুর থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করেছেন, তাতেই তিনি নিজেই একটি প্রশ্নকে হুমকি বলে বর্ণনা করেছেন!

গত ৩০ মে আলোচিত সাহিদার ভিডিয়ো প্রসঙ্গে আফজালকে মেসেজ পাঠানো হয়েছিল, “আরও বক্তব্য দিতে চান?” কিনা এটি জানতে চেয়ে। আগে তিনি একটি বক্তব্য দিয়েছেন ২৯ মে। মামলার এজাহারে তিনি এই প্রশ্নকে হুমকি বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি উত্তর দেননি। সৎ সাহসের এত অভাব কেন? কেন হুমকি ভেবেছেন তিনিই ভালো বলতে পারবেন। ব্যাপারটি আদালতের একমাত্র ‘এখতিয়ার ও ক্ষমতা’। ফলে সেখানেই সুরাহা হউক। তবে এটুকু আন্দাজ করতে পারি, কোন ঘটনা চাপা দিতে আরও দশটা ঘটনা ঘটে গেছে। যা দেরিতে হলেও প্রকাশ পাবেই।

তৃতীয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও মার্কিন সংবিধান রচনাকারীদের একজন ছিলেন  উইলিয়াম জেফারসন। তাকে এখনও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে স্মরণ করা হয়। কবি জন মিল্টনকেও স্মরণ করা হয় একই কারণে। পুলিশ পরিদর্শক আফজালকে স্মরণ করার মতো কি ঘটনা তিনি জন্ম দিচ্ছেন, এটি আর কেউ জানে না তিনি ছাড়া।

কেবল এটুক স্মরণ করিয়ে দিতে চাই ডিবির ওসির দায়িত্ব পালনকালে আফজাল হোসাইন পুলিশ পরিদর্শক শেখ সাদিকের অভিযানের নামে পাঠানো একাধিক প্রেস রিলিজ নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছিল। সময়ই বলে দিবে তিনি আসলে কতটা দক্ষ কর্মকর্তা। এ প্রসঙ্গে একাধিক সংবাদে আফজাল ও সাদিকের বক্তব্য প্রকাশ হয়েছিল।

গত জানুআরি মাসে জয়দেবপুর থানার এসআই আব্দুর রহমান ফোর্সসহ জয়দেবপুর থানার শিরিরচালা থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনজনই চোরাই গ্যাস লাইনের সঙ্গে জড়িত। গ্রেপ্তার করা আসাসিমদের জয়দেবপুর থানায় একত্রেই বসিয়ে রেখেছিল। আসামিদের একটি ছবিও যোগফলে প্রকাশ হয়েছিল। কিন্তু যখন মামলা দায়ের হয়েছে, তখন দেখা গেলো ওই তিন জন আসামি থেকে একজন ছাড়া পেয়ে গেছে। কত লাখ টাকায় ছাড়া পেয়েছিল ‘ওই আসামি’ এর বয়ান দিয়েছিল ভাওয়ালগড় ইউনিয়নের একজন মেম্বার শফিকুল ইসলাম। শফিকুলই আসামি ছাড়ানোর অনুঘটক।

এসআই আব্দুর রহমানের বাড়ি নরসিংদী জেলার মনোহরদী থানায়। যোগফলে সংবাদ প্রকাশ হচ্ছে এমন আভাস পেয়ে ‘মনোহরদী থানায় বাড়ি এমন একজন পুলিশ কর্মকর্তা’ যোগফলে ফোন করে আব্দুর রহমানকে খাতির করা যায় কিনা এই তদবির করেছিলেন। ওই পুলিশ কর্মকর্তা তখনও গাজীপুর জেলায়ই কর্মরত ছিলেন। আগে একটি থানায়ও দায়িত্ব পালন করেছেন।

স্মরণীয় আব্দুর রহমান যখনই ঘটনা ঘটিয়েছেন, তখন জয়দেবপুর থানার ওসি জাবেদুল ইসলাম ছুটিতে ছিলেন। তখন চার্জ ছিল আফজাল হোসাইনের। তিনি ঘটনার দায় এড়াতে পারেন কিনা এটি আমাদের বোধগম্য নয়। পুরান ঘটনা মনে করিয়ে দেওয়ায় আরও মামলার আসামি হয়ে যাই কিনা এই সংশয়ও জারি রাখলাম। ওসির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া আসামি ছাড়িয়ে নিয়েছে কে? থানা কি অন্য কারও নিয়ন্ত্রণে? আবার আসামি ছাড়ানোর জন্য যে লেনদেন হয়েছে ওই লেনদেনের ভাগ ‘কার পকেটে’ গেছে? যাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তাকে গ্রেপ্তার হয়েছিল কেন?

