করোনাভাইরাস

আদালত বন্ধ থাকলে করোনায় আক্রান্ত না হওয়ার ‘গ্যারান্টি’ কী?

আসাদুল্লাহ বাদল

30 Jun, 2020 02:59am


আদালত বন্ধ থাকলে করোনায় আক্রান্ত না হওয়ার ‘গ্যারান্টি’ কী?
ছবি : সংগৃহীত

‘গার্মেন্টস চলছে, পশুর হাট বসবে, আদালত চালু হবে না কেন?’ এই প্রশ্ন তুলেছেন একজন ফেসবুক পোস্টে। এরমধ্যে আইনজীবীরা আদালত চালু করার জন্য যারা মত প্রকাশ করছেন, তাদের মত এমন।

আইনজীবী আবু বকর সিদ্দিক গত ৯ মে নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে ঘরে থেকে নিরাপদ থাকার একটি ফ্রেম বেঁধেছিলেন। তার দুর্ভাগ্য, তিনি করোনায় সংক্রমিত হয়েই মারা গেছেন।

এমন অনেকেই আছেন উপসর্গ ছাড়া করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। নিরাপদ থেকেছেন, নিয়মও মেনেছেন। তবু আক্রান্ত হয়েছেন। ফেরিওয়ালা, সবজি বিক্রেতা, মুরগি বিক্রেতাসহ অগণিত ব্যক্তি দিনরাত একইভাবে আগের মতোই জীবন যাপন করছেন। তারা খুব বেশি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, এমন হিসাব কারও নিকটই নাই। সীমিত আকারে হলেও গণপরিবহণ চলছে। গণপরিবহণের সঙ্গে যুক্তরা খুব বেশি করোনায় আক্রান্ত হয়েছে, এমন খারাপ খবর শুনিনি। শুনতে চাই না। বরং পৃথিবী ও পৃথিবীর মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুক এই প্রত্যাশা করি।

সুপ্রীমকোর্টের একজন বিচারপতি করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছিলেন। তিনি সুস্থ হয়েছেন। তিনি আদালতে এসে আক্রান্ত হননি। অন্তত ৩৭ জন বিচারক করোনায় আক্রান্ত। দেশে যে পরিমাণ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে, এতে বিচার অঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি আক্রান্ত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিংবা এমন কোন গ্যারান্টি কি আছে, আদালত বন্ধ রাখলে কেউ করোনায় আক্রান্ত হবে না? একজন বিচারক করোনায় সংক্রমিত হয়ে মারা গেছেন। ১১ জন আইনজীবী মারা গেছেন। তারা কেউ রেগুলার আদালত চলাকালে আক্রান্ত হননি। বরং কেউ বাড়িতে অবস্থানকালে আবার কেউ ভার্চুয়াল আদালত চলাকালেই আক্রান্ত হয়েছেন।

৩৮ জন পুলিশ সদস্য মারা গেছে। পুলিশ আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। ডাক্তার মারা গেছে ৫৪ জন [মানবজমিন, ২৮ জুন ২০২০]। করোনা উপসর্গে মারা গেছে ১০ জন। এ কারণে তারা কি হাত গুটিয়েছে? তা হলে আদালত সংশ্লিষ্ঠদের আলাদা কি মত?

এছাড়া কারও পছন্দের হিসাবে না মিললেও করোনা ছাড়া আর কোনদিন মানুষ মরেনি এমন তো নয়। ১০০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তিও করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। ৭০, ৮০, ৯০ বা আরও বেশি বয়সী ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবেও মারা যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। হয়তো এই সময়ে কারোনার ধকল বেড়েছে। এ ছাড়া আক্রান্তের তুলনায় মারা যাওয়া সংখ্যায় অসন্তুষ্টি বাড়ানোর তেমন কি কারণ থাকতে পারে। ভ্যাকসিন নিয়ে প্রতিদিনই সুখবর আসছে। অচিরেই মানুষ করোনা জয় করবে। বরং যারা করোনাকে ‘প্রাণঘাতী’ বা ‘ভয়ঙ্কর’ হিসাবে উপস্থাপন করে তাদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ জাতীয় ট্রমা তৈরি করা মোটেও সমীচীন নয়।

গার্মেন্টস চালুর চেয়ে শ্রমঘন আর কোন প্রতিষ্ঠান আছে বলে ধারণা করি না। সেই গার্মেন্টস চালু হয়ে গেছে সাধারণ ছুটি শুরুর ১৫ দিন পরেই। গার্মেন্টস শ্রমিকও অনেকে আক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু জীবন থামানো যায় না। গার্মেন্টস শ্রমিক যদি নিয়ম মেনে কারখানায় কাজ করতে পারে, তা হলে আইনজীবী ও তাদের সহযোগীরা পারবে না কেন?

