সংবাদপত্রের ‘কালো দিবস’ ও হরেকরকম দালালের দালালি

আসাদুল্লাহ বাদল

16 Jun, 2020 12:31am


সংবাদপত্রের ‘কালো দিবস’ ও হরেকরকম দালালের দালালি
আসাদুল্লাহ বাদল

দ্বিমত, ভিন্নমত দলন করলে সাংবাদিকতা টিকিয়ে রাখা যায় না। সহনশীলতার মাত্রা কত এটি ঘোষণা দিয়ে রাখা উত্তম হতে পারে। ঘুষ দুর্নীতি চাপা দিতে আইন ও ক্ষমতার অপব্যবহার করা যায়, চূড়ান্তভাবে টিকে থাকা যায় না। যারা সংবাদপত্র দলন করেছে, তাদের চেহারা কেমন আজ মিলিয়ে নেন যোগফলে।

“ঢাকা থেকে ঈশ্বরদী হয়ে পাবানা পৌঁছালাম। দুপুরে দিকে একটি গুলির শব্দ শুনলাম। কৌতুহল হলো। শুনলাম পাবনায় ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে একটি রিজার্ভ হাউস আছে। এই রিজার্ভ হাউসে নাকি যে কোনো লোককে ডেকে এনে যখন তখন গুলি করে হত্যা করা যায়।... দীর্ঘদিন ধরে পাবনার আদালতে নাকি কোন বিচার বসছে না। বিচারকরা শঙ্কিত। তাদের নাকি কোন বিচারের কাজ করতে দেওয়া হয় না। জেলা ছাত্রলীগের নির্দেশে রায় দিতে হয়।” 

আমার জবানবন্দি, নির্মল সেন, পৃষ্ঠা ৫৮০-৮১। পরে ‘পাবনায় একটি রিজার্ভ হাউস’ শিরোনামে নির্মল সেন দৈনিক বাংলায় [সরকারি] উপ-সম্পাদকীয় লেখেন। এর পরে পাবনায় আরও ঘটনা ঘটে। ‘রিজার্ভ হাউস’ বন্ধ হয়। তবু এই খবরের ব্যাখ্যা নির্মল সেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী মনসুর আলীকে দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেও জানিয়েছেন। 

ঘটনাটি ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দের। এর পরে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা নতুন করে ভাবতে হয়েছে বইকি। হিসাবই আলাদা। পতনেরও সিঁড়ি। আমি নির্মল সেনের ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’ পড়ে দেখেছি। তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি হিসাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে বিচিত্রায় যে ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন, তাও পড়েছি। আমার উপলদ্ধি গণমাধ্যমের জন্য সবসময় স্পর্শকাতর। কিন্তু আমি ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় মনে করি না। দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, দালালদের কুমতলবে অবরুদ্ধ থাকায় স্পর্শকাতর রেফারেন্স দিতে পারিনি। ভবিষ্যত ইচ্ছা অবদমন করিনি। কলম থামানো যায় না বলে গভীর আস্থা রাখছি।

২০১৮ খ্রিস্টাব্দে ২২ ডিসেম্বর একজন সংসদ সদস্যের হলফনামার খবর প্রকাশ হয় দৈনিক যোগফলে। পরে গভীর রাতে [২৩ ডিসেম্বর ২০১৮] ফোন আসতে থাকে যোগফলে। নিজের দেওয়া হলফনামা নিয়ে কত আপত্তি ওই সাংসদের। কথা হয় সাড়ে আঠারো মিনিট। এর পরে ফোন আসে নেতা নামধারী এক পেশাজীবীর। তিনি হুমকি দিয়ে জানতে চান ওকালতি করে সাংবাদিকতা করা যায় কিনা (প্রশ্নটি নির্বোধের মতো)। অথচ তিনি (হুমকিদাতা) ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুলাই গাজীপুর সিটি নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হিসাবে সাংবাদিকতার কার্ড নিয়েছেন। ওই কার্ড কেবল তার আত্মীয়কে ভোটে হেল্প করার কাজেই লাগিয়েছেন। তাকে কার্ড পাইয়ে দিতে সহায়তা করেছেন দালালদের একজন।

