গণমাধ্যমই দুর্নীতিবাজের ‘মুখ ঢাকার’ উপর্যুক্ত ব্যবস্থা

আসাদুল্লাহ বাদল

12 Jun, 2020 10:25am


গণমাধ্যমই দুর্নীতিবাজের ‘মুখ ঢাকার’ উপর্যুক্ত ব্যবস্থা
রোকনুজ্জামান খান ও মো. মোজাহিদ

পাকিস্তান আমলে রাজনৈতিক সভা সমাবেশের খবর প্রচার ছিল মারাত্বক ঝুঁকিপূর্ণ। খবরের আভাস পেলেই পত্রিকা অফিসে নানা বাহানার সার্কুলার জারি হতো। তখন গণমাধ্যম বলতে পত্রিকাই মূখ্য ছিল।

১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার তেজগাঁওয়ে একদল ছাত্রের মিছিলে হামলা করে পুলিশ। এতে ২৫ ছাত্রকর্মী আহত হয়। তখন পর্যন্ত সামরিক শাসনের কড়াকড়ির কারণে  তেমন একটা আন্দোলন দানা বাঁধেনি।

এরইমধ্যে ইত্তেফাক অফিসে ‘অলিখিত নোটিশ’ আসে তেজাগাঁওয়ে যে মিছিল হয়েছে, ওই মিছিলের খবরটি পত্রিকায় ছাপা না হয়। সরকারি এই আদেশ না মেনে পারা যায় না। কিন্তু খবরটি ইত্তেফাক ছেপে দেয়।

ইত্তেফাকের বার্তা সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেন খবর প্রকাশ করেন এভাবে, গতকাল [ঘটনার পরদিন প্রকাশ] ঢাকার ‘তেজগাঁওয়ে ছাত্রদের কোন মিছিল হয়নি’। তবে ‘সেখানে ২৫ ছাত্র আহত হয়েছে’।

খবর দেখেই আবার ফোন আসে ইত্তেফাক অফিসে। সিরাজুদ্দীন হোসেন সামরিক কর্র্তৃপক্ষকে জানালেন, মিছিল হয়েছিল। তবু মিছিলের খবর প্রকাশ করতে বাধা দিয়েছেন। তাই আপনাদের কথায়ই লিখে দিয়েছি ‘মিছিল হয়নি’। কিন্তু কেউ আহত হয়নি, এই কথা লিখতে তো ‘বারণ’ করেননি।

সামরিক কর্তৃপক্ষের জবাব ছিল, সিরাজ সাহেব আপনি খুব চালাক। [হুবহু লিখতে পারিনি, স্মৃতি থেকে লিখেছি]

কখনও কখনও কোন কোন ব্যক্তি নিজেকে ‘প্রত্যাহার’ করে নিতে চায়। ফলে তিনি আড়ালে থাকতে চান। কোন কাজ থেকে বিরত থাকতে চান। তখন তারা অনেক সময় গণমাধ্যমের সহায়তা নিয়ে থাকেন। রিকশাওয়ালা নিজেকে রিকশাওয়ালা পরিচয় দিতে আপত্তি করে না। কিন্তু ‘ঘুষখোর’ নিজেকে ‘ঘুষখোর’ পরিচয় দিতে তো চায়ই না, এই পরিচয় ‘চাপা’ দিতে আরও দশটা অপকর্ম করে। প্রয়োজনে ঘুষের ফাইলে প্রশাব ঢেলে দেয়!

কোন শিশুকে তার মা যদি খাবারের প্রস্তাব দেয়, তখন অনেক শিশু দাবি করে, সে এখন টিভি দেখছে। এভাবেই একজন শিশু গণমাধ্যম ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের খাবারের চাহিদাকে আড়াল করে রাখে।

আবার কেউ যদি কারও মুখোমুখি হতে না চায়, তা হলেও নিজেকে গণমাধ্যমের মাধ্যমে আড়াল করে রাখতে পারে। যদি তার হাতে থাকে একটি পত্রিকা, তবে তিনি পত্রিকাটি একটু উচু করে ধরে নিজের চেহারা আড়াল করতে পারেন। আবার পত্রিকা পড়ার মনোযোগও দেখাতে পারেন।

পাওনাদার সামনে চলে আসার সুযোগে পত্রিকা উচু করে ধরেও নিজেকে আড়াল করতে পারেন।

বিশেষত ভ্রমণকারীরা নিজেকে সবচেয়ে বেশি আড়াল করেন গণমাধ্যমের সহায়তায়। ইদানীং এয়ারফোন কানে লাগিয়ে গান শোনার নতুন পদ্ধতি দেখা যায়। এতেও বাইরের কোলাহল থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার মাধ্যম ‘গণমাধ্যম’।

