এ রকম জীবনসঙ্গি হলে আর কিছু লাগে না: মাহফুজ আনাম

যোগফল রিপোর্ট

01 Jul, 2020 03:51pm


এ রকম জীবনসঙ্গি হলে আর কিছু লাগে না: মাহফুজ আনাম
মাহফুজ আনাম

তুখোড় বিতার্কিক। মুক্তিযোদ্ধা হতে সেনাবাহিনীতে। হতে চেয়েছিলেন রাজনীতিবিদ। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পড়তে হঠাৎ করেই এসে পড়লেন সাংবাদিকতায়। পাঁচ বছরের মাথায় চলে গেলেন ইউনেস্কোতে চাকরি নিয়ে। প্রথমে প্যারিসে পরে নিউইয়র্কে। টানা ১৪ বছর পর দেশে ফিরে এস এম আলীর সঙ্গে মিলে প্রতিষ্ঠা করলেন দ্য ডেইলি স্টার। 

পাকিস্তান বলে বেড়াচ্ছিল, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আসলে পাকিস্তানকে ভাগ করার ভারতীয় চক্রান্ত। এই ভুল ভাঙাতে তখন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হয়েছিল। আমি দক্ষিণ ভারতের কয়েকটি জায়গায় গিয়েছিলাম। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এসব জায়গাতে তারা বাংলাদেশ সম্পর্কে বেশি কিছু জানতেন না। বেশির ভাগ জায়গাতেই খুব আগ্রহ নিয়ে তরুণ প্রজন্ম-সাংবাদিক-শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবীরা আমার কথা শুনতেন। এক একটি শহরে ১০-১২-১৫টি সভাও করছি, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বলছি। এভাবে চলতে চলতে আগস্টের দিকে একদিন শুনলাম, আর্মিতে শর্ট সার্ভিস কমিশনে সেকেন্ড ব্যাচ নেবে। সেখানে একজন ক্যাডেট নির্বাচিত হয়ে ট্রেনিংয়ে চলে গেলাম। ঘটনাচক্রে আমাদের ট্রেনিং চলাকালেই দেশ স্বাধীন হয়ে যায়।

মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে মানুষ হিসেবে আমার বিরাট পরিবর্তন হলো। ছোটবেলায় খুব রোগে ভুগতাম। দুর্বল প্রকৃতির ছিলাম। হুট করে ঠাণ্ডা লাগত, সহজেই জ্বর হতো। ক্যাম্পে থেকে থেকে আমার ভেতরে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসে গেল। মনে আছে, সেনাবাহিনীতে এক রাতে ট্রেনিং নিচ্ছি, হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়েছে। রাতভর বৃষ্টিতে ইউনিফরমও ভিজে গেল। মনে হলো, নির্ঘাত নিউমোনিয়ায় মারা যাব। পরে তো শরীরের গরমেই কাপড় শুকাল, পরদিন আবার রুটিন লাইফে চলে গেলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম আরে, আমার তো জ্বর হলো না! কল্পনাও করতে পারবেন না, ও রকমের একজন দুর্বল প্রকৃতির মানুষের জন্য এটি কী বিরাট আবিষ্কার। তার পর থেকে বৃষ্টিতে ভিজে, এটা-সেটা করেও আর কিচ্ছু হলো না। মুক্তিযুদ্ধে আমার নিজের মুক্তির একটি যুদ্ধ হয়ে গেল।

দেশে ফিরে পরদিনই জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে দেখা করে বললাম, ‘স্যার, আমি তো মুক্তিযুদ্ধ করতে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছি; সেনাবাহিনীতে ক্যারিয়ার গড়ার কোনো ইচ্ছা আমার নাই। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যেতে চাই।’ সঙ্গে সঙ্গে তিনি কাকে যেন বললেন, ‘ওর অ্যাপলিকেশন নিয়ে নাও।’ আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এলাম।

