রুটি কলা ও ২০ কোটি টাকার অবিশ্বাস্য গল্প

ইসমাইল আহমেদ রুপন

30 Jun, 2020 09:25pm


রুটি কলা ও ২০ কোটি টাকার অবিশ্বাস্য গল্প
ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ খরচ দেখিয়েছে ২০ কোটি, প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন তুলেছেন কীভাবে কী? আর ডাক্তারদের কপালে নাকি জুটেছে কলা-রুটি! তাহলে এই টাকাটা গেলো কোথায়?

চিকিৎসকদের থাকা-খাওয়া বাবদ এক মাসে ২০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে এমন তথ্য ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে তার সত্যতা যাচাই করে জানা যায়, মূলত দুই মাসের খরচ বাবদ ২০ কোটি টাকা ব্যয় দেখিয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে জিএম কাদের ঢামেক হাসপাতালের বিল নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এতো অস্বাভাবিক কেন হবে? এটি আমরা পরীক্ষা করে দেখছি। যদি কোনো অনিয়ম হয় আমরা ব্যবস্থা নেবো।

এদিকে, ডাক্তারদের অভিযোগ তাদের খাবার হিসেবে দেওয়া হচ্ছে কলা-রুটি। প্রমাণস্বরূপ কেউ কেউ খাবারের ছবি পোস্ট করেছেন, কেউবা অভিমানের সুরে ক্যাপশনে লিখে দিয়েছেন কবিতা। অর্থাৎ, পুরো ব্যাপারটা হচ্ছে, ঢামেক কর্তৃপক্ষ খরচ দেখিয়েছে ২০ কোটি, প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন তুলেছেন কীভাবে কী? আর ডাক্তারদের কপালে নাকি জুটেছে কলা-রুটি! তাহলে এই টাকাটা গেলো কোথায়?

এখানে উল্লেখ্য, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের পুরোটা এবং শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক ইনস্টিটিউটের ৬০টি বেডকে করোনা হাসপাতাল হিসেবে  গত ১ মে থেকে চালু করে ঢামেক কর্তৃপক্ষ।

এই হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য ১৫২ জন চিকিৎসক, নার্স, অন্য স্টাফ এবং আনসারসহ প্রায় দুই হাজার কর্মী নিয়োগ দেওয়। যেহেতু এরা কোভিড-১৯ রোগীদের সেবায় নিয়োজিত, তাই তাদের বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে ডিউটিতে দেওয়া হয়। প্রতিটি গ্রুপ ৭ দিন ডিউটি করে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে যায়। তারপর পরিবারের সঙ্গে এক সপ্তাহ কাটিয়ে আবার ডিউটিতে ফেরে।

এই চিকিৎসক, নার্স ও অন্য স্টাফদের থাকা ও খাওয়ার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কর্তৃপক্ষ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ৩০টি হোটেল ভাড়া করে। তাদের যাতায়াতের জন্য ভাড়া করা হয় বেশকিছু মাইক্রোবাস। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চিকিৎসক, নার্সসহ অন্য স্টাফদের খাওয়া বাবদ জনপ্রতি প্রতিদিন ৫০০ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়।

তাদের এই থাকা, খাওয়া ও যাতায়াতের তিন খাতে গত মে ও জুন এই দুই মাসে ২০ কোটি টাকার বরাদ্দ চেয়ে ঢামেক কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাবনা পাঠায়। প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো হয় অর্থ মন্ত্রণালয়ে। সেই প্রস্তাবটি গত সপ্তাহে অনুমোদন দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়।

এই ২০ কোটি টাকার মধ্যে শুধু খাবার খরচই দেখানো হয়েছে সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা। বাকিটা আনুসাঙ্গিক খরচ। জনগণের ট্যাক্সের টাকার কী দারুণ ব্যবহার। বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি দূর্নীতিগ্রস্থ খাতটি স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের অধীনে, এই অপ্রিয় সত্যটুকু নগ্নভাবে প্রকাশ করে দিয়েছে করোনা ক্রাইসিস। করোনা আছে পুরো পৃথিবীতে, কিন্ত এমন নির্লজ্জ প্রকাশ্য দুর্নীতি কি আর কোথাও আছে?

এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্য খাতে যত হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে সেই টাকার হিসেব বের করতে পারলে এই দেশে করোনা চিকিৎসার টাকার অভাব হবার কথা ছিলো না, করোনা টেস্টের জন্য আলাদা করে টাকা নেওয়ার দরকার ছিলো না, উল্টো এই স্বাস্থ্য খাতকে প্রণোদনা দিয়ে উন্নয়নের জোয়ারে ভাসিয়ে দেওয়া যেত।

সমস্যাটা হচ্ছে, কতিপয় দূর্নীতিবাজ আমলা এবং নীতিহীন কিছু নেতারা একটা দূর্ভেদ্য দেওয়াল তৈরি করে রেখেছেন। কিছু অসাধু চিকিৎসকও এর সাথে জড়িত রয়েছেন। এই কঠিন সিন্ডিকেটের বলয় এড়িয়ে কারও চিৎকারই প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছায় না।

স্বাস্থ্য খাতের এই লুটপাট আজকে নতুন না। বছরের পর বছর ধরে এভাবেই চলে আসছে। এই পরিস্থিতিতে সৎ সরকারি কর্মকর্তারা মুখ খুলতে চাইলেও পারছেন না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে নিয়ে শুরু করে প্রতিটা স্তরে মন্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে তাদের ওপর।

এর মধ্যেই ডাক্তার ও নার্সদের মিডিয়ায় কথা বলা নিষেধ করেছে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর। কোন অধিদপ্তরের কোন কর্মকর্তা কী পরিমাণ লুটপাট করেছে সেই হিসেব দফতরগুলোর পিয়নদের কাছেও আছে। কিন্তু কারও নাম বলা যাবে না। বললে চাকরি থাকবে না। মিডিয়ায় লিখলে, ফেসবুকে লিখলে মামলা হবে, জেলে যেতে হবে। 

এরইমধ্যে এইসব ব্যাপারে লেখার কারণে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন অনেকে।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী চারপাশ ঘিরে যেসব মানুষেরা আছেন, তারা তাকে বোঝান সবকিছু ঠিক আছে। খুব সুন্দরভাবে সব পরিচালনা করা হচ্ছে। কিন্তু যখন কোনো দুর্যোগে আসল চিত্র বেরিয়ে আসে তখন সবকিছুইতেই প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। তাহলে এই ‘মাঝখানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের’ কাজটা আসলে কোথায়? শুধুই কি লুটপাটে? 

মহাভারতের দুর্ভেদ্য চক্রব্যূহ ভাঙতে একমাত্র অর্জুন সক্ষম হয়েছিলেন। হিরক রাজার দেশকে বহু আগেই পেছনে ফেলে আসা বাংলাদেশের দুর্নীতির এই চক্রব্যূহ আদৌ কি কখনও ভেদ করা সম্ভব হবে? সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। সূত্র: এগিয়ো চলো ডটকম।


বিভাগ : হ-য-ব-র-ল