বাংলাদেশে মতপ্রকাশ: স্বাধীন অথবা শোচনীয় [এক]

ফাহমিদুল হক

23 Jun, 2020 07:53pm


বাংলাদেশে মতপ্রকাশ: স্বাধীন অথবা শোচনীয় [এক]
ছবি : সংগৃহীত

চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানবীয় সামগ্রিক স্বাধীনতার পূর্বশর্ত। কর্তৃত্ববাদী শাসন এই স্বাধীনতা হরণের মাধ্যমে শুধু সমাজকে নিশ্চলই করে না, তার বিমানবিকীকরণ ঘটায়। বাংলাদেশে জন্মলগ্ন থেকে প্রবাহমান শাসনপ্রণালীর গঠন কাঠামো ও চর্চা তাকে পরিণত করেছে সর্বস্বৈরতন্ত্রে। এই সর্বস্বৈরতন্ত্রের সাম্প্রতিক সংযোজন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। ‘অরাজ’ এই আইনকে সর্বস্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রবাদের অন্যতম নিয়ন্ত্রণমূলক শুঁড় মনে করে। প্রবাহমান প্রবন্ধে  ফাহমিদুল হক মত প্রকাশের স্বাধীনতার বর্তমান শ্বাসরূদ্ধকর পরিস্থিতিকে খোলাসা করেছেন, শাসকতার নানা ধারা, প্রবণতা, চর্চাকে সমালোচনাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আলোকপাত করে। প্রবন্ধটির বর্তমান সংস্করণ শুদ্ধস্বর থেকে দুই কিস্তিতে প্রকাশ করা হল। এটি প্রথম অংশ। দ্বিতীয় অংশের একই শিরোনাম। সম্পাদক।

ভূমিকা

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা বাকস্বাধীনতা একটি দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ নির্মাণ ও সার্বিক উন্নয়নের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বলার অবকাশ রাখে না। বাংলাদেশ যুদ্ধ করে স্বাধীন দেশ হয়েছে, নিশ্চয়ই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ধারণাকে বাদ দিয়ে নয়। “ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়” ভাষা আন্দোলন ও তৎপরবর্তী সময়ে ব্যবহার করা এই জনপ্রিয় গান কিংবা স্লোগানটি কেবল বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকারের বয়ান করে না, সার্বিকভাবে চিন্তার স্বাধীনতার কথাও বলে। বাংলাদেশের সংবিধানেও মানুষের চিন্তার স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে কিছু ‘যুক্তিসঙ্গত বাধা’ ব্যতিরেকে নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। এই রচনায় স্বাধীন বাংলাদেশে, বিশেষত সাম্প্রতিক সময়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পরিস্থিতির একটি চিত্র তুলে ধরা হবে। তাতে আমরা দেখতে পাবো, স্বাধীনতার পর নানান সরকারের সময়ে দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কমবেশি লঙ্ঘিত হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি শোচনীয় হয়ে পড়েছে।

ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিংবা জনপরিসরে বই, সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, রেডিয়ো, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র ও কম্পিউটার নেটওয়ার্কে ভাবনা প্রকাশের অধিকার হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা (ড্যানেসি, ২০০৯: ১২৮)। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে আমরা চিন্তার স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে একত্রে মিলিয়ে আলোচনা করে থাকি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে একটি দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সূচক হিসেবে পাঠ করা হয়। একটি দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আছে কি নেই, এবং নাগরিকের চিন্তার স্বাধীনতার আছে কি নেই, তা দিয়ে সহজেই গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি পরিমাপ করা সম্ভব। সে হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশে গত এক দশকে সরকারব্যবস্থা যেমন গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে ক্রমশ একদলীয় বা একনায়কতান্ত্রিক হয়ে উঠেছে, তেমনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে।