এটি আমার জীবনের আকস্মিক এক ঘটনা। তখন আমি ছাত্র ইউনিয়নের মুহসীন হল শাখার সাধারণ সম্পাদক। শাহীন আনামের সঙ্গে জোরেশোরে প্রেম করছি। স্বাধীনের পর দেশে ফিরে সিদ্ধান্ত নিলাম, বিয়ে করব। আবার মা-বাবার ওপর থাকব, এ তো মানায় না। কী করা যায়, চাকরি খুঁজতে হবে, পয়সা রোজগার করতে হবে। একটু লেখালেখি পারি, গেলাম আবদুস সালাম সাহেবের কাছে। আব্বাকে [আবুল মনসুর আহমদ] তিনি খুব শ্রদ্ধা করতেন। শুনেই বললেন, ‘ঠিক আছে, কাল থেকে আসো।’ হয়ে গেলাম বাংলাদেশ অবজারভারের এডিটোরিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট।

আমি তো ময়মনসিংহে বাংলা মিডিয়ামে পড়তাম। ১৯৫৬ সালে আব্বা সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হলেন। তার সঙ্গে আমরাও করাচি চলে গেলাম। সেখানে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি হলাম। তার পর থেকে তো ইংলিশ মিডিয়ামেই পড়েছি। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেও আমার শিক্ষার ভাষা কিন্তু ইংরেজি। অবজারভারে যে জয়েন করলাম, সেটিও তো ইংরেজি কাগজ, বাংলাদেশ টাইমসও তা-ই। আমার ধারাটি পরে সেদিকেই চলে গেল।

সকালে ক্লাস করে দুপুর দুইটা-তিনটার দিকে অফিসে গিয়ে রাত সাতটা-আটটা পর্যন্ত থাকতাম। চাকরিও হলো, পড়াশোনাও চলল। তারপর বাংলাদেশ টাইমস বেরোল, তারা সহকারী সম্পাদকের পদে নিয়ে গেল। সেখানে আমার দায়িত্বে সম্পাদকীয় ও মতামত পাতা।

১৯৭৩ সালে। তখন আমি অবজারভারে। বেতন পেতাম ৩০০ টাকা। স্ত্রী ইউএসআইএসে চাকরি নিল। ও পেত ৬০০। ৯০০ তখন অনেক টাকা। আব্বা-আম্মার সঙ্গে থাকতাম। সব ভাই মিলে সংসারে টাকা দিতাম। যার মাইনে যত বেশি, তিনি তত বেশি দিতেন। তখনকার একটি ঘটনা বলি, ’৭৫ সালে আমাদের বড় মেয়ে হলো। সে বছর ইদের দিন আমি বিয়ের শেরোয়ানিটি পরলাম। হঠাৎ সেটির পকেটে হাত দিয়ে দেখি, ২০০ টাকা! টাকা দেখে আমাদের দুইজনের যে কী আনন্দ, চিন্তাও করতে পারবেন না। টাকাটা বিয়ের সময় হয়তো কেউ সালামি দিয়েছিলেন, মনের ভুলে আর বের করা হয়নি।

দেখলাম, এডিটোরিয়াল বিচ্ছিন্ন জায়গা, সব কিছু নিউজ রুমেই হয়। আমারও সব সময় রাজনীতির প্রতি আগ্রহ। ১৯৭৩ সালের শেষ দিকে অবজারভারে নিজস্ব প্রতিবেদক হয়ে নিউজ রুমে ঢুকে গেলাম। রিপোর্টার হলাম। ’৭৪ সালে শেখ মণি টাইমসে নিয়ে গেলেন। এই করতে করতে ১৯৭৭ সালে ইউনেসকোতে যোগ দিয়ে চলে গেলাম আমেরিকা।

বঙ্গবন্ধুর হত্যা আমাকে খুব হতাশ করেছিল। মন এত খারাপ হলো, ভাবলাম হলোটা কী? শেখ মুজিবের সমালোচনা ঠিক আছে, কিন্তু তার পরিবারসুদ্ধ মেরে ফেলা! তখন ঠিক করলাম, কিছুদিনের জন্য বিদেশে যাব। মনে মনে ঠিক করেছিলামও যে ১০ বছরের জন্য বাইরে যাব। ১০ বছরে ফেরা হয়নি, ১৪ বছরে ফেরা হয়েছে। 