বেচারার প্রশ্নটি এখনও কানে বাজে? তিনি যে কার্ড গলায় ঝুলিয়ে ছবি তুলেছিলেন, তাও যোগফল মর্গে রয়েছে।

হঠাৎ দেখছি ওই নামধারী একটি ‘ভাড়া খাটা’ কাগজের বিরাট পোস্টে পদধারী। নাম তাও প্রিন্টার্সে। প্রিন্টার্সে এমন পদ লেখা যায় কিনা এটি আমার জানা নেই। ওই দালালই ভালো বলতে পারবে। নাও বলতে পারে, জানা থাকার ব্যাপার তো। কাউকে খুশি করতে গেলে নিয়ম আর কতটা মানা যায়? আবার পেশাজীবী পদবীটিও ঠিক বানানে লেখতে পারেনি প্রিন্টার্সে। এক লাইনের প্রিন্টার্সে সড়কের নাম, অফিসের নামও ভুল বানানে লেখা। এমনকি যে পদ লেখা হয়েছে, এর পরিপূরক কোন পদের নাম নেই। প্রকাশকের নাম তো নেই-ই। তবু তারা সাংবাদিক। তারাই দাবড়িয়ে বেড়ায় বিভিন্ন দফতর। দুর্নীতিবাজরাও তাদের সহায়তায় টিকে থাকে। সুযোগ পেলে কুমতলব কাজে লাগায়। নিজের পিঠ বাঁচাতে এরা পারে না এহেন কাজ নেই।

এমন স্ববিরোধী ব্যক্তিরা সব পেশাকে কলঙ্কিত করে ফেলেছে। নিজেও জানে না  কোথায় কি প্রমাণ রেখে এসেছে, তবু হুমকি দেয়! এমন ব্যক্তির সঙ্গে এসব নাম জড়ানো হয়েছে, যার নামের অযোগ্যতা এর আগে সরকারিভাবে প্রমাণ হয়েছে। বলতে গেলে প্রতারক।

আসছি আবার শিরোনামের দিকে। দৈনিক বাংলা ১৭ জুন ১৯৭৫ একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। এটি স্মরণযোগ্য ও প্রনিধানযোগ্য। সেখানে বলা হয়, ‘সংবাদপত্র ডিক্লারেশন বাতিল অধ্যাদেশ জারি।’ এ সংবাদে লেখা হয়, ‘সরকার সোমবার [১৬ জুন ১৯৭৫] ১৯৭৫ সালের সংবাদপত্র ডিক্লারেশন বাতিল অধ্যাদেশ জারি করেছেন। এই অধ্যাদেশ দ্বারা ‘বাংলাদেশ অবজারভার’ ‘দৈনিক বাংলা’ এবং ১২২টি সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকা ছাড়া দেশের আর সমস্ত সংবাদপত্রের ডিক্লারেশেন আজ ১৭ জুন থেকে বাতিল বলে গণ্য হবে। অধ্যাদেশ জারি করার পরপরই সরকার ঢাকা থেকে দুইটি সংবাদপত্র ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ ও ‘বাংলাদেশ টাইমস’ প্রকাশনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। ফলে চারটি দৈনিক এবং ১২২টি সাময়িকী ছাড়া অন্য কোন সংবাদপত্র বা সাময়িকী বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা যাবে না।

১২২টি সংবাদপত্র তেমন প্রভাবশালী ছিল না। জনগণের ওপর এসব পত্রিকার কোন প্রভাব ছিল না কিনা তাও কেউ জানত না। এখনও জানে না।

২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ১৬ জুন ফেসবুকে একজন সাংবাদিক কয়েকজন সাংবাদিক নেতার ছবি আপলোড করে সংবাদপত্রের কালো দিবসের আলোচনা হয়েছে বলে জানান। ওই সাংবাদিক গাজীপুরের একটি সাংবাদিক সংগঠনের সদস্য। তিনি আবার শিক্ষকও।

কয়েকদিন পর তিনি তার ওই ‘পোস্ট ডিলিট’ করে দেন। আহা রে ‘শখের সাংবাদিকতা’। এরাই হচ্ছে সাংবাদিকতার হর্তাকর্তা। কেবল পোস্ট ডিলিট করেননি, লিখেছেন তিনি আগে যে পোস্ট দিয়েছিলেন তা সত্য নয়। এমন কোন ঘটনা ওইদিন ঘটেনি! এতেও প্রমাণ হয় আসলে একটা কিছু ঘটেছিল।

