শাবাশ আইজিপি, ‘বাস্তবায়ন’ দেখাতে পরামর্শ নিবেন?

আসাদুল্লাহ বাদল

18 Jun, 2020 11:33am


শাবাশ আইজিপি, ‘বাস্তবায়ন’ দেখাতে পরামর্শ নিবেন?
বেনজীর আহমেদ

‘আমাকে স্বাধীনতা দাও অথবা মৃত্যু দাও’ এই উক্তি করেছিলেন আমেরিকান রাজনীতিবিদ প্যাটরিক হেনরি। এটি এখনও গ্রহণযোগ্য। নিচের লাইনেই রয়েছে বাণীটির তাৎপর্য।

“পুলিশ সদস্যরা কোনোভাবেই কোন ধরনের দুর্নীতির সাথে যুক্ত থাকতে পারবেন না। পুলিশকে দুর্নীতিমুক্ত হতে হবে। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যারা অবৈধ অর্থ উপার্জন করে বড়লোক হতে চান, বাংলাদেশ পুলিশ তাদের স্থান নয়। তারা পুলিশের চাকরি ছেড়ে বাড়ি গিয়ে ব্যবসা করে বড়লোক হওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।”

আইজিপি ডক্টর বেনজীর আহমেদ মঙ্গলবার [১৬ জুন ২০২০] বিকালে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, ঢাকা ও ময়মনসিংহ রেঞ্জ এবং গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি এবং পুলিশ সুপারদের সাথে ভিডিয়ো কনফারেন্সের মাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার সময় এ কথা বলেন।

তিনি আরও বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান 'জিরো টলারেন্স'। কোন পুলিশ সদস্য মাদকের সাথে অথবা মাদক ব্যবসার সাথে সম্পর্কযুক্ত থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সূত্র: দৈনিক যোগফল, ১৭ জুন ২০২০। 

এই আলোচনা যথেষ্ট গুরুত্বের দাবিদার। আমার নিজের অভিজ্ঞতা, সাংবাদিকতার চোখে দেখা মিলিয়ে যাওয়া ‘মলিন স্বপ্ন’ ভেসে ওঠায় অসফল মত পেশ করছি। ‘তাক লাগানো’ বক্তব্য নয়, হিসাবের খাতায় যোগফল দেখতে চাই। আন্তরিকতার সঙ্গে আইজিপি বেনজীর আহমেদ নির্দেশনামূলক বক্তব্য দিয়েছেন এই বিশ্বাস রয়েছে। আইজিপি আরও যে পয়েন্ট ধরেছেন সব বাস্তবায়নযোগ্য। শাবাশ জানাই তাকে। অন্তত একটি বাতাস চালু করেছেন তিনি। কখন শুরু করবেন এটি প্রশ্ন। এমন একটি সমাজ রাষ্ট্র কায়েম করতে না পারলে কল্যাণ রাষ্ট্রের স্বপ্ন অহেতুক। এই কথার সূত্র ধরে এগিয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ।

বেনজীর আহমেদ ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র বলে জানি। তিনি ভালো আবৃত্তি করেন বলেও জানি। নিশ্চয়ই তিনি কবি জন মিল্টনের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সম্পর্কিত লেখা ‘অ্যারিওপোটিকা’ [১৬৬৪] সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন। এটি আমলে নিলেই অনেক কিছু সম্ভব। গণমাধ্যমকে কেন রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়? ঘুষের সংবাদের অনুসন্ধানকালে সাংবাদিককে আটক করে কারাগারে পাঠানোর ষোলকলা পূর্ণ করার জন্য? গাজীপুরে সম্প্রতি এই ঘটনা ঘটেছে। নসিহত করা লাগবে না, অভিযোগটি আমলে নেন।

জনগণ মাত্রই পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়ার মতো অবস্থা বিরাজ করছে এটি মনে করা যায় না। অনেকে পুলিশকে প্রভাবিত করে, নিজে লাভবান হয়। ফলে তিনি (প্রভাবিত করা ব্যক্তি) অভিযোগ দায়ের করবেন কেন। গণমাধ্যম এ ব্যাপারে গন্ধ পেলে জানাতে [নিউজ] পারে। তাই বলে গণমাধ্যমকে আটকে দিবেন। ক্ষমতার অপব্যবহার যেন না হয়। পিঠ চুলকিয়ে নেওয়াও অনৈতিক সুবিধা।

ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়ন করতেন হাসান মাহমুদ খন্দকার বলে জানতাম। তিনি সবচেয়ে বেশি সময় আইজিপি ছিলেন।

একজন সহপাঠী এসপি হিসাবে বছর খানেক আগে পদোন্নতি পেয়েছে। একজন প্রতিবেশিও এসপি হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। আরও অনেকেই চেনা, নানাভাবে। তাদের সম্পর্কে যে ধারণা সেটি থেকেও প্রশ্ন তুলতে চাই। কাজে লাগলেই হলো।

যিনি পুলিশ বাহিনীতে যোগদান করেছেন, এখনই তার সম্পদের হিসাব নেন। আইজিপিকে এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। বৈবাহিক সম্পর্ক ও রক্তের সম্পর্ক উভয়কেই এই হিসাবের আওতায় আনতে হবে। স্ত্রী, সন্তান, শ্যালক, শালিকা, শশুড়, শ্বাশুড়ি, ভাই বোন, পিতা মাতাসহ হরেক রকম আত্মীয়ের সম্পদ বেড়ে যায় বানের পানির মতো। দানপত্র হেবা দলিলের পরিমাণও বেড়ে যায়। কিভাবে বাড়ে চারদিকে। সমাজে আর কারও এভাবে বাড়তে পারে না? বেনামে গড়ে উঠে অনেক কিছু।

কোন স্কেলে, কে চাকরি করে, বেতন রেশন কত? বাসা ভাড়া, পরিবারের খরচ কত, জীবনমান কেমন? সন্তানেরা কোথায় পড়াশোনা করে? কত খরচে এই পড়াশোনা করা যায়? ব্যাংক বিমা, আসবাবপত্র, অলঙ্কার কেমন? হঠাৎ জন্মবার্ষিক বা বিবাহবার্ষিকে ‘সোনাদানার’ পাহাড় ‘জমে’ না তো? এমন আরও অনেক সূত্র মিলালেই সমীকরণ মিলে।

ঢাকা, গাজীপুর বা নারায়ণগঞ্জের যেকোন রাস্তায় দুই চার ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকবেন। চোখে পড়বে ‘পুলিশ’ স্টিাকার লাগানো প্রাইভেট গাড়ি। এসব গাড়ি মোটেও সরকারি নয়। নিজের টাকার গাড়িতে এই স্টিকার লাগানোর কোন আইন আছে কি? সোজা উত্তর নাই। তা হলে আইনের ‘রক্ষক’ এই স্টিকার লাগানোর মধ্যে দিয়ে কি সোজা পথে হাঁটছেন? ‘পুলিশ’ স্টিকার লাগানোর নিশ্চয়ই কতগুলো সুবিধা আছে। পুলিশ [আইনশৃঙ্খলাবাহিনী] ছাড়া আর কেউ কি কারও গাড়ি তল্লাশী করতে পারে? জাত ভাই কেন পুলিশ লেখা গাড়ি তল্লাশি করবে? এতে কি কোন অপরাধ ঘটার কারণ থাকতে পারে না? আবার এই সুযোগে পুলিশ না হয়েও কেউ এমন ‘স্টিকার’ লাগিয়ে কোন ঘটনা থেকে পার পেয়ে যেতে পারে। ছোট সূত্র থেকেই বড় সফলতা আসতে পারে।

“প্রাতিষ্ঠানিক গাড়ি ছাড়া ব্যক্তিগত গাড়িতে পুলিশ, প্রেস বা কোন স্টিকার ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়েছে ঢাকার পুলিশ।” বিবিসি বাংলা, ৪ মে ২০১৬। এখান থেকে বাকিটা আন্দাজ করে নেন। অন্য যারা আইন মানছে না, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে নিজেকে [পুলিশ] সোজা লাইনে থাকতে হবে।