’৭৭ থেকে ’৮২ পর্যন্ত প্যারিসে ছিলাম। ’৮২ সালে নিউ ইয়র্কে ট্রান্সফার হলাম। সেখানে কাজ ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার গণমাধ্যমে ইউনেসকোকে তুলে ধরা। আমার জীবনের সেটি খুবই আকর্ষণীয় সময়। তখন ইউনেসকোতে তথ্যপ্রবাহ নিয়ে ‘নিউ ওয়ার্ল্ড ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন অর্ডার’ নামে একটি বিতর্ক শুরু হলো। তখন বক্তব্য ছিল, তথ্য ডমিনেট করছে পশ্চিমা বিশ্ব। রয়টার্স, এএফপির মতো চারটি নিউজ এজেন্সিই সারা বিশ্ব ডমিনেট করত। সেখানে বলা হলো, পশ্চিমা দেশগুলো থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সংবাদ প্রবাহিত হয়; উন্নয়নশীল দেশগুলোর খবর সেখানে যায় না। ম্যাকব্রাইড কমিশন নামে একটি কমিশন হলো। শন ম্যাকব্রাইড ছিলেন আয়ারল্যান্ডের নোবেল বিজয়ী, তার নেতৃত্বে তথ্যপ্রবাহের ইস্যুতে নজর রাখার জন্য একটি কমিটি হলো। এভাবে সাংবাদিকতার মধ্যে কিন্তু আরও বেশি ঢুকে গেলাম। 

দুই বছর পর পর হোম লিভ পাওয়া যেত। আমি কিন্তু প্রতিবছর বাড়ি আসতাম; একবার ইউনেসকোর খরচে, একবার নিজের খরচে। ’৮২-তে একবার ঢাকায় আসছি। বড় ভাই মাহবুব আনাম অবজারভারে কাজ করতেন। তিনি বললেন, ‘হামিদুল হক চৌধুরী পাকিস্তান থেকে চলে এসেছেন, অবজারভার আবার নতুন করে বের করতে চান। যাবে নাকি একবার দেখা করতে?’ হামিদুল হক চৌধুরীর কথা অনেক শুনেছি, গেলাম। এক কথায় দুইকথায় কাগজ সম্পর্কে কথা হলো। আলোচনা জমে উঠল। তিনি বললেন, ‘তোমার কী কী চিন্তা আছে আমাকে লিখে জানাও।’ নিউ ইয়র্কে ফিরে গিয়ে তাকে লিখিত ভাবনা পাঠালাম। অবজারভার কিভাবে নতুন করে করা যায়। একপর্যায়ে তিনি বললেন, ‘তুমি অবজারভারে আসো।’ আমি তো এ রকম একটি সুযোগই খুঁজছিলাম। কথাবার্তা হয়ে গেল, আমি আসব এবং কিছুদিন পর কাগজটির দায়িত্ব নেব।

ওদিকে নিউ ইয়র্ক থেকে ব্যাংককে ট্রান্সফার হয়ে গেছি। ব্যাংককে আসার পর তার সঙ্গে টেলিফোনে কথাবার্তা হচ্ছে। আমার মাইনেসহ সব ঠিক হয়ে গেল। ইউনেসকো আমার এক বছরের লিভ উইদাউট পে গ্রান্ট করল, আমার জায়গায় একজন সিলেকশনও হয়ে গেল। আমাকে ফেয়ারওয়েল দেওয়া শুরু হলো। তারপর হঠাৎ হামিদুল হক চৌধুরীর কাছ থেকে কোনো ফোন আসে না। আমার ফোনও তিনি ধরেন না। আমি তো খুবই চিন্তিত। সাত-আট দিন পর ফোন ধরে তিনি বললেন, ‘বুঝছ মাহফুজ, ওইটা হলো না।’ আমি আকাশ থেকে পড়লাম, চোখে পানি এসে গেল। হামিদুল হক চৌধুরীর মতো ব্যক্তি, অবজারভারের মতো অর্গানাইজেশন। এ রকম একজন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেও যদি আস্থা রাখা না যায়! তখনই মনে হলো, নিজের কাগজ করতে হবে। অন্যের কাগজে কাজ করে আই ক্যান নট ডিপেন্ড। ওই সময়ে আপনি বলতে পারেন...আগেও মাথায় ছিল, বাট ওই সময়ের ডেলিবারেট একটা সিদ্ধান্ত হলো, ইউ হ্যাভ টু বিল্ড আ নিউ নিউজপেপার।