আচ্ছা বলুন তো, যদি ওই দিন কোন আলোচনা না হয়ে থাকে, তা হলে তিনি যে ছবি পোস্ট করেছিলেন সেগুলো কোথা থেকে এসেছিল? অথবা যদি ওই ঘটনা ছাড়া তিনি এমন মিথ্যাচার করে থাকেন, তা হলে তার শাস্তি কি? একটি সংগঠনের ব্যানার ব্যবহার করে দেওয়া ওই পোস্ট এতই ‘হালকা’? কালো দিবস পালন কি নিষেধ? না, যাদের জন্য দালালি তারা চায় না।

আসলে কোথায় তিনি ‘ধমক’ খেয়েছেন, কে জানে। মেরুদণ্ড ছাড়া সাংবাদিকতা বড়ই বেমানান। কেবল দালালি করতে মেরুদণ্ড লাগে না।

কলমের এক খোঁচায় সেদিন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল দৈনিক আজাদের মতো প্রাচীন, প্রভাবশালী এবং তখনও ব্যাপক প্রচারসংখ্যার দৈনিক পত্রিকা দৈনিক পূর্বদেশ, সংবাদ, মর্নিং নিউজ, পিপলস, গণকণ্ঠসহ ৮৭টি দৈনিকসহ ৪ শতাধিক পত্রিকা। পাকিস্তানিরা পুড়িয়ে দিয়েছিল ‘দি পিপল’। এটি চালু হয়েছিল যুদ্ধ শেষে। কিন্তু পিপলও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বন্ধ হয় জনপদ। এর সম্পাদক ছিলেন আব্দুল গাফফার চৌধুরী। পত্রিকাটির মালিকানা ছিল একজন মন্ত্রীর।

গণতন্ত্রকামী, দেশপ্রেমিক প্রতিটি মানুষের রাজনৈতিক ও মৌলিক অধিকার হরণের এক বেদনাবিদ্ধ দিন ১৬ জুন। গণতন্ত্রের গালভরা বুলি আউড়িয়ে, কথায় মৌলিক অধিকারের ফুলঝুড়ি ছড়ানো যায়, কিন্তু বাস্তবতার চেহারা মিলানো যায় না।

যারা আদর্শের কথা বলেন, চেতনার কথা বলেন, তারা বলতে পারবেন যদি চার পত্রিকা ছাড়া আর কোন পত্রিকা না থাকতো, তা হলে আজ আপনি কোথায় সাংবাদিকতা করতেন। কিভাবে সম্পাদক হতেন। কিভাবে প্রকাশক হতেন? যারা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা বলে লাগাম ছাড়া হচ্ছেন, টকশোতে ফেনা তুলছেন, তারা কি আদৌ সাংবাদিক হিসাবে নাম লেখানোর সুযোগ পেতেন? যারা এত নিবন্ধ প্রবন্ধ লেখছেন, এসব কোথায় প্রকাশ করতেন? আসলে ‘বুদবুদ’ আপনাদের বয়ান। সত্য মিথ্যা যাচাই করার ক্ষমতাও নাই, স্ববিরোধীতা আঁচ করার ক্ষমতাও নাই। যা বলেন, এর বাস্তবতা মিলিয়ে দেখেন যোগফল কত হয়?

৬০ বছর সাংবাদিকতা করেছেন সিরাজুর রহমান। তিনি সবচেয়ে বেশি সময় কাজ করেছেন বিবিসিতে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ইন্টারভিউ প্রচার করার সুযোগ তিনি করে দিয়েছিলেন ব্রিটেনে। ‘এক জীবন এক ইতিহাস’ তার বিখ্যাত গ্রন্থ। সাংবাদিকতার মূল্যায়ন তিনি বয়ান করেছেন ওই গ্রন্থে। চার পত্রিকা রেখে, বাকি পত্রিকা বন্ধের বিস্তারিত ফিরিস্তি সেখানে রয়েছে।

সাংবাদিক তুষার আব্দুল্লাহ রচনা করেছেন ‘দলবাজির সাংবাদিকতা’। এটিও সাংবাদিকদের পাঠ্য হতে পারে। অন্তত যদি কেউ ‘দাস’ হতে চায় তা হলেও।

