এত দালালের ভিড়ে ‘সাংবাদিকতা’ কোনঠাসা, তবু আশা জাগে

আসাদুল্লাহ বাদল

13 Jun, 2020 09:37am


এত দালালের ভিড়ে ‘সাংবাদিকতা’ কোনঠাসা, তবু আশা জাগে
আসাদুল্লাহ বাদল

কে সাংবাদিক? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আছে বলে তর্কে যেতে চাই না। কোথায় দেওয়া আছে? এমন প্রশ্ন সাংবাদিক নামধারী অনেকের নিকট আগে পরে শুনেছি বলে একই কথা আবার বলছি।

১৯৭৪ সালের বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল আইনে সাংবাদিকের সংজ্ঞা দেওয়া আছে। এই সংজ্ঞাভুক্ত হয়েও যারা রীতিনীতি লঙ্ঘন করে, তাদের নিয়ে যত আপত্তি। গত ১ জুন দৈনিক যোগফলের নামে একটি মামলা হয় জয়দেবপুর থানায়। মামলার সূত্র ক্রমেই লাল হচ্ছে। গরম করা লোহা লালের মতো। আসুন সূত্র মিলাই।

গত জানুয়ারি মাসে জয়দেবপুর থানার গ্যাসের মামলার আসামি ছাড়ানোর পেছনে একজন সাংবাদিক নামধারী ব্যক্তি জড়িত ছিল। তিনি আবার বনের জমিতে ভবন বানোনোর ইজারা নিয়েছিলেন। ওই ইজারার ঘটনার ভিডিয়ো প্রকাশ হয় যোগফলে। তিনি যার ভাড়া খাটা হিসাবে সরকারি জমিতে ভবন নির্মাণের ঘটনায় জড়িত, তিনি (ভিডিয়োতেই নাম ঠিকানা পরিচয় বিস্তারিত রয়েছে) সেখানে অন্য কোন সাংবাদিক গেলে তার অনুমতির প্রশ্ন তুলেন।

চলতি বছর ১৬ ফেব্রæয়ারি ওই নামধারী সাংবাদিক যোগফলে কয়েকবার ফোন করেন। একবার তার ফোন রিসিভ করা হলে তিনি যোগফলের নিকট আকুতি মিনতি করে শেষবারের মতো তাকে বাঁচাতে (সেভ) দাবি করেন। তখন পরিস্থিতি মারাত্বক ভাবে তার প্রতিকূলে বলেও জানান। ওই ভিডিয়ো প্রচারের আগের সংবাদের সময় সাংবাদিক নামধারী ওই ব্যক্তি ওই ভবন নির্মাণের ঘটনা থেকে সুবিধা নিয়েছেন বলে যোগফলের নিকট খোলামেলা স্বীকার করেন। এক পর্যায়ে বনের জমিতে বানানো ভবন তার বলেই দাবি করেন। পুলিশ প্রশাসনের নজরে এসব খবর কখনও আসেনি বলেই মনে হচ্ছে। তারা একই ঘাটছাড়ায় (কতিপয়) অবস্থান করছে। তার (নামে সাংবাদিক) এসব কল রেকর্ড যোগফল মর্গে রয়েছে। মামলার ইন্ধন জোগানোর ক্ষেত্রে ১ জুন রাত [প্রথম প্রহর] থেকে বিকাল পর্যন্ত কয়েকটি বক্তব্যও যোগফলে রয়েছে। যে পুলিশ সদস্যের ওপর তিনি ভর করেছিলেন, তার আসামি ছাড়ানোর তথ্যও মার খায়নি। এসব অসৎ কর্মকর্তারা পার পেয়ে যায় দালালদের লোভের কারণে।

আর এক নামধারী সাংবাদিক একটি রিসোর্টের দেখভাল করেন। তিনি ‘খাঁটি’ সদর উপজেলার বাসিন্দা। ওই রিসোর্টে গত কয়েক মাস আগে ডিবির একটি অভিযান হয়। এতে গ্রেপ্তার হয় কয়েক যৌনকর্মী। ওই খবর চাপা দিতে ওঠে পড়ে লাগে সাংবাদিক নামধারী ওই চক্রটি। এরা মূলত যৌনকর্মীর দালাল। মে মাসের শেষ সপ্তাহে পুস্পদাম রিসোর্টে অভিযান হয়। এতে গ্রেপ্তার হয় ১১ যৌনকর্মী। ওই খবরও এরা গায়েব করে ফেলে। না হলে যে ‘বখরা’ পাওয়া যায় না। এসব সংবাদ যোগফলে প্রকাশ হলে তাদের মুখোশ খুলে যায়। তাদের আর এক সহকর্মী গত কিছুদিন আগে বিদ্যুৎ বিল না দিয়ে খেলাপি সাজেন। তার বিদ্যুতের লাইন কাটতে গেলে সাংবাদিক নামধারী এই ব্যক্তিটি হামলা করেন পল্লী বিদ্যুতের কর্মচারিদের ওপর। এ ব্যাপারে থানায় অভিযোগ দায়ের হলে, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংবাদ প্রকাশ হয় যোগফলে।