প্রেক্ষাপট

স্বাধীন হবার পর বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কখনই আদর্শ পরিস্থিতিতে ছিল না। সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকেরা সরাসরি মত প্রকাশ করতে পারছেন। এর আগে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মধ্যেই সীমিত ছিল, কারণ ব্যক্তি নাগরিকের মত প্রকাশের তেমন কোনো মাধ্যম ছিল না। সেই বিবেচনায় বলা যায়, স্বাধীনতার চার বছরের মধ্যে ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার সময় চারটি পত্রিকা ছাড়া বাকি সব পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয় [সম্পাদকের নোট: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনার পর বাকশালপন্থীরা গণমাধ্যম থেকে নির্বাসিত হয়। সংবাদপত্র চালু থাকলে হয়তো তাদের পক্ষে প্রচার থাকত। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনও যাদের স্বার্থে করা হয়েছে, তারাই ভিকটিম হতে পারে]। এরপর ১৯৭০-র দশকের দ্বিতীয় ভাগ থেকে জিয়াউর রহমান সরকারের সময়ে ও ১৯৮০-র দশকে এরশাদ আমলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামরিক শাসন চলাকালে সংবাদপত্রের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল না। সাংবাদিকরা একটি নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতি সবসময়ই টের পেতেন, তবুও অনেকে নির্ভিকভাবে সাংবাদিকতা করার চেষ্টা করেছেন। এরশাদ সরকারের পতনের পর নব্বই দশকে অপেক্ষাকৃত উন্মুক্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশে এবং বিশ্বায়নের প্রভাবে দেশে মুক্তবাজার নীতি গৃহীত হলে বেসরকারি পর্যায়ে নতুন নতুন অনেক সংবাদপত্র প্রকাশিত হতে থাকে এবং সাংবাদিকরা অনেকখানি স্বাধীনতা উপভোগের সুযোগ পান। আর নতুন শতকে ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমের বিস্ফোরণে অনেক টেলিভিশন ও রেডিয়ো চ্যানেলের আগমন ঘটে। তবে এসব ইলেক্ট্রনিক মাধ্যম চালু করবার লাইসেন্স কেবল সরকারঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরাই পেয়ে থাকেন। ফলে সরকার পরিবর্তনে বেশ কিছু চ্যানেল বন্ধ হয়ে যায় অথবা মামলার মুখোমুখি হয়। ২০০৮ সাল থেকে বাংলাদেশে যেহেতু একটি দলই ক্ষমতাসীন রয়েছে এবং লাইসেন্স প্রদানের নীতি যেহেতু একই থেকে গিয়েছে, তাতে দেশে বহু সংবাদপত্র, প্রায় চল্লিশটি টেলিভিশন, প্রায় ২০টি এফএম রেডিয়ো থাকার পরও সরকারপছন্দ মতই ‘স্বাধীনভাবে’প্রকাশ  হচ্ছে, এবং সরকারবিরোধী মত প্রকাশিত হচ্ছে স্বনিয়ন্ত্রণের (সেলফ-সেন্সরশিপ) মধ্য দিয়ে ও সীমারেখা মধ্যে থেকে। সাম্প্রতিক সময়েই যুক্ত হয়েছে সাধারণ নাগরিকের সরাসরি মতপ্রকাশের মাধ্যম সামাজিক মাধ্যম (ফেসবুক ইউটিউব) ও ব্লগ। প্রাথমিকভাবে এই পাটাতনগুলোর ব্যবহারকারীরা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারলেও, আইনি বেড়াজাল এবং হত্যা-হামলা-মামলা ইত্যাদির মুখে তারাও স্বনিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছেন। আবার স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে, মিথ্যা সংবাদ ছড়িয়ে রাজনৈতিক ফায়দা অর্জনের অংশ হিসেবে সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহারের চেষ্টাও দেখা যাচ্ছে। আবার বেসরকারি সংবাদপত্র ও ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যমে অতিমাত্রায় বাণিজ্যিকীকরণের ফলে, আধেয় নির্বাচন অনেকক্ষেত্রে সাংবাদিকদের পরিবর্তে মিডিয় প্রতিষ্ঠানের পুঁজিপতি মালিক ও বিজ্ঞাপনদাতাদের দ্বারা নির্ধারিত হচ্ছে। অর্থাৎ মালিক ও বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রভাবও স্বাধীন সাংবাদিকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