১৯৭২-১৯৭৫ সালে প্রথম কিস্তিতে অবমাননাকরভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল দৈনিক বাংলার সূচনাকারী সম্পাদক প্রতিথযশা সাহিত্যিক আবুল কালাম শামসুদ্দীনকে। মিথ্যা অভিযোগে দীর্ঘদিন যাবত কারা নির্যাতন করা হয় দৈনিক পূর্বদেশ সম্পাদক মাহবুবুল হককে [ভাষা সংগ্রামী]। তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হলেও তাকে ওই পদে ফিরে যেতে দেওয়া হয়নি। ‘সুপ্রীম টেস্ট’ শীর্ষক সম্পাদকীয় লেখায়  অন্যায়ভাবে অপসারণ করেছিল ‘বাংলাদেশ অবজারভার’ সম্পাদক এ দেশের সমাজের কিংবদন্তীতুল্য ব্যক্তিত্ব আব্দুস সালামকে। অপশাসনের বিরুদ্ধে অকুতোভয়ে কলম চালনার দায়ে দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি আল মাহমুদকে বাস করতে হয়েছিল কারাগারে। বন্ধ করা হয়েছিল ওই পত্রিকাটি । 

সংসদে লবণের রিপোর্ট লেখার কারণে চাকরি হারায় দুই সাংবাদিক। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে ১ জানুআরি ছাত্র সমাবেশে পুলিশের গুলিতে নিহতের ঘটনায় ‘টেলিগ্রাম’ প্রকাশ করে চাকরি হারান বর্তমানে জনকণ্ঠের উপদেষ্টা সম্পাদক তোয়াব খান [বঙ্গবন্ধুর তথ্য কর্মকর্তা হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন] ও হাসান হাফিজুর রহমান [ভাষা সংগ্রামী]।

সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের সূচনাকারী মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী প্রকাশ করেছিলেন ‘সাপ্তাহিক হক কথা’। এটিও বন্ধ করা হয়। বাজেয়াপ্ত করা হয়। আমার সুযোগ হয়েছে হককথার সব সংখ্যা পড়ে দেখার। বিচিত্রায় প্রকাশ হওয়া স্বাধীনতার এক দশকের সেরা রাজনৈতিক কলাম সংকলন করেছেন সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ। তার সম্পাদিত দুইটি সংকলনই পড়েছি। মুক্তিযুদ্ধকালে দেশ ও দেশের বাইরে থেকে প্রকাশ হওয়া ২৩৪টি সংবাদপত্রের ২৫ খন্ডে সংকলন করেছেন মুনতাসীর মামুন ও হাসিনা আহমেদ। এসবও উল্টে পাল্টে দেখেছি সাংবাদিকতার স্বাধীনতা আঁচ করতে। ১৮৪৭ থেকে প্রকাশ হওয়া বাংলা সংবাদপত্রের সেরা রচনাগুলো পড়েছি ১৭ খন্ডে। যদিও ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সংবাদপত্রের যাত্রা শুরু হয়।

সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে হরণ করা হয় দেশের মানুষের বাক ও ব্যক্তিস্বাধীনতাসহ সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। সেই থেকে প্রতিবছর ১৬ জুন এদেশের সংবাদিক সমাজের কাছে একটি ‘কালো দিন’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে ১৯৭৫ সাল থেকে। অনেকে ইচ্ছা করে মিথ্যা কথা না বললেও, সত্য কথা বলেন না। যা মিথ্যারই শামিল।

দৈনিক স্বদেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রেস এন্ড পাবলিকেশন্স এ্যাক্ট-এর বলে গ্রেফতার করা হয় ‘নয়াযুগ’ পত্রিকার সম্পাদককে। এর আগে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল লাল পতাকা, গণশক্তি, স্পোকসম্যান, মুখপত্র পত্রিকা। চট্টগ্রামের দেশ পত্রিকাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

১৯৭৪ সালে বহুল আলোচিত বিশেষ ক্ষমতা আইন জারি করে। যে আইনের ১৬ থেকে ১৮ এই তিনটি ধারায় সংবাদপত্রকে নিয়ন্ত্রণের সব আয়োজন ছিল। ১৯৯১ সালে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের অস্থায়ী সরকার সাংবাদিকদের দাবির মুখে সংবাদ মাধ্যমের এই কালাকানুন তুলে নিয়েছিলেন।

