তাসের ‘ভাঁজে’ নিজেকে ‘লুকিয়ে’ রাখতে পারবেন?

আসাদুল্লাহ বাদল

14 Jun, 2020 01:17am


তাসের ‘ভাঁজে’ নিজেকে ‘লুকিয়ে’ রাখতে পারবেন?
মুচী জসিম

“তা হলে এ ছেলে মুক্তিযুদ্ধে কেন গিয়েছিল? কোন লক্ষ্যে? কোন আশায়? সে কোন স্বপ্ন দেখেছিল মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে? ... আমার বিশ্বাস মুক্তিযুদ্ধ এদের কাছে ছিল সাময়িক উত্তেজনা।”

ওপরের এসব কথার আগে আরও কিছু কথা রয়েছে। এরও অংশ বিশেষ জানানো দরকার।

“স্যার, আমি যদি ম্যাট্রিকে প্রথম হই, তা হলে কি সংবাদপত্রে আমার ছবি ছাপা হবে? সাংবাদিকরা কি আমার সাক্ষাৎকার নিতে আসবে? তার কথা শুনে আমি অবাক হলাম। জিজ্ঞেস করলাম, কি করে তুই পরীক্ষা দিলি? তুই আমার বাসায় থাকিস অথচ আমি জানি না যে তুই ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী। সে হেসে ফেলল। বলল, স্যার পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছি। পরীক্ষা দেবে দুইজনে। দুইটি অ্যাডমিট কার্ড জোগাড় করেছি। একটি আমার নামে, অপরটি আমার বন্ধুর নামে। আমার বন্ধু বিএ পাস। পরীক্ষার হলে সে আমার খাতায় লিখবে আর আমি তার খাতায় লিখব। তাই আমার ভয় হচ্ছে, আমার বন্ধু আমার বদলে পরীক্ষা দিলে সে নিশ্চয়ই প্রথম বা দ্বিতীয় স্থান অধিকার করবে। কিন্তু সকলে জানবে যে আমি প্রথম বা দ্বিতীয় হয়েছি। তখন আমি বিপদে পড়ে যাব। তখন সাংবাদিকরা আমার খোঁজে আপনার বাসায় আসবে। আপনার সুবাদে সকলেই আমাকে চেনে। আমরা দুইজনেই বিপদে পড়ে যাব। তার কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলাম।” নির্মল সেন, আমার জবানবন্দি, পৃষ্ঠা ৪৭৬, প্রথম ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ২০১২। এসব কথার ফল বোরোতে আরও দুই বছরও লাগতে পারে।

সাংবাদিক ও রাজনীতিক নির্মল সেনের এ কথা নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারবে পাঠকরা। যে চার বার পরীক্ষা দিয়ে পাস করতে পারেনি, সে প্রথম বা দ্বিতীয় হলে কি বিপদ হতে পারে এই অনুমান থেকে।

অনেকের ভিন্ন ধরনের ‘অভিভাবক’ থাকে। তারা সিগন্যাল না দিলে সাক্ষাৎকারও নেয় না। এমন ‘আজব’ ব্যক্তিদের চারপাশেই আমাদের থাকতে হয়।

গাজীপুর জেলা ডিবির তৎকালীন এসআই মফিজুর রহমান মল্লিকের দেড় হাজার পিস ইয়াবা ও জব্দ তালিকা গায়েবের খবর দেখেই তাৎক্ষণিক তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। পরে তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছিল বলে যোগফলকে জানানো হয়েছিল। যারা খবরটি প্রকাশ করেছে, তাদের কারও সাক্ষি নেওয়া হয়নি। কিভাবে তদন্ত হলো? কোথায় তদন্ত হলো? মফিজ পরে কালীগঞ্জ থানায় বহাল হয়! মফিজের প্রত্যাহারের খবরও কোন এতিমরা লেখতে পারেনি।

সাংবাদিকতার কথা বলছি এই কারণে, আমরা কেবল পাতানো কার্পেট দেখি। কার্পেটের নিচে জমে থাকা ‘ময়লা’ দেখি না। ময়লা দেখলে ‘চাকচিক্য’ থাকে না। কিন্তু আপনার মনকে কি বলে ‘সায়’ দেন যে কার্পেটের নিচে ময়লা নেই?

