গাজীপুরে করোনা পরীক্ষার ফল পেতে দেরি, সংক্রমণ বাড়ছেই

যোগফল প্রতিবেদক

19 Jun, 2020 08:48pm


গাজীপুরে করোনা পরীক্ষার ফল পেতে দেরি, সংক্রমণ বাড়ছেই
ছবি : সংগৃহীত

যোগফল প্রতিবেদক : গাজীপুরে করোনা উপসর্গ সন্দেহে নমুনা সংগ্রহ করা হলেও ফল মিলছে না স্বল্প সময়ে। পিসিআর ল্যাব থাকার পরও নমুনা পরীক্ষার ফল পেতে সময় লাগছে ১০ থেকে ১২ দিন। ফল আসতে বিলম্ব হওয়ায় নমুনা নেওয়া ব্যক্তিরা করোনায় আক্রান্ত কিনা দ্রæত সময়ে জানতে পারছে না। নমুনা দেওয়া ব্যক্তিরাও ঘুরে বেড়াচ্ছেন যেখানে সেখানে। আক্রান্ত ব্যক্তির সংর্স্পশে আসা ব্যক্তিরা নিজে যেমন সংক্রমিত হচ্ছে তেমনি অন্যদেরও সংক্রমিত করছেন। এতে গাজীপুরে প্রতিদিনই বাড়ছে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা।

এদিকে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে করোনার উপসর্গ নিয়ে ৫৫ বছর বয়সী একজনের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার [১৮ জুন ২০২০] সন্ধ্যায় জ্বর, ঠান্ডা ও কাশি নিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসলোসনে ভর্তি হওয়া ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়।

শুক্রবার [১৯ জুন ২০২০] গাজীপুরে নতুন শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৮৮ জন। আগের দিন ছিল শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৭৪ জন। এ নিয়ে জেলায় মোট রোগী ২ হাজার ৬৭৩ জন। জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য মতে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মারা গেছে ২৮ জন। এর পরে মারা গেলো আরও একজন।

গাজীপুরের কোনাবাড়ি এলাকার বাসিন্দা ও চাকুরিজীবী আসলাম হোসেন (৪০) করোনায় আক্রান্ত হয়ে এখন সুস্থ্য আছেন। তিনি বলেন, গত ১ জুন থেকে তার জ্বর, সর্দি ও কাশি শুরু হয়। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ঔষধ সেবন ও টুটকা চিকিৎসা নেন। গত ৩ জুন করোনা পরীক্ষা করতে দেন। ১৪ জুন সন্ধ্যায় তাকে ফোন করে করোনা পজেটিভ বলে জানানো হয়। এরই মধ্যে তার জ্বর চলে যাওয়ায় অফিস করতেও শুরু করে দেন। এই সময়ে তার সংস্পর্শে অনেকেই এসেছেন। 

শুধু আসলাম হোসেন নয় তার মতো গাজীপুরে শত শত মানুষ পরীক্ষার ফল পেতে দেরি হওয়ায় করোনা সংক্রমিত ব্যক্তিরা প্রতিনিয়ত ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে ধারনা করা হচ্ছে। অনেকে উপসর্গ নিয়ে কর্মক্ষেত্রে গিয়ে কাজও করছেন। এতে করোনাভাইরাসের সংক্রামন বেড়েই চলছে।

শরীরে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কিছু লক্ষণ দেখেই মানুষ হুরোহুরি করে ছুটছেন পরীক্ষাকেন্দ্রে। পরে ফল পাওয়ার জন্য থাকতে হচ্ছে দীর্ঘ প্রতীক্ষায়। কারণ পরীক্ষার ফল না পাওয়া পর্যন্ত সে নিশ্চিত হতে পারছেন না, করোনায় আক্রান্ত কি না। এদিকে গাজীপুরে জ্বর, সর্দি, কাশির মত লক্ষণ নিয়ে করোনাভাইরাস পরীক্ষা করার জন্য নমুনা জমা দিলেও পরীক্ষার ফল আসতে কখনো চার-পাঁচ, আবার কখনও ১০-১২ দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

গাজীপুরের এক স্বাস্থ্যকর্মী গত ২ জুন করোনা পরীক্ষা করতে দিয়েছেন। তার ফল পেয়েছেন গত ১৫ জুন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, জ্বর, কাশি ও ঠান্ডা সর্দি থাকায় করেনোভাইরাস পরীক্ষা করতে দিয়েছেন। তৃতীয় দিন থেকে সুস্থ্য হয়ে গেছেন। তিনি সাতদিন আইসোলেশনে থাকার পর বাহিরে বের হচ্ছেন। অবশেষে গত ১৫ জুন তাকে ফোন করে জানানো হয় আপনি করোনা পজিটিভ। ১৬ জুন তিনি ফের করোনাভাইরাস পরীক্ষা করতে দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তার ফল পায়নি।