সাংবাদিক নামধারী এই ‘দালাল চক্র’ গণমাধ্যমের আড়ালে নানা ধরনের অপকর্মে জড়িত। গত ১ জুন জয়দেবপুর থানায় যোগফলের তিন সাংবাদিকসহ মুক্ত বলাকার প্রতিনিধি ও ভুক্তভোগী নারী সাহিদা আক্তারের নামে যে মামলা হয়, এতে ইন্ধন জোগায় ওই চক্রটি। তাদের কিছু কথোপকথন রয়েছে যোগফল মর্গে।

যিনি দলিল লেখেন, তিনিও লেখক [ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন না]। দলিল লেখারও ভাষা আছে। রীতিনীতি আছে। দলিল লেখা আয়ত্ত করতে হয়। জিপিওর সামনে বসে যিনি সামান্য টাকার বিনিময়ে চিঠি লিখে দিতেন, তিনিও লেখক। কিন্তু ‘লেখক’ ধারণা কেবল গল্প, কবিতা, রচনা, উপন্যাস, সাহিত্য রচয়িতাকেই  বোঝানো হয়। যারা সংবাদপত্রে ঘটনার বিবরণী লিখে পাঠায়, তিনিও ‘শখ’ করে বলেন আমি ‘অমুক’ পত্রিকায় লেখি। এই লেখি মানে লেখক নয়। ঘটনার বিবরণী লেখা আর লেখক হওয়া এক হলে সবাই লেখক। পত্রিকায় যারা পোস্ট এডিটরিয়াল লিখেন, তারাও লেখক। যিনি খবর লিখে নিজেকে লেখক দাবি করেনে, তিনি আসলে মূর্খ। আর এই মূর্খ ধারণা কেবল আরও মুর্খের নিকটই প্রকাশ করা যায়। শিশু শ্রেণিতে যে শিশু বর্ণমালা লেখে, সেও লেখক।

থানায় অনেক ‘রাইটার’ থাকেন। যারা পুলিশ অফিসারদের সহায়তা করেন। তারাও লেখক। বরং আসল লেখক। কারণ লেখককে তো ইংরাজিতে রাইটারই বলা হয়। এহেন লেখকে দেশ ভরে গেছে।

জাল ভোটের সাক্ষি হতে ভোট কেন্দ্রে হাজির থাকা সাংবাদিক, যারা একটাও খবর লেখেন না, তারাও লেখক। এমন অনেক সাংবাদিকের পরিচয় দেখেছি একাধিক ভোটের হিসাবে। পরে জেনেছি, তারা কেউ কেউ ওই কেন্দ্রে জাল ভোটের খবর ‘চাপা’ দিতেই হাজির ছিলেন। মূলত পাহারা দেওয়ার কাজই করেছেন।

জিডি করা থেকে, আসামি ‘ছাড়া ধরা’ অনেক কর্মেই জড়িত এমন কিছু নামধারী ব্যক্তি। আবার ক্যামেরা হতে থাকলেও তো কথাই নেই। যার ক্যামেরা যত বড়, তিনি তত বড় সাংবাদিক।

শোক সংবাদ লেখতে দিলেও যিনি মাথার চুল ছিড়েন, তার সঙ্গে প্রকৃত সাংবাদিক কখনও পারে না।

ত্রাণের লাইনে দাঁড়াতেও এদের শরম হয় না। আবার দালালি ‘হালাল’ পেশা। কিন্তু দালাল হিসাবে পরিচিতি নিতে চায় না। যারা ব্রোকার সনদধারী, তারাও বাংলায় ‘দালাল’ খেতাব নিতে রাজি হয় না।

এইসব দালালদের সঙ্গে দুর্নীতিবাজদের যে সম্পর্ক, তা অনেক মধুর। প্রকৃত সাংবাদিক হয়তো এর ধারে কাছেও যেতে পারে না। আবার একটি কাজ বাগিয়ে  নেওয়ার ক্ষেত্রে একজন দালালের যে দক্ষতা, এটি পেশারদার সাংবাদিক কখনও পারবে কিনা সন্দেহ।

আবার দালালরা ঐক্যবদ্ধ। বরং প্রকৃত সাংবাদিকরা বিচ্ছিন্ন। ফলে দালালরা সুবিধা নেয়। প্রকৃত সাংবাদিকরা দালালদের চক্রান্তের শিকার হয়। এমনই চক্রান্তের শিকার হয়েছে ‘দৈনিক যোগফল’।