ক্যারিশমেটিক যে অভিনয় দেখছেন, এর ‘পোস্টমর্টেম’ বের করতে হলে কতগুলো ব্যক্তির জমি বেচার দলিল দেখতে হবে। জমি বেচার টাকা কি কাজে লাগিয়েছে, এও দেখতে হবে। তারা ঋণ নিয়েছেন কিনা, এটি যাচাই করতে হবে। কার নিকট থেকে ঋণ নিয়েছেন, এটিও দেখতে হবে। জমি বেচে বা ঋণ নিয়ে কি কোন ‘শখ পূরণ’ করেছে? ঋণ পরিশোধ করতে কি পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন, এও দেখতে হবে। কত টাকার দলিল, কত টাকা ঋণ মিলিয়ে নিলেই 'যোগফল' মিলানো সম্ভব। ঘটনার সঙ্গে জমি বেচা বা ঋণের সম্পর্ক একটা ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে। 

বাজার দর কত ‘চাউর’ ছিল? ব্যাংকে বা চেকে লেনদেন নাও হতে পারে। হাতে হাতে হলেও একশটা ঘটনার একটা হলেও রেশ রেখে যাবে। একদিন দুইদিন বা দুই-চার মাসেও এটি শেষ করা সম্ভব হবে না। আরও একবছর লাগলেও আমরা প্রক্রিয়া থেকে সরে যাচ্ছি না। এই কারণ আন্দাজ পেয়ে থাকলে ভালো করেছেন। 

একজন ব্রিটিশ নাগরিককে খুন করে আফ্রিকার জঙ্গলে বিমান থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। ভীষণ বড় চালাকি ছিল সেটি। তবু ধরা পড়েছে। বিচার হয়েছে। যাদের বিস্তারিত জানার আগ্রহ, তারা বিএল দাসের সাক্ষ্য আইনের সহায়তা নিতে পারেন।

আমরা কেবল মূর্তির সামনের অংশটা দেখি। পেছনের অংশটা দেখার সময়ই পাই না। সামনের অংশটা দেখেই হাততালি দিতে থাকি। বাহবা দিতে থাকি। মারহাবা, মারহাবা বলতে থাকি। কিন্তু একজন সাংবাদিক যদি অনুসন্ধান করতে না পারে, পেছনের কথাটা দেশ ও দেশের মানুষকে জানাতে না পারে, তা হলে তার ‘হালচাষ’ করাই উত্তম। কারণ হালচাষ করেও প্রথম আলোতে কর্মরত রংপুরের রহিতুল মিয়া সফল। ‘সাংবাদিকতায়’।

ঘুষ নিলে ধরার মতো ঘটনা ঘটতে পারে, এ কথা জানলে কেউ ঘুষ নিতে রাজি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু কোথাও না কোথাও ধরা পড়তে হবে এই কথা জানা থাকা দরকার। কেউ যদি বিষ পানে গভীর জঙ্গলে গিয়ে আত্মহত্যা করে, তাকে পোস্টমর্টেম করলে কী জানা যায় না মরার কারণ কি ছিল? এমন সহজ প্রশ্নের কঠিন উত্তর নিয়েই আমাদের ‘কাজ কারবার’। কারও পছন্দ না হতে পারে, কিন্তু অসংখ্য মানুষের তা পছন্দ হয়।

‘ভবঘুরে’ দুইজন কি করে? কি তাদের পেশা? কোথায় কোথায় দাবড়িয়ে বেড়ায় তারা? কাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে তারা?

