করোনাভাইরাস

আত্মসমর্পণ ও আগাম জামিনের সুযোগ নেই ভার্চুয়াল আদালতে

যোগফল প্রতিবেদক

04 Jul, 2020 08:36am


আত্মসমর্পণ ও আগাম জামিনের সুযোগ নেই ভার্চুয়াল আদালতে
ছবি : সংগৃহীত

করোনা পরিস্থিতিতে সীমিত পরিসরে চালু হলেও ভার্চুয়াল আদালতের সুফল অনেকে পাচ্ছেন। কিন্তু দেশের ইতিহাসে প্রথম চালু হওয়া এমন পদ্ধতিতে আসামিদের আত্মসমর্পণ কিংবা আগাম জামিনের সুযোগ রাখা হয়নি। এতে অসংখ্য আসামির জীবনে দুর্ভোগ নেমে এসেছে। তিন মাসের বেশি সময় তারা আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এই পরিস্থিতিতে সাধারণ আইনজীবী পরিষদের আহবায়ক ডক্টর মোমতাজ উদ্দীন আহমদ মেহেদী নিয়মিত আদালত চালুর দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন। তার চেষ্টায় এরইমধ্যে বেশ কয়েক জেলায় আইনজীবীরা মানববন্ধন করেছেন। তিনি লাগাতার কর্মসূচি পালনেরও ঘোষণা দিয়েছেন।

উচ্চ ও অধস্তন আদালতের একাধিক আইনজীবী জানান, পারিবারিক বিরোধ, যৌতুক, হুমকি-ধমকি, রাজনৈতিক বিরোধ ছাড়াও এ দেশে নানা কারণে অস্তিত্বহীন ঘটনায় মামলা হয়। এসব মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার হয়ে জামিন আবেদন অথবা উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন নিতে হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে অপেক্ষাকৃত লঘু অপরাধের এসব আসামি পলাতক জীবনে বিপাকে রয়েছেন। তাই ভার্চুয়াল আদালতে আসামির আইনি অধিকার নিশ্চিত ও দুর্ভোগ লাঘবে আত্মসমর্পণ করে জামিন কিংবা আগাম জামিন আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত চান আইনজীবীরা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বরগুনার বামনা থানায় গত ১০ মে দুইজনকে আসামি করে একটি মামলা হয়, যেখানে আসামিদের বিরুদ্ধে ইচ্ছেকৃত আঘাত, বলপূর্বক সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে ভীতির অভিযোগ আনা হয়েছে। গ্রেপ্তারের ভয়ে দুইজনই পলাতক জীবন পার করছেন। অন্যদিকে গত ১৯ এপ্রিল কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর থানায় এক ব্যক্তিকে হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত ও ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে মামলায় ১৬ জনকে আসামি করা হয়। আসামিরা পলাতক। পলাতক জীবন কবে শেষ হবে, তা তারা জানেন না। অথচ আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম চললে এসব আসামি আইনি আশ্রয় নিতে পারতেন।

একটি সংবাদের অনুসন্ধানকালে দৈনিক যোগফলের দুই সাংবাদিকসহ আরও এক সাংবাদিক গ্রেপ্তার করে মামলা দেয় গাজীপুর জেলার জয়দেবপুর থানার পুলিশ। মামলার বাদি পুলিশ পরিদর্শক আফজাল হোসাইন ৪ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন মর্মে অভিযোগ ছিল। অভিযোগকারী নারীকেও ওই মামলায় আসামি করা হয়েছে। তিন বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। অথচ তার বিরুদ্ধে জামিনযোগ্য ধারার অপরাধ। ওই মামলায় যোগফলের সম্পাদক আসাদুল্লাহ বাদলের নামও মামলায় জড়িত করা হয়েছে। অথচ সব অভিযোগ ভিত্তিহীন। তিনিও এখন পলাতক রয়েছেন। জামিনের সুযোগ নিতে পারছেন না।

ফৌজদারি বিধান অনুযায়ী, অপরাধমূলক কোনো ঘটনার পর ব্যক্তি তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার হলে তাকে সংশ্লিষ্ট মহানগর বা জেলার বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হাজির করা হয়। অপরাধের গুরুত্ব কিংবা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ওপর তাকে কারাগারে পাঠান দায়িত্বরত ম্যাজিস্ট্রেট। কোনো অপরাধের অভিযোগে কারও নাম এজাহারে এলে সেই ব্যক্তি অধস্তন আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইতে পারেন। অপরাধের ধরন, কিছু বিধিনিষেধ ও বাধ্যবাধকতা সাপেক্ষে আদালত জামিন মঞ্জুর কিংবা নামঞ্জুর করে। আদালতে মামলার পর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলে নির্দিষ্ট দিনে আত্মসমর্পণের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া গ্রেপ্তারের আশঙ্কা থেকে হাইকোর্টে আগাম জামিন (নির্ধারিত সময় পর্যন্ত) আবেদনের সুযোগ রয়েছে কিংবা অধস্তন আদালতে জামিন নামঞ্জুর হলে হাইকোর্টে আবেদনের সুযোগ পান আসামিরা। কিন্তু করোনার সংক্রমণরোধে ভার্চুয়াল শুনানির মাধ্যমে অধস্তন আদালতে শুধু হাজতি আসামির জামিনের শুনানিসহ সীমিত আকারে মামলার আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে। আর উচ্চ আদালতে জামিনসহ স্বল্প পরিসরে মামলার শুনানি ও আদেশ দেওয়া হচ্ছে।

আইনজীবীরা জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে জামিন আবেদনের আইনি সুযোগ বন্ধ থাকায় অনেকে পুলিশের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ করছেন। ফলে আসামিদের সাংবিধানিক ও আইনি অধিকারের বিষয়ে যতœশীল হতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে কিংবা প্রয়োজনে ভার্চুয়াল আদালতে বিশেষ ব্যবস্থায় আসামিদের আত্মসমর্পণ, জামিন চাওয়া কিংবা জামিন নামঞ্জুর হলে কারাগারে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমান বাস্তবতায় বিষয়টি একটু কঠিন হলেও অসম্ভব নয় বলে মনে করেন তারা।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘আমাদের দেশে আক্রোশের বশে বহু মামলা হয়। এসব মামলার সামর্থ্যবান আসামিরা পুলিশের সঙ্গে আপস করে ঘরে থাকেন। অন্যরা পলাতক। চাইলে আগাম জামিন অধস্তন কিংবা হাইকোর্টও দিতে পারে। সংশ্লিষ্ট আইনজীবী তার মক্কেলকে ভার্চুয়ালি উপস্থাপন করবেন। এটি কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। বিচারক আদেশ দেবেন। এ বিষয়ে অচিরেই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।’

সিনিয়র আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এএম আমিনউদ্দিন বলেন, ‘আত্মসমর্পণের বিষয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কথা বলেছি। আমি মনে করি, দ্রুত এটি করা উচিত। মামলা হলে যে কারও এ অধিকার লাভের সুযোগ রয়েছে। মহামারিতে প্রয়োজনে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে এটি করা যেতে পারে। অনেক মামলায় মানুষ আত্মসমর্পণ করে জামিন নিতে পারত। কিন্তু তাকে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে, এটা কেন? আত্মসমর্পণ করলে বিচারকরা প্রয়োজনে ডিভাইসের মাধ্যমে তাকে শনাক্ত করবেন।’

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘আত্মসমর্পণ করার মতো আসামিদের জন্য এখন কোনো পথই খোলা নেই। জামিনযোগ্য মামলারও শুনানি করা যাচ্ছে না। এজন্য আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিচার কার্যক্রম চালুর দাবি জানাচ্ছি।’

উচ্চ আদালতের আইনজীবী এএম জামিউল হক ফয়সাল বলেন, ‘বিগত কয়েক মাসে অপেক্ষাকৃত লঘু অপরাধের মামলায় অনেকে আসামি হয়েছেন। কিন্তু তারা সাংবিধানিক আইনি অধিকারটুকু পাচ্ছেন না। ফলে তারা পুলিশি হয়রানি এড়াতে পলাতক জীবন কাটাচ্ছেন। আইনি পরামর্শ চাইলেও আমরা দিতে পারছি না। এতে আমরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’

দীর্ঘদিন আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আর্থিক সংকটে পড়েছেন আইনজীবী ও তাদের সহযোগীরা।



এই বিভাগের আরও