করোনাভাইরাস

স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিয়মিত আদালত চালু সময়ের দাবি

আবু জাফর

04 Jul, 2020 03:59pm


স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিয়মিত আদালত চালু সময়ের দাবি
ছবি : সংগৃহীত

দেশে প্রথম নভেল করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। পরে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের সরকারি পদক্ষেপের অংশ হিসেবে গত ২৬ মার্চ থেকে দেশব্যাপি সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। যা পরে পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে বাড়াতে থাকে সরকার। 

সুপ্রীম কোর্টও প্রথমে ২৪ মার্চ ১৯৪ নম্বর নোটিশ মূলে ২৯ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত সকল আদালতের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। আরও পরে ১৯৭, ১৯৮, ১৯৯, ২০৩, ২০৯, ২১৯ নম্বর নোটিশ মূলে বিগত ২৮ মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি বর্ধিত করা হয়।

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে সাধারণ ছুটিতে আদালত বন্ধ রেখে ভার্চুয়াল আদালত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত ৭ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনে মন্ত্রিসভার বৈঠকে “আদালত কর্তৃক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ, ২০২০” এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। দুই দিন পর ৯ মে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ভার্চুয়াল কোর্ট সম্পর্কিত অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

এরপর গত ১০ মে শুধু হাজতে থাকা আসামিদের জামিন শুনানীর জন্য বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের ২১১ নম্বর নোটিশ মূলে ভার্চুয়াল আদালতের সূচনা হয়।

পরে গত ৭ জুন সুপ্রীম কোর্ট ৩ নম্বর নোটিশ মূলে রিমান্ড শুনানি ও বিশেষ কিছু দেওয়ানি, ফৌজদারি মামলা ও আপীল রুজু সংক্রান্তে প্র্যাকটিস নির্দেশনা প্রদান করা হলেও অদ্যাবধি সাধারণ মামলা রুজুসহ বিচারের অন্য কোন কার্যধারা ভার্চুয়াল আদালতের এখতিয়ারে প্রদান করা হয় নাই। ফলে অসংখ্য বিচারপ্রার্থী মানুষ অবর্ণনীয় কষ্টের সম্মুখীন হচ্ছেন।

স্মরণীয়, বিগত ৩০ জুন দেওয়ানি মামলা দায়ের ও আপিল দায়ের করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে সরাসরি। কিন্তু হাজতি আসামির জামিন শুনানী ছাড়া আর কোন সুযোগ বাড়েনি।

এটি নিরসনের লক্ষ্যে ২৩ জুন জাতীয় সংসদে বা.জা.স. ১৫/২০২০ মূলে “আদালত কর্তৃক তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার আইন” উত্থাপন করা হয় যা বর্তমানে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে টেকনিক্যাল মূল্যায়নের জন্য অপেক্ষামান। ওই আইনের মাধ্যমে ই-জুডিশিয়ারি বাস্তবায়ন হলে তা বিচারপ্রার্থীদের স্বল্প খরচে ও অল্প আয়াসে ন্যায় বিচার প্রাপ্তিতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদী।

তবে পূর্ণাঙ্গরূপে ই-জুডিশিয়ারি বাস্তবায়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, জনসচেতনতা তৈরি, স্টেকহোল্ডারদের প্রশিক্ষণ প্রদান করার মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও কার্যকর ভার্চুয়াল আদালত প্রতিষ্ঠা সময়সাপেক্ষ বিষয়।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ অনুসারে আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইন অনুযায়ী ও কেবল আইন অনুযায়ী ব্যবহার লাভ দেশের প্রত্যেক নাগরিকের বাংলাদেশে অবস্থানরত যেকোন ব্যাক্তির মৌলিক অধিকার। অথচ বিগত প্রায় তিন মাস যাবৎ অধিকার বঞ্চিত, ফৌজদারি অপরাধের শিকার হওয়া ব্যক্তির অভিযোগ দায়ের এবং অভিযুক্ত কোন ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থন এর মাধ্যমে আইনের আশ্রয় লাভ করতে সক্ষম হচ্ছেন না। এরূপ অবস্থায় সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে এবং মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে।

গত ২৮ জুন দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশ হওয়া একটি প্রতিবেদনে দেখা যায় শুধু মে মাসে ১৩ হাজার ৪৯৪টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার কারণে বাংলাদেশের বেশিরভাগ দরিদ্র, নারী ও শিশু ভিক্টিমরা নিকটস্থ থানায় প্রতিকার না পাওয়ার প্রমাণিত ইতিহাস রয়েছে।

এছাড়াও দ্যা ডেইলি স্টারে ১৮ জুন প্রকাশ হওয়া প্রতিবেদনে আইনমন্ত্রীর বরাত দিয়ে বলা হয়, দেশের আদালত সমূহে ৩৫ লাখ ৮২ হাজার ৩৪৭টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

এই অবস্থায় ভার্চুয়াল আদালতের ওই কার্যধারা পূর্ণাঙ্গরূপে শুরুর আগ পর্যন্ত মামলাজট নিরসন, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজনে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন করে জনগণের ন্যায় বিচার প্রাপ্তির মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার নিমিত্তে আদালতের কার্যক্রম চালু করা এখন সময়ের দাবি।

এরূপ পরিস্থিতিতে প্রয়োজনে আলাদা শিফটে, বিচারপ্রার্থীদের অপ্রয়োজনীয় উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখে, হলফনামা সম্পাদন সংক্রান্ত কার্যভার নোটারি পাবলিককে অর্পণ করে আদালত প্রাঙ্গনে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে অডিয়ো ভিজ্যুয়াল সরঞ্জাম ব্যবহার করে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে আদালতের নিয়মিত কার্যক্রম চালু করা অত্যন্ত জরুরি।

এই অবস্থায়, এই বিষয়ে আইনপ্রণেতা, বিচারক, আইনজীবী, গণমাধ্যমকর্মী ও সচেতন বিচারপ্রার্থীদের সুচিন্তিত, যৌক্তিক, কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া একান্ত জরুরি।

আবু জাফর; অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। সূত্র: ফেসবুক ওয়াল।


বিভাগ : ভার্চুয়াল