ওই ভাগের টাকায় ‘সাংবাদিক নামধারী’ কতিপয় ব্যক্তি খিচুড়ি ভোজনে মিলিত হয়েছিলেন। আফজালও বাদ যাননি ওই খিচুড়ি ভোজন থেকে। সাংবাদিক নামধারীরাও আসামি ছাড়ানোর ঘটনায় জড়িত ছিলেন। হম্বিতম্বি করে সংবাদের প্রতিবাদ পাঠানোর খায়েশ প্রকাশ করেও তারা পরে পিছনে হঠে যায়।

যোগফলের নামে মামলা দায়েরের পর আব্দুর রহমানের তদবির কারকও (সেই পুলিশ কর্মকর্তা, যেন তারা সবকিছু ইজারা নিয়েছেন) উজিয়ে উঠেছেন। যেমনটা উজিয়ে উঠেছেন আফজাল। ভাষায় গরমিল হলে অভিধানের সহায়তা নেন। প্রশ্নকে হুমকি মনে রার মতো আরও মামলা যেন গজিয়ে না ওঠে।

এখানেই শেষ নয়। সেই খবর যোগফলে প্রকাশ হওয়ার পর আফজাল হোসাইন ফোন করেছিলেন। তিনি নিজের সততার ঢোল পিটিয়েছিলেন। তাকে যোগফলের তরফ থেকে বলা হয়েছিল লিখিত প্রতিবাদ জানাতে। কিন্তু ছয় মাসেও তিনি লিখিত প্রতিবাদ করেননি। তার সততার মাত্রা কত, তিনিই ভালো বলতে পারবেন। এসব পুরান ঘটনার জেদ মেটানোর সাধ থাকতে পারে আফজালের। আবার অভিযোগ তদন্ত না হওয়ার ফলে আফজালরা হয়তো কোনকিছুই আমলে নেননা। কারণ, কিছুই হয় না; এই রেওয়াজ তো দেখাই যাচ্ছে।

গত ২৫ মে ইদের দিন যোগফল অনলাইন সংস্করণে (করোনাকালে দুই মাস যাবত গাজীপুরের কোন পত্রিকা প্রকাশ হয় না। সবগুলো পত্রিকা বন্ধ ছিল। যোগফল ছিল ব্যতিক্রম) জয়দেবপুর থানার এএসআই সোহরাব হোসেন ‘ডগরী’ গ্রামের ওয়ারেন্টভুক্ত এক আসামিকে গ্রেপ্তার করে ‘ছেড়ে’ দিয়েছেন। ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে (ঘুষ) সোহরাব নিয়েছন ৩৫ হাজার টাকা। এসব অভিযোগ যারা আসামি ছাড়িয়ে নিয়েছেন তাদের। [সূত্র : ঘুষ নিয়ে ওয়ারেন্টের আসামি ছাড়লো জয়দেবপুর থানা পুলিশ, যোগফল, ২৪ মে ২০২০, পেজে যুক্ত হয় ২৫ মে ২০২০]

সেমাই খাওয়ার সময় সোহরাব হোসেন খবরের ব্যাপারটি অবগত হন। এর পর ইদের দিন বিকালে যোগফলের স্টাফ রিপোর্টার মো. মোজাহিদের বাড়িতে হাজির হন সোহরাব। মোজাহিদের পিতা মাতাকে সোহরাব নানা অনুনয় বিনয় প্রকাশ করেন। মানুষের যে অঙ্গ ছুয়ে অনুরোধ করলে সাধারণত ক্ষমার দৃষ্টি প্রকট হয়, সেই কাজও করেছেন সোহরাব। কিন্তু কিছুই করার ছিল না যোগফল কর্তৃপক্ষের। সোহরাবের অনুরোধের বিষয়টি আমাকে মোবাইল ফোনের লাউড স্পিকারে শোনানো হয়েছিল। জল হয়তো নিচের দিকে গড়িয়েছে। কিন্তু কখনও কখনও জল ওপরেও গড়ায়। কেবল ভাটার টান নয়, জোয়ারের বেগ দেখা যায় তখন।

এসব কথার পিছনে আসল কথা কি তা জানেন তো পাঠক? একটু অপেক্ষা করুন ‘চেটেপুটে’ খাওয়ার ‘ওলট পালট’ কাহিনি জানতে পারবেন।

সোহরাব যোগফলের নিকট সংবাদে উদ্ধৃত যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে তিনি ‘তদন্ত পরিদর্শক স্যারের’ নাম ব্যবহার করেছেন। এই তদন্ত পরিদর্শক স্যারটি কে নিশ্চয়ই জানেন আপনারা? ওই সংবাদে আলোচিত তদন্ত পরিদর্শককে ফোন করা হয়েছিল। তিনি ফোন কল রিসিভ করেননি তিনি। এসএমএস পাঠানো হয়েছিল। তাতেও সাড়া দেননি।

মিথ্যাচারের মুখোশ খুলবে এজাহার বিশ্লেষণেই। কেবল একটু অপেক্ষা করতে হবে। শুরুতে বলেছিলাম, যা রটে তার কিছু ঘটে। এটি প্রবাদ মাত্র। না ঘটলে যদি রটে, তা হলে রটার কারণ খুঁজা দরকার। মামলা কি এসবের সমাধান?

আসাদুল্লাহ বাদল: প্রকাশক ও সম্পাদক, দৈনিক যোগফল। ৮ জুন ২০২০।

পরের কিস্তি: যোগফলের নামে মামলা দায়েরের নাটকীয়তা। ‘এজাহার’ নিয়ে কি ঘটেছিল? কারারুদ্ধ সাংবাদিকরা কেন নির্যাতনের অভিযোগ করেছে?






এই বিভাগের আরও