আমি যখন প্যারিসে, তিনি তখন ম্যানিলাভিত্তিক প্রেস ফাউন্ডেশন অব এশিয়ার এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর। প্রেস ফাউন্ডেশনের অনেক ফান্ডিং ইউনেসকো করত। ওই রকম একটা ফান্ডিংয়ের মিটিংয়ে তিনি প্যারিসে গিয়ে শুনলেন যে এখানে নতুন একটা বাঙালি যোগ দিয়েছে, নাম মাহফুজ আনাম। তিনি খোঁজ করে আমার রুমে এলেন। প্রথম এস এম আলীর সঙ্গে আমার দেখা। পরে কথা হলো, বন্ধুত্ব। পরে আমি যখন ব্যাংককে, এসএম আলী তখন কুয়ালালামপুর। পাকিস্তান আমলে পাকিস্তান টাইমস, ডনে কাজ করেছেন। হি ওয়াজ দ্য ম্যানেজিং এডিটর অব ব্যাংকক পোস্ট। তাকে বললাম, ‘আলী ভাই, আপনি তো কয়েক বছর পর রিটায়ার করবেন। চলেন, ঢাকায় গিয়ে একটা কাগজ করি। আপনি লিডারশিপ দেন।’ এস এম আলী তো সঙ্গে সঙ্গে রাজি, ‘হ্যাঁ, খুব ভালো আইডিয়া। কিন্তু আমি যেতে পারব কি না শিওর না।’ তারপর ’৮৯ সালে আলী ভাই রিটায়ার করলে তার সঙ্গে ঢাকায় আসতে রাজি হলেন ন্যান্সি ভাবি। তখন একদম স্পষ্ট হয়ে গেল, আলী ভাই এডিটর, আমি এক্সিকিউটিভ এডিটর। ’৯০ সালে আমি ইউনেসকো থেকে রিজাইন করলাম।

ইউজুয়ালি হয় কী, উদ্যোক্তারা সিদ্ধান্ত নেয়, কাগজ বের করবে, তারপর খোঁজে এডিটর কে হবে। আমাদের ব্যাপারে উল্টো হয়েছে। আমরা দুইজন পেশাদার সাংবাদিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কাগজ বের করব। আমরা তখন মার্কেটে খুঁজে শ্রেষ্ঠ উদ্যোক্তাদের বের করছি। তারা আলী ভাইয়ের মতো একটা বিরাট ব্যক্তিত্বের আহ্বানেই এসেছেন। খুবই বিচক্ষণতার সঙ্গে আমরা ইনভেস্টর সিলেক্ট করলাম, যারা ফিন্যানশিয়ালি স্ট্রং কিন্তু সৎ। এখানে এস মাহমুদ, যিনি আমাদের প্রথম ম্যানেজিং ডিরেক্টর, তার একটা বিরাট ভূমিকা ছিল। তিনি সবাইকে জড়ো করেছেন। আমাকে তিনি চিনতেন, স্নেহ করতেন। আমাদের কাগজ বের হলো ১৪ জানুয়ারি। ডেইলি স্টারের জন্ম হয়েছে ডেমোক্রেসির পুনরুদ্ধারের সময়।

’৮৬ সালে এস এম আলীর সঙ্গে যখন আমার ইন্টেলেকচ্যুয়াল একচেঞ্জ হচ্ছে, তখন আমি রেগুলার অবজারভার পড়তে শুরু করলাম। তখন আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে অবজারভার রিয়ালি ইজ আ ডেড পেপার অ্যান্ড উই হ্যাভ আ গুড গ্রাউন্ড। মানে একটা ওপেনিং ছিল ফর এ গুড নিউজপেপার। আর অবজারভারের যেটা সবচেয়ে বড় ভুল ছিল, ডেইলি স্টার বেরোচ্ছে, অথচ অবজারভারের গুণগত কোনো পরিবর্তন নেই। অবজারভার কোনো নোটিশই করছে না। তখন অবজারভারে যদি ডাইনামিক লিডারশিপ থাকত, ডেইলি স্টার দেখে তারা নিজেরা যদি পরিবর্তন হতো, তাহলে আমাদের হয়তো আরও কষ্ট করতে হতো। এমনিতেই এ ধরনের একটি পত্রিকাকেই হারাতে ডেইলি স্টারের প্রায় সাত বছর লাগছে। বোঝা যায়, মানুষ কাগজ যেটা পছন্দ করে, সেটা আঁকড়ে ধরে থাকতে চায়। খুব সহজে কিন্তু পাঠক বদলায় না। অবজারভারের ক্ষেত্রেও দেখলাম সাত বছর লাগল!