মতপ্রকাশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি

প্যারিসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রিপোর্টার্স স্যান্স ফ্রন্ট্রিয়ার (আরএসএফ) প্রতিবছর সারাবিশ্বের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের অধিকার প্রশ্নে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে পিছিয়ে আছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৬তম। এক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান ছিল ১৩৮তম এবং পাকিস্তানের অবস্থান ১৩৯তম। [সম্পাদকের নোট: ২০২০ সালে এটি আরও কয়েক ধাপ পিছিয়ে ১৫১তম] আরএসএফ যেসব সূচকের ভিত্তিতে এই র‌্যাংকিং করে সেগুলো হলো – বহুত্ববাদ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, পরিবেশ ও স্বনিয়ন্ত্রণ, আইনি কাঠামো, প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, অবকাঠামো, সহিংসতা। আমি মনে করি, বাংলাদেশ যেকয়েকটি স্থানের পিছিয়ে পড়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো, স্বনিয়ন্ত্রণ, আইনি কাঠামো ও সহিংসতা। বহু মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি সত্ত্বেও, স্বনিয়ন্ত্রণ বা সেল্ফ সেন্সরশিপ খুব স্পষ্ট, আগের আইসিটি আইন ও হালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে খুবই কঠোর এক আইন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং অনলাইন ব্যবহারকারী ও সাংবিাদকদের ওপর মামলা ও প্রত্যক্ষ হামলা অব্যাহত রয়েছে।

সর্বোপরি, দেশব্যাপী এক ভয়ের পরিবেশ রয়েছে যা মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে অন্যতম এক বাধা। গুম, ক্রসফায়ার ও এনকাউন্টারের  নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বিরোধীদলের ও বিরোধীমতের ব্যক্তিদের ব্যাপকহারে গ্রেফতার ও হয়রানি, ফোনে আড়িপাতা ও সুবিধামতো সেগুলো জনসম্মুখে প্রকাশ, ২০১৮ সালের শিক্ষার্থীদের দুই আন্দোলন, শিক্ষা ক্ষেত্রে কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলন – নিষ্ঠুরভাবে দমন এবং প্রখ্যাত আলোকচিত্রী ও অ্যাক্টিভিস্ট শহিদুল আলমকে গ্রেফতার ও কারাগারে প্রেরণের মতো ঘটনা সার্বিকভাবে এক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে। যাতে মানুষ স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ থেকে নিজেকে বিরত রাখছে। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে একতরফাভাবে শতকরা ৯৬ ভাগ আসন বর্তমান সরকার নিজের করে নেবার মাধ্যমে দেশে একদলীয় কর্তৃত্বপরায়ণ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে যা এক ভীতিকর, হতাশাজনক ও চরম অগণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্ম দিয়েছে। এই পরিবেশ প্রকারান্তরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিসরকে একেবারে সঙ্কুচিত করে ফেলেছে।

