বাংলাদেশে মতপ্রকাশ: স্বাধীন অথবা শোচনীয় [দুই]

ফাহমিদুল হক

23 Jun, 2020 07:57pm


বাংলাদেশে মতপ্রকাশ: স্বাধীন অথবা শোচনীয় [দুই]
ছবি : সংগৃহীত

চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানবীয় সামগ্রিক স্বাধীনতার পূর্বশর্ত। কর্তৃত্ববাদী শাসন এই স্বাধীনতা হরণের মাধ্যমে শুধু সমাজকে নিশ্চলই করে না, তার বিমানবিকীকরণ ঘটায়। বাংলাদেশে জন্মলগ্ন থেকে প্রবাহমান শাসনপ্রণালীর গঠন কাঠামো ও চর্চা তাকে পরিণত করেছে সর্বস্বৈরতন্ত্রে। এই সর্বস্বৈরতন্ত্রের সাম্প্রতিক সংযোজন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। ‘অরাজ’ এই আইনকে সর্বস্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রবাদের অন্যতম নিয়ন্ত্রণমূলক শুঁড় মনে করে। প্রবাহমান প্রবন্ধে  ফাহমিদুল হক মত প্রকাশের স্বাধীনতার বর্তমান শ্বাসরূদ্ধকর পরিস্থিতিকে খোলাসা করেছেন, শাসকতার নানা ধারা, প্রবণতা, চর্চাকে সমালোচনাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আলোকপাত করে। প্রবন্ধটির বর্তমান সংস্করণ শুদ্ধস্বর থেকে দুই কিস্তিতে প্রকাশ করা হল। এটি দ্বিতীয়অংশ। প্রথম অংশের একই শিরোনাম। সম্পাদক।

মূলধারার গণমাধ্যম

আইসিটি আইন পরোক্ষভাবে এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রত্যক্ষভাবে মূলধারার সাংবাদিকতাকে প্রভাবিত করছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কারণে তদন্তমূলক প্রতিবেদন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এমনকি চলতি সংবাদ বা হার্ড নিউজ পরিবেশনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যদিও আইনমন্ত্রী ডয়েচে ভেলে বাংলাকে বলেছিলেন, ‘সাংবাদিকরা চিন্তা করবেন না, ৩২ ধারা আপনাদের বিরুদ্ধে নয়’৬, কিন্তু এই আশ্বাসসবাণী বলবৎ থাকেনি। সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে খুলনার দুইজন সাংবাদিক রিপোর্ট করেন যে খুলনা-১ আসনে ভোটারের সংখ্যার চাইতে ভোটপ্রদানের সংখ্যা বেশি হয়েছে। ওই দুইজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয় এবং একজন গ্রেফতার হন। গ্রেফতার করা সাংবাদিককে শারীরিকভাবে হেনস্থা করার অভিযোগও পাওয়া যায়। পরে অবশ্য তিনি জামিন পান। জানা যায়, নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তিনি ওই রিপোর্ট করেন এবং ভুলটা নির্বাচন কমিশনের।