মাওলানা মান্নান একটা ইংরেজি কাগজ বের করলেন, দ্য টেলিগ্রাফ। সেখানে আমার কাগজের প্রায় ২৬ জন একসঙ্গে চলে গেল। ’৯২ সালের ঘটনা। আলী ভাই হঠাৎ একদিন সকালে উঠে দেখেন, চোখে দেখছেন না। তিনি খুব ঘাবড়ে গেলেন। ব্যাংকক গেলেন চোখ দেখাতে। তার প্লেন টেক অফ করছে, আর আমার কাছে, আমি অ্যাক্টিং এডিটর, রেজিগনেশন লেটার আসছে। আমার ২৬ জন সিনিয়র স্টাফ চলে গেল। একটা নতুন কাগজ, তখন দুই বছরও হয়নি। বিকালে ন্যান্সি ভাবিকে ফোন করলাম, ‘ভাবি, পিপল আর রিজাইনিং। আলী ভাইকে বলেন, কী করব।’ মিসেস আলী বললেন, ‘রিজাইন যারা করবে, তারা করবেই। ওর তো চোখে সমস্যা, সেটি তো মস্তিষ্কের সঙ্গে সম্পর্কিত...এ অবস্থায় আমি আলীকে বলতে চাই না। তুমি যা ভালো মনে করো করো।’

তখন যা করলাম, আমার ডেইলি স্টার জীবনের অন্যতম বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিলাম। ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইংলিশ, ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন আর জার্নালিজম থেকে ফ্রেশ ৩৫ জনকে রিক্রুট করলাম। ২৬ এর বিপরীতে আমি ৩৫ নিলাম। এটাই হলো ডেইলি স্টারের সাকসেসের অন্যতম ভিত্তি। আই গট নিউ ব্লাড, ননপলিটিক্যাল ব্লাড, প্রফেশনাল ব্লাড, ইগার টু লার্ন। তাদের মেজরিটি অংশ এখন আমার সঙ্গে আছে।

ডিপার্টমেন্টে যোগাযোগ করলাম। কাগজে বিজ্ঞাপন দিলাম, মুখে মুখে ছড়িয়ে গেল। সবাই খুব ব্রাইট ছিল, তা নয়। কোনো রকম ব্যাগেজ ছাড়া। আলী ভাই মারা গেলেন ’৯৩ সালের অক্টোবর মাসে।

’৯৩-র নভেম্বরে বোর্ড অব ডিরেক্টর ফর্মালি আমাকে অ্যাপয়েন্ট করল। ইন দ্য মিন টাইম আমি অ্যাক্টিং এডিটর ছিলাম। ১৯৯৩ এর নভেম্বরে আমি ডেইলি স্টারের সম্পাদকের দায়িত্ব নিলাম। আমার সঙ্গে এই নতুন গ্রুপ, আমারও কিন্তু অভিজ্ঞতা ছিল না। আমি যখন সাংবাদিকতা ছেড়ে যাই, ওনলি অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর ছিলাম, ’৭২ থেকে ’৭৭ মাত্র পাঁচ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা। বলতে পারেন ডেইলি স্টারের সম্পাদক একটা অনভিজ্ঞ ব্যক্তি। এস এম আলীর মতো পাহাড়তুল্য ব্যক্তিত্বের জায়গায় আমার মতো অনভিজ্ঞ ইয়াং ব্যক্তি, উইথ আ টিম, যাদের অ্যাভারেজ সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা এক-দুই বছরের বেশি নয়।

