অপসাংবাদিকতা রুখতে নৈতিকতা না আইন, কোনটি জরুরি?

যুবায়ের আহমেদ

29 Jun, 2020 09:29pm


অপসাংবাদিকতা রুখতে নৈতিকতা না আইন, কোনটি জরুরি?
ছবি : সংগৃহীত

আমি দশজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তাদের মধ্যে যারা কোনো সংবাদের কারণে নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত ভাবেন, তারা বললেন, আইন৷ বাকিরা কিন্তু নৈতিকতাকেই তুলে ধরেছিলেন৷ 

১৯৬৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এক আদালতে আলোচিত এক মামলার নিষ্পত্তি হয়৷ নিউইয়র্ক টাইমসের বিরুদ্ধে মামলাটি ঠুকে দেন আলবামা রাজ্যের মন্টগোমারির তিন কমিশনারের একজন সুলিভান৷ তার অভিযোগ, পত্রিকাটি তাদের পাতায় এমন একটি বিজ্ঞাপন ছাপিয়েছে, যাতে তার মানহানি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন৷

পূর্ণ পাতার ওই বিজ্ঞাপনটি মূলত ছিল দক্ষিণে নাগরিক অধিকার আন্দোলনকারীদের পক্ষে৷ সেখানে বলা হয়েছে যে, আন্দোলনকারীদের দমন-পীড়ন করা হয়েছে৷

এতে ক্ষুব্ধ হন সুলিভান৷ তার বক্তব্য হলো যে, সেখানকার প্রশাসনের দায়িত্বে ছিলেন তিনি৷

মামলার খবরে বিস্ময় প্রকাশ করে নিউইয়র্ক টাইমস৷ তারা বলে যে, ওই বিজ্ঞাপনের কোথাও সুলিভানের নাম পর্যন্ত নেই৷ তাহলে তিনি কেন নিজের ওপর নিচ্ছেন? এ বিষয়ে তারা কোনো সংশোধনী প্রকাশ করতেও অপারগতা জানায়৷

নিউইয়র্কের আদালত দুইপক্ষের শুনানি শেষে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, যে বিজ্ঞাপনটি প্রকাশ করা হয়েছে, তার পেছনে পরিষ্কার অভিসন্ধি ছিল পত্রিকাটির৷ এর কিছু অংশে মিথ্যাচার করা হয়েছে বলেও মনে করেছে আদালত৷ তাই মামলাকারীর পক্ষে রায় দেওয়া হয়৷ রায়ে বাদীর পক্ষে ৫ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা হয়৷

এই রায়টি খুব আলোচিত হয়৷ রায়ের পক্ষে-বিপক্ষে এখনও যুক্তিতর্ক চলে৷ তবে আদালত যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে, সেটি অনেক জায়গাতেই রেফারেন্স হিসেবে বিবেচনা করা হয়৷ কোনো গণমাধ্যম যদি কোনো মিথ্যা তথ্য পরিষ্কার কোনো অভিসন্ধি থেকে প্রকাশ করে, এবং এতে যদি কারও মানহানি হয়েছে বলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি মনে করেন, তাহলে তিনি মামলা করতে পারেন৷

কারণ, বেশিরভাগ দেশে যেমন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বা বাকস্বাধীনতার পক্ষে আইন আছে, তেমনি একজন নাগরিকেরও নিজস্ব সম্মান ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বজায় রাখার অধিকার আছে৷

এই রায় এবং পরে অনেক রায়েই যে বিষয়টি বারবার আলোচিত হয়েছে, তা হলো, সংবাদ প্রকাশের নৈতিকতা এবং রাষ্ট্র ও ব্যক্তির স্বাধীনতা ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোপনীয়তা বজায় রাখতে রাষ্ট্র দ্বারা আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখা৷

দুইটি বিষয়কে অনেক ক্ষেত্রেই ‘অজান্তে বা জেনে শুনে' গুলিয়ে ফেলা হয়৷ ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের আইনি সুরক্ষার নামে সংবাদ মাধ্যম বা বাক স্বাধীনতার ওপর অবাধ হস্তক্ষেপের উদাহরণ বিশ্বজুড়ে আছে৷ বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়৷

শুরু থেকে আজ পর্যন্ত গণমাধ্যম জনগণের স্বার্থ সুরক্ষা, সুশাসন ও গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে ভুমিকা রেখেছে এবং এখনো রেখে যাচ্ছে৷সেক্ষেত্রে এর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপকে বড় রকমের প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ বলেও মনে করা হয়৷ তবে একইসঙ্গে গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীলতার পরিচয়ও দিতে হয়৷

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সংবাদমাধ্যমকে ব্যাপকভাবে প্রপাগান্ডার মেশিন হিসেবে ব্যবহার করার পর ‘টাইম' ও ‘লাইফ' ম্যাগাজিনের প্রকাশক হেনরি লুস একটি গণতান্ত্রিক দেশে মিডিয়ার ভুমিকা কী হওয়া উচিত তা ঠিক করতে একটি কমিশন গঠন করার জন্য শিকাগো ইউনিভার্সিটির প্রেডিডেন্ট রবার্ট হাচিন্সকে অনুরোধ করেন৷

প্রচণ্ড সমালোচনার মুখেও ১২জন বুদ্ধিজীবীকে নিয়ে কমিশনটি গঠন করেন, যেখানে কোনো সাংবাদিক ছিলেন না৷ এই কমিশন পরিচিত ‘হাচিন্স কমিশন' নামে৷ ১৯৪৭ সালে সেই কমিশন এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, সমাজ গঠনে গণমাধ্যমের ভুমিকা অনস্বীকার্য৷ তাই সংবাদ মাধ্যমকেও ‘সামাজিক দায়িত্ব' নিয়ে কাজ করতে হবে৷