এই আড়াল করার পদ্ধতি অনেকটা নিজেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার মতো। দুর্নীতিবাজরা গণমাধ্যমের গন্ধ পেলেই ক্যামেরা বন্ধ রাখার আবদার করেন। ফোন কল কেটে দিয়ে নিজেকে ব্যস্ত বলে জানান। অথবা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ব্যাটারিতে চার্জ ছিল না, নেটওয়ার্ক ছিল না এমন অজুহাত তুলেন। 

আপদ, বিপদ ও মুসিবত মনে করা এমন একশ্রেণি প্রতারণার আশ্রয় নেন বরাবর। কিন্তু গণমাধ্যমের জালে তবু আটকে যান। আটকে যাওয়া টের পেলেই হাঁটেন ভিন্ন পথে। প্রয়োজনে ব্ল্যাকমেইল করেন সহকর্মীদের। বলেন ‘অমুক’ সাংবাদিক বলেছে, আমার ‘গোপন তথ্য’ তুমি ফাঁস করে দিয়েছো। তুমি ছাড়া তো এ কথা আর কেউ এই অফিসে জানে না। দেখি তোমার ফোনসেটটা। এতে ওই সাংবাদিকের ফোন নম্বর মোবাইল সেটে আছে কিনা। তাকে এরমধ্যে কল করেছো কিনা।

এ সকল দুর্নীতিবাজরা ঘুমাতে পারে না। এ পাশ ওপাশ করে। এদের আঁত শুকিয়ে যায়। এরা সময় কাটানোর জন্য টিভি দেখে, গেম চালায়, গান শুনে, পত্রিকা পড়ে। কিন্তু মর্ম উপলদ্ধি করে না। তবু এরা গণমাধ্যমের সহায়তায় নিজেকে ‘আড়াল’ করে, মনের আড়ালে। এরা প্রকৃতপক্ষে ‘গণমাধ্যম’ বিরোধী।

প্রকৃত যারা গণমাধ্যমের বন্ধু, গণমাধ্যম বৎসল তাদের ইচ্ছা সবসময় শুভ। তারা সুবিধা দেখে হ্যাঁ বা না উচ্চারণ করে না। এরা অন্যায়কে অন্যায় বলে। বিড়ালের রঙ দেখে বিড়ালের শিকারি গুন বিবেচনা করে না।

‘আমাকে একটু একা থাকতে দাও’ জাতীয় বাক্য উচ্চারণ করে একশ্রেণি। এরা মূলত মানসিক রোগী। দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার কারণে নিজেদের ‘এতিম’ করে রাখতে চায়। এরা অনেক সময় শিশুকালে এতিম হওয়ার ফলে বেপরোয়া জীবন বেছে নেয়। নানা অপ্রাপ্তি পূরণ করতে এরা বেপরোয়া জীবনে ঝুঁকে পড়ে।

অনেক দুর্নীতিবাজ দুশ্চিন্তায় ক্লান্ত থাকে। কিন্তু প্রকাশ করতে চায় না। আতঙ্ক এদের পিছু ছাড়ে না। তখনও তারা গণমাধ্যম ব্যবহার করে, অন্যদের থেকে নিজেকে আলাদা করে রাখে।

এ ধরনের আচরণ নিজেকে সমাজ থেকে প্রত্যাহার করার শামিল। ফলে নেতিবাচক ফল অনেক ইতিবাচক কাজকে ঢেকে দেয়। অসততার কথা এরা ভুলেও স্বীকার করে না। এরা বড় ধরনের ক্ষতি নিজেরাই করে বসে। যেমনটি করেছে সাবেক ডিআইজি মিজানুর রহমান। তার কপাল পুড়েছে মূলত গণমাধ্যমের সূত্র ধরেই।

যিনি পানির বদলে প্রশ্রাব ঢেলে দিয়েছেন, তিনি বর্বরতার উদাহরণ দেখিয়েছেন। ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ নীতি’ সম্পর্কে তিনি ‘অজ্ঞাত’। বিশেষ মোহে মূর্খ। তার পরিণতির জন্য তিনি অপক্ষো করছেন বলেই ধারণা। প্রশ্রাবই তার পতনের ‘সিঁড়ি’।

তিনি তার ক্ষমতায় ‘বিভোর’ ছিলেন। ফলে একজন গণমাধ্যমকর্মীকে হুমকি দিতে হিসাব রাখতে পারেননি। তিনি একা ‘ধরা’ পড়েননি। সঙ্গে ভাগিনাকেও জেলে রাখার ব্যবস্থা করেছেন।