আমাদের ফিন্যানশিয়াল ক্যালকুলেশন টার্নড আউট টোটালি রং। আমাদের ধারণা ছিল, প্রতি মাসে দুই তিন হাজার সার্কুলেশন বাড়বে, পরে এটি অবাস্তব মনে হলো। ভেবেছি, ভালো কাগজ যখন প্রমাণিত হবে, তখন লোকে আস্তে আস্তে নেবে। সো, উই থট যে আমরা ১০ হাজারের সার্কুলেশনে খুব ইজিলি পৌঁছে যাব। ১৫ হাজারের সার্কুলেশন আর এক বছরে। তো, দুইতিন বছরের মধ্যে হয়ে যাবে। ইট প্রুভড ভেরি রং। প্রথম যখন শুরু করি, তখন ডেইলি স্টারের অফিস ছিল মতিঝিলে। মাসে ভাড়া ছিল দুই লাখ টাকা। ’৯১-র কথা বলছি। দুই লাখ টাকা! এটা টোটালি আনরিয়ালিস্টিক প্রোপজিশন। এক বছরের মাথায় দুই লাখ টাকার অফিস ছেড়ে চলে এলাম ধানমণ্ডির ৩ নম্বর রোডে, ৩৭ হাজার টাকায়।

আলী ভাইকে বললাম, ‘আলী ভাই, আমাদের অফিস এখানে রাখা যাবে না।’ আলী ভাই বললেন, ‘এত শিগগির যদি অফিস পাল্টাও, তা হলে স্টাফদের মোরালিটি খারাপ হয়ে যাবে।’ বললাম, ‘আলী ভাই, যখন মাইনে দিতে পারব না, তখন মোরালিটি আরও খারাপ হবে।’ এমন অবস্থাও গেছে যে মাইনে দেওয়ারও পয়সা ছিল না। আলী ভাই তার বন্ধুদের কাছ থেকে ১৫ হাজার, ২০ হাজার, ৩০ হাজার টাকা করে ধার নিয়েছেন, আমরা মাইনে শোধ করেছি। আমাদের দুইজনেরই চক্ষুলজ্জা এত বেশি ছিল যে মালিকের কাছে গিয়ে যে বলব টাকা দাও, এটি মাথায়ও ঢোকেনি; বললেই কিন্তু দিতেন। ইনফ্যাক্ট আমি তো প্রথম ১৪ মাস ডেইলি স্টার থেকে কোনো মাইনে নিইনি। ওয়াইফের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা ধার করে মাইনে দিয়েছি। ইদ এলে না, মনে হতো দুঃস্বপ্ন দেখছি। বোনাস কোথা থেকে দেব! তখন তো আবার ট্রেসিং পেপার কেটে কেটে পেস্টিং হতো।

একদিন হঠাৎ ওই ট্রেসিং মেশিনটা নষ্ট। গেলাম দোকানে। নতুন মেশিনের দাম ৫৬ হাজার টাকা। ১২ হাজার টাকা ডাউন পেমেন্ট করে বাকিটা বকেয়া রেখে মেশিন কিনে আনলাম। সেই মেশিনে পরে কাগজ বের হলো। তো, খুবই টানাপড়েনের মধ্যে গেছে। এখন ভাবি আরে, আমি কেন তখন উদ্যোক্তাদের কাছে গেলাম না। ’৯৩ সালে শুরুর দিকে আমাদের টাকা সব শেষ হয়ে গেল। তখন উদ্যোক্তারা যে টাকাটা প্রথম ঢেলেছিলেন, ঠিক তার সমপরিমাণ টাকা লোন হিসেবে দিলেন, ইন্টারেস্ট ফ্রি লোন। সেটা দিয়ে কাগজটা চলল।

হঠাৎ ইনডিপেনডেন্ট এলো। বেক্সিমকোর বিরাট বাজেটে প্রতিদিন রঙিন পত্রিকা, বিদেশি নিউজপ্রিন্ট। টেলিগ্রাফে স্টাফরা চলে যাওয়ার পর এটি ছিল আমার জন্য দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ। তখন আমার পয়সাই নেই। আমি কোথায় যাই? মোটামুটি ভয় পেয়েছিলাম। লোকাল নিউজপ্রিন্ট ইউজ করতাম। তখন শুধু প্রথম পাতাটি বিদেশি নিউজপ্রিন্টে করলাম। মানুষ বলত, পরিষ্কার শার্টের নিচে ময়লা গেঞ্জি। পরে দেখলাম, কোয়ালিটি থাকলে চাকচিক্য না থাকলেও চলে।