কিন্তু এই আইনি বাধার বাইরেও একটা চিত্র আছে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মিডিয়াই মোটের ওপরে সরকারের নিয়ন্ত্রণে। আগেই বলা হয়েছে লাইসেন্স প্রদানের নীতি অনুযায়ী টেলিভিশন চ্যানেলগুলো খুব একটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। অনলাইন পোর্টালগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। দক্ষিণপন্থী সংগ্রাম, দিনকাল, ইনকিলাব ইত্যাদি পত্রিকার প্রভাব তেমন নেই পাঠকমহলে। তবে প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, বণিকবার্তা বা নিউ এইজ পত্রিকা কিছুটা স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা করার চেষ্টা করে। বিশেষ করে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার শীর্ষস্থানীয় দুইটি পত্রিকা এবং সমাজে তাদের প্রভাব রয়েছে। এই দুইটা পত্রিকা নিয়ে আমাদের পুরনো অভিযোগ রয়েছে, নব্বই দশকে মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রসারের জন্য জনমনে ভোক্তামনষ্কতা তৈরি করতে (দেখুন হক, ২০১১) এবং রাজনীতিবিদদের পরিবর্তে সুশীল সমাজের মাধ্যমে রাষ্ট্রপরিচালনা করতে (দেখুন নিউটন, ২০১৩) পত্রিকা দুইটি ভূমিকা রাখতে চেয়েছে। প্রথমটিতে সফল হলেও তারা দ্বিতীয়টিতে ব্যর্থ হয়েছে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ বা রাজনীতিবিদরা পুনরায় ক্ষমতা গ্রহণের পরে। তবে গত এক দশকে পরাক্রমশালী আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে অন্য সব পত্রিকা-মিডিয়া যেমন গাঁটছড়া বেঁধেছে, সেই প্রেক্ষাপটে এই দুই পত্রিকা স্বাধীনভাবে কাজ করার চেষ্টা করেছে। ফলে তাদের ওপরে চাপ এসেছে। ‘সরকারের ইমেজ ক্ষুন্ন করার চেষ্টা’র অভিযোগে ২০১৫ সালে শীর্ষস্থানীয় টেলিকম কোম্পানিগুলোকে বিজ্ঞাপন না দিতে সরকারের দিক থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বস্তুত, প্রচুর সংবাদপত্র, প্রচুর টেলিভিশন ও বেতার চ্যানেল থাকার পরেও সরকারবিরোধী বক্তব্য প্রচারমাধ্যমগুলোতে কমই দেখা যায়। সংবাদপত্রের কলামে বা টেলিভিশন চ্যানেলে সরকারপন্থী সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীদের উপস্থিতিও প্রবল, যাদের দাপটে ভিন্নমত কোণঠাসা হয়ে পড়ে। কেবল বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক দলের রুটিন কর্মসূচি নয়, জনগণের স্বার্থে যে আন্দোলনগুলো হয়ে থাকে, সেগুলোর খবরাখবর এসব মিডিয়ায় সামান্যই পরিবেশিত হয়। পরিবেশবাদী ও জাতীয় সম্পদ রক্ষার উদ্দেশে যে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রবিরোধী আন্দোলন, তার সীমিত ও খণ্ডিত কাভারেজ হতে দেখি আমরা। উল্টো বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পক্ষের মত সবলভাবে উপস্থিত হয়ে থাকে। এরকম পরিস্থিতি তৈরি হয় বলেই ড্যানি শেকটার  (১৯৯৮) বলেছিলেন, “দ্যা মোর ইউ সি, দ্য লেস ইউ নো”। শেকটার অবশ্য কথা বলেছিলেন ইরাক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে।

গণমাধ্যমের জন্য স্বাধীন মতপ্রকাশে যেমন বাধা আছে, বা ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়ে আছে এবং গণমাধ্যমগুলো স্বনিয়ন্ত্রণ করছে, কিন্তু সরকারকে বাড়তি সেবা দেবার জন্য বেশ কিছু গণমাধ্যম মাঠে সরব থাকে। যখন কোনো আন্দোলন দানা বাঁধে (ধরা যাক, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন), কিছু টেলিভিশন চ্যানেল চেষ্টা করে আন্দোলনের নেতৃবৃন্দকে টক-শোতে ডেকে নিয়ে, সহযোগী সাংবাদিকদের সহায়তায়, আন্দোলনকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে কলঙ্ক আরোপ করতে, এভাবে পুরো আন্দোলনকে অপশক্তির আন্দোলন বলে প্রমাণ করতে। একদিকে রয়েছে সরকারের নিষ্ঠুর দমননীতি – গুম-নিখোঁজ, ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার; অন্যদিকে রয়েছে পোষ্য মিডিয়া, যারা স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার কাজটি করে থাকে। তারই অংশ হিসেবে ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে একাত্তর টিভি ও সময় টিভিতে নির্বাচনকালীন বিরোধী জোট নাগরিক ঐক্য ও বিএনপি নেতৃবৃন্দের বেশ কিছু ফোনালাপ ফাঁস করা হয়। এতে তাদের নির্বাচনকালীন পরিকল্পনা, যাতে কিছু সহিংস ঘটনার পরিকল্পনাও রয়েছে, সেগুলোকে বারবার প্রচার করা হয়। আমরা জানি, সূত্র ছাড়া কোনো সংবাদ হয় না, কিন্তু এগুলো প্রাইম টাইম নিউজ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। ফোনে আড়ি পাতা এমনিতেই নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী, সেই অনৈতিক কাজটিকে তারা সংবাদ উপাদান হিসেবে প্রচার করেছে। এসব ফোনালাপকে ‘নাশকতার পরিকল্পনা’র ট্রিটমেন্ট দিয়ে, অভিযুক্তদের কোনো বক্তব্য প্রচার ছাড়াই একতরফা প্রচারকে অনৈতিক ও দালালীর সাংবাদিকতা বলতে হবে। কারণ এই আলাপগুলো সবই একপাক্ষিক, এগুলোর সব সুবিধা সরকারই পেয়েছে। এসব ‘দালাল মিডিয়া’র ক্ষমতা ছিল না নির্বাচনকে ঘিরে সরকারের নেতৃবৃন্দ কী পরিকল্পনা করছে, তা জানানোর, কীভাবে ভোট কারচুপি হবে, কীভাবে নির্বাচনের আগে বিরোধী কর্মীদের গ্রেফতার করা হবে বা হুমকি দিয়ে নিজ নিজ গৃহে অন্তরীণ থাকতে বাধ্য করা হবে?

