কামারপুত্র কামার হতে শরম পায়

আসাদুল্লাহ বাদল

26 Jan, 2020 02:46pm


কামারপুত্র কামার হতে শরম পায়
ধিরিন্দ্র কর্মকার

যে সব পেশা বিলুপ্ত হতে পারে এর একটি কামার বৃত্তি। কামার বৃত্তিতে যুক্ত ব্যক্তিকে কর্মকার বলা হয়ে থাকে। সাধারণত কর্মকার ‘কামার’ হিসাবে পরিচিত। এমনকি সাহিত্য চর্চায়ও কামার শব্দটির আধিক্য বিদ্যমান। পারিবারিক গণ্ডি বা বংশ পরম্পরায় কামারের পেশা চালু আছে এখনও। কিন্তু ভবিষ্যতে এই পেশা চালু থাকবে কি না বা বংশানুক্রমিক কেউ কামার পেশা গ্রহণ করবে কি না এটি অনিশ্চিত বলা চলে। নতুন প্রজন্ম বাপদাদার পেশাদারত্বের প্রতি মোটেও আগ্রহ প্রকাশ করে না। বরং খোলনলচে পাল্টে ফেলতে চায়।

ধিরিন্দ্র কর্মকার (৫০) পৈত্রিক সূত্রে কামার বৃত্তি গ্রহণ করেছেন। বয়স যখন ৮-১০ তখন থেকে পিতার সঙ্গে দোকানে, বাজারে ঘুরে ঘুরে কামারের পেশায় যুক্ত হন। কামারগিরি শেখা-ই ধিরিন্দ্রের ধ্যান জ্ঞান ছিল। ধিরিন্দ্রের পিতা সুরেশ কর্মকার (৯০) প্রায় ১৫ বছর আগে পেশা ছেড়ে দিয়েছেন বার্ধক্যজনিত কারণে। সুরেশের পিতাও কর্মকার ছিল। সুরেশ কর্মকারের পৈত্রিক ভিটা গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের পাকুরদেশি গ্রামে। তিনি সারাজীবনই কামারগিরি করেছেন বাজারে বাজারে। বাড়িতেও কাজ করেছেন। একটি হাপর দিয়ে কামারগিরি চালিয়েছেন। তখন আধুনিক হাপর ছিল না। এখন হাপরে বৈদ্যুতিক সংযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। একাধিক হাপর কেনারও সুযোগ ছিল না। এখন সাধারণত নির্ধারিত বাজারে কামারের দোকান চালু হয়েছে। সুরেশের এক পুত্র বীরেন্দ্র বোর্ডবাজারে সেলুনের দোকান দিয়েছেন। বীরেন্দ্র মনে করেন কামারগিরির চেয়ে কম পরিশ্রমে সেলুন চালানো যায়। উপার্জনও একটু বেশি। তিনি পৈত্রিক পেশা ত্যাগ করেছেন অধিক আয় রোজগারের কথা ভেবেই। আরেক পুত্র নারায়নগঞ্জে চাকুরি করেন। একমাত্র ধিরিন্দ্র বাপদাদার পেশায় যুক্ত রয়েছেন। কিন্তু ধিরিন্দ্রের সন্তান অন্তর কর্মকার (২০) কামারবৃত্তিকে শরম পান বলে মনে করেন। অন্তর ভাওয়াল কলেজে বিএ ক্লাসে পড়াশোনা করছেন। দোকানে আসতেও দ্বিধাবোধ করেন। বিশেষ প্রয়োজনে দোকানে আসলে বন্ধুবান্ধবদের চেহারা দেখে দোকান এড়িয়ে চলেন বেশিরভাগ সময়। যত শ্রম আর টাকা লাগে অন্তরকে শিক্ষিত করে চাকুরিতে দিতে চান ধিরিন্দ্র। চাকুরি না হলেও অন্তত ভাল ব্যবসার টার্গেট।

ধিরিন্দ্র নিজেও ১৪-১৫ ঘন্টা পরিশ্রম করেন নিজের পেশা টিকিয়ে রাখতে। কিন্তু নিজের সন্তানকে কামারবৃত্তিতে যুক্ত করতে চাননা। কুড়ানি, নিড়ানি, কাস্তে, কোদালসহ লোহার তৈরি সব যন্ত্র তৈরি হয় ধিরিন্দ্রের দোকানে। অন্তর দুয়েকটা হাতুড়ির বারি মারতে পারলেও তেমন কোন যন্ত্র তৈরি করতে শিখেনি।

কামারগিরি টিকিয়ে রাখতে কয়লা ও লোহার প্রয়োজন হয়। কিন্তু ডিজিটাল সময়ে এসবের যোগান কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে কেবল কোনাবাড়িতে লোহা ও কয়লা পাওয়া যায়। দৈনিক কমপক্ষে দেড় হাজার টাকা দরকার দোকান চালাতে। একজন কর্মচারি দিয়ে দোকান চালানো গেলেও দুইজন কর্মচারি হলে ভালভাবে দোকান চালানো যায়। কর্মচারি সাধারণ খাবার খরচসহ ৫০০ টাকার নিচে কাজ করতে রাজি হয় না। নিজের দিকে বিবেচনা করে, দোকান ভাড়াও অন্যান্য প্রয়োজন মিটাতে আরও এক হাজার টাকা দরকার। কিন্তু সব সময় দেড় হাজার টাকার কাজ পাওয়া যায় না। অবশ্য কখনো কখনো বড় অর্ডার পাওয়া যায়। কিন্তু অর্ডারের চাপ সামলানো যায় না। তিনি নিজে তার তৈরি জিনিসে নাম লিখে দেন বলেও জানান। কাপাসিয়া, মঠখোলা, হাতিরদিয়ায় তার জিনিসপত্র বেশি চলে বলে জানান ধিরিন্দ্র।