আমার আব্বা ৭০ বছর আগে, কলকাতার একটি সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলেন। নাম ছিল ‘ইত্তেহাদ’। এটি ছিল তার শেষ সম্পাদনা। তার আগেও তিনি সম্পাদনা করেছেন। আব্বা ছিলেন অবিভক্ত বাংলার শেষ সম্পাদক। দেশভাগের পরও তিনি ১৯৪৯ পর্যন্ত কলকাতায় বসে কাগজটি চালালেন। তারপর বন্ধ করে দিয়ে ’৫০ সালে ঢাকায় চলে এলেন। আব্বা একাধারে লেখক, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ ছিলেন। বলতে পারেন, আব্বার সাংবাদিকতাটি আমি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি এবং আমার মেয়ে তাহমিমা সাহিত্যটি পেয়েছে। এমন এক পরিবারে বড় হয়েছি, যেখানে সাহিত্য, সাংবাদিকতা, লেখাপড়ার চর্চা ছিল। আমার এক বড় ভাই [মাহবুব আনাম] বাংলাদেশ টাইমসের সম্পাদক হয়েছেন। 

বলতে পারেন, তিন নারীর প্রবেশে আমার জীবন তিনটি মোড় নিয়েছে। বিয়ে করার পর সংসারী হলাম, বড় মেয়ের জন্ম হলো ১৯৭৫ সালে; ১৯৭৭ সালে জাতিসংঘে চাকরি পেলাম, ছোট মেয়ের জন্ম হলো ১৯৮৭ সালে; ১৯৯১ সালে ডেইলি স্টার শুরু করলাম। এই নারীদের আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই জীবনে একরকম বিরাট পরিবর্তন এসেছে।

আমার জীবনের মূল্যবোধ আম্মা-আব্বার কাছ থেকে এসেছে। নারীর প্রতি সম্মানবোধও তাদের কাছ থেকে পেয়েছি। মনে আছে, আব্বা আম্মাকে এত সম্মান করতেন যে ছোট বা বড় কোনো সিদ্ধান্তই কোনো দিন আব্বাকে এককভাবে নিতে দেখিনি। যদি জিজ্ঞেস করতাম, ‘আব্বা, এটা করি?’ তিনি বলতেন, ‘তোমার আম্মা কী বলে?’ বলতাম, আম্মা রাজি। আব্বা বলতেন, ‘তাহলে আমিও রাজি।’ আম্মাও একই কথা বলতেন। ছোট ছোট সিদ্ধান্তও তারা দুইজন মিলে নিতেন। আমি আব্বা-আম্মার কাছ থেকে পেয়েছি সেলফ রেসপেক্ট, ডিগনিটি। আবেগ ও ভালোবাসা আমার স্ত্রীর কাছ থেকে পেয়েছি। বৈবাহিক জীবনে আমি অত্যন্ত সুখী। বলতে পারেন, আমার স্ত্রী হচ্ছে ডেইলি স্টারের আনসাং হিরোইন। তার বিশাল ভূমিকা আছে। তখন আমি জাতিসংঘে চাকরি করি, বিউটিফুল স্যালারি, ইন্টারন্যাশনাল লিভিং, সব মেয়েই তো সংসারের স্থিতিশীলতা চায়...কিন্তু যখন ডেইলি স্টারের কথা বললাম, সে বলল, ‘যদি এটি তোমার স্বপ্ন হয়, তাহলে তোমার সঙ্গে আমি আছি।’ এ রকম জীবনসঙ্গি হলে আর কিছু লাগে না।

আমি মনে করি, জনগণের মধ্যে সৎ নিউজপেপার বলে আমরা নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি। পাঠকরা দেখতে পারল সত্যিকার অর্থে একটি ইনডিপেনডেন্ট মাইন্ডেড নিউজপেপার। আমরা জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি যে এই কাগজটা কোনো দলেরও নয়, কোনো গোষ্ঠীরও নয়। এই কাগজটা যা করে, নিজেদের অবস্থান থেকে করে। এবং সাধারণত জনগণের পক্ষে আসে। সো ওইটাই। এথিক্যাল নিউজপেপার।

ডেইলি স্টার তো বেশ সুপ্রতিষ্ঠিত, আমি তো চাইলে গা ঝাড়া দিয়ে চলতে পারি, কিন্তু তা করি না। সব সময় চেষ্টা করি, কিভাবে আরও ভালো সম্পাদক হতে পারি, কোন বইটি পড়লে আরও কী জানতে পারব।


বিভাগ : কাঠগড়া


এই বিভাগের আরও