আচ্ছা এমন নাটকীয়তা কী আপনি দেখেছেন? একটি পরীক্ষা শেষ হয়েছে। পরীক্ষার ফলও প্রকাশ হয়েছে। পাসের সনদও হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সনদ পেয়ে যোগদানের প্রক্রিয়ায় যেতে চাচ্ছে পাস করা ব্যক্তিরা। ওই সময় জানা গেলো ভিন্ন ভিন্ন জেলার ব্যক্তিদের অ্যাডমিট কার্ড হাতে কে বা কারা স্বজন সেজেছে। স্বজনের পরিচয় আর প্রকাশ পেলো না। কি রহস্য ঘিরে আছে সেখানে? অন্য জায়গার ঘটনায় আমার তো মাথা ব্যাথা হওয়ার কথা নয়। যদি ঘটনার কোন সূত্র না মিলে থাকে, তা হলে পুরো আয়োজনটাই ভাওয়াল রাজার মতো না হয়ে যায়! নাটকীয়তা সবসময় ভাবমূর্তির বাইরে থাকে। ফলে ভাবমূর্তি বরফের মতো গলে যায়। গলতে গলতে পানিরও চিহ্ন থাকে না।

যে জেলায় পরীক্ষা হয়েছে, ওই জেলার বাসিন্দা না হলে যিনি পরীক্ষার্থী হিসাবে যোগ্য না, তার কাছে ভিন্ন জেলার অ্যাডমিট থাকলে কী সমস্যা? আবার যেখানে থেকে, তারা ওই অ্যাডমিট নিয়ে ঘুরছে তাতেই আমার কি আসে যায়? আসলেই তারা কোন ‘অ্যাডমিট’ নিয়ে ঘুরেছে? না, তাদের ‘ভিকটিম’ বানানো হয়েছিল? একজন ভিকটিম ‘কিভাবে কিভাবে’ ছাড়াও পেয়েছিল। আর কোন ঘটনা কি থাকতে পারে না? যা আমরা বোবা দর্শক হিসাবে আঁচ করতে পারিনি। কাউকে ভিকটিম বানিয়ে, কাউকে বাঁচানো বা আড়াল করা হয়নি তো? ‘নীরবতা কুণ্ডলী’ থিওরির বয়স হয়েছে ৪৫ বছর। থিউরিটি এখন সাবালক। 

যারা তাস খেলা জানেন বা খেলা দেখেছেন, তাদের জন্য আন্দাজ করা সহজ। খেলোয়ারদের মধ্যে তাস ভাগ করা হয় আড়াল করে। যার ভাগে যে তাস পড়ে, তিনি সেই তাস দেখতে পারেন। সামনের খেলোয়ার কেবল তাসের পেছনের অংশ দেখতে পান। সব তাসেরই পেছনের অংশ একই ডিজাইন ও একই রঙের থাকে। ফলে পেছন থেকে আন্দাজ করা যায় না কোন তাসের কি নাম [রুহিতন], কি মান [টেক্কা]। খেলার জন্য এভাবেই এক খেলোয়ার আর এক খেলোয়ারকে তাসের ভাঁজে আড়াল করে রাখেন। তাসের ভাঁজ আড়াল করে রাখলেও আমরা তাসের সামনের অংশটাই দেখাতে চাই। জনগণ ভাঁজ করা তাসের সামনের অংশটা দেখারই আগ্রহে থাকে। যত অপব্যবহার আর চালাকি করে তাসের ভাঁজের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখেন, খেলা এক সময় শেষ হবে। তখনও অন্তত সব তাস দেখার সুযোগ হবে। আসল মওকা তখন বের হতে বাধ্য।

কিশোরগঞ্জের যুবক ‘মুচী জসিম’ খ্যাত কালিয়াকৈরে বনবিভাগের ৩০০ বিঘা জমি দখল করেছে মর্মে খবর বেরিয়েছিল [‘মুচি জসীমের’ এখন শত কোটি টাকা’