এক সঙ্গে একটি এজলাসে কতজন আইনজীবী থাকতে পারবে, একদিনে কতটি মামলা, কোন সময়ে শুনানী হবে সবই ঠিক করে দেওয়া সম্ভব। সপ্তাহের কোন দিন কোন ধরনের মামলা করা যেতে পারে, তাও ঠিক করা সম্ভব। বিস্তারিত ভেবেই আদালত চালু করা যেতে পারে।

৪ মাস আগেও করোনা নামক ভাইরাস এমন মহামারি রূপে পুরো পৃথিবীর মানুষকে ঘরবন্দি করবে এই ধারণা কেউ পোষণ করতো না। রোগের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই মানুষ পৃথিবীতে টিকে রয়েছে। এখনও টিকে থাকার চেষ্টা চালাচ্ছে। টিকে থাকবেই। 

পশুর হাট বসবে এই প্রস্তুতি চলমান রয়েছে। সামনে আর মাত্র এক মাস আছে ইদের বাকি। অন্তত ১০ দিন আগে থেকে পশু বেচাকেনা শুরু করতে না পারলে দেশের লাখ লাখ কৃষক বেকায়দায় পড়বে। ফলে তাদের পশু বিক্রির একটা ব্যবস্থা তো থাকবেই। আবার ইদ। এই ইদে কোরবানি দেওয়ার বিধান রয়েছে। গত ইদের আগে দোকানপাট শপিং মল খুলে দেওয়া হয়েছিল। করোনার কারণে কি পশু বিক্রি বন্ধ রাখবেন? যারা আদালতে আসতে দ্বিমত করছেন, তারা কি পশু কেনাবেচা করবেন না? না বন্ধ রাখবেন?

লকডাউন ব্যাপারটা মোটেও এখন হিসাবের মধ্যে নেই। রেড জোনও কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না। 

সিনিয়র আইনজীবী [সুপ্রীম কোর্ট ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নেতা] আব্দুল বাসেত মজুমদার আবেদন জানিয়েছেন, দেশের সব আদালত খুলে দেওয়ার জন্য। আরও অনেকের একই মত।

ভার্চুয়াল কোর্ট চালু হওয়ার পর প্রায় ৪৫ হাজার আসামি জামিন পেয়েছে [বাংলা ট্রিবিউন, ২৭ জুন ২০২০]। এর মধ্যে শিশু অভিযুক্ত ৬০০ জনের মতো। হাজতি আসামি ছাড়া বাকি আসামি ও অন্য মামলার ক্ষেত্রে ৩ মাসের বেশি সময় অপেক্ষায় থাকা কতটা সম্ভব?

৩০ জুন অর্থ বছর শেষ হচ্ছে। আয়কর দেওয়া ও ভ্যাট দেওয়ার চাপ আসছে। কমবেশি এই কাজগুলো করতে আদালতমুখি হতে হয়। আইনজীবীদের দারস্থ না হয়ে আয়কর দেওয়া অসম্ভব।

যদি ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে আদালত চালু রাখতেই হয়, তা হলে এর পরিসর বাড়ানো জরুরি। অন্তত আসামির আত্মসমর্পণ করার পদ্ধতি ভার্চুয়াল পদ্ধতির আওতায় আনা যেতে পারে। এই ক্ষেত্রে যে আইনজীবী আসামিকে আত্মসমর্পণ করাবেন, তিনি দায়িত্ব নিয়ে আসামিকে কোর্ট হাজতে পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন। যদি কারও জামিন মঞ্জুর না হয়। কিংবা ওই আসামিদের গ্রেপ্তার না করা বা মুক্ত রাখার জন্য  নিয়মিত আদালত চালু হওয়া পর্যন্ত আদেশ দেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে জামিনযোগ্য ধারার বিধান ও সাধারণত জামিন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে এমন মামলার জামিন শুনানীর ব্যবস্থা থাকা দরকার। এছাড়া আপোস করার বিধান রয়েছে এমন মামলাও শুনানীর বিধান রাখা জরুরি।   

স্বাস্থ্যবিধি মেনে ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে আইনজীবীদের জীবন জীবিকার স্বার্থে সুপ্রিমকোর্টসহ দেশের সব আদালতের নিয়মিত কার্যক্রম চালু করার দাবিতে ঢাকা বারে সমাবেশ করছে আইনজীবীরা। দিনাজপুরেও একই রকম সমাবেশ হয়েছে। এর আগে সুপ্রীমকোর্ট প্রাঙ্গণে একটি সমাবেশ করে আদালত খুলে দেওয়ার দাবি জানানো হয়। আদালত চালু না হলে আগামী ১ জুলাই সারা দেশে আইনজীবীরা সমাবেশ করার প্রস্তুতি নিয়েছে।

মমতাজ উদ্দিন আহমদ মেহেদী সাধারণ আইনজীবী পরিষদের আহ্বায়ক ও সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক। তিনি ঢাকা বারেরও সাবেক সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, ১৩ মার্চ থেকে সুপ্রিমকোর্ট ও ২৬ মার্চ থেকে দেশের সব আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। মার্চ মাসে মূলত আদালত চালু থাকলেও জরুরি মামলা ছাড়া বিশেষ কোন কাজ হয়নি। সেই হিসাবে ৪ মাস যাবত আইনজীবী ও তাদের সহকর্মীরা অবসর সময় পার করছেন।

