মোহাম্মদ নাসিমের ক্ষুদ্র স্মৃতি

আসাদুল্লাহ বাদল

13 Jun, 2020 03:17pm


মোহাম্মদ নাসিমের ক্ষুদ্র স্মৃতি
মোহাম্মদ নাসিম

মোহাম্মদ নাসিম আমাকে মোটেও চিনতেন না। আমাকে চেনার মতো তেমন কোন কাজই আমি করিনি। তবু তিনি আমাকে একবার ফোন করেছিলেন। প্রায় ছয় বছর আগে জেলহত্যা দিবসে ‘সাপ্তাহিক গাজীপুর দর্পণ’ এ ‘নিরাপদ হেফাজতে হত্যা চরম বর্বরতা, শিরোনামে আমার একটি লেখা প্রকাশ হয়। দর্পণের ওই সংখ্যায় ডাকসুর সাবেক ভিপি ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মোজাহিদুল ইসলাম সেলিমেরও একটি বিশেষ লেখা প্রকাশ হয়। ওই লেখাটিও আমি এনে দিয়েছিলাম।

দর্পণের সংখ্যাটি নাসিমের হাতে পড়েছিল। প্রায় আড়াই হাজার শব্দের ওই লেখা পড়ে, আমার ফোন নম্বর জোগার করে; তিনি আমাকে ফোন করেছিলেন। খুশি করতে নয়, লেখাটি সম্পর্কে মত জানাতে তিনি ফোন করেছিলেন। তবে তিনি একটি পরামর্শ দিয়েছিলেন। আমার মতের সঙ্গে তার বাসনার মিল হয়েছিল। আমি তার পরামর্শটি নিয়েছি। সফল না হলেও, কাজটি শেষ করেছি। তার ধারণা ছিল আমি ‘লেখা চালালে’ ভালো করব। তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরটি ছিল ব্যাংলাদেশে গ্রামীণ ফোনের তৃতীয় বাণিজ্যিক নম্বর। তিনি তখন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী থাকায় নম্বরটি [০১৭১১৫২...২] বরাদ্দ পেয়েছিলেন। প্রথমটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও দ্বিতীয়টি ডক্টর মহম্মদ ইউনুস ব্যবহার করেন।

আমি দীর্ঘদিন পর ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ৩০ ডিসেম্বর মোহাম্মদ নাসিমকে ফোন করেছিলাম। তিনি ফোন রিসিভ করেছেন যথারীতি। পরিচয় দিতেই চিনে ফেলেন আমাকে। তবু আমি বিস্মিত হইনি। এটি তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা মিলে একটি ব্যাপার হয়েছিল। তার নম্বরটি ‘রেখে’ দিতে বলেছিল বলেই, আমার কাজে লেগেছিল।

গাজীপুরে বসে একটি রিপোর্ট করতে গিয়ে মূলত তাকে ফোন করেছিলাম। ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ সম্পর্কে সকলে অবগত হলেও ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে সিরাজগঞ্জ থেকে ‘জয় বাংলা বেতার কেন্দ্র’ চালু হয়েছিল এটি আমি জানতে পেরেছি মাত্র সাত মাস আগে। খুব বেশি তথ্য এ সম্পর্কে জানেন কেউ, তা আমার মনে হয় না এখনও। ইতিহাসের বইপত্র কিছু পড়েছি। অনেক রাজনৈতিক নেতাদেরও দেখেছি। কিন্তু কেন শুনিনি এমন একটি ঘটনা। ফলে আমি ছিলাম বিস্মিত। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানীর মাধ্যমে আমি জানতে পারি ঘটনাটি। ছাত্রলীগের (জাসদ) সাবেক সভাপতি আব্দুল্লাহিল কাইয়ুম, সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম, সাংবাদিক সেলিম সিকদার ও জয় বাংলা বেতার কেন্দ্রের সূচনাকারী একজন সংগঠকের [আলফা] সন্তানের সহয়তা নিয়ে গত ১ জানুআরি ২০২০ আমি রিপোর্টটি প্রকাশ করি দৈনিক যোগফলে। এই রিপোর্টের তথ্য নেওয়ার কারণেই মোহাম্মদ নাসিমকে ফোন করেছিলাম। তিনি সহায়তা করায় রিপোর্টটি আমার চাহিদা মতো তৈরি করতে পেরেছি। তিনি আফসোস করেছিলেন। সিরাজগঞ্জের সাংবাদিকরা কেন ব্যাপারটি নিয়ে কাজ করে না। তার আজ [১৩ জুন ২০২০] প্রয়াণ ঘটেছে।

মাস খানেক আগে দৈনিক যোগফলে শহিদ এম মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজে করোনা পরীক্ষার যন্ত্রপাতি পড়ে থাকার রিপোর্ট প্রকাশ হয়। রিপোর্ট প্রকাশের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। পরে একটি ফলোআপও প্রকাশ হয় যোগফলে।

১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে নাসিম বিরোধী দলীয় চিফ হুইপের দায়িত্ব পান। সংসদে তার ভাষণ আমার পছন্দ হতো। ২৪ বছর একদিন (১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দের ১২ জুন) আগে তিনি আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রথমে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী হন। তিনি এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়ে মোবাইল ফোনের ‘মনোপলি’ ভেঙেছিলেন। 