দৈনিক কালেরকণ্ঠ, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮]। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলেও খবর বেরোয় [‘মুচি জসিম’ গ্রেপ্তার, কালেরকণ্ঠ, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮]। ওই খবরের সত্যতা পাওয়া যায়নি। তা হলে কি গ্রেপ্তারের খবর ‘ভুল’ ছিল। ‘ভুল খবর’ এমন কোন দাবি কি করা হয়েছিল? এই ঘটনার দায় কে নেবে? হউক না সে অপরাধী। বিচার কি এই রকম? তবে মুচী জসিমের লাশ পাওয়া গিয়েছিল কাপাসিয়ার জঙ্গলে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির লাশ কি পাওয়া যাওয়ার কথা, ক্রসফায়ার না হয়ে থাকলে? কি মামলা দায়ের হয়েছিল লাশ পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে? এভাবেই কত ঘটনা আড়াল হয়ে যায় [ সূত্র: মরলো মুচী জসিম, বাঁচলো কে? যোগফল, ২০১৮]। ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে ১২ জুন অপহরণ হয় কল্পনা চাকমা। আজও তিনি অপহরণ হওয়ার তালিকায়ই রয়ে গেছেন!

এভাবে মুলা ঝোলানো হলো! কিছুই অনুমান করতে পারেনি সাংবাদিক নামধারীরা। কেবল নিজের পিঠ বাঁচানোর জন্য, নিজের পেট বাঁচানোর জন্য চুপটি মেরে রইলো। চুপ থাকতে থাকতে আদি বোবা হয়ে গেল। জন্মের পরে দুধের জন্য এরা চিৎকার করেছিল। কিন্তু অনিয়ম দেখে, বেপরোয়া ও বেআইনি প্রক্রিয়া দেখেও না দেখার ভান করে রয়েছে। এরা এমন প্রভুভক্ত যেন হাতুড়ির আঘাতেও এদের শব্দ বের হয় না। এরা কোনদিনও আর শব্দ করতে পারবে না হয়তো। মরার আগে পানি করার খায়েশ জানাতে পারে কিনা এই সন্দেহ জারি রইলো।

নাটক তো আমি লেখিনি। ফলে নাটক পছন্দ না হলেও কিছু করার নেই। নাটকে কেমন দৃশ্য হাজির করা হবে, এটি তো দর্শকের সঙ্গে কথা বলে করা হয় না। কিন্তু দর্শক হিসাবে কি আমি নাটকের নম্বর দিতে পারি না?

অভিনয় শিল্পীর অভিনয় দেখে, কেউ আবেগে আত্মহত্যা করতে পারে। এতে শিল্পীর কি ভূমিকা থাকতে পারে? যেমন: সালমান শাহ মারা যাওয়ার পর, কয়েক ভক্ত আত্মহত্যা করেছে।

অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, ঘুষের বিরুদ্ধে আপনি দাঁড়াবেন কি না এটি আপনার ব্যক্তিগত অভিমত হতেই পারে। কিন্তু অন্য কেউ দাঁড়ালে তার বিরোধীতা করার মতো স্বাধীনতা আপনি কোথায় পেলেন? আপনাকে আফসোস করতে হতে পারে, নির্বোধ সেজে থাকার জন্য। কারণ নাটক তো আপনি লেখেননি। ফলে শিল্পী যেমন অভিনয় করবে, আপনার তা পছন্দ না হলেও দেখতে হবে। আসলে শিল্পীরও স্বাধীনতা নেই। শিল্পী তো নাটক লেখেনি, নাটক লিখেছে রচয়িতা। যিনি আরও ভিন্ন।

নিজেকে বাঁচাতে, নিজেকে ধ্বংস করার মতো বোকামি বইকি। হউক না দেরি, রাত পোহাতে। তবু ভোর হবে। আলোই সমাধান। অন্ধকার নয়।

আসাদুল্লাহ বাদল: প্রকাশক ও সম্পাদক, দৈনিক যোগফল। ১৪ জুন ২০২০।



এই বিভাগের আরও