হুমকি ও বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্বনিয়ন্ত্রণ ও দালালীর বাইরে অবশ্যই আর একটি বিষয় হলো সাংবাদিকদের ওপর প্রত্যক্ষ বা শারীরিক হামলা। দেশিয় বেসরকার মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী ২০১৭ সালে দেশে ১২২ জন সাংবাদিক শারীরিক নির্যাতন, হামলা, মামলা বা হুমকি-হয়রানির শিকার হয়েছেন।ৃ আর ২০১৮ সালে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা হয়েছে ২০৭টি। এর মধ্যে খুন হয়েছেন ৩ জন। ২০১৬ সালে নির্যাতনের ঘটনা ছিল ১১৭টি (সুলতান, ২০১৯: ২)। ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় কর্মরত আলোকচিত্রী ও সাংবাদিকদের সরাসরি আঘাত করে সরকার সমর্থক ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সদস্যরা এবং এতে অন্তঃত ১০ জন সাংবাদিক আহত হন১০।

সামাজিক মাধ্যম

ফেসবুক বা ইউটিউবের মতো সামাজিক মাধ্যম হলো এমন পাটাতন যাতে সাধারণ মানুষ যুক্ত এবং এখানে সরাসরি তারা তাদের মত প্রকাশ করে থাকেন। ম্যানুয়েল ক্যাস্টেলস (২০০৫) বর্ণিত ‘নেটওয়ার্ক সমাজ’-এর সার্থক উদাহরণ হলো এই সামাজিক মাধ্যম। এর সদস্যরা ‘আনুভূমিক যোগাযোগ’-এর মাধ্যমে একটি ‘প্রতি-ক্ষমতা’র (ক্যাস্টেলস, ২০০৭) জন্ম দেয় এবং এর মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটিয়ে দেয়। মধ্যপ্রাচ্যে আর উত্তর আফ্রিকায় এরকম কয়েকটি সরকারের পতন হয়েছিল ২০১০-১১ সালে। এই ঘটনা সব দেশের সরকারকে সতর্ক করে তোলে এবং সরকারগুলোর প্রণোদনায় নজরদারির এমন যন্ত্র তৈরি করা হয়, যার মাধ্যমে অনলাইন ব্যবহারকারীদের নজরদারি করা যায়, অফিসে বসেই। কোনো সরকার এগুলো তৈরি করেছে, আর কোনো সরকার জনগণের করের টাকা দিয়ে বেশি দামে এগুলো কিনেছে এবং এরপর জনগণকেই নজরদারি করা শুরু করেছে। বাংলাদেশ সরকারও এর ব্যতিক্রম নয়। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আইসিটি আইন বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। গত নির্বাচনের আগে এই নজরদারি আরও বৃদ্ধি পায়। বোঝাই যায়, সরকারি সম্পদ ব্যবহার করে সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহারকারীদের নজরদারিতে রেখে নির্বাচনে সুবিধা আদায় করার চেষ্টা করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। নজরদারি, কঠোর আইন প্রণয়ন ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে সামাজিক মাধ্যমে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের অধিকারকে সরকার অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে।