তখন তিনি দুইটি আসনে জিতেছিলেন। একটি ছেড়ে দেওয়ার পর, তার ভাই মোহাম্মদ সেলিম জিতেন ওই শুন্য আসনে। ২০০১ খ্রিস্টাব্দে সেলিমকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। নাসিম দুই আসনে নির্বাচন করে দুইটিতেই হারেন। স্বতন্ত্র নির্বাচন করেন সেলিম। তিনিও হারেন। পরে সেলিম ‘বাংলাদেশের আওয়ামীলীগ’ নামে একটি দল ঘোষণা করেন। কিছুদিন পরে তিনি ব্রিটেনে চলে যান। কয়েক বছর আগে তিনিও [সেলিম] মারা যান।

মোহাম্মদ নাসিম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীরও দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে সরকারি চাকরিজীবী থেকে সাংবাদিক ‘আমিনুর রহমান তাজ’ দৈনিক আজকের কাগজে একটি বিশেষ রিপোর্ট করে চাকরি হারান। আমিনুর রহমান তাজ আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড। তাকে আমি একবার দেখেছিলাম। তার সাংবাদিকতার দক্ষতা আমাকে বিমোহিত করে এখনও।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে নাসিম দক্ষিণ পশ্চিাম অঞলের চরমপন্থী হিসাবে পরিচিত অস্ত্রবাজদের আত্মসমর্পণ করিয়েছিলেন। ওই আত্মসমর্পণ করানোর পিছনে অনুঘটক হিসাবে কাজ করেন ‘বীর দর্পণ’ পত্রিকার সম্পাদক মীর ইলিয়াস হোসেন দিলীপ। দিলীপ নিজেও একটি ‘বেআইনি’ কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ছিলেন। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ছিলেন। নিজে পড়েছিলেন মাদরাসায়। কিন্তু শহীদুল্লাহ কায়সারের মতো কমিউনিস্ট নেতা হয়ে ওঠেছিলেন। শহীদুল্লাহ কায়সারও মাদরাসায় পড়েছেন।

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানটি ছিল নানা কারণে বিতর্কিত। অনেকেই ওই আত্মসমর্পণ পছন্দ করেননি। সবসময়ই এ জাতীয় আত্মসমর্পণ ঘিরে কিছু আলোচনা চালু থাকে। নাসিমের সঙ্গে দিলীপের সখ্যই ছিল ওই আত্মসমপর্ণের সূতিকাগার। পরে ২০০০ খ্রিস্টাব্দের ১৫ জানুআরি প্রকাশ্যে ঝিনাইদহে দিলীপকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ধারণা করা হয়, যারা ওই আত্মসমর্পণ পছন্দ করেননি, তারাই দিলীপকে খুন করেছে। দিলীপ হত্যার কূল কিনারা হয়নি।

দিলীপ বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র সাংবাদিক যিনি গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্র ঋণের ভাওতাবাজি প্রমাণ করেছিলেন। দিলীপ একবার কাপাসিয়ায় এসেছিলেন। তাকে দেখে ও তার আচরণে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম।

এম. মনসুর আলীর জীবনী পড়ে জেনেছি মোহাম্মদ নাসিম একজন আইনজীবী ছিলেন। কিন্তু এই তথ্য আগে পরে কখনও শুনিনি। এমন অনেক ঘটনাই আমাদের জানার বাইরে থেকে যায়। যেমনটি ‘ছিল’ নয়, এখনও আছে ‘জয় বাংলা বেতার কেন্দ্র’।

নাসিম আওয়ামীলীগের ভূমিধস বিজয়ের বছর নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। ২০০৮ খ্রিস্টাব্দের ২৯ ডিসেম্বর তার সন্তান ডাক্তার তানভীর শাকিল জয় এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

নাসিম সম্পর্কে আমিনুর রহমান তাজ ও মীর ইলিয়াস হোসেন দিলীপের আলোচনা মগজে ধারণ করা আছে। সেসব ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে লিখে জানাতে পারি পাঠককে।

স্মরণীয়, আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ভোতা একটি অস্ত্র নিয়ে খুলনা অঞ্চলে এক খেতমজুর নেতা যোগদান করেন। তিনি এক বছর কারাগারে ছিলেন। তার এমন ইচ্ছা হয়তো কেউ ভাবতেও পারবেন না। আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্স কেমন, কেমন ওই নেতাদের জীবন ধারণ, এসব জানতেই তিনি আত্মসর্ম্পণ করেন।

যারা ওই সময়ে আত্মসমর্পণ করেছিলেন, তাদের অনেককে পরে আনসার বাহিনীতে চাকরি দেওয়া হয়। বিশেষ আনসার বাহিনীর এক সদস্য ‘সুকুমার মন্ডল’ সাবেক জয়দেবপুর থানার [ওই ভবনে এখন জিএমপির সদর থানা] ওসির বডিগার্ড হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি এখনও গাজীপুর জেলায় একটি থানায় কর্মরত। আগ্রহীরা তার নিকট থেকে জেনে নিতে পারেন চাঞ্চল্যকর ও রোমাঞ্চকর তথ্য।

নাসিমের বিশাল জগতের অনেক স্মৃতিই ভাসবে মানুষের মনে। আমি যেমন ক্ষুদ্র ব্যক্তি, তেমনই আমার স্মৃতিও ক্ষুদ্র। এই সময়ে তাকে [মোহাম্মদ নাসিম] শ্রদ্ধা জানাতেই এই লেখার অবতারণা। ভালো থাকবেন পাঠক। আমি কেবল স্বাধীন সাংবাদিকতার হিসাবটি চুকিয়ে নিতে চাই।

আসাদুল্লাহ বাদল: প্রকাশক ও সম্পাদক, দৈনিক যোগফল। ১৩ জুন ২০২০।



এই বিভাগের আরও