গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যেভাবে সংকুচিত হচ্ছে

যোগফল রিপোর্ট

29 Jun, 2020 09:17pm


গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যেভাবে সংকুচিত হচ্ছে
ছবি : সংগৃহীত

গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৪৬ নম্বরে৷ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা বাংলাদেশের৷ বিশ্লেষকরা মনে করেন, দেশে গণমাধ্যম কখনওই স্বাধীন ছিল না৷ এখন স্বাধীনতা আরও সংকুচিত হচ্ছে৷ ২০২০ সালে এই ক্রমিক র্আও পিছিয়ে এখন ১৫০তম।

২০১৭ সালের তথ্যের ভিত্তিতে রিপোর্টার্স উদাউট বর্ডার (আরএসএফ)  যে প্রেস ফ্রিডম সূচক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আগের বছরের মতোই ১৪৬তম থাকলেও, এবছর নেতিবাচক স্কোর বেড়েছে৷ ২০১৭ সালের নেতিবাচক স্কোর ৪৮ দশমিক ৩৬ থেকে বেড়ে এ বছর ৪৮ দশমিক ৬২ হয়েছে৷ তাদের সূচক অনুযায়ী, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ৷ এ অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থান ভুটানের ৯৪৷

নেপালের অবস্থান ১০৬ নম্বরে, আফগানিস্তান ১১৮, শ্রীলংকা ১৩১, মিয়ানমার ১৩৭, ভারত ১৩৮, পাকিস্তান ১৩৯, থাইল্যান্ড ১৪০ এবং কম্বোডিয়ার অবস্থান ১৪২ নম্বর স্থানে৷

বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা এবং জঙ্গিদের হুমকিকে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে৷ প্রকাশিত প্রতিবেদনের বাংলাদেশ অংশে বলা হয়েছে, আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ একটি সেক্যুলার দেশ হলেও সেখানে সংবিধান ও ইসলামের সমালোচনা ভালো চোখে দেখা হয় না৷

দেশের সংস্কৃতিকে বহুত্ববাদী আখ্যা দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে মহামারির মতো করে সাংবাদিক নিপীড়নের ঘটনা এবং সেইসব ঘটনায় দায়িদের দায়মুক্তির সংস্কৃতির কারণে সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্র ও স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে৷ প্রতিবেদনে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের সমালোচনা করে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে অন্তত ২৫ জন সাংবাদিক, ব্লগার ও ফেসবুক ব্যবহারকারী বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন৷

মানবাধিকার কর্মী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহি পরিচালক নূর খান বলেন, ‘‘বাংলাদেশে স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে৷ স্বাধীন সংবাদ পরিবেশন এবং স্বাধীন সাংবাদিকতা কঠিন হয়ে পড়ছে৷ একদিকে জঙ্গি, দুষ্কৃতকারী, মাসলম্যানদের দাপট, অন্যদিকে ৫৭ ধারা বা নতুন যে ডিজিটাল আইন হচ্ছে তা সাংবাদিকদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক৷''

তিনি বলেন, ‘‘গণমাধ্যমের ওপর এই চাপ নতুন নয়৷ তবে এখন পদ্ধতিগত পরিবর্তন আসছে৷ সরকার যখন কর্তৃত্ববাদী হয়ে পড়ে, তখন যে গণমাধ্যমকে তার নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়, তাই হচ্ছে৷ মানুষ মুক্তভাবে কথা বলতে ভয় পায়৷ গণমাধ্যমও তাই এখন সেল্ফ সেন্সরশিপে চলে গেছে৷''

সিনিয়র সাংবাদিক আফসান চৌধুরী বলেন, ‘‘রিপোর্টার্স সানস ফ্রন্টিয়ার বললেও আমি মনে করি বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর জঙ্গিদের চাপ কম৷ কিছু ব্যক্তি আছে, যারা জঙ্গিদের ভয় পায়৷ কিন্তু জঙ্গিদের ভয়ে বাংলাদেশের কোনো সাংবাদিক বা গণমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ করছে না, সেটা আমি মনে করি না৷ তবে ৫৭ ধারার চাপ আছে৷ তবে এই চাপটা গণমাধ্যমের চেয়ে বেশি ফেসবুকের ওপরে৷ সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর ৫৭ ধারার চাপ প্রবল৷ আর মেইন স্ট্রিম মিডিয়ায় আছে সেল্ফ সেন্সরশিপ৷ একটা মেইন স্ট্রিম মিডিয়া চালাতে মালিকদের যে পরিমাণ টাকা লাগে, সেটা সরকারের ঘনিষ্ঠ না হলে তো সম্ভব নয়৷ যেহেতু মালিকরা গণমাধ্যম চালু করেছে নিজেদের সুবিধার জন্য, তাই তারা কেন বিপদ ডেকে আনবেন? আর এ কারণেই গণসাধ্যমে সেল্ফ সেন্সরশিপ হয়৷''