এধরনের নজরদারি ও শাস্তি প্রদানের পেছনে সরকারপক্ষ এবং তার পক্ষে সাফাই প্রদানকারী টকশোকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী ও অনলাইন পণ্ডিতেরা যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন নকল সংবাদ ও গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টাকে। একথা সত্যি ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যম হলো নকল সংবাদ ও গুজবের উর্বর ক্ষেত্র। ফেসবুকে গুজব ছড়িয়ে রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া কিংবা রংপুরে সাম্প্রদায়িক হামলাও করা হয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় এক পর্যায়ে টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হলে, সেই সুযোগে হত্যা-ধর্ষণের গুজব ডালপালা মেলে। গুজব ছড়ানোর অভিযোগে অভিনয় শিল্পী নওশাবা গ্রেফতার হন। তখন আন্দোলনকারীরা গুজবনির্ভর আন্দোলন করছে এবং তারা ‘অপশক্তি’দের দ্বারা চালিত বলে নিন্দা জানায় সরকারের ঘনিষ্ঠ মিডিয়া এবং অনলাইন যোদ্ধারা। কিন্তু অচিরেই জানা যায়, গুজব ও মিথ্যা সংবাদ ছড়াতে সরকারপক্ষীয়রা কম যান না। নির্বাচনের ১০ দিন আগে, সরকারের বিভিন্ন পদে থাকা কিছু ব্যক্তি দ্বারা পরিচালিত একাউন্ট ও পেজ ফেসবুক বন্ধ করে দেয়। এছাড়া ব্লগ-জমানা (২০০৭ পরের সময়ে) থেকেই কিছু গ্রুপ (যেমন ‘এ-টিম’) অনলাইনে লড়াই-আক্রমণ-গালাগালিতে পরিচিত হয়ে ওঠে যার কিছু নিম্নমানের সংস্করণ (যেমন ‘সিপি গ্যাং’) ফেসবুকে সন্ত্রাস কায়েম করে এবং শেষপর্যন্ত এরা ক্ষমতাসীনদের পক্ষেই তাদের ‘লাঠিয়ালগিরি’কে উৎসর্গ করে। এই অনলাইন যোদ্ধারাও অনলাইনে স্বাধীন মতপ্রকাশের জন্য বাধা। এদের আক্রমণের লক্ষ্য সরকারবিরোধী বক্তব্য প্রদানকারী স্বাধীনতাবিরোধী দক্ষিণপন্থী জামাতগোষ্ঠী কেবল নয়, প্রগতিশীল, বাম, কিংবা স্বাধীনচিন্তার মানুষদেরও এরা অকথ্য ভাষায় আক্রমণ করতে সক্ষম। উল্টো সমালোচনামুখর প্রগতিশীলদেরও তারা ছদ্ম জামাতি বা ‘বামাতি’ উপাধি দেয় এবং প্রয়োজনে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। এরা সরকারকে ক্রিটিক করছেন এরকম যেকোনো ব্যক্তি, তিনি যদি সম্মানীয় ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিও হন, তাদের বিরুদ্ধে এদের কেউ একজন মিথ্যা বা বানোয়াট কথা লেখে এবং বাকিরা তা শেয়ার করে করে প্রায় সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে ফেলে।

একটি কারচুপির নির্বাচনের পর ক্ষমতা গ্রহণ করে সরকার কিছু ‘কল্যাণমুখী’পদক্ষেপ নেয়। এর অংশ হিসেবে তারা বহু পর্নোগ্রাফির সাইট বন্ধ করে দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় অশ্লীলতা ও জুয়ার ওয়েবসাইট বন্ধ করতে ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে বা আইআইজিগুলোকে ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ তারিখে একটি তালিকা পাঠায় বিটিআরসি। সেই তালিকায় সামহোয়ারইনৃ ব্লগের নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ফলে সামহোয়ারইন সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে। এই লেখা পর্যন্ত সামহোয়ারইন সব নেটওয়ার্ক থেকে দেখা যাচ্ছে না, অর্থাৎ আংশিক নিষেধাজ্ঞা বিদ্যমান আছে। বাংলা ভাষার প্রথম কমিউনিটি ব্লগ, যেটা ২০০৬ সালের শেষে চালু হয়, যেখানে অনেক লেখকের জন্ম হয়েছে এবং অনলাইনে বাংলা ভাষায় লেখালেখি চর্চায় যে সাইটটির অবদান পথিকৃতের, সেই সাইটটির বিরুদ্ধে আপত্তিকর অভিযোগ অত্যন্ত আপত্তিজনক।