একজন সার্জেন্ট বিচারপতির প্রটোকল ভেঙে ছিলেন। ওই সময়ের আইজিপি প্রটোকল ভাঙার সাফাই গেয়ে হাইকোর্ট বিভাগে লিখিত ‘বয়ান’ জমা দিয়েছিলেন। সার্জেন্ট নমুনা আন্দাজ করে ক্ষমা চাইতে ভুল করেননি। ফলে সার্জেন্ট তার চাকরি বাঁচাতে সক্ষম হন। কিন্তু আইজিপি বেচারা চাকরি হারান। এটি বাংলাদেশেরই ঘটনা।

গত জানুয়ারি মাসে জয়দেবপুর থানার গ্যাসের মামলার আসামি ছাড়ানোর পেছনে একজন সাংবাদিক নামধারী ব্যক্তি জড়িত ছিল। তিনি আবার বনের জমিতে ভবন বানোনোর ইজারা নিয়েছিলেন। ওই ইজারার ঘটনার ভিডিয়ো প্রকাশ হয় যোগফলে। তিনি যার ভাড়া খাটা হিসাবে সরকারি জমিতে ভবন নির্মাণের ঘটনায় জড়িত, তিনি (ভিডিয়োতেই নাম ঠিকানা পরিচয় বিস্তারিত রয়েছে) সেখানে অন্য কোন সাংবাদিক গেলে তার অনুমতির প্রশ্ন তুলেন।

চলতি বছর ১৬ ফেব্রুয়ারি ওই নামধারী সাংবাদিক যোগফলে কয়েকবার ফোন করেন। একবার তার ফোন রিসিভ করা হলে তিনি যোগফলের নিকট আকুতি মিনতি করে শেষবারের মতো তাকে বাঁচাতে (সেভ) দাবি করেন। তখন পরিস্থিতি মারাত্বক ভাবে তার প্রতিকূলে বলেও জানান। ওই ভিডিয়ো প্রচারের আগের সংবাদের সময় সাংবাদিক নামধারী এই ব্যক্তি ওই ভবন নির্মাণের ঘটনা থেকে সুবিধা নিয়েছেন বলে যোগফলের নিকট খোলামেলা স্বীকার করেন। এক পর্যায়ে বনের জমিতে বানানো ভবন তার বলেই দাবি করেন। পুলিশ প্রশাসনের নজরে এসব খবর কখনও আসেনি বলেই মনে হচ্ছে। তারা একই ঘাটছাড়ায় অবস্থান করছে। তার এসব কল রেকর্ড যোগফল মর্গে রয়েছে। মামলার ইন্ধন জোগানোর ক্ষেত্রে ১ জুন রাত [প্রথম প্রহর] থেকে বিকাল পর্যন্ত কয়েকটি বক্তব্যও যোগফলে রয়েছে। যে পুলিশের ওপর তিনি ভর করেছিলেন, তার আসামি ছাড়ানোর তথ্যও মার খায়নি। 

তার আর এক সহকর্মী একটি রিসোর্টের দেখভাল করেন। ওই রিসোর্টে গত কয়েক মাস আগে ডিবির একটি অভিযান হয়।  এতে গ্রেপ্তার হয় কয়েক যৌনকর্মী। ওই খবর চাপা দিতে ওঠে পড়ে লাগে সাংবাদিক নামধারী ওই চক্রটি। এরা মূলত যৌনকর্মীর দালাল। ওই সংবাদটি যোগফলে প্রকাশ হলে তাদের মুখোশ খুলে যায়। তাদের আর এক সহকর্মী গত কিছুদিন আগে বিদ্যুৎ বিল না দিয়ে খেলাপি সাজেন। তার বিদ্যুতের লাইন কাটতে গেলে সাংবাদিক নামধারী এই ব্যক্তিটি হামলা করেন পল্লী বিদ্যুতের কর্মচারিদের ওপর। এ ব্যাপারে থানায় অভিযোগ দায়ের হলে, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংবাদ প্রকাশ হয় যোগফলে।

সাংবাদিক নামধারী এই ‘দালাল চক্র’ গণমাধ্যমের আড়ালে নানা ধরনের অপকর্মে জড়িত। গত ১ জুন জয়দেবপুর থানায় যোগফলের তিন সাংবাদিকসহ মুক্ত বলাকার প্রতিনিধি ও ভুক্তভোগী নারী সাহিদা আক্তারের নামে যে মামলা হয়, এতে ইন্ধন জোগায় ওই চক্রটি। তাদের কিছু কথোপকথন রয়েছে যোগফল মর্গে।

কি ‘সংকেত’ জমা রেখেছি মর্গে এটি কেবল সময়ই বলে দিবে। মুক্তমত প্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল নিরাপত্তা নামক কালো আইন অবিলম্বে বাতিল কর।

আসাদুল্লাহ বাদল: প্রকাশক ও সম্পাদক, দৈনিক যোগফল। ১২ জুন ২০২০।



এই বিভাগের আরও