আইনি কাঠামো

বর্তমান সরকার ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা সংক্রান্ত বেশ কিছু আইন প্রণয়ন করেছে, নীতিমালা গ্রহণ করেছে। এর কিছু খসড়া আকারে এখনও আছে, কিছু চূড়ান্ত  হয়েছে। এসবকিছুর মধ্যে একমাত্র ‘তথ্য অধিকার আইন ২০০৯’ নিয়ে তেমন কোনো বিতর্ক হয় নি। নয়তো প্রায় সব আইন ও নীতিমালা নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে। এসব আইন ও নীতিমালাকে বিশ্লেষক-সাংবাদিক-অনলাইন ব্যবহারকারী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত ‘নিবর্তনমূলক’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। ‘সম্প্রচার নীতিমালা ২০১৪’ প্রচুর বিতর্কের জন্ম দেয়। তবে সবচেয়ে বেশি বির্তক হয় আইসিটি আইনকে (২০০৬ সালে প্রণীত, ২০১৩ সালে সংশোধিত হয়) নিয়ে। বিশেষত এর ২০১৩ সালের সংশোধিত আইনের ৫৭ ধারাটি নিয়ে প্রচুর বিতর্ক হয়। এটি বিশেষত ডিজিটাল মাধ্যমে মানহানিকর কিছু বলা হলে তার বিরুদ্ধে যে শাস্তির বিধান রাখা হয় তা ছিল অত্যন্ত কঠোর এবং প্রচলিত আইন ও সাংবিধানিক পরিকাঠোমের বিরোধী। একই ধরনের মানহানিকর বক্তব্য মুদ্রণ মাধ্যমে দেওয়া হলে, তার জন্য যদি ২ মাসের কারাদণ্ড বরাদ্দ হয়, তবে কেবল ডিজিটাল মাধ্যম বা অনলাইনে তা প্রকাশ করলে ৭ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়। এবং যেকোনো মামলা জামিন-অযোগ্য, যেকোনো কিছু পুলিশ আমলে নিতে পারবে এবং ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেফতার করতে পারবে। অর্থাৎ অভিযুক্তের নিজেকে রক্ষা করার জন্য কোনো ফাঁকই রাখা হয় নি। ফলে এটা ছিল প্রচলিত অর্থে এক ‘কালো আইন’এবং এর ভয়ঙ্কর দিকটির কথা সরকার স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং তারা বলতে থাকেন যে, নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ৫৭ ধারার মতো কিছু থাকবে না। কিন্তু নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাশ হবার দেখা যায়, তা আইসিটি আইনের তুলনায় আরও ভয়ঙ্কর। আইসিটি আইন ছিল অনলাইনের ব্যবহারকারীদের জন্য বিপজ্জনক। কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারার কারণে সাংবাদিকতাকে নিগড়ে বেঁধে ফেলা হয়।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে পুনরায় বিতর্ক শুরু হয় এবং এপর্যায়ে সাংবাদিকরা এবং বিশেষত ‘সম্পাদক পরিষদ’ আইনের আপত্তিকর দিকগুলো নিয়ে বিস্তৃতভাবে বিশ্লেষণ করে সংবাদপত্রে পূর্ণপৃষ্ঠাব্যাপী প্রতিবেদন ছাপেন এবং স্পষ্টভাবে বলেন এই আইনের কয়েকটা ধারায় পরিবর্তন আনতে হবে। সম্পাদকরা এমনকি প্রেসক্লাবের সামনে এবিষয়ে প্রতিবাদী মানববন্ধনও করেন। কিন্তু সরকার যেহেতু কর্তৃত্ববাদী আচরণে আগের তুলনায় আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী, তাই তারা কোনো আপত্তিই কর্ণপাত করেননি। ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ তারিখে সংসদে আইনটি পাশ হয়ে যায়। সারা দেশের মানুষের আপত্তি আমলে না আনা হলেও, পুলিশের আপত্তির মুখে একটি স্থানে পরিবর্তন আনা হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৪৩ ধারায় তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সির মহাপরিচালকের অনুমোদন নেওয়ার বিধান যুক্ত করার সুপারিশ করেছিল সংসদীয় কমিটি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পুলিশের আপত্তির মুখে মাত্র এক দিনের মধ্যেই অনুমোদনের বিষয়টি বাদ দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। অর্থাৎ তারা কারো কোনো অনুমতি ছাড়াই তল্লাশি বা গ্রেপ্তার করতে পারবে।

বস্তুত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আগের ৫৭ ধারার ব্যাপারগুলো ২৫, ২৮, ২৯, ৩১ ধারায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখানে নির্বাচিত দুইটি ধারা (৩২ ও ৪৩) আলোচিত হলো। 

৩২ ধারায় বলা আছে: (১)  যদি কোনো ব্যক্তি ১৯২৩ সালের গোপনীয়তা আইন এর আওতাভুক্ত কোনো অপরাধ কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটন করেন বা করিতে সহায়তা করলে, তাহা হইলে তিনি অনধিক ১৪ (চৌদ্দ) বৎসর কারাদণ্ডে অনধিক ২৫ (পঁচিশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডেদণ্ডিত হবেন।

(২) যদি কোনো ব্যক্তি উপধারা (১) এ উল্লেখিত অপরাধ দ্বিতীয়বার বা পুনঃপুনঃ সংঘটন করেন তাহা হইলে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে, বা অনধিক   এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