গত ৩ মাস আইনজীবীরা নিয়মিত কোর্ট করতে না পারায় অধিকাংশ আইনজীবী চরম অর্থ সংকটে পড়েছেন ও বিচারপ্রার্থী জনগণের চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। নবীন আইনজীবীদের পক্ষে পারিবারিক ব্যয় সামলানো জটিল হয়ে পড়েছে।

এরমধ্যে সরকার ভার্চুয়াল বিচার ব্যবস্থা চালু করেছে। অধিকাংশ আইনজীবীর জমানো টাকা নেই। যারা আইনজীবীদের সঙ্গে কাজ করেন মোহরার হিসাবে, তারা কেউ সচ্ছল নয়। যারা আইনজীবীদের মামলা কম্পোজ করেন, ফাইল টানাটানি করেন, চেম্বার গুছিয়ে রাখেন, তারা সকলেই দুর্যোগে রয়েছেন।

বর্তমানে করোনা পরিস্থিতির কারণে নিয়মিত কোর্ট না থাকায় সাজা পাওয়া আসামি, যাদের আপিল দায়রা জজ আদালতে ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন, তারা আইনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

হাজারও আসামি পলাতক, তারা আইনের আশ্রয় লাভের সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে ফেরারি জীবন যাপন করছেন। অথবা করোনাকালে আদালত বন্ধ রাখলে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ (মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন দণ্ডের বিধান) ছাড়া বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার করার কার্যক্রম বন্ধ রাখা জরুরি। বৈশ্বিক মহামারির কারণে এতটুকু সুবিধা দিতে না পারলে মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য হুমকি হয়ে যাবে।

এনআই অ্যাক্ট ব্যতীত অন্য কোনো আইনে নতুন মামলা ফাইলিং হচ্ছে না। এ অবস্থায় আইনজীবীদের মাঝে মারাত্মক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। চলমান এনআই অ্যাক্টের মামলায় টাকা পরিশোধের শর্তে মামলা আপোস করা হয়। এমন হাজার হাজার মামলা আটকে গেছে। এসব মামলার ক্ষেত্রে নতুন আদেশ জরুরি।

থানায় মামলা দায়ের হলেও কোর্টে মামলা দায়ের হচ্ছে না। আবার হাজতি আসামি ছাড়া অন্যরা বিচার বঞ্চিত হচ্ছে। যৌতুকের মামলাসহ অনেক সিআর মামলা কোর্টে দায়ের। পারিবারিক ও দেনমোহরের মামলাও কোর্টে দায়ের হয়। এসব মামলা করতে না পেরে অনেকে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।

দেনমোহর ও ভরণ পোষণের মামলার কিস্তিতে টাকা পরিশোধ হয়। অনেকে কিস্তি না পেয়ে সন্তানসহ মানবেতর জীবন যাপন করছে। সাধারণত মাসিক কিস্তিতে টাকা পরিশোধ হয়ে থাকে। যৌতুকের মামলায়ও আদালতের সম্মতি সাপেক্ষে উভয় পক্ষ আপোস মীমাংসা করে দেনমোহর পরিশোধ করার প্রথা চালু আছে। এসব মামলা রয়েছে আদালতগুলোতে হাজার হাজার। মানি স্যুটসহ অনেক মামলা ঝুলে আছে। আবার প্রভাবশালীরা আদালত বন্ধ থাকার সুযোগে নানান ফায়দা নিচ্ছেন।

আইনজীবীরা অবিলম্বে শ্রম আদালত, বিদ্যুৎ আদালত, মোবাইল কোর্টের আপিলসহ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতগুলো খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৮, ১০০, ১০৭, ১৪৪ ও ১৪৫ ধারার কার্যক্রম চালু করতে রেগুলার আদালত চালু করা জরুরি।

৩০ জনু পর্যন্ত ভার্চুয়াল কোর্ট শেষে যেন নিয়মিত আদালত চালু করা হয় এই দাবি জোরালো করতে আইনজীবীদের প্রতি আহবান জানান অনেকে।

ভার্চুয়াল কোর্ট হলেও যাবতীয় আয়োজনের জন্য আইনজীবী ও তাদের সহযোগীদের আদালত এলাকায় যেতেই হয়। ফাইল কেনা, কাগজ কেনা, ওকালতনামা, জামিননামা পরোয়ানা ফেরতসহ আরও অনেক কাগজপত্র আদালত এলাকায়ই পাওয়া যায়। মনিহারি দোকানে এসব পাওয়া যায় না।

ফলে নিয়মিত আদালত চালু করাই সমাধান। যত নিয়ম দরকার, সব নিয়ম প্রয়োগ করে হলেও।