মতপ্রকাশের অন্য উপায়

এতদিন কেবল চলচ্চিত্র সেন্সরবিধির আওতায় ছিল। কিন্তু আজকাল সাহিত্যচর্চা বা বইপুস্তকের মাধ্যমে মতপ্রকাশের বিষয়টিও পরোক্ষ সেন্সরশিপের মধ্যে পড়ে গেছে। একসময় লেখালেখির কারণে তসলিমা নাসরীনকে দেশ ছাড়তে হয়েছে, কিন্তু এখন লেখালেখি করে ধর্মান্ধ জঙ্গিগোষ্ঠীর হাতে মৃত্যুবরণ করতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে মতপ্রকাশ দুই দিক থেকে আক্রান্ত – একদিকে রয়েছে রাষ্ট্রীয় আইন, আরেকদিকে জঙ্গির চাপাতির ঝিলিক। অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ড নিশ্চয়ই সবচেয়ে আলোচিত (অভিজিতের বই প্রকাশ করার জন্য তার প্রকাশক দীপনকেও হত্যা করা হয় এবং আর এক প্রকাশক টুটুলকে হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে আক্রমন করা হয়), কিন্তু এক এর পর এক যখন ব্লগার খুন হচ্ছিল, তখন খুনিদের গ্রেফতার করতে সরকার কোনো সক্রিয় উদ্যোগ নেয়নি। বরং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে  লিখলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালে মধ্যে বেশ কয়েকবার ঘোষণা দেন। এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীও সেই ধারায় বক্তব্য দেন। নিজেকে জাহির করার জন্য ধর্ম নিয়ে বিদ্বেষমূলক লেখালেখি নিশ্চয়ই দায়িত্ববোধের পরিচয় নয়, কিন্তু সেকারণে কাউকে হত্যা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এবং সেই হত্যাকারীদের গ্রেফতার না করে, ঘটনার শিকার নিহত ব্লগারদের দায়ি করা হলে মূলত হত্যাকারীদেরই উৎসাহিত করা হয়। আস্কারাপ্রাপ্ত বিভিন্ন জঙ্গীগোষ্ঠী ব্লগারদের পরে, হিন্দু পুরোহিত, খ্রিস্টান পাদ্রী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রমুখকে একের পর এক হত্যা করতে থাকে। এই ধারাবাহিক জঙ্গি কার্যক্রম থামাতে সরকার লক্ষ্যযোগ্য কোনো পদক্ষেপই নিতে পারে নি, হোলি আর্টিজেনে মর্মান্তিক হামলার আগ পর্যন্ত। হোলি আর্টিজেনের হামলার পর সরকারের টনক নড়ে এবং তারা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা শুরু করে। এক পর্যায়ে বিভিন্ন অভিযান চালিয়ে সরকার জঙ্গি কার্যক্রমে যুক্ত নেতা ও কর্মীদের হত্যার মাধ্যমে জঙ্গি কার্যক্রমকে সাময়িকভাবে দমন করে।

কিন্তু এর মধ্যেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নেমে আসে নানান অবাঞ্ছিত পদক্ষেপ। বইমেলা থেকে ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাতের অভিযোগে ২০১৫ সালে রোদেলা প্রকাশনী বন্ধ করে দেয় বাংলা একাডেমি। ২০১৬ সালে ব-দ্বীপ প্রকাশনীকে বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং প্রকাশক শামসুজ্জোহা মানিককে গ্রেফতার করা হয়। সবচেয়ে মারাত্মক ব্যাপার, বইমেলার নতুন বই-পুস্তক পুলিশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য এর চেয়ে হানিকর আর কী হতে পারে! আর এও বড় খেদের বিষয় যে, যে শাহবাগ আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে হেফাজতে ইসলামের উত্থান, যে হেফাজতে ইসলাম বলেছিল ‘নাস্তিকদের কতল করা ওয়াজিব হয়ে গেছে’, সেই হেফাজতের তালিকা মোতাবেক সরকার পাঠ্যপুস্তক থেকে রচনা সরিয়েছে, হাইকোর্টের সামনে থেকে থেমিসের ভাস্কর্য অপসারণ করেছে এবং তাদেরই দেয়া ‘কওমী জননী’ উপাধি প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ করেছেন। অথচ এই সরকারকেই ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলাম বলেছিল নাস্তিকদের সরকার। ঢাকা দখল করলে এই সরকারই হেফাজতে ইসলামকে নির্মমভাবে শাপলা চত্বর থেকে সরিয়েছিল ২০১৩ সালের ৫ মে। যে দল ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, সেই দল পরিচালিত বর্তমান সরকার একদিকে আচরণে অসহিষ্ণু-ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে ধর্মীয় শক্তির কাছে নতজানু হয়ে পড়েছে। মতপ্রকাশ স্বাধীনতা পরিস্থিতি শোচনীয় হবার জন্য গুরুতর কারণগুলো আমাদের সামনে এভাবে হাজির হয়ে পড়েছে। হোলি আর্টিজেনের ঘটনা দ্বারা অনুপ্রাণিত চলচ্চিত্র ‘শনিবার বিকাল’ যে সেন্সরবোর্ডে আটকা পড়বে, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। তেমনি বিস্ময়কর নয় ৫ মার্চ, ২০১৯ তারিখে এশিয়ার বৃহত্তম আলোকচিত্র মেলা ‘ছবিমেলা’উপলক্ষ্যে শহিদুল আলমের সঞ্চালনায় বিশ্বখ্যাত প্রতিবাদী লেখক অরুন্ধতী রায়ের জনগণের জন্য উন্মুক্ত বক্তৃতাটি নিয়ে অনেক নাটক হয়েছে।

উপসংহার

একটি বদ্ধ পরিস্থিতিতে সরাসরি বক্তব্যপ্রদান কঠিন হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি আসলেই অনেকখানি পাল্টে গেছে। নির্বাচনের পরে খুলনা-১ আসনসংক্রান্ত সংবাদ পরিবেশন করায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে কোনো প্রতিবেদন দ্বারা যদি কেউ আক্রান্ত বোধ করেন, ক্ষতিগ্রস্ত হন, তবে পত্রিকায় একটি প্রতিবাদলিপি পাঠাতে পারেন, পত্রিকা সেটা ছাপবে প্রতিবেদকের ব্যাখ্যাসহ। কিন্তু সেসব চর্চার মধ্যে না গিয়ে সরাসরি সাংবাদিককে গ্রেফতার করে রিমান্ডে পাঠানোর ঘটনায় বোঝা যায়, পরিস্থিতি অনেক পাল্টে গেছে। সাংবাদিক-লেখক-অনলাইন ব্যবহারকারীর জন্য স্বাধীনতার পরিধি খুবই সীমিত হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে স্যাটায়ার-সাহিত্য কিছুটা উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। তবে সবচেয়ে ভালো হয় সরকার টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসে যদি আরেকটু সহনশীল হয়, ভিন্নমতের জন্য কিছুটা পরিসর ছেড়ে দেয়। সরকারের মনে রাখা উচিত যারা সারাক্ষণ তার প্রশংসা করছে, তাদের মধ্যেই স্তাবকের সংখ্যাই বেশি। আর যারা সমালোচনা করেন, তাদের মধ্যে কিছু বন্ধুও হয়তো আছে। তারা হয়তো সমালোচনার মধ্য দিয়ে তাকে সঠিক পথে থাকতে সাহায্য করছে। সর্বোপরি আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশ সরকারের যথেষ্ট দুর্নাম ইতোমধ্যে জুটেছে, তার অন্যতম একটি কারণ হলো মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা। বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে অর্থনৈতিক অগ্রগতির কথা সবাই জানেন ও মানেন। কিন্তু জিডিপিভিত্তিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে আজকাল আর কেউ উন্নয়ন বলে না, উন্নয়নের জন্য সঙ্গে চাই সামাজিক ন্যায়বিচার, সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন এবং অবশ্যই নাগরিকের চিন্তার স্বাধীনতা।

বাংলাদেশে মতপ্রকাশ: স্বাধীন অথবা শোচনীয় [এক]

ফাহমিদুল হক: শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 


বিভাগ : কোমল