৪৩ ধারায় বলা আছে, যদি কোনো পুলিশ অফিসারের মনে করেন যে এই আইনের (ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন) অধীন কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, বা হচ্ছে বা হবার সম্ভাবনা আছে তবে ওই স্থানে প্রবেশ করে পুলিশ বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি করতে পারবে, ব্যবহৃত ডিজিটাল ডিভাইস জব্দ করতে পারবে, দেহ তল্লাশি করতে পারবে এবং সন্দেহ হলে গ্রেফতার করতে পারবে।

এটা বেশ কৌতুকপ্রদ ব্যাপার যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারায় ১৯২৩ সালের আইনকে সাক্ষি মানা হচ্ছে। ব্রিটিশ আমলে প্রবর্তিত এই আইনটি তৎকালীন সরকারের জবাবদিহি এড়ানোর জন্য প্রবর্তিত হয়েছিল যাতে নিঃসন্দেহে একটি অগণতান্ত্রিক আকাঙ্খা ছিল। অর্থাৎ সরকার যা প্রকাশ করবে না বা করতে চায় না, তাই ওই আইনের সুরক্ষায় অধরা থেকে যাবে। তা হলে সাংবাদিকরা করবেটা কী? বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থ লোপাট হয়ে গেলে, সেসংক্রান্ত কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে, সেই তথ্য যদি ডিজিটাল ফরম্যাটে থাকে, তবে তা সংগ্রহ করা অপরাধ হবে? শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি হলে তদন্ত করা যাবে না, যেক্ষেত্রে আজকার অনেক তথ্যই ডিজিটাল ফরম্যাটে রক্ষিত থাকে? অর্থাৎ সরকারি পর্যায়ে যত অঘটন, অনিয়ম, কেলেঙ্কারি হোক, অনুসন্ধানের সুযোগ থাকবে না? অনুসন্ধানের চেষ্টা করলে বা তথ্য সংগ্রহ করলে ১৪ বছরের জেল হবে? একদিকে তথ্য অধিকার আইন বলবৎ আছে, অন্যদিকে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট বরাত দিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের দূর্গ গড়ে তোলা হচ্ছে। আইনি তামাশা বলা যেতে পারে একে।

অন্যদিকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সবচেয়ে বিপজ্জনক ধারা হলো ৪৩ ধারা। পুলিশকে কী অপরিসীম ক্ষমতা দেয়া হয়েছে! পুলিশ যদি নেহায়েত মনে করে কোনো অপরাধ ‘সংঘটিত হতে পারে’তবেই তল্লাশি-জব্দ-গ্রেফতার করতে পারবে, কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়াই। পুলিশের ‘মনে হওয়া’ই যথেষ্ট কাউকে শাস্তি দেবার জন্য, হয়রানি করার জন্য! পুলিশি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে এরকম আইনই বোধহয় প্রয়োজন পড়ে, যেখানে নাগরিকের বা অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগই রাখা হয়নি।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ১৩টি ধারা জামিন-অযোগ্য। প্যারিসভিত্তিক আরএসফ, নিউ ইয়র্কভিত্তিক কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে), ইন্টারন্যাশনাল ফোরাম অব জার্নালিস্টস – মতপ্রকাশ ও সাংবাদিকতা পরিবীক্ষণকারী সব আন্তর্জাতিক সংস্থাই এই আইনটির বিরুদ্ধে উদ্বেগ জানিয়েছে।

সম্পাদক পরিষদ ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ তারিখে কয়েকটি পত্রিকায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে তাদের বিশ্লেষণী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনের শুরুতে তারা তাদের বিশ্লেষণের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন।

জাতীয় সংসদে সদ্য পাস হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে নিচের মৌলিক ত্রুটিগুলো রয়েছে:

১. ডিজিটাল যন্ত্রের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটন প্রতিহত করা এবং ডিজিটাল অঙ্গনে নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে একটি আইন প্রণয়নের চেষ্টা করতে গিয়ে এমন একটি আইন করা হয়েছে, যা সংবাদমাধ্যমের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি, বিষয়বস্তুর ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং আমাদের সংবিধানপ্রদত্ত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের বাক্ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