“দুর্নীতি বন্ধ করার প্রধান শর্ত হলো মান সম্মত সেলারি (বেতন) ও অন্য সুযোগ সুবিধা না দেওয়া। কনস্টেবলদের যে বেতন দেওয়া হয় তা দিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়। উচ্চতর স্কেল দিয়ে নতুন আইন তৈরি করে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। নিয়োগ বিধিতে পরিবর্তন আনতে হবে। বহিরাগত সাব ইন্সপেক্টর নিয়োগ বন্ধ করে শিক্ষিত এবং মেধাবী কনস্টেবলদের প্রমোশনের ব্যবস্থা করতে হবে। গ্রাজুয়েট পাস কনস্টেবল ভর্তি করতে হবে।” বাংলাদেশ পুলিশ এর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ‘মুন্নাফ মাকসুদ’ ওই মন্তব্য করেছেন (আইজির বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ জুন ২০২০)। এমন দাবি সব সময় করা হয়, এখনও এই দাবি বিবেচনা করা যেতে পারে।

এএসপি পদে যারা যোগদান করেন, এসআই ও কনস্টেবল পদে যারা যোগদান করেন; তাদের জীবনের গতি আলাদাভাবে বিবেচনায় রাখা দরকার।

শামীমা বেগম ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে সহকারী জজ হিসাবে যোগদান করেন। কিছুদিন তিনি বিচারক হিসাবে দায়িত্ব পালন করে, বিচারকের চাকরি ছেড়ে পরে পুলিশে যোগদান করেন। তিনি পাবনা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসাবে কর্মরত জানতাম। এটি দারুণ দৃষ্টান্ত।

বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে বছর খানেক চাকরি করে পরের বিসিএসে পুলিশে যোগদান করেছেন, এমন একজন বর্তমানে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার হিসাবে কর্মরত। তাকে অনুসরণ করা যেতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা না করে পুলিশে যোগদান করেছেন এমন ব্যক্তিও আছেন। ডিএমপির বর্তমান কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম এর এক সহপাঠী একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমানে অধ্যাপক। ওই অধ্যাপকের সঙ্গে আমার রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল। ডিএমপির কমিশনার সম্পর্কে ধারণা আছে (তিনি একজনের ঘুষের অফার কেবল প্রত্যাখ্যান করেননি, তাকে ‘দুর্নীতিপরায়ণ’ বলে মন্তব্য করেছেন, যুগান্তর ৫ জুন ২০২০)। ওই কমিশনারের এক চাচাতো ভাই গাজীপুরে কর্মরত পুলিশ পরিদর্শক, তিনিও চেনা। ডিএমপির সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া অবসরে যাওয়ার পর ক্যাসিনোর ঘটনায় যে ‘বয়ান’ পেশ করেছেন, তাও জানি। ফলে ধরে নেই অনেক কিছু সম্ভব নয়। এই বলে নিরাশ হবো? মোটেও না। তাদের সম্পর্কে এত চমৎকার ধারণা ডস্টবিনে ফেলে দিবো? না এসব ধারণা একজন পরিদর্শকই লুটিয়ে দিতে পারে।

আর ডিআইজি মিজান পুলিশের জন্য মানহানিকর।

‘বাঘে ছুঁলে এক ঘা আর পুলিশে ছুঁলে ১৮ ঘা’ এই প্রবাদ আর শুনতে চাই না। জনগণের টাকায় বেতন-ভাতা থেকে শুরু করে সব কিছু হয় জানিয়ে, তাই জনগণের সেবায় নিয়োজিত হতে হবে। জনগণের আস্থা বিশ্বাস অর্জনই পুলিশের সবচেয়ে প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব। পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষ্যে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণ। দৈনিক ইনকিলাব, ১০ জানুআরি ২০১৮। এ সময় পুলিশের আইজি ছিলেন এ কে এম শহীদুল ইসলাম। তিনি শরিয়তপুর জেলার নড়িয়া থানার বাসিন্দা। রেল শ্রমিকদের নেতা দেওয়ান মো. আলী তার এলাকার বাসিন্দা। সেই সুযোগে আলোচনা পর্বে ধারণা রয়েছে শহীদুল ইসলাম সম্পর্কে। 