কমিশন তিনটি ভাগে তাদের সুপারিশ দেয়৷ প্রথমত, সরকারের কী দায়িত্ব হবে? কমিশন মনে করে যে, সমাজকেই দায়িত্ব নিতে হবে৷ গণমাধ্যমকে তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতে দিতে হবে৷ তবে কোনো গণমাধ্যম যদি তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সরকার বা আইন তাদের ব্যবস্থা নেবে, যদিও একে সর্বশেষ ধাপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে৷

দ্বিতীয়ত, তারা বলছে, গণমাধ্যম যদি নিজেরাই নিজেদের দায়িত্ব নেয়, তা হলে সরকারকে যতটুকু ভুমিকা রাখার কথা বলা হয়েছে, সেই সুযোগ আরো কমে যায়৷ সেক্ষেত্রে নিজেদের সমালোচনা নিজেরাই করে এক ধরনের সুস্থ সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব নিতে হবে৷

তৃতীয়ত, তারা জনগণকেও দায়িত্ব নেওয়ার সুপারিশ করেছেন৷ তারা বলেন, জনগণ পত্রিকা কিনবেন৷ তাই তাদের হাতেই ক্ষমতা কাকে তারা গ্রহণ করবেন বা কাকে বর্জন করবেন৷ তাই তারাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন৷

পরে অনেক তাত্ত্বিকই এই সুপারিশ গ্রহণ করেছেন৷ তারা বলেছেন, যদিও যুগ যুগ ধরে ‘কোড অব এথিক্স' আছে গণমাধ্যমের, তারপরও কমিশনের সুপারিশগুলো খুবই প্রয়োজনীয়৷

তবে এর সমালোচকরা বলেছেন, যে সামাজিক দায়িত্বশীলতার কথা বলা হয়েছে, এর অর্থ এক ধরনের দায়বদ্ধতা, দায়বদ্ধতা যতটা জনগণের প্রতি তার চেয়েও বেশি রাষ্ট্রের প্রতি৷ আর রাষ্ট্রের প্রতি যে দায়বদ্ধতা, তা পালিত না হলে আইনের খড়গ নেমে আসবে৷

এত দশক আগে যেসব বিতর্ক বা আলোচনার সমাধান খোঁজা হয়েছে, এখনও কি সেই সমাধান পাওয়া গেছে? যদি তাই হতো, এখনও সংবাদ মাধ্যম কী প্রকাশ করতে পারবে বা কী পারবে না, সেসব নিয়ে আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের শেষ নেই৷

তাই আজও সাংবাদিকতার পাঠে মিডিয়া এথিক্স বা নৈতিকতা ও মিডিয়া ল' বা আইন খুব গুরুত্বের সাথে রাখা হয়৷

তবে তাই বলে যে, বিষয়গুলো এখনও একই তিমিরে রয়ে গেছে, তা নয়৷ অনেক বদলেছে৷ সংবাদ প্রচারের মাধ্যম প্রসারিত হয়েছে৷ সেই সঙ্গে আইন বদলেছে৷ সাংবাদিকতার প্র্যাকটিস বদলেছে৷ তাই অনেক সমস্যার ধরণও বদলেছে৷ তাই এই বিবাদ একটি চলমান প্রক্রিয়া৷

কিন্তু বাংলাদেশের দিকে তাকালে বৈশ্বিক সাংবাদিকতার যে মান, সেখানে এখনও যেতে সময় লাগবে৷ একটি ছোট উদাহরণ দিই৷

খুব দূরে নয়, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশ ফিলিপাইন৷ সেখানকার রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বাংলাদেশ থেকে উন্নত নয়৷ তবে সেখানে বড় বড় সংবাদ মাধ্যমগুলোতে একটি আলাদা বিভাগ চালু আছে৷ সেটি হলো, এথিক্স ডিপার্টমেন্ট৷

প্রতিষ্ঠানটির খবর সংগ্রহ থেকে ছাপানো পর্যন্ত একটি এথিকাল গাইডলাইন আছে৷ সংবাদকর্মীদের জন্য আলাদা গাইডলাইন আছে৷ সেই গাইডলাইন কেউ ভঙ্গ করছেন কি না তা দেখার জন্য এই ডিপার্টমেন্ট, যার প্রধান সরাসরি প্রধান সম্পাদকের কাছে দায়বদ্ধ৷

বাংলাদেশে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলেই এমন করতে পারে৷ কিন্তু অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে বিভাগ তো দূরের কথা, কোনো এথিকাল গাইডলাইনই নেই৷ হয়তো অচিরেই কেউ চিন্তা করবেন এমন কিছুর৷ সেই প্রত্যাশা থাকলো৷

তবে কোনোভাবেই আইন দিয়ে সাংবাদিকতা বা বাকস্বাধীনতা রুখে দেওয়া মেনে নেওয়া যাবে না৷ কারণ, এখনকার বিশ্বে সংবাদ প্রকাশের ধরন অনেক পাল্টেছে৷ উইকিলিক্স থেকে পানামা পেপার্স এগুলোই উদাহরণ৷ সাংবাদিকতার গণ্ডি আর দেশে সীমাবদ্ধ নেই৷ এখন কোলাবোরেশনের যুগ৷ সেই সুযোগ পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত।


বিভাগ : মুক্তমত