২. এই আইন পুলিশকে বাসাবাড়িতে প্রবেশ, অফিসে তল্লাশি, লোকজনের দেহ তল্লাশি এবং কম্পিউটার, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, সার্ভার ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম-সংক্রান্ত সবকিছু জব্দ করার ক্ষেত্রে সীমাহীন ক্ষমতা দিয়েছে। পুলিশ এ আইনে দেওয়া ক্ষমতাবলে পরোয়ানা ছাড়াই সন্দেহবশত যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের কোনো কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

৩. এই আইনে অস্পষ্টতা আছে এবং এতে এমন অনেক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার ভুল ব্যাখ্যা হতে পারে এবং সহজেই সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যেতে পারে।

৪. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এমন এক আতঙ্ক ও ভীতির পরিবেশ তৈরি করবে, যেখানে সাংবাদিকতা, বিশেষত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।

৫. এই আইন সংবাদমাধ্যমের কর্মী ছাড়াও কম্পিউটার ও কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ইত্যাদি ব্যবহারকারী সব ব্যক্তির মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করবে। (প্রথম আলো, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮)

কিন্তু সরকার কারো কোনে ওজর, কোনো প্রতিবাদ আমলে নেয় নি। একতরফা সংসদে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে কোনো তর্কবিতর্ক করতে হয় নি। বস্তুত কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার পেছনে আইসিটি আইন বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে সরকার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছে। সফলভাবে এর প্রয়োগও আমরা দেখেছি। যেমন সরকারপ্রধান বা কোনো মন্ত্রী বা আওয়ামী লীগের কোনো নেতার নামে অনলাইনে কেউ প্রতিবাদমূলক কিছু লিখলে দেখা গেছে ওই নেতার নির্দেশে বা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে ৫৭ ধারায় দ্রুত মামলা করছে কোনো ছাত্রনেতা বা চাটুকার কর্মী। এভাবে আইসিটি অ্যাক্টের প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ দ্রুতহারে বৃদ্ধি পায়। ২৪ জুলাই, ২০১৮ তারিখে প্রধান তথ্য কমিশনার অধ্যাপক গোলাম রহমান জানান, ৫৭ ধারার অপপ্রয়োগ হচ্ছে। বস্তুত আইসিটি আইন প্রবর্তনের পর সনাতনী মানহানিবিষয়ক আইন ব্যবহার হয়নি বললেই চলে। প্রথম আলোয় প্রকাশ ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ তারিখের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে:

বাংলাদেশে সাইবার অপরাধের মামলা হু হু করে বাড়ছে। অঙ্কের হিসেবে ৩ বছরে মামলা বেড়েছে প্রায় ২ হাজার গুণ। আর এসব মামলার প্রায় সবই করা হচ্ছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারায়। ধারাটি অজামিনযোগ্য (আসাদুজ্জামান, ২০১৬)।

এই হিসেব প্রতিবেদক সাইবার ক্রাইম ট্রাইবুনালের মামলার সংখ্যা হিসেব করেই বলেছেন। এমন নয় যে, অনলাইনে ছদ্মনাম ব্যবহার করে সত্যি সত্যি অত্যন্ত মানহানিকর কেউ কিছু লেখে না। কিন্তু মামলার হারের এই বৃদ্ধি প্রমাণ করে, স্বাভাবিক সমালোচনা, যা গণতান্ত্রিক দেশে মানুষের সাংবিধানিক অধিকার, সেটা হরণ করার জন্যই এই আইনের প্রবর্তন করা হয়েছে। শহিদুল আলমকেও আইসিটি আইনে গ্রেফতার করা হয়েছিল। আবার অরাজনৈতিক কারণেও, ব্যক্তিগত-পেশাগত দ্বেষ-বিদ্বেষ থেকেও অন্যকে হয়রানি করার জন্য এই আইনের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। এই লেখকের বিরুদ্ধেও ৫৭ ধারায় মামলা হয়েছে। সবমিলিয়ে দেশে একটা কর্তৃত্ববাদী, অসহিষ্ণু ও অগণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করতে এই আইন খুব অবদান রেখেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এই প্রবণতার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়ে গণমাধ্যমকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে।

বাংলাদেশে মতপ্রকাশ: স্বাধীন অথবা শোচনীয় [দুই]

ফাহমিদুল হক: শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 


বিভাগ : কোমল