কিন্তু প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রী এমন কথা উচ্চারণ করার পরও তেমন কোন পদক্ষেপ কি পুলিশের পক্ষে নেওয়া হয়েছে? এখন নেওয়া শুরু করেন। তা হলেই চলবে।

এর মাত্র ১৫ দিন পর পুলিশের নতুন আইজি নিয়োগ হন ডক্টর জাবেদ পাটোয়ারী। তিনিও অবসরে চলে গেছেন। ইউসিসি কোচিং সেন্টারের সূচনাকারী ও মালিক আবদুল হালিম পাটোয়ারী টিটো। এই বড় ভাইকে চিনতাম। তার চাচাতো ভাই জাবেদ পাটোয়ারী। এসব ধারণা মগজে গেঁথে রয়েছে। কিন্তু তারা কাজের সুযোগ ও সততার মাপকাঠিতে অনেক কিছু করে যেতে পারেননি। বেনজীর আহমেদ পারবেন বলে ধারণা করছি। প্রধানমন্ত্রীর এই কথাকে এখন আমলে না নেওয়ার কারণ কি থাকতে পারে?

আমি কি অভিযোগ করবো? আদালত যে অভিযোগ করেছে, সেটি আমলে নিলেই তো সেতু পার হতে পারবো। না, আদালতের ওই মন্তব্য নিয়ে ভিন্নমত আছে?

“ওসিরা থানায় সালিশ বসায় কোন সাহসে? তারা (পুলিশ) নিজেরা বিচার বসায় কীভাবে? এত সাহস তারা কোথায় পায়? এত ক্ষমতা তাদের কে দিয়েছে? পুলিশের কাজ তো মানুষের সেবা করা, মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সালিশ করা নয় বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট।” দৈনিক দেশ রূপান্তর, ২ এপ্রিল ২০১৯।

এই মন্তব্য ধরে কি আগানো যায় না? এই সূত্র ধরে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে? না হয়ে থাকলে এখনও শুরু করা যেতে পারে।

“ওই রিট আবেদনের শুনানিতে বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহসান  ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ থেকে এসব মন্তব্য আসে।

আদালত আরও বলেছেন, ‘থানাগুলোতে টাকা ছাড়া জিডি (সাধারণ ডায়েরি) হয় না। অনেক পুলিশকে দেখি কষ্ট করে দিনযাপন করে। কিন্তু অনেক পুলিশের ৪-৫টি সুন্দর সুন্দর বাড়ি রয়েছে। দুদক কি তাদের দেখতে পায় না।” দৈনিক দেশ রূপান্তর, ২ এপ্রিল ২০১৯।

সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী রফিকুল ইসলাম মন্ত্রী থাকাকালে নিজে জিডি করতে গিয়ে টাকা গুনেছেন পরীক্ষা হিসাবে। এই পরীক্ষা এখনও বাতিল হয়নি। আবারও প্রকল্প হিসাবে নিতে পারেন।

আদালত আরও বলেন, ‘ওসিরা যেখানে সেখানে কোর্ট বসায়, রাতে কোর্ট বসায়। তাদের (পুলিশ) এ ক্ষমতা কে দিয়েছে? এত সাহস তারা কোথায় পায়। পুলিশের কাজ তো মানুষের সেবা করা, মানুষের পাশে দাঁড়ানো। তাদের কাজ তো সালিশ করা নয়। ওসি কি সালিশ করতে বসেছেন? তারা সুবিধামতো মামলা নেবেন। অথচ টাকা ছাড়া থানায় জিডি হয় না। ১৩ হাজার পুলিশ যারা থানায় বসেন তাদের কারণে গোটা পুলিশের বদনাম হচ্ছে।’

এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর উদ্দেশ্যে হাইকোর্ট বলেন, ‘আপনি কোট, গাউন খুলে সাধারণ বেশে কোন থানায় একটি জিডি করতে যান। দেখবেন টাকা ছাড়া জিডি হবে না।’ দৈনিক দেশ রূপান্তর, ২ এপ্রিল ২০১৯। এই বক্তব্যের পরও পুলিশ থেমে নেই। নিচের শিরোনামটি দেখুন। 

“শ্রীপুর থানার গোলঘরে নির্ধারিত হয় জমির মালিকানা” দৈনিক মানবজমিন, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯। কি ভাবছেন। ‘চটকদার’ বয়ানে সমাধান আছে। সমাধান আশা করলে কাজে হাত দিতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন তুললেই যদি, প্রশ্ন না শুনেই থামিয়ে দিতে চান, তা হলে চলবে কিভাবে?