যোগফলের বিরুদ্ধেও তারা খবর লেখতে পারেনি। যোগফল মামলার আসামি এই খবর লেখতে বাধা কোথায়? কাদের খুশি করতে এই আয়োজন? এদের চেহারা দেখলে মুচকি হাসিও দেওয়া যায় না। ভোতা কলমের এসব নামধারী সৈনিকেরা আসলে কি চায়, তারা নিজেরাও জানে না। কি কারণে যোগফলের নামে মামলা হয়েছে, এটি স্পষ্ট করার দায়িত্ব যদি কোন সাংবাদিকের না থাকে, তা হলে তাদের আর ‘সাংবাদিক’ দাবির ‘বৈধতা’ কি? সড়কে দুর্ঘটনাকে যারা ‘সড়ক দুর্ঘটনা’ বলে তাদের হুশ কতটুকু? দুর্ঘটনা কি সড়কে ঘটায়? কলেরায় মরে, না কলেরা মরে?

দলিল লেখার প্রশিক্ষণ নিতে হয়। ইদানীং নামধারী সাংবাদিকদের কোন প্রশিক্ষণ নিতে হয় বলে দেখছি না। আবার নামকরা প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকরা প্রশিক্ষণ নেয়, কিন্তু পেশায় প্রভাব ফেলে না। ফলে দালাল আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। 

একজন মাদকের ডিলার আটক হওয়ার পর, আটককারী সংস্থা মাদকের কারণেই ওই আসামিকে আটক করেছে বলে জানান। এই খবর কয়েকটি সংবাদপত্রে প্রকাশ হয়। এমন একটি খবর দৈনিক যোগফলেও প্রকাশ হয়। পরে ‘যোগফল’ জেরার মুখে পড়ে ওই সংস্থার। তারা সাফ জানায়, অন্যরা কি করেছে, সেটি তাদের নজরে নেই। যোগফলে কিভাবে খবরটি প্রকাশ করেছে সেটিই তাদের নজরে! বিব্রত হওয়া ছাড়া আর কোন কারণ দেখি না।

মাদকের ‘ওই ডিলার’ থানার ১০০ গজের মধ্যে অফিস করতো। কিন্তু তাকে ধরা  (গ্রেপ্তার) হতো না। তাকে আটক করে অন্য একটি সংস্থা। অন্য একটি সংস্থার ‘ধরা’ ও বক্তব্য বদলানোর পেছনে কোন কারণ থাকবে না তা কি হয়?

দুই আসামি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন হলেও যাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে [সূত্র: দৈনিক মুক্ত সংবাদ, জুলাই ২০১৯] তার স্বজনেরা সাংবাদিকদের সামনে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু আইনের শাসনের অভাবে অনেকেই দালালকেই ভরসা করে। সাংবাদিককে নয়।

যারা সংবাদপত্রের ‘কণ্ঠরোধ’ করেছিল তারা খুনের শিকার হওয়ার পরও খবর হিসাবে গণমাধ্যমে ঠিকমতো স্থান পায়নি। ন্যায় বিচারের অসংখ্য দাবি তারা জনগণকে জানাতে পারেনি। শথ ফুল ফুঁটতে দেওয়ার আকুতি যারা ধ্বংস করে, তারা নিজেরাই কঠিন পরিণতি ভোগ করে।

ক্যারিশমেটিক অভিনয় শিল্পী সাজতে ব্যস্ত থাকে কিছু ব্যক্তি। তারা তাদের প্রটোকল হিসাব করে কাজ করেন না। সস্তা জনপ্রিয়তা নিয়ে ভাবেন তারা। সরকারি কর্মচারি হয়েও ‘নেতাগিরি’ মনোভাবে হাজির হন অনেক ক্ষেত্রে। এরা দালালদের সহায়তা নিয়ে থাকে। দালালরা এমন আজেবাজে প্রচার চালায় নিজের স্বার্থে। ফলে, দেশ ও দেশের জনগণের বিরাট ক্ষতি হয়ে যায়। তাদের কোন কমিটমেন্ট থাকে না। 

কমিটমেন্ট করেই বলছি, একাই রিলিফ পার্টি উচ্ছেদ করা সম্ভব। একাই দুর্নীতিবাজদের উচ্ছেদ করা সম্ভব। কারণ, কমিটমেন্টের প্রতি জনগণের মত থাকে। জনগণ সব সময় এলার্ট অনুমান করতে পারে না কিন্তু আসল সময়ে ফেল করে না। জনগণই ইতিহাসের ইঞ্জিন। তারাই ইতিহাস রচনা করে। তাদের প্রতিই ভরসা রইলো।

আসাদুল্লাহ বাদল: প্রকাশক ও সম্পাদক, দৈনিক যোগফল। ১৩ জুন ২০২০।



এই বিভাগের আরও