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুআরি জাতীয় সংসদে চতুর্থ সংশোধনী পাস করে। ওই বিধান বলে দেশের সকল রাজনৈতিক দলের অবলুপ্তি ঘটিয়ে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠনের মাধ্যমে এক দলীয় প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতির সরকার কায়েম করা হয়। 

১৯৭৫ সালের ১৩ জুন ৪২১ নম্বর গেজেটের মাধ্যমে জারি করা হয় সংবাদপত্রের ডিক্লারেশন বাতিল সংক্রান্ত ‘নিউজ পেপারস (এনালমেন্ট অব ডিক্লারেশন) অর্ডিন্যান্স ১৯৭৫’।

২৫ জানুআরি বাকশাল কায়েমের মাত্র দুইদিনের মাথায় ২৭ জানুআরি টিপু সুলতান রোডে অবস্থিত গণকণ্ঠ পত্রিকা অফিস পুলিশ দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিল সরকার। পত্রিকার সম্পাদক আল মাহমুদ জানিয়েছিলেন, এতে পৌনে ৩০০ সাংবাদিক-কর্মচারী বেকার হয়েছিল। ১৯৭৩ সালের মুদ্রণ ও ছাপাখানা আইন প্রয়োগ করে এটা করা হয়েছিল। আল মাহমুদ তার আত্মজীবনীতে এসব বর্ণনা দিয়েছেন।

চারটি সংবাদপত্রের কার্যকরতা বলবৎ রেখেই সেখানে দলীয় লোক বসিয়ে দেওয়া হয়। তখন যারা সম্পাদক পদ পেয়েছিলেন তারা হচ্ছেন: দৈনিক ইত্তেফাকের নূরুল ইসলাম পাটোয়ারী [একজন মন্ত্রীর আত্মীয়], ডেইলি বাংলাদেশ অবজারভারের ওবায়দুল হক, ডেইলি বাংলাদেশ টাইমসের শেখ ফজলুল হক মণি [বঙ্গবন্ধুর ভাগিনা, তিনি বাকশালের যুগ্ন সম্পাদক ছিলেন] ও দৈনিক বাংলার এহতেশাম হায়দার চৌধুরী। শেখ ফজলুল হক মণির বাংলা পত্রিকা বাংলার বাণীও বন্ধ হয়। বাংলার বাণীতে প্রকাশ হওয়া শেখ ফজলুল হক মণির রাজনৈতিক কলাম সংকলন করেছেন ফকীর আব্দুর রাজ্জাক।

এ সময়ে হাজারও সক্রিয় সাংবাদিক রাতারাতি চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন। ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনাবলীর পরে সংবাদপত্রের উপস্থিতি না থাকায় আওয়ামীলীগ সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়ে। কারণ তাদের পক্ষে লেখার জন্যও কোন সংবাদপত্র ছিল না।

আশাবাদী হই একটি কারণে। উদহারণ নয়, দৃষ্টান্ত দেখে। জাতীয় সংসদে সরকারি দলের সদস্য হয়েও বাকশালে যোগদান করেননি ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ও জেনারেল আতাউল গণী ওসমানী। স্বতন্ত্র হিসাবে নির্বাচন করে জাসদে যেগদান করেছিলেন আব্দুল্লাহ সরকার। তিনি জাতীয় সংসদে বাকশাল বিরোধী ও ১৯৭৩ সালের ছাপাখানা ও প্রকাশনা (ডিক্লারেশন ও রেজিস্ট্রেশন) আইন বিরোধী যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা পড়ে আমি মুগ্ধ। রাজনীতির কারণে তাকে চিনতামও। তাকে আজ শ্রদ্ধা জানাই। হুলিয়া মাথায় নিয়ে ঘুরেছেন, তবু বাকশালে যোগ দেননি।

এমন লড়াই জারি রাখব আজীবন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য। দালালদের উচ্ছেদের জন্য। ঘুষখোর দর্নীতিবাজদের উচ্ছেদের জন্য।

আসাদুল্লাহ বাদল: সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক যোগফল, ১৬ জুন ২০২০।



এই বিভাগের আরও