গাজীপুর জেলার জয়দেবপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আফজাল হোসাইন একটি সংবাদের তথ্য অনুসন্ধানকালে তিন সাংবাদিককে তাদের অফিস থেকে আটক করে। পরে  তাদের নামে মামলা দেয়। ‘দৈনিক যোগফল’ সম্পাদক প্রকাশককে (অ্যাডভোকেট আসাদুল্লাহ বাদল) ওই মামলায় উল্লিখিত সময়ের বাইরে একটি বানোয়াট অভিযোগে আসামি করা হয়েছে। যিনি পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন ওই নারীকেও আসামি করা হয়েছে। অথচ ওই নারীর বক্তব্যের ভিডিয়োতে অভিযোগ স্পষ্ট। যা পুলিশ তদন্ত না করেই নিজের পিঠ বাঁচাতে চেয়েছে। সূত্র: যেভাবে যোগফলের নামে ‘মামলার ষড়যন্ত্র’।

এই পরামর্শ গ্রহণ করার মানসিকতা থাকবে, না অনুসন্ধান পর্যায়ের মতো আরও মামলার উৎপত্তি হবে?

কমপ্লায়েন্স গার্মেন্টের বাথরুমে ‘অভিযোগ বক্স’ রাখা থাকে। কারণ মালিক পক্ষের ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে পারে না। ওই অভিযোগ বক্সের চাবিও থাকে কমপ্লায়েন্স কর্তৃপক্ষের নিকট। কোন শ্রমিক কারাখানার ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ দিতে পারে ওই বক্সে। দেশের প্রতিটি থানায় অন্তত দুইটি অভিযোগ বক্স স্থাপন করুন। এই বক্সের নিয়ন্ত্রণ রাখুন কাউন্টার পুলিশিং জাতীয় কোন ইউনিটে। অভিযোগ তদন্ত করান আরও একটি ইউনিট দিয়ে। কেবল ‘১০৯’ নম্বরে ফোন করে দুদকে অভিযোগ দেওয়া যায়। বিরাট সাফল্য আসতে পারে।

যাদের এসব ইউনিটে রাখলে ভালো হয়, তারা যেন অভিযুক্তদের বাড়িঘর ‘পরখ’ করতে পারে। ‘চাকচিক্য’ দেখলেই অনেক কিছু ‘ঠাহর’ করা যায়।

এমন কথাও আছে বেতন ছাড়াও চাকরি করতে সম্মত অনেক সরকারি দফতরের বিভিন্ন পদের ব্যক্তিরা। কি কারণে এহেন খায়েশ জন্মে। অথবা কেন বলে থাকি ‘খালি’ বেতনে কি চলে?

একজন আসামি আমার নিকট অভিযোগ করেছিল, তার শরীরে থানার ভেতরে একজন পুলিশ পরিদর্শক বোতলে করে ... ঢেলে দিয়েছেন। প্রমাণ দেওয়া আমার কাজ নয়। সূত্র দিতে পারি। মিলিয়ে দেখেন। চেষ্টা করলেই সফল হতে পারবেন।  এটুকু দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি, ওই ব্যক্তি আসামি [তাকে আসামি বানানো হয়েছে] হলেও তিনি মিথ্যা কথা বলবেন এমনভাবে তাকে আমি চিনি না।