তিনি বলেন, ‘‘যেটা রিপোর্টার্স সানস ফ্রন্টিয়ার বলে না বা বলছে না তা হলো, গণমাধ্যমকর্মীরা নিজেরাও খবর সেন্সর করে৷ তারা খবর টুইস্ট করে, একপেশে খবর প্রকাশ করে, উল্টাপাল্টা খবর করে৷ সাংবাদিকদের দলীয়করণ বিষটি আসছে না রিপোর্টার্স সানস ফ্রন্টিয়ারের প্রতিবেদনে, যেটার কারণে গণমাধ্যমকে মনে হতে পারে নীরব৷ সরকারের বিরুদ্ধে লিখলেই গণমাধ্যম স্বাধীন৷ কিন্তু বিরোধী পক্ষের ব্যাপারে গণমাধ্যমে যা বলা হয়, তাকে কম স্বাধীন বলা যাবে না

তিনি আর এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘‘চাপ ছাড়া  কখনও সাংবাদিকতা করিনি৷ এই চাপ নতুন কিছু নয়৷ এখন যেটা হচ্ছে, চাপের ধরন পাল্টাচ্ছে৷ আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনায় (কোটা সংস্কার আন্দোলন) প্রমাণ হলো যে, মূলধারার গণমাধ্যম দুর্বল থেকে দুর্বলতর হচ্ছে৷ মানুষের আস্থা হারাচ্ছে৷ এর কারণ হলো, মূলধারার গণমাধ্যমে পেশাদারত্বের অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে৷''

বাংলাদেশে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালে এ বছর মত প্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে৷ আইসিটি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারা বাতিলের দাবিতে গণমাধ্যম কর্মীরা সোচ্চার থাকলেও এর অপপ্রয়োগ অব্যাহত ছিল৷ ৫৪ জন সাংবাদিক, লেখকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে৷ ১২২ সাংবাদিক নির্যাতিত এবং একজন মৃত্যুবরণ হয়েছেন৷ সাংবাদিকরা বেশি হুমকি এবং আক্রমণের শিকার হয়েছেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে৷

বাকস্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা আর্টিকেল নাইনটিন-এর বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার পরিচালক তাহমিনা রহমান বলেন, ‘‘বাংলাদেশে আাইনের মাধ্যমে বাকস্বাধীনতা রুদ্ধ করাই এখন গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ গত পাঁচ বছরে আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারায় ১৫০টি'রও বেশি মামলা হয়েছে, যার বেশিরভাগই করা হয়েছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে৷ আর নতুন করে যে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট আসছে, সেখানে কিন্তু ৫৭ ধারার গ্রাউন্ডগুলো থাকছে৷''

তিনি আরও বলেন, ‘‘গত পাঁচ বছরে ৯ জন ব্লগারসহ ২০ জনকে হত্যা করা হয়েছে মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য৷ আর তার আগের পাঁচ বছরে এই সংখ্যা ছিল  সাত৷  সুতরাং আগামী মে মাসের মাঝামঝি সময়ে হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলে বাংলাদেশের মানবাধিকারের অবস্থা রিভিউ হবে৷ সুতরাং বাংলাদেশের ট্রেন্ড যাতে নেগেটিভ না হয়, সে ব্যাপারে সরকারকে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে৷''

সূচকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে পাঁচটি পর্যায়ে ভাগ করে আরএসএফ৷ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো কালোতালিকাভুক্ত হয়৷ এর চেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে রাখা হয় লাল তালিকায়৷ কিছুটা ভালো অবস্থানে থাকা দেশগুলো চিহ্নিত হয় হলুদ রং দিয়ে৷ আর যেসব দেশ সংবাদমাধ্যমের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা ভোগ করে, সেই দেশগুলো অন্তর্ভূক্ত হয় সাদা তালিকায়৷ এবারের তালিকাতেও  কালো তালিকাভুক্ত দেশগুলোর চেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জায়গা হয়েছে লাল তালিকায়৷ সূত্র: ডয়চে ভেলে।


বিভাগ : মুক্তমত