গাজীপুর সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরের কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গত ৭ জুন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান পিসিআর ল্যাবটি উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পর থেকে নমুনা পরীক্ষা শুরু হয়েছে। সেখানে শুরুতে প্রতিদিন ৫০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। তবে এখন প্রতিদিন ১৮৪ টি নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। অথচ জেলায় প্রতিদিন ৪৫০ থেকে ৫০০ নমুনা পাওয়া যাচ্ছে। গেল এক সপ্তাহে ২ হাজারের অধিক নমুনা পরীক্ষায় ৩ শতাধিক মানুষ করোনা পজিটিভ হয়েছেন। গাজীপুরে পিসিআর ল্যাবে ১৮৪ টি নমুনা রেখে বাকি সংগ্রহ করা নমুনাগুলো ঢাকার আইইডিসিআরসহ বিভিন্ন পরীক্ষাগারে পাঠানো হচ্ছে। কিছু দিন আগে ১০-১২ দিন সময় লাগলেও এখন পরীক্ষার ফল ১ থেকে ৫ দিনের মধ্যে দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে গাজীপুর স্বাস্থ্য বিভিাগ। 

আক্রান্তদের মধ্যে উপসর্গ কম থাকায় অনেকেই মনে করছে তারা করনোয় আক্রান্ত নয়। যার কারনে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে অন্যদের সংস্পর্শে গিয়ে পরিবার ও অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ করে যাচ্ছে। এতে দিন দিন ঝুঁকিও বাড়ছে। গাজীপুরের করোনা সংক্রমিত রোগিরা নিজেদেরকে অন্যদের থেকে আলাদা করতে পারছেন না। ফলে করোনা পজিটিভ রোগীর সংখ্যা ব্যাপকহারে বাড়ছে। 

শুক্রবার [১৯ জুন ২০২০] সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরে ২৪ ঘন্টায় নতুন করে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে ৮৮ জন। তাদের মধ্যে গাজীপুর সিটি করপোরেশন ও সদরে সর্বাধিক ৪৬ জন। এছাড়া কালিয়াকৈরে ১৬ জন ও শ্রীপুরে আটজন। কালীগঞ্জে ১৫ ও কাপাসিয়ায় তিনজন। 

গাজীপুর সিভিল সার্জন অফিস তিন মাসেও সদর উপজেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকার আলাদা হিসাব দিতে পারেনি। সিটি ও উপজেলা আলাদা প্রশাসনিক এলাকা হলেও একত্রে হিসাব দেওয়ার কারণে রোগীর সংখ্যা ও এলাকার সংক্রমণ নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।

এ ব্যাপারে গত ২৬ মে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র জাহাঙ্গীর আলম যোগফলকে জানিয়েছিলেন, সিটির ওয়ার্ড ভিত্তিক রোগীর সংখ্যা প্রকাশে তিনি সিভিল সার্জনকে বলেছেন। কিন্তু আরও প্রায় এক মাস পার হলেও ওয়ার্ড তো দুরের কথা সিটি ও উপজেলার হিসাবই আলাদা করতে পারেনি।

গাজীপুর শহর এলাকার বাসিন্দা কবির হোসেন বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কমাতে হলে ২৪ ঘন্টার মধ্যে পরীক্ষার ফল দিতে হবে। এতে আক্রান্তরা নিজেদের আলাদা করে রাখতে পারবে। 

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর এলাকার এক ব্যাবসায়ী জানান, তার পরিবারের একজনের দেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর পুরো পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যের নমুনা পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়েছে। ছয়দিন পর নমুনার পরীক্ষার ফল পাওয়ার পর তিনি জানাতে পারেন তার পরিবারের আরও চার জন করোনায় আক্রান্ত। গত এক মাস ধরে তার মতো অনেকেই পড়েছেন বিড়ম্বনায়। অনেকের অভিযোগ করোনা পরীক্ষার ফল আসতে ১০-১২ দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

গাজীপুরের কোনাবাড়ি এলাকার একটি প্রাইভেট ক্লিনিকের চিকিৎসক জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, অনেক রোগীর ক্ষেত্রে শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি রয়েছে কিনা তা  জানা প্রয়োজন। করোনা পরীক্ষার ফল আসতে দেরি হওয়ায় সাধারণ রোগের চিকিৎসা দিতে দেরি হচ্ছে বা তাদেরও সময় নিতে হচ্ছে।

গাজীপুরের সিভিল সার্জন মো. খাইরুজ্জামান বলেন, গাজীপুরে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ জনের মতো নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। গাজীপুরে পিসিআর মেশিন রয়েছে দুইটি। এর একটি গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আর অন্যটি শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে হাসপাতালে। গাজীপুর পিসিআর মেশিনে ১৮৪টি নমুনার পরীক্ষা করা সম্ভব হয়। বাকি নমুনাগুলো ঢাকায় বিভিন্ন ল্যাবে পাঠানে হয়। আগে সময় একটু বেশি লাগলেও এখন এক থেকে চারদিনের মধ্যে নমুনা পরীক্ষার ফল দেওয়া হচ্ছে। 

তিনি আরও বলেন, গাজীপুরে যারা আক্রান্ত হচ্ছে তাদের বেশিরভাগের কোন উপসর্গ নেই। যার কারণে অনেকে আক্রান্ত হয়ে ঘুরে বোড়াচ্ছেন। এতে করে করোনার সংক্রমণ বাড়ছে।


বিভাগ : তালাশ


এই বিভাগের আরও