মানবাধিকার কমিশন কমিশন ‘জেগে জেগে ঘুমাচ্ছে’: হাইকোর্ট

যোগফল প্রতিবেদক

24 Jun, 2020 06:13pm


মানবাধিকার কমিশন কমিশন ‘জেগে জেগে ঘুমাচ্ছে’: হাইকোর্ট
সুপ্রীমকোর্ট

ঢাকার মিরপুরে গৃহকর্মী খাদিজা নির্যাতনের ঘটনায় যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কঠোর সমালোচনা করেছে হাইকোর্ট। আদালত বলেছে, মানবাধিকার কমিশন আইনে অর্পিত তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে না। গৃহকর্মী খাদিজা নির্যাতনের মত মারাত্মক মানবাধিকার লংঘনের বিষয়ে মানবাধিকার কমিশন যে পদক্ষেপ নিয়েছে তাতে পরিষ্কার যে কমিশন তার দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ বা সচেতন নয় এবং দেশের মানবাধিকার লংঘনে প্রতিকার দিতে কমিশন আইনে অর্পিত দায়িত্ব পালনে অবহেলার পরিচয় দিয়েছে।

বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার [২৩ জুন ২০২০] এ রায় প্রকাশ পেয়েছে।

রায়ে হাইকোর্ট বলেছে, মানবাধিকার রক্ষায় কমিশন চরম অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে এবং কমিশন জেগে জেগে ঘুমাচ্ছে। গৃহকর্মী খাদিজা নির্যাতন বিষয়ে আদালত বলেছে, পাঁচ বছর ধরে অভিযোগটি ঝুলিয়ে রেখে কিভাবে কমিশন এতটা অদক্ষতা, অকার্যকর এবং দায়িত্বহীনতার কাজ করে? কমিশনকে আইনে দেওয়ানি আদালতের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে কিন্তু সেই ক্ষমতাও কমিশন প্রয়ােগ করেনি এবং এই পাঁচ বছরে খাদিজা ও তার পরিবার কমিশনের দ্বায়িত্বহীনতার কারণে পুরো সিস্টেমের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। আমাদের সন্দেহের কোন অবকাশ নেই যে, কমিশন, কমিশনের চেয়ারম্যান এবং সদস্যবৃন্দ তাদের উপর অর্পিত আইনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে।

স্মরণীয়, ঢাকার মিরপুরে গৃহকর্তার দ্বারা গৃহকর্মী খাদিজা নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনা নিয়ে ২০১৩ সালের ১০ ডিসেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মিরপুর থানা পুলিশ কি পদক্ষেপ নিয়েছে তা জানতে চেয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে চিঠি দেয়। কিন্তু কোন উপযুক্ত জবাব না পেয়ে ২০১৮ সালে হাইকোর্টে রিট করেন মানবাধিকার সংগঠন চিলড্রেন চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের পক্ষে ব্যারিস্টার আব্দুল হালিম। ওই রিটের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে গত বছরের ১১ নভেম্বর হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করে।

রায়ে সাত দফা নির্দেশনা দিয়েছে আদালত। হাইকোর্ট বলেছে, মানবাধিকার কমিশন আইনগতভাবে একটি আধা-বিচারিক কর্তৃপক্ষ। সুতরাং, ইহা অবশ্যই ন্যায়-বিচারের সকল নীতি মেনে চলতে বাধ্য। এই রায় প্রাপ্তির ৬০ দিনের মধ্যে খাদিজা নির্যাতনের বিষয়ে শুনানি সম্পন্ন করে কি প্রতিকার, ক্ষতিপূরণের সুপারিশ বা অন্য যে সব সুপারিশ প্রস্তাব করা যায় তা করতে কমিশনকে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। যদি শুনানিতে খাদিজার মানবাধিকার লংঘনের সত্যতা পাওয়া যায় তাহলে মানবাধিকার কমিশন আইনের ১৯ ধারার বিধানমতে খাজিদার যথাযথ ক্ষতিপূরণের সুপারিশ কমিশন করবে। কোন সরকারি কর্তৃপক্ষ বা কর্মকর্তা কমিশনের আদেশ-নির্দেশ কর্ণপাত বা বিবেচনা না করলে কিংবা অবহেলা করলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগের নিকট আবেদন করার জন্য কমিশনকে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া কমিশন আইনের ১৬ এবং ১৮ ধারার বিধান অনুযায়ী মানবাধিকার লংঘনের বিষয়ে অনুসন্ধান বা ক্ষেত্রমত তদন্ত করে যথাযথ সুপারিশ করার ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য কমিশনকে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।

রায়ে আরও বলা হয়েছে, খাদিজা নির্যাতন মামলার অভিযোগে কমিশন মানবাধিকার রক্ষায় এবং প্রতিকার দিতে মারাত্মকভাবে ব্যর্থ এবং আইনি অবহেলার পরিচয় দিয়েছে। কমিশন যেভাবে আদেশ দিয়েছে তা কোন ভাবেই পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় না যে এই আদেশগুলো কমিশনের আদেশ নাকি কোন সদস্যের আদেশ। উক্ত সদস্য এরুপ আদেশ আদৌ দিতে পারে কিনা। মানবাধিকার কমিশন আইনের ১১(৩) এবং ২৮ ধারার বিধানে এ ধরনের আদেশের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ। কমিশনকে এই মর্মে নির্দেশনা দেওয়া যাচ্ছে যে, কমিশন যেন সঠিক বিধি মেনে সদস্য বা সদস্যবৃন্দের পূর্ণ নাম উল্লেখ করে আদেশ প্রদান করে এবং আদেশের নকল যেন ভূক্তভোগী পেতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া কমিশন যে খসড়া বিধিমালাটি তৈরি করে রেখেছে তা অতি দ্রুত মানবাধিকার সংগঠনগুলার সাথে আলোচনা সাপেক্ষে চুড়ান্ত করে গেজেটের মাধ্যমে প্রকাশ করে।


বিভাগ : হ-য-ব-র-ল