গাজীপুর জেলার শ্রীপুর থানার সাবেক ওসি জাবেদুল ইসলাম যিনি বর্তমানে জয়দেবপুর থানার ওসি, তিনি মামলার এজাহার বদল করেছেন সুবিধা মতো [বাদির সইও দুই রকমের]। সূত্র: শ্রীপুর থানার মামলা নম্বর ৪৩(৫)২০১৯। ওই মামলায় সাংবাদিকদের নিকট দেওয়া এজাহার ও পরে আদালতে দাখিল করা এজাহার ভিন্ন। উভয় এজাহার ফিরিস্তিযোগে আদালতের নথিতে রয়েছে। জয়দেবপুর থানার মামলা নম্বর ১(৬)২০২০ এর এজাহারে কি ঘটেছে, এই রকম একটি অডিয়ো বক্তব্য জয়দেবপুর জিআরও অফিস থেকে যোগফল মর্গে রয়েছে। হতচকিত না হয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেন। গত ১ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখে সুপ্রীমকোর্ট থেকে এজাহার বদলানোর ব্যাপারে নির্দেশনা রয়েছে আইজিপির প্রতি। রাজশাহীর পুঠিয়া থানার সাবেক ওসি সাকিল উদ্দীন আহমদ এজাহার বদল করেছিলেন।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলামের কাছে একজন সদ্য সাবেক যুগ্ম কমিশনার ইমাম হোসেনের ঘুষের অনৈতিক প্রস্তাবের বিষয়ে আইজিকে দেওয়া একটি চিঠির কথা বিভিন্ন গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছে। অপরাধের বিচারের বদলে পুলিশ কর্তাদের কাছে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে অপরাধের তথ্য কীভাবে ফাঁস হয়েছে, তা খুঁজে বের করা। যে সাংবাদিকেরা খবরটি প্রকাশ করেছেন, তাদের এখন পুলিশি তদন্ত কমিটি তলব করেছে। একজনকে এরই মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলেও জানা যাচ্ছে।


গত বছর কনস্টেবল নিয়োগ নিয়ে ক্যারিশমেটিক অভিনয় দেখেছি, এর ‘পোস্টমর্টেম’ বের করতে হলে কতগুলো ব্যক্তির জমি বেচার দলিল দেখতে হবে। জমি বেচার টাকা কি কাজে লাগিয়েছে, এও দেখতে হবে। তারা ঋণ নিয়েছেন কিনা, এটি যাচাই করতে হবে। কার নিকট থেকে ঋণ নিয়েছেন, এটিও দেখতে হবে। জমি বেচে বা ঋণ নিয়ে কি কোন ‘শখ পূরণ’ করেছে? ঋণ পরিশোধ করতে কি পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন, এও দেখতে হবে। কত টাকার দলিল, কত টাকা ঋণ মিলিয়ে নিলেই ‘যোগফল’ মিলানো সম্ভব। ঘটনার সঙ্গে জমি বেচা বা ঋণের সম্পর্ক একটা ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে। বাজার দর কত ‘চাউর’ ছিল?


গাজীপুর জেলা ডিবির তৎকালীন এসআই মফিজুর রহমান মল্লিকের দেড় হাজার পিস ইয়াবা ও জব্দ তালিকা গায়েবের খবর দেখেই তাৎক্ষণিক তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। পরে তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছিল বলে যোগফলকে জানানো হয়েছিল। যারা খবরটি প্রকাশ করেছে, তাদের কারও সাক্ষি নেওয়া হয়নি। কিভাবে তদন্ত হলো? কোথায় তদন্ত হলো? মফিজ পরে কালীগঞ্জ থানায় বহাল হয়!

২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ৬ ফেব্রুয়ারি তিন তরুণকে অপহণের দায়ে ওই দুই পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। 

তারা ছিলেন কালিয়াকৈর থানার এএসআই আবদুল্লাহ আল মামুন ও মির্জাপুর থানার এএসআই মুসফিকুর রহমান। 

“তারা দুইজনই গাজীপুর জেলার ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চে (ডিবি) কর্মরত ছিলেন। তখন থেকেই তাদের মধ্যে সখ্যতা গড়ে ওঠে। এরপর নানা অপরাধে জড়ান”। 

এই দুই পুলিশ এখন কোথায় কি অবস্থায় আছে? তারা কি রেহাই পেয়ে গেছে? শুনেছিলাম, তারা দোষ স্বীকার করেছে!


‘রিমান্ডে থাকাকালে ভয় দেখিয়ে আসামির কাছ থেকে বসত বাড়িসহ ৬২ শতাংশ জমি ও তিনটি গাড়ি নেওয়া হয়েছে দাবি করে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মোজাম্মেল হকসহ ২০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।’ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ১০ এপ্রিল ২০১৯।

‘এক ব্যবসায়ীকে আটক করে ইয়াবা মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে পুলিশের এক উপ-পরিদর্শকের (এসআই) বিরুদ্ধে। গত বুধবার রাতে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর পূর্বপাড়া এলাকায় এই ঘটনা ঘটেছে।

অভিযুক্ত ওই এসআই হলেন কালিয়াকৈরের মৌচাক পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক (এসআই) রফিকুল ইসলাম। তিনি এক সময় গাজীপুর গোয়েন্দা পুলিশে কর্মরত ছিলেন।’ জাগোনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম ও দৈনিক যোগফল, ২১ জুন ২০১৯।

প্রশ্ন হতে পারে পুলিশ ছাড়া আর কোন দফতরে কি ‘অনিয়ম দুর্নীতি ঘুষ’ নেই। একবাক্যে সব দফতরেই আছে। এই সব দফতরের ‘অনিয়ম দুর্নীতি ঘুষ’ উচ্ছেদ করতে হলেও পুলিশ লাগবে। এই কারণে স্বচ্ছ পুলিশ আগে দরকার।

‘মুজিব বর্ষের অঙ্গীকার, পুলিশ হবে জনতার।’ কথাটিতে ফাঁক আছে। ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’ চিরাচরিত এই কথা থেকে বেরিয়ে আসার কোন যুক্তি পাই না। পুলিশ জনগণের বন্ধু থাকুক। পুলিশ জনতার হবে, বললে এখন জনতার নেই বা আগে জনতার ছিল না এমন প্রশ্ন সামনে চলে আসে বইকি।

করোনাকালে পুলিশের কৃতিত্ব বিশেষ সম্মান বয়ে এনেছে। অসাধ্য সাধন বলা যেতে পারে। জীবন দেওয়া থেকে শুরু করে, লাশ দাফন। যখন নিকট আত্মীয় ভেগে যাচ্ছে। এরচেয়ে বেশি কিছু আশা করার নেই। তবু অনিয়মের অভাব নেই।


ওই যে রূপকল্পের কথা বলেছেন আইজিপি। ‘রূপকল্প’ বাস্তবায়ন করলে পুলিশকে  ভেতরে রেখেই করতে হবে। বুকে হাত দিয়ে প্রত্যেকের বলা উচিত অন্তত করোনাকালে ‘অনিয়ম দুর্নীতি ঘুষ’ থেকে দুরে থাকব। পরে আর আগের স্বভাবে ফিরব না। তবেই একটি স্বপ্নের বাংলাদেশ সম্ভব। আর না হলে যার যার পকেটে চলে যাবে সব।

এই লেখায় অনেকগুলো অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। এহেন অভিযোগের তলে তলিয়ে যায়, অসংখ্য ভালো কাজ। ফলে এহেন অভিযোগের সূত্রে সমীকরণ মিলিয়ে নেন। যদি আরও বক্তব্য আশা করেন, তাও দিতে পারব। ‘আরও বক্তব্য দিতে চান’ লিখে একজন পুলিশ পরিদর্শককে মেসেজ পাঠিয়ে ছিলাম। তিনি এটিকে হুমকি বিবেচনা করে এজাহার সাজিয়েছেন!

যোগফলের নামে ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দায়ের হওয়ার পর চুপসে যাওয়াদের ভিড়ের লাইন দেখে, আবার বলছি একদিনে ‘সব বেচে’ দিলে দোকান চলবে কিভাবে? সব বেচা হয়ে গেলেও একজন অবিক্রিত থাকে। একজনই আঙুল তুলতে পারে। একজন আঙুল তুললেই চলে।

গণমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ না ভাবলে, গণমাধ্যমই হতে পারে পুলিশকে স্বচ্ছ জায়গায় তুলে আনতে সহায়ক শক্তি। গণমাধ্যম মাত্রই স্বচ্ছ এই কথা কখনই বলছি না। অভিযোগ তদন্ত করতে হবে স্বচ্ছভাবে।

আসাদুল্লাহ বাদল: প্রকাশক ও সম্পাদক, দৈনিক যোগফল, ১৮ জুন ২০২০।



এই বিভাগের আরও