সন্ত্রাসীরাও দোকানে আসে কখনো। তাদের কোন অর্ডার কোন দিন রাখেননি ধিরিন্দ্র। বরাবর মাফ চেয়ে নিস্কিৃতি নিয়েছেন তিনি। কারণ তার জানা মতে সামান্য লোভে বড় দা তৈরি করে একাধিক কামার জেল খেটেছেন। অবশ্য চাপাতি বা ছোড়া বানানোর চাপ থাকে। বিশেষত ইদের সময় কিছু লোহার তৈরি জিনিসপত্রের জন্য মাপজোঁকের বিষয়টি নিশ্চিত করা যায় না। আবার কেউ ক্ষুদ্র দা ছোড়া দিয়েও অপকর্ম করার সুযোগ পেয়ে থাকে। যিনি লোহার জিনিস তৈরি করেন তার আসল মতলব কি এটি অন্য কেউ জানতে পারে না।

গ্রামের মধ্যে দোকান থাকার কারণে দীর্ঘ সময়ের পরিচিতজনরা যেসব কাজ করাতে চায় তাতে দাম দরের বিষয়ে বেশি আপত্তি করা যায় না। এমনকি খুশি হয়ে যা দেয় তাই নিতে হয়। ফকির জালাল র্ধীরাশ্রমের বাসিন্দা। তার বয়স ৬৬ বছর। আগে ধিরিন্দ্রের পিতার নিকট থেকে লোহার কাজ করাতেন। এখন ধিরিন্দ্র করেন। উভয়ের নিকট কাজ করাতে মজুরির জন্য সমস্যা হয়নি।

ধিরিন্দ্র পেশাদারত্ব রক্ষায় ঋণ নিয়ে গতিশীল ব্যবসা চালানো সম্ভব বলে মনে করেন। সেক্ষেত্রে লাখ পাঁচেক টাকা হলেই সম্ভব। কিন্তু কামারের দোকোনের জন্য কোন ঋণের ব্যবস্থা আছে কি না এটি তার জানা নেই। এখন মাত্র দুই হাজার টাকা মাসিক ভাড়া দেন। দোকানের অগ্রিম দেওয়া আছে ১৫ হাজার টাকা। এই গণ্ডি বৃদ্ধি করলে ১০-২০জন কর্মচারি খাটানো সম্ভব বলেও তিনি মনে করেন। কামারের দোকানের কিছু যন্ত্রপাতি বদল হয়েছে। এখন বিদ্যুতের সাহায্যে কিছু কাজ করা যায়। আবার লোডশেডিং হলে পুরাতন পদ্ধতিই ভরসা। অদূর ভবিষ্যতে একইরকমভাবে কামারগিরি চালু থাকবে না নতুন কোন পদ্ধতি চালু হবে এ নিয়ে ধিরিন্দ্র সংশয়ে আছেন। তার ধারণা ইউরোপ আমেরিকায় নিশ্চয়ই আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে কামারের বদলে নতুন যন্ত্রপাতি তৈরি করানো হয়। বাংলাদেশে এরকম প্রযুক্তি আসলে এমনিতেই কামারগিরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আবার এখনো দেশের ৭০ ভাগ মানুষ গ্রামেই বাস করে। মানুষের অভ্যাসও মূলত পুরানো এসব যন্ত্র ব্যবহারেই আটকে আছে। আমাদের দেশেও কিছু যন্ত্র পাওয়া যায় যেসব দিয়ে বিকল্প পদ্ধতিতে কাজ করা যায়। কিন্তু অভ্যাসের কারণে এখনও ওইসব আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়েনি। সময়ই বলে দিতে পারে কামারের তৈরি জিনিসের চাহিদা কতদিন টিকে থাকবে।

সাধারণ জ্বরের রোগী আর ধিরিন্দ্রের শরীরের তাপ একইরকম থাকে। আগুনের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে কখন তাপ বেশি, কখন তাপ কম এটি তার মনে হয় না। গরমের দিনে কমপক্ষে দুইবার গোসল করতে হয়। শীতের দিনে কেবল ভিন্ন। উভয় হাত একত্রে কাজে লাগাতে হয়। এক হাতে হাতুিড় আরেক হাতে হাপর টানতে হয়। লোহা যখন লাল হয়ে যায়, তখন হাতুড়ি পিটানোর তাল চলে আসে। এ যেন জনম জনমের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। রুটি রুজি তো আছেই। ধিরিন্দ্র ভাবেন কামারগিরি কি আসলেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে?

ব্যাংক ঋণ চালু হলে ধিরিন্দ্র ব্যবসার গণ্ডি বাড়াতে পারবেন। পেশাও টিকাতে পারবেন বলে আশাবাদী। ৩০ জুলাই ২০১৮